বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার নিয়ে গঠিত একটি প্রস্তাবিত আঞ্চলিক জোট হচ্ছে বিসিআইএম। এটি মূলত দেশগুলোর মধ্যে একটি অর্থনৈতিক করিডোর; যা মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্য হয়ে ভারত ও চীনকে একটি করিডোর হিসেবে সংযুক্ত করা হবে। প্রস্তাবিত করিডোরটি এ অঞ্চলের ১৬ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে থাকবে। সড়ক, রেল, জল ও আকাশপথ সংযোগের মধ্য দিয়ে এই মাল্টিমডেল কানেকটিভিটি বাণিজ্য, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিসিআইএম করিডোরে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে বাংলাদেশ ছিল চীন সরকারের নেয়া বৈশ্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) ছয় করিডোরের একটি। প্রকল্পটি চীনে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (এক অঞ্চল, এক পথ) নামে পরিচিত। 

আগামী কয়েক দশক ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোয় ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে চীন। অন্যদিকে চীনের দাবি, সিল্করোড ইকোনমিক বেল্ট যা চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডের স্থলভাগের অংশ এবং সাগরে মেরিটাইম সিল্ক রুট (সামুদ্রিক রেশমপথ) শুধুই অর্থনৈতিক উদ্যোগ। যদি দেশটির নীতিমালাগুলো খুব ভালোভাবে সমন্বিত করা হয় তাহলে এ বিনিয়োগের একটি বড় অংশ নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। 

বিআরআইয়ের প্রথম রুটটি মধ্য চীনের শিয়ান থেকে শুরু হয়ে উত্তর ইউরোপের রটারডাম পর্যন্ত গেছে। এর সুবাদে মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ইউরোপ এবং রাশিয়া থেকে মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপ পর্যন্ত পথ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে একটি সামুদ্রিক পথ রয়েছে, যা ভূমধ্যসাগরকে দক্ষিণ চীন সাগরের সঙ্গে যুক্ত করছে, এটি চীনের প্রস্তাবিত একবিংশ শতকের মেরিটাইম সিল্ক রুটের তিনটি বিকল্প সমুদ্রপথের প্রথম; এই রুটটি বিশাল এক পথ, যা সুয়েজ খাল, ভারত মহাসাগর, মালাক্কা প্রণালি এবং অন্যান্য আরো অনেক গন্তব্যে প্রসারিত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বিআরআই প্রকল্পের সঙ্গে ৬৫-৭০টি দেশ যুক্ত থাকবে এবং মোট ৪৪০ কোটি মানুষ এখান থেকে লাভবান হবে। প্রকল্পটি সমাপ্ত হতে ৩০-৩৫ বছর পর্যন্ত সময় লাগবে। 

ভারত ও চীনের অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষায় বঙ্গোপসাগর খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। ফলে উভয় দেশই একই কৌশলগত অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। বঙ্গোপসাগরে ভারতের চার হাজার কিলোমিটার উপকূল রয়েছে। যদিও এ উপসাগরের কাছে চীনের কোনো উপকূল নেই। বঙ্গোপসাগরে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে চীন ও ভারত উভয়েই নিজেদের শক্তি বাড়াচ্ছে। তারা নিজেদের স্বার্থের বিষয়গুলো প্রচার করতে ও সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে বঙ্গোপসাগর কেন্দ্র করে চীন ও ভারতের স্বার্থের বিষয়গুলো সবার সামনে চলে এসেছে। 

একটি মেগা অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে বিআরআইয়ের সম্ভাবনা 

বিআরআইয়ের ছয়টি করিডোরের প্রথম রুটটি মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপের পূর্বাঞ্চল, রাশিয়া এবং ইউরোপের কেন্দ্রস্থল পর্যন্ত বিস্তৃত। এর বাণিজ্য ও পরিবহন অবকাঠামোগুলো অর্থনীতি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং মুদ্রার সঙ্গে পরিপূরক করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক জোট বৃদ্ধি করা হবে, যা ভ্যাকসিন সহযোগিতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরো বৃদ্ধি করবে। অন্যদিকে ভূমধ্যসাগরকে দক্ষিণ চীন সাগরের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য বিআরআই উদ্যোগে একটি সামুদ্রিক পথও রাখা হয়েছে। এই রুট তিনটি মেরিটাইম সিল্ক রোডের মধ্যে একটি, যা সুয়েজ খাল, ভারত মহাসাগর এবং মালাক্কা প্রণালির মতো বিভিন্ন গন্তব্যের মধ্যে সম্প্রসারিত। বিশ্ব সংযোগের জন্য মেরিটাইম সিল্ক রোডের অন্য দুটি বিকল্প সমুদ্রপথ হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় সমুদ্রপথ এবং সুমেরু অঞ্চলের সমুদ্রপথ। 

