এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আসা প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক ছাড়িয়েছে। দেশে নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর এজেন্টদের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদারে এজেন্ট ব্যাংকিং বড় ভূমিকা রাখছে। দেশের প্রতিটি থানা, বড় বন্দর বা বাজারে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে গেছে। এজেন্টরা খুব সহজে ও দ্রুত প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ তাদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হুন্ডি তত্পরতা কমে এসেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হুন্ডি আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ডলারের ওঠানামার কারণে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা যত বেশি বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ হবে, হুন্ডির তত্পরতা তত দ্রুত কমবে। ইতিবাচক এ অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে সেবার মান উন্নয়ন ও এর সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। পাশাপাশি মানুষের অর্থের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। আগে রেমিট্যান্সের অর্থ গ্রহণের জন্য গ্রাহকদের ব্যাংকের শাখায় আসতে হতো। দূরত্ব, শারীরিক ও আর্থিক ঝুঁকির কারণে অনেক প্রবাসী পরিবারই ব্যাংকের শাখায় এসে টাকা নিতে অস্বস্তিতে থাকত। এর সুযোগই নিত অবৈধ হুন্ডি কারবারিরা। তাদের নিয়োগ দেয়া লোকেরা অবৈধ পথে আসা রেমিট্যান্সের অর্থ প্রবাসী পরিবারে পৌঁছে দিত। এখন বাড়ির পাশের বাজারে ব্যাংকগুলোর এজেন্ট পৌঁছে গেছে। ফলে নিরাপদ মাধ্যমে প্রবাসী পরিবারের সদস্যরা রেমিট্যান্সের অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন। অনেক ক্ষেত্রে এজেন্টরাই উপকারভোগীদের ঘরে রেমিট্যান্সের অর্থ পৌঁছে দিচ্ছেন। আবার অনেক সুবিধাভোগীর এজেন্ট ব্যাংকিং হিসেবে রেমিট্যান্স জমা হচ্ছে এবং জমা হওয়ার তথ্য মোবাইল মেসেজে চলে যাচ্ছে। এতে প্রবাসীদের কাছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে, যা রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে, যা ধরে রাখা জরুরি।

ব্যাংক একটা দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। দিন দিন এ খাতের প্রতিযোগিতা বাড়ছে, ফলে নতুন নতুন গ্রাহক ও বাজার তৈরিতে ব্যাংকের রিসার্চ বিভাগকে আরো ভাবতে হবে কী করে গ্রাহকসেবা সহজীকরণ করা যায়। প্রায় সব ব্যাংকের সুদের হার বর্তমানে একই রকম। তাই সেসব গ্রাহককে টার্গেট করে এজেন্ট ব্যাংকিং বা উপশাখাকে কীভাবে আরো নিখুঁতভাবে পরিচালনা করা যায়, সেদিকে নজর দেয়ার সময় এসেছে। সরকারি ব্যাংকের ভেতরে অগ্রণী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করলেও অন্য সরকারি ব্যাংক এখনো অনেকটাই পিছিয়ে। যেহেতু বেসরকারি ব্যাংকের সেবা প্রদান থেকে মুনাফা অর্জনে নজরদারি বেশি থাকে, তাই সরকারি ব্যাংকগুলোকেই হাল ধরতে হবে, যাতে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এ সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা শুধু শহরে নয়, প্রত্যন্ত গ্রামেও এখন ছড়িয়ে পড়ছে এবং দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। তবে ব্যাংকিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ এ সেবা যত্রতত্র ও যাকে তাকে দিয়ে করানোর মতো ঘটনাও ঘটছে। ব্যাংকগুলো বিভিন্ন এলাকায় মোবাইলের ফ্লেক্সি লোড দোকানদার, বিকাশের দোকানদার, মুদিখানার দোকানদার, ওষুধের দোকানদারসহ বিভিন্ন পেশার লোকদের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো ব্যাংক এনজিওর আদলে ঋণ বিতরণ করছে। কোনো কোনো ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংক বিকাশের আদলে টাকা পাঠানোকেই প্রধান কাজ হিসেবে মনে করছে। কোনো কোনো এজেন্ট বিল কালেকশন করছে এবং সেই টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে সটকে পড়ার ঘটনাও আছে। ফলে গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকের ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। নানা ঝামেলা ও ঝুঁকি নিয়ে এভাবেই চলছে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম। পত্রিকার মাধ্যমে এ তথ্য এরই মধ্যে নজরে এসেছে। এজেন্ট ব্যাংকিংকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে এর গাইডলাইন নতুন করে সাজাতে হবে। তবে ইদানীং উপশাখা দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকি উপশাখা দিয়ে দূর করা সম্ভব, কেননা উপশাখা ওই নির্দিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা দিয়ে পরিচালিত হয় বিধায় ঝুঁকি অনেকাংশে কম থাকে। এটিও নতুন একটি ধারণা, যার যাচাই-বাছাই ও সম্প্রসারণ ঘটতে পারে।

করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্ব অর্থনীতির দুর্বলতাগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশ তাদের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার ও ধরে রাখতে নানা পন্থা-কৌশল অবলম্বনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারও চেষ্টা করছে অর্থনীতিকে কীভাবে গতিশীল করা যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত ব্যাংকনির্ভর। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অর্থনৈতিক উন্নতির প্রাথমিক ধাপ হলো শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা। জনগোষ্ঠীর যত বেশি সংখ্যক মানুষ ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসবে অর্থনীতির ভিত ততই মজবুত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগোপযোগী নীতি প্রণয়ন, নীতির উদারীকরণ ও ব্যাংকারদের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকিং সেবা দিন দিন সম্প্রসারণ হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির সম্প্রসারণ ব্যাংক খাতে পরিবর্তন এনেছে। করোনার ধাক্কায় ব্যাংকগুলো প্রযুক্তি উন্নয়নে বিশেষ মনোযোগী হয়েছে। গ্রাহকরা নিরাপদ দূরত্বে থেকে যাতে লেনদেন করতে পারে সেজন্যই অনলাইন ব্যাংকিংয়ের নানা সুবিধা যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে ৬৫ শতাংশের বেশি মানুষ আর্থিক সেবার আওতায় এসেছে। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আর্থিক খাতে যুক্ত হয়েছে নিত্যনতুন ব্যাংকিং সেবা। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম লক্ষ করা যাচ্ছে না।

দ্রুত বর্ধমান এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে চলেছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতি উপকৃত হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে আর্থিক সেবাপ্রাপ্তির মাধ্যমে তৃণমূল মানুষের মাঝেও সঞ্চয় প্রবণতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় ব্যাংক হিসাবে জমার পাশাপাশি এজেন্ট আউটলেটগুলোর মাধ্যমে ঋণ বিতরণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ব্যাংকগুলো। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যবসা ও কর্মসংস্থান তথা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আরো প্রসার ঘটবে। এছাড়া প্রবাসী আয় আহরণের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেশজুড়ে, বিশেষ করে পল্লী এলাকার হুন্ডি প্রথা নিরুৎসাহিত করতে এবং সরকার ঘোষিত আড়াই শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা প্রাপ্তিতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। তবে এখনো হুন্ডি প্রথা বিলুপ্ত হয়নি, সম্প্রতি এটি আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে বলে খবর মিলছে। এক্ষেত্রে এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবাকে গতিশীল করার মাধ্যমে হুন্ডির রাশ টেনে ধরা সম্ভব। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সেবার মান উন্নয়নের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক খাতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো কঠিন নয়।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের আয় বাড়ানোর কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করতে হলে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে এজেন্টের মাধ্যমে কৃষি ও এসএমই ঋণ বিতরণের নির্দেশনা জারি করেছে এবং ঋণ বিতরণের পরিমাণ আশাব্যঞ্জক হারে বাড়ছে। বর্তমানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা আর্থিক সেবা গ্রহণে পুরুষের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নারীদের আর্থিক সেবা গ্রহণে উৎসাহিত করা হলে তা নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি দেশে লিঙ্গবৈষম্যও অনেকাংশে কমে আসবে। সার্বিক বিবেচনায় এজেন্ট ব্যাংকিং বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমে একটি নব উদ্যম ও গতিশীলতা এনেছে। এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পুরোপুরি সফল করতে হলে উপযুক্ত এজেন্ট নিয়োগ ও আউটলেট পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে ব্যাংকগুলোকে।