প্রাচীন চীনের একজন সম্রাট কোনো এক কারণে একবার তার প্রজাদের সবার জন্য পানি ফুটিয়ে পান করার হুকুম জারি করেছিলেন। সেবার রাজ্য পরিভ্রমণে সম্রাট যখন বাইরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছিলেন, তখন ভুলক্রমে অজানা কোনো এক গাছের পাতা তার ফুটানো পানির পাত্রের মধ্যে পড়ে যায়, যা খানিকটা লাল বর্ণ ধারণ করে এবং সে পানি পান করার পর সম্রাট অনুভব করেন এটা আলাদা একটা অনুভূতি তৈরি করে। শরীর-মনকে চাঙ্গা করে দেয়। এরপর সম্রাট ওই গাছের পাতাকে ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন এবং সে থেকেই পৃথিবীর মানুষ চায়ের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারে।

ইদানীং সকালে খবরের কাগজ পড়তে গিয়ে সে সম্রাটের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সম্রাট কি সেই সময়ে ভাবতে পেরেছিলেন, তার এ ভুলক্রমে আবিষ্কার চিরহরিৎ বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদের একটি কুঁড়ি দুটি পাতা একবিংশ শতাব্দীতে এসে দুনিয়ার বড় বড় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ভবঘুরে কবি, রাজনৈতিক নেতা, সরকারপ্রধান, বিপুল সম্পদের মালিক, ব্যবসায়ী, করপোরেট চাকুরে, বিশ্ববিখ্যাত অভিনেতা কিংবা ফুটপাতের হকার, রিকশাচালক, রাস্তার ভিক্ষুক সবার কাছে হয়ে যাবে একটি জনপ্রিয় পানীয়!

সম্রাট হয়তো ভাবতেও পারেননি এ একটি কুঁড়ি আর দুটি পাতাই একদিন রাতজাগা কোনো কবির মধ্যরাতের ক্লান্তি দূর করবে, উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে শেষ বয়সী বৃদ্ধের সকালের ঘুম জড়ানো ক্লান্তিকে দূর করে তাকে ফুরফুরে করে তুলবে কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকার রোমাঞ্চের সঙ্গী হবে এ চা।

সম্রাটের ভাবনার ত্রিসীমানায় হয়তো এও ছিল না যে এ একটি কুঁড়ি আর দুটি পাতা থেকে উৎপাদিত পানীয় একদিন বেনিয়াদের ব্যবসায়িক পণ্য হবে। এ পানীয় একদিন হাজার হাজার সহজ-সরল মানুষকে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে জীবিকার সন্ধানে দেশান্তর করবে। আড়কাঠির মাধ্যমে তাদের দাসদের মতো সমগোত্রীয় মানুষদের কাছেই বিক্রয়যোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত করবে।

সম্রাট ভাবতেও পারেনি এ পানীয়ের জন্য একদিন লাখ লাখ আদিবাসী নির্যাতনের শিকার হবে, উত্পীড়নের শিকার হবে চা শ্রমিক নারী, চাবুকের আঘাতে ছাল-চামড়া উঠে যাবে অধিক খাটুনির ফলে জীবন ক্ষয়ে যাওয়া জীর্ণ-শীর্ণ কোনো যুবক চা শ্রমিকের কিংবা নিজ মুলুকে ফিরে যাওয়ার পথে বেনিয়া এবং তাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের রক্ষকদের বন্দুকের গুলিতে বেঘোরে প্রাণ হারাবেন চা শ্রমিকরা। আবার তাদের নির্যাতন, অত্যাচারের কাহিনী নিয়ে গল্প, উপন্যাস, সিনেমা তৈরি হবে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে (সব ক্ষেত্রে নয়), ভূপেন হাজারিকা গান লিখবেন তাদের দুঃখ-কষ্টের অংশীদার হয়ে, সে গান আবার বিশাল বিশাল কনসার্টে গাওয়া হবে মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য।