বিআরআইয়ের প্রভাব বুঝতে হলে শীতল যুদ্ধকালীন সময়ে মার্শাল প্ল্যান অথবা ইআরপি এইডের মতো পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকল্পের হাত ধরে ধাপে ধাপে ইউরোপীয় কমন মার্কেট—ইউরোপীয় কমিশন—ইউরোপীয় ইউয়ন গঠন প্রক্রিয়া এবং পূর্বাঞ্চলীয় ইউরোপে নেয়া সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মলোটভ প্ল্যানগুলো স্মরণ করতে হবে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে বোঝা যায়, মেগা অবকাঠামো প্রকল্পগুলো প্রায়ই অর্থনৈতিক বিস্তারের মাধ্যমে একটি বড় বাজারকে একীভূত করে; যা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ায় এবং জনসাধারণের জীবনমান উন্নত করে। তবে এ ধরনের সমন্বিত অঞ্চল অথবা চুক্তির সদস্যদের মধ্যে আধিপত্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতাও বৃদ্ধি পায়। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউরোপের জনগণকে সহায়তার জন্য মার্শাল প্ল্যান প্রকল্প চালু করে যুক্তরাষ্ট্র। এটি ইউরোপিয়ান রিকভারি প্রোগ্রাম নামেও পরিচিত। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মার্শাল প্ল্যানের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপজুড়ে কমিউনিজমের বিস্তার রোধ করা। বিপরীতে পূর্বাঞ্চলীয় ইউরোপের দেশগুলোকে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পুনর্নির্মাণের জন্য ১৯৪৭ সালে মলোটভ প্ল্যান নামে পরিকল্পনা গ্রহণ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। অনেকেই বিশ্বাস করেন বাইপোলার যুগে ইউরোপকে ভূরাজনৈতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, কূটনৈতিক, সামরিক এবং সাংস্কৃতিক মানদণ্ডে ইউরোপকে বিভক্ত হতে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্রের এই মার্শাল প্ল্যান। আর ইউনিপোলার যুগে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও), বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কার্যক্রমের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার আধিপত্য বজায় রেখেছিল। 

একইভাবে প্রাচীন সিল্ক রুট পুনরুজ্জীবিত করে চীনও সেইপথে হাঁটতে যাচ্ছে। এর ওপর কারেন্সি বাস্কেটে চীনের স্থানীয় মুদ্রা রেনমিনবিকে অন্তর্ভুক্ত করতে নেয়া উদ্যোগ, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন, ব্রিকস এবং ডিজিটাল সিল্ক রোড গঠনের পাশাপাশি আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার গোটা ইউরেশিয়া মহাদেশকে পুনর্গঠন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর বর্তমানে পুরো বিশ্ব ইউনিপোলার থেকে এখন মাল্টিপোলার যুগে প্রবেশ করছে। 

অন্যদিকে বিআরআইয়ে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিকে চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরের (সিপিইসি) সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। সিপিইসি পশ্চিম চীনকে দক্ষিণ এশিয়ার উত্তরে হিমালয় পার হয়ে আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার পূর্ব অংশ থেকে হিমালয় অতিক্রম করে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনকে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে। এটি পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ, বিহার, নেপাল, ভুটান ও আসামকে নিয়ে একটি নতুন করিডোরের মাধ্যমে পাকিস্তানের সিপিইসি এবং বাংলাদেশের বিসিআইএমের সংযোগকারী বাণিজ্যপথ সরবরাহ করতে পারবে; যা হিমালয় পর্বতের পূর্ব ও পশ্চিম অংশে বসবাসকারীদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়তা করবে। ফলে এসব অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে, দারিদ্র্য কমবে এবং জীবনমানের উন্নয়ন হবে।

ড. রেজাউল করিম চৌধুরী: ক্যাপ্টেন, মেরিটাইম পরামর্শদাতা, আইনজীবী; 

বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব মালয়েশিয়া, টেরেংগানুতে গবেষণারত

কাজী মো. আবু সাইদ: মেরিন ইঞ্জিনিয়ার

এমএস, মেরিটাইম পলিসি, ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া টেরেংগানু