বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের তীব্রতার মাঝে দেশের চাহিদার বিপরীতে আমদানিস্বল্পতা থাকলেও চট্টগ্রামে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রাক্কলিত ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বর্তমানে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রস্তাবটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে।
বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের ক্ষেত্রে শিগগিরই কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা নেই। এর সঙ্গে প্রতিকূল মূল্য পরিস্থিতি ও ডলারের বিনিময় হারের ঊর্ধ্বমুখিতায় প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেলের সংস্থান করা যাচ্ছে না। যে কারণে জ্বালানি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। আবার চলমান এ সীমাবদ্ধতায় ইআরএলের সক্ষমতা পূরণের মতো জ্বালানি তেল আমদানিও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সে হিসেবে ইআরএলের এ ব্যয়বহুল প্রকল্পটি নেয়া হলেও আদতে এর সুফল পাওয়া যাবে কিনা সেটি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কেননা সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের কোথাও নতুন করে জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার তৈরি করা হয়নি। বাংলাদেশে যে পরিশোধনাগারটি নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে, সেটি পাঁচ বছর আগে নির্মাণ করা হলে প্রকল্পটি থেকে বৃহৎ আকারে সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু বর্তমানে এটি নির্মাণ হলে এ প্রকল্প থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এবং ইআরএলের তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর ৫৫-৬০ লাখ টনের বেশি জ্বালানি চাহিদা রয়েছে। ইআরএলের প্রথম ইউনিটের জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। বর্তমানে এ সক্ষমতার সর্বোচ্চ ৯৬-৯৭ শতাংশ ব্যবহার করা যায়। দ্বিতীয় ইউনিটের কার্যক্রম শুরু হলে ইআরএলের সক্ষমতা ৩০ লাখ টন বেড়ে ৪৫ লাখ টনে দাঁড়াবে।
এদিকে এ সময়ে জ্বালানি তেল পরিশোধন করে যে পরিবহন খাতে কাজে লাগার কথা, সেক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন চলে এসেছে। বাজারে বিদ্যুচ্চালিত যানবাহন আসছে। যে কারণে এ ধরনের পরিশোধনাগারে বৃহৎ আকারে বিনিয়োগের ভাবনা থেকে বিশ্বের অনেক দেশ বের হয়ে আসছে।
তাই বর্তমান সময়ে এ পরিশোধনাগারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। কারণ জ্বালানি সংকটে বিপুল পরিমাণ ব্যয়ে নির্মিতব্য প্রকল্পটি যদি প্রকৃত অর্থে কাঙ্ক্ষিত উপযোগিতা না নিয়ে আসে, তাহলে এটি অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল প্রকল্প হিসেবে নিঃসন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাছাড়া ব্যয়বহুল প্রকল্পটি ইআরএলের হোল্ডিং কোম্পানি বিপিসির জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে বলে ধরে নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে খোদ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যরাও মনে করছেন, এমনিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় বিপিসি আর্থিকভাবে অনেক চাপে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এ রকম মেগা প্রকল্পের ব্যয় নির্বাহ করা বিপিসির একার পক্ষে সম্ভব হবে না।
এক্ষেত্রে ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসের দুটি প্রতিষ্ঠান এবং অস্ট্রিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রাথমিক কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পটির জন্য সরকারি খাসজমি, জেমকো ও পদ্মা অয়েল কোম্পানি থেকে মোট ৫৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া ইআরএল কর্তৃপক্ষের ১২৩ দশমিক ১২৭ একর নিজস্ব জমি দেয়া হচ্ছে। ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ প্রকল্প শুরু না হলেও এর মধ্যেই এ বাবদ প্রায় ১ হাজার ৫৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়ে গিয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড কর্তৃপক্ষ আশা করছে, প্রকল্পটি দ্রুত একনেকে পাঠানো হবে। একনেকে পাস হওয়া মাত্রই কাজ শুরু করে দেয়া হবে বলে তারা জানিয়েছেন।
অর্থাৎ ২০১০ সালে যখন প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়, সে সময় থেকে শুরু করে এ দীর্ঘ সময়ে ব্যয় নির্ধারণ, জমি অধিগ্রহণ এবং বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তি সম্পাদন সবকিছুই করে ফেলা হয়েছে। এখন শুধু একনেকে প্রস্তাবটি পাস হওয়ার অপেক্ষায়। পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো প্রকল্পের ডিপিপির সর্বশেষ সংশোধনীতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ৭৬৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
এ ব্যয়বহুল প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে, প্রকল্পটির ফল পেতে পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে। চলমান জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক মন্দার পূর্বাভাস অনুযায়ী এমন বৃহৎ আকারের প্রকল্প হাতে নেয়া যে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হবে না বিশেষজ্ঞরা সেটিই বলছেন। এক্ষেত্রে এমন মেগা প্রকল্প থেকে উপকার পেতে পাঁচ বছর আগেই প্রকল্পটি হাতে নেয়ার বিষয়েও তারা বলেছেন। যেহেতু ২০১০ সালে প্রকল্পটি শুরু করার পর সেটি প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় এরই মধ্যে এক যুগ অতিক্রম করে ফেলেছে, সে হিসেবে প্রকল্পটির কার্যকারিতা ও উপযোগিতা যাচাই করেই এটি বাস্তবায়নের বিষয়ে একনেকে সিদ্ধান্ত দেয়া হবে সেটিই আমরা প্রত্যাশা করি।
যেহেতু প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে এবং এরই মধ্যে প্রকল্প বাবদ প্রায় ১ হাজার ৫৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। তার পরও আরো বৃহৎ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ এতে রাষ্ট্রের আরো অন্যান্য খাতের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে। যেহেতু জ্বালানি তেলের আমদানিতে কোনো সুখবর নেই সেহেতু দেশের বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজনে এ প্রকল্পের অনুমোদন আরো পরে দেয়া যেতে পারে।
যদিও এ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ইআরএলের প্রস্তাবিত ইউনিটটিতে ইউরো-৫ মানের গ্যাসোলিন ও ডিজেল উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যমান রিফাইনারির ডিজেলকে ইউরো-৫ মানে রূপান্তর করা হবে। এছাড়া প্রকল্পটির মাধ্যমে দেশে এলপিজি, গ্যাসোলিন, জেট ফুয়েল-১, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও বিটুমিন উৎপাদন বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন দুটি পণ্য লুব বেজ অয়েল ও সালফার উৎপাদন করা হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে দেশ যখন সংকটে রয়েছে, তখন যেকোনো বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ এ প্রকল্প যদি পাস করা হয়, তাহলে প্রকল্পটি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের জোগান পাওয়া সম্ভব না হলে তখন তো প্রকল্পটিতে উৎপাদন বন্ধ থাকবে। আর ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইআরএলের প্রথম ইউনিট থেকেও সক্ষমতার শতভাগ কিন্তু ব্যবহার করা যায় না। এখন দেশের চাহিদা অনুযায়ী বার্ষিক ৫৫-৬০ লাখ টনের বেশি জ্বালানি চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিটের সক্ষমতার যে প্রাক্কলিত পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছে সেটি বিবেচনা, প্রকল্পের পেছনে অনেক টাকা ব্যয় হয়ে যাওয়ায় বিপিসি যেন লোকসানে না পড়ে তা পর্যালোচনা এবং সার্বিকভাবে ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য পাইপলাইনে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে কিনা এসব কিছু যাচাই করে সর্বাগ্রে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে একনেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হোক।










