আধুনিক সভ্যতার এ সময়ে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। যে কারণে নাগরিকদের বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) নির্ধারিত মূল্যের বিনিময়ে জনগণকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। আগে তারাই শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও সরকার ব্যক্তি খাতকেও এক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করে। আর এতেই বিপত্তি দেখা দেয়, বেড়ে ওঠে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয়। বিপিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেন্টাল ও আমদানি করা বিদ্যুতের মাধ্যমে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখে। কিন্তু এতে তাদের বিপুল ব্যয় বেড়ে যায়। বিশেষ করে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে অধিক দামে বিদ্যুৎ কিনে গ্রাহককে স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করতে গিয়েই সমস্যার শুরু। এটি হয়েছে ভ্রান্ত নীতি ও ভুল পরিকল্পনার কারণে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাবদ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ব্যয় বেড়েছে ২২ হাজার কোটি টাকা। বর্ধিত এ ব্যয়ের ৯৬ শতাংশই হয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আইপিপি) থেকে বিদ্যুৎ কেনায়। রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থার লোকসানের পরিমাণ প্রতি বছরই বেড়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে লোকসানের পরিমাণ ৬৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে বিপিডিবির বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আগামী বছর এ ব্যয় আরো বাড়লে সরকারের পক্ষে তার জোগান দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দেয়ার শঙ্কা রয়েছে, অর্থনৈতিক অগ্রগতিও স্থবির হয়ে পড়তে পারে।
বিদ্যুৎ খাতে ক্রমাগত লোকসানের পেছনে মূলত দুটি কারণ দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, একদিকে বেসরকারি খাতে বিশেষত রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে, আবার প্রত্যাশিত হারে চাহিদা না বাড়ায় বসিয়ে রাখতে হচ্ছে নতুন-পুরনো অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র। উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হলেও চাহিদা না থাকায় এত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুতের চাহিদা না থাকায় কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। তবে অলস বসে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ঠিকই কোটি কোটি টাকা ভাড়া দিতে হয়। অলস বসে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ যুক্ত হয়ে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। পিডিবির হাজার কোটি টাকা লোকসানের বোঝা জনগণের ঘাড়ে এসে পড়েছে। এটিকে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনলে বিদ্যুৎ খাতে লোকসান অনেক কমে যেত। এদিকে সঠিক পরিকল্পনার ঘাটতি এবং চাহিদা না থাকার পরও একের পর এক কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে জ্বালানি খাতে সংকট আরো প্রকট হয়েছে। এ খাতের আরেকটি সমস্যা হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে যেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েও সুফল মিলছে না। বিদ্যুৎ বিভাগের মহাপরিকল্পনায় বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, জনবসতি, জাতীয় সক্ষমতা এবং জনস্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে; আমদানি ও ঋণনির্ভরতাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় অতিরিক্ত চাহিদা নিরূপণ করা হয়েছে। এসব ভ্রান্ত নীতির কারণে বিপিডিবিকে ব্যাপক লোকসান করতে হয়েছে। আর ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকারের কাছ থেকে কখনো ভর্তুকি আবার কখনো ঋণ করতে হয়েছে।
বিপিডিবির বিদ্যুৎ কেনায় খরচ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল পরিশোধেই দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়কৃত অর্থের অর্ধেক চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র ভাড়া ক্যাপাসিটি চার্জ বা সক্ষমতার অব্যবহূত চার্জ পরিশোধ করতে গিয়ে বিপিডিবির আর্থিক ঘাটতি বছরের পর বছর বেড়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তির নানা শর্ত থাকায় বিপিডিবি এখন এ পথ থেকে চাইলেও বের হয়ে আসতে পারছে না। এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাবদ সংস্থাটির ব্যয় বিদ্যুৎ বিক্রির আয় থেকে বেশি হচ্ছে। ফলে সংস্থাটির ক্রমপুঞ্জীভূত লোকসান বাড়ার পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা কমছে। আগামীতে যাতে পিডিবি আর ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য সরকারকে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ও আইপিপি খাতের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কত বছর ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হবে, কী পরিমাণ অর্থ দেয়া হবে প্রভৃতি বিষয়ে নীতি সংস্কার করা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নের সঙ্গে বিনিয়োগ, উৎপাদন ব্যবস্থা, জীবনমানের উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভরশীল। গত এক দশকে এ খাতে সরকারের অর্জন অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে এক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার বিষয়টি জনমনে বড় ধরনের সংশয় সৃষ্টি করেছে। বিদ্যুৎ খাতের অ্যাডহকভিত্তিক পদক্ষেপ ও অপরিণামদর্শী চুক্তিগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে এবং দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিদ্যুতের দাম অনেকটা নির্ভর করে প্রাথমিক জ্বালানি মূল্যের ওপর। সংগত কারণে প্রায় সব দেশই দেশীয় উৎসের জ্বালানি প্রাপ্যতার নিরিখে বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা করেছে। কারণ তারা জানে আমদানিনির্ভর জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সহনীয় দামে তা সরবরাহ করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন প্রভৃতি দেশ তাই টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন করেছে। দেশীয় জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। সেজন্য জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিদ্যুতের দাম আমাদের চেয়ে কম। এমনকি প্রতিবেশী ভারতও প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, পানিসম্পদ, সৌরশক্তিসহ দেশীয় জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং সুলভে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। বাংলাদেশেও কৌশল একসময় একই রকম ছিল। স্বল্পমূল্যের প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় অর্থনীতির চাকা স্বচ্ছন্দে চালু রেখেছে। পরবর্তী সময়ে গ্যাস সংকট জ্বালানি খাতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর বেড়ে যায় নির্ভরতা। এর ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা জারি রাখা হয়। এখনো আমদানিনির্ভরতা বিদ্যমান। প্রাকৃতিক গ্যাস কিংবা অন্য জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানে খুব একটা গতি নেই। ফলে এলএনজি আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকেই এগোচ্ছে সরকার, যা আরো একটি ভ্রান্ত নীতির উদাহরণ। আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারের উদ্বায়িতা প্রবল। আকস্মিক দাম ওঠানামা করে। এই বহিঃস্থ অভিঘাত মোকাবেলায় সমর্থ নয় আমাদের জ্বালানি খাত। উচ্চমূল্যে আমদানীকৃত এলএনজি দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সহনীয় দামে পৌঁছানো নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা। কাজেই আমদানির পরিবর্তে দেশীয় উৎসের জ্বালানির ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। অন্য দেশের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে এক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
ঋণ ও ভর্তুকির কারণে অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা ও গ্রাহকের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে বিদ্যুৎ খাতের বিদ্যমান নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে বিদ্যুতের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি করার সময় ক্যাপাসিটি চার্জ বাদ দেয়ার পাশাপাশি পুরনো, অদক্ষ ও ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব বন্ধ করতে হবে। ২০ বছরের কম মেয়াদ রয়েছে এমন রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র অনুমোদন থেকে বিরত থাকতে হবে। যেহেতু বেসরকারি কোম্পানিগুলো তাদের বিনিয়োগের বিপরীতে উল্লেখযোগ্য রিটার্ন পাচ্ছে, তাই এ খাতের স্থিতিশীলতার স্বার্থে এটিকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা প্রয়োজন। যদি এ খাতে স্থিতিশীলতা আনতে সরকার ব্যর্থ হয় তাহলে খুচরা গ্রাহক, শিল্প ও গৃহস্থালি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম অনেক বেড়ে যাবে এবং এতে শিল্প খাতে ধীরগতি তৈরি হবে; যা সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতিকেও ধীর করবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে বিপিডিবির বিপুল অংকের আর্থিক ঘাটতির মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে আগামী বছর আরো ৫ হাজার ১০১ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যুক্ত হচ্ছে। চাহিদা না থাকলে এসব কেন্দ্রে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ সরকারকে বিপুল অংকের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এতে আগামী বছর সরকারের বিদ্যুৎ খাতের বড় অংকের আর্থিক বোঝা আরো ভারী হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, এরই মধ্যে বিপিডিবির কাছে তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওনা হয়ে গেছে। লোকসানের বোঝা কমাতে বিপিডিবিকে এখন জ্বালানিসহ সংশ্লিষ্ট খাতগুলোয় সাশ্রয়ের কথা ভাবতে হবে, কিন্তু সাশ্রয়ের কথা ভাবতে গিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে সেটি আবার জনগণের ভোগান্তি বাড়াবে। এজন্য সরকারকে বিপিডিবির ব্যয় কমানোর দিকেই মনোযোগী হতে হবে।
বিদ্যুতের সংকট আমাদের এ বছর যথেষ্ট ভুগিয়েছে, সে হিসেবে সম্ভাব্য সংকটের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আগামী বছর যেন লোডশেডিংয়ের ভয়াবহতা তৈরি না হয় সেজন্য আগাম প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। স্পট মার্কেট থেকে কেনা এলএনজি ও ডিজেলের মাধ্যমে বিদ্যুতের খরচ অনেক বেশি পড়ে। সে হিসেবে এইচএফও, দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি ও কয়লা ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ অর্ধেকে নেমে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবহার করলে সরকারের ১৬ থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকার ব্যয় সাশ্রয় হতে পারে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এতদিন ধরে বিপিডিবি যে ভুল পথে হেঁটেছে, এখন তারই ফলাফল দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্তের কারণে বহু দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছে। বিপিডিবি এরই মধ্যে আগামী বছরের জুনের মধ্যে ডিজেলভিত্তিক আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি চার্জ এড়াতে ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ ভিত্তিতে খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে সঙ্গে সিস্টেম লস এড়ানোর ক্ষেত্রে তদারকি বাড়ানো এবং কম কার্যকারিতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিপিডিবি। আমরা প্রত্যাশা করি দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য অব্যাহত লোকসান কমানোর ক্ষেত্রে বিপিডিবি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে সময়োপযোগী কর্মপন্থা গ্রহণ করবে।