সম্রাটের ভাবনায় এতসব কিছু আসা সম্ভব ছিল না হয়তোবা, কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমাদের ভাবনার দুয়ার খুলে গিয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তির  প্রচুর উন্নতি হয়েছে। কাগজ আবিষ্কারের ফলে লিপিবদ্ধ হয়েছে প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগের ইতিহাস। সে ইতিহাস পড়ে আমরা প্রাচীন মধ্যযুগীয় মানুষের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারি, ভাবতে পারি এবং ভাবতে ভাবতে শিউরে উঠি যে তারা এত বর্বর ছিল! যে মানুষকে পণ্যের মতো দাস হিসেবে বাজারে বিক্রি করত। দাসদের কোনো অধিকার ছিল না, তাদের কোনো ইচ্ছার মূল্য ছিল না, তারা যথেষ্ট খাবার পেত না। স্বাধীনতার কথা তো বলাই বাহুল্য।

মাঝে মাঝে ভাবতে ইচ্ছে করে পৃথিবীর অনাগত ১০০ বছর, ২০০ বছর কিংবা ৫০০ বছর পরের মানুষরা আমাদের ব্যাপারে কী ভাববে? ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যায়, মনে হয় তারা যখন জানতে পারবে একবিংশ শতাব্দীতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব চলছিল, প্রযুক্তির অনেক উন্নতি হয়েছিল কিন্তু সেখানে অধিকাংশ মানুষেরই বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম মৌলিক অধিকার ছিল না। সে সময় বাংলাদেশ নামক একটা দেশ ছিল, যে দেশে স্থানভেদে এক পেয়ালা চা খেতে খরচ হতো ৫ টাকা থেকে শুরু করে কয়েকশ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু যে শ্রমিক সারা দিন খেটে শুধু নুন আর মরিচ দিয়ে ভাত খেয়ে চা উৎপাদনের কাজ করত সে দিনশেষে পেত মাত্র ১২০ টাকা। যখন তারা জানবে তখনকার মানুষ রেস্টুরেন্টে কিংবা টি বারে গিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার সঙ্গে গল্প করতে করতে চা পান করত আর ফেরার সময় কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার টাকা মূল্য চুকাতো খুশিমনে। যিনি পেয়ালা দুটি বয়ে এনেছেন তাকেও খুশিমনে কিছু টাকা টিপস হিসেবে দেয়াটাকে সৌজন্যতা মনে করত। অন্যদিকে যারা চা উৎপাদন করে তারা সারা দিন খেটে যা মজুরি পেত তা দিয়ে পরিবারের রাতের খাবারই জুটত না! আবার দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজে কিংবা তদবিরে চা পানের জন্য লাখ লাখ টাকা আদান-প্রদান হতো আর চা শ্রমিক পেত সারা দিনে মোটে ১২০ টাকা পারিশ্রমিক।

পৃথিবীর অনাগত মানুষ যখন জানবে যে সে সময়ে অনেক শিক্ষিত তরুণ-তরুণী সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুক নামক ডিজিটাল দুনিয়ায় অভিজাত চায়ের কাপের ছবিসমেত স্ট্যাটাস দিত চা ছাড়া সকালটাই বৃথা অথচ আধপেট খেয়ে কিংবা না খেয়ে সারা দিন খেটে চা উৎপাদনকারী শ্রমিকের কথা, তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামের কথা, তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কথা বেমালুম ভুলে যেত তারা। তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে তুলতে শ্রমিকের রক্ত ঘাম করা আর এককাপ রক্তবর্ণের স্পেশাল চা পান করা যায় কিনা ভাবত। 

এসব জানার পর তারা কি আমাদের অসভ্য অমানুষ ভাববে না? আমরা যেমন ভাবছি আমাদের আগের কালের মানুষদের ব্যাপারে। এ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে আমাদের সামনে। না ভাবলেও ক্ষতি নেই, আমরা হয়তো চলে যাওয়া মানুষদের মতো অসভ্য তকমাই পাব অনাগত মানুষের কাছে। তাতে কার কী আসে যায়? মুখোশের আড়ালে আমরা হয়তোবা তাই-ই !!

 

শামীম হোসেন: শিক্ষার্থী, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়