দেশে গ্যাসের চরম ঘাটতির মধ্যে বড় ধরনের সিস্টেম লস অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে বেশি দামের কারণে খোলাবাজার থেকে এলএনজি কেনা কমিয়েছে সরকার। তাতে গ্যাসের সরবরাহ কমে গিয়েছে দিনে ৩০ কোটি ঘনফুট। এতে দেশের বিদ্যুৎ, শিল্প ও আবাসিক খাতে প্রচণ্ড সংকট দেখা দিয়েছে। এক দশকের মধ্যে দেশ সবচেয়ে বেশি লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বাধ্য হয়ে গ্যাস-বিদ্যুতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু তার পরও গ্যাসের সিস্টেম লস বাড়ছে। সিস্টেম লসের বড় কারণ অবৈধ সংযোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে চুরি হওয়া গ্যাসের পুরোটাই চালিয়ে দেয়া হচ্ছে সিস্টেম লস নামে। বিতরণ কোম্পানিগুলো নিয়ম করে ওই অর্থ গ্রাহকের কাছ থেকে নিচ্ছে। অথচ আবাসিকে যে পরিমাণ গ্যাস দিয়ে বিল নেয়ার কথা তা করা হচ্ছে না। শিল্পে যে চাপে গ্যাস দেয়ার কথা তাও দেয়া হচ্ছে না। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর গ্রাহক ঠিকই অর্থ দিয়ে যাচ্ছেন। আশঙ্কার বিষয় হলো, গোটা বিষয়টিই একটি সিস্টেমের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সিস্টেম গেইন দেখিয়ে ওই গ্যাসের অর্থও তুলে নেয়া হচ্ছে। সিস্টেম লসের গ্যাস কোথায় এবং কীভাবে নষ্ট হয়, তার প্রকৃত কারণ জানা জরুরি। গ্যাস সংকটের সময় সিস্টেম লস বৃদ্ধি অবশ্যই রোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে বিতরণ কোম্পানিগুলোর সক্রিয়তা কাম্য।

গ্রাহকের কাছে গ্যাস পৌঁছতে আদর্শ সিস্টেম লস ধরা হয় ২ শতাংশের নিচে, সর্বোচ্চ ২ দশমিক ২৫ শতাংশ। এর মধ্যে বিতরণে ২ শতাংশ ও সঞ্চালনে দশমিক ২৫ শতাংশ, কিন্তু বাংলাদেশে উত্তোলন ও আমদানীকৃত গ্যাসের সিস্টেম লস প্রায় ৮ শতাংশে ঠেকেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে সেটা বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ, যা উদ্বেগজনক। দেশে বৈধ ৩৮ লাখ আবাসিক গ্রাহকের মধ্যে ৩ লাখ ৬৮ হাজার প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ প্রতি মাসে সাড়ে ৩৪ লাখ গ্রাহকের পকেট কাটা হচ্ছে। এই চুরির প্রায় পুরোটাই বিতরণ সংস্থা তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি অধিভুক্ত এলাকায়। কোম্পানিটি চাপের মুখে জোনগুলোকে পৃথক করার উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়। সেই কাজটিও চলছে ঢিমেতালে। বাসাবাড়িতে বৈধভাবে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন। এর পরও বন্ধ হয়নি অবৈধ গ্যাস সংযোগ। জানা যায়, রাজধানী এবং আশপাশের কয়েকটি জেলায় লাখ লাখ বাসায় রয়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। বৈধভাবে গ্যাস সংযোগ না পেয়ে গ্রাহক অবৈধ সংযোগ নিতে তত্পর হয়ে ওঠেন। আর এতে সহায়তা করছেন একশ্রেণীর দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারী। গ্যাসের অবৈধ সংযোগ এতটাই ব্যাপক, বিদ্যমান লোকবল দিয়ে সবসময় সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণের কাজ চালানো যায় না। এটা অনস্বীকার্য, গ্যাস বিচ্ছিন্নকরণের অভিযান চললেও রাতারাতি সংযোগ আবার যেভাবে দেয়া হচ্ছে, তা কমানো যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে কার্যকর উপায় উদ্ভাবন করা দরকার। না হলে এ চুরির প্রবণতা দিন দিন বাড়বে। এসব অবৈধ সংযোগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনেকেই বলছেন, সরকারি সংস্থাগুলোর সিস্টেম লস, অনিয়ম, অদক্ষতা, অপচয় ও দুর্নীতি দূরীকরণে মনোযোগ দিলে সংকট মোকাবেলা সহজ হতো। সরকারের উচিত চুরি বন্ধ করা। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে পরিমাণ গ্যাসের বিল নেয়া হয়, প্রকৃতপক্ষে তার থেকে কম মূল্যের গ্যাস ব্যবহার হয়, কিন্তু গ্যাস চুরি বন্ধ না করে বারবার গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। এতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে ভুগতে হচ্ছে।

দেশে রয়েছে জ্বালানি গ্যাস উৎপাদনে নানা সংকট। এর ফলে নতুন বাসাবাড়িগুলো গ্যাস সংযোগ পাচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন করে ঘরবাড়িতে আর গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে না। ফলে অনেকে রান্নার কাজে এখন বোতলজাত এলপি (লিকুইড পেট্রোলিয়াম) ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন। এর পাশাপাশি রাজধানীসহ আশপাশের কয়েকটি জেলায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে বাসাবাড়িতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারকে গ্যাস চুরি বন্ধ করার একটি কার্যকর উপায় অবশ্যই অবিলম্বে বের করতে হবে। লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে গ্যাস চুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। গ্যাস চুরি মূলত চলে অসৎ ও স্বার্থান্বেষী কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায়। এদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি হয়ে পড়েছে। সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে হলে মিটারিং সিস্টেমের আধুনিকীকরণ ও উন্নত করা দরকার। বিতরণ ও সঞ্চালন, সব জায়গায়ই মিটারিং সিস্টেম জোরদার করতে হবে। সঞ্চালন লাইনের গ্যাস প্রবেশের পথে যেমন মিটার দিতে হবে, তেমনি গ্যাস বিতরণ লাইনে যাওয়ার পথটিতেও দিতে হবে মিটার। যেন কত গ্যাস এল, কত গেল, তার পুরো হিসাব থাকে। মিটারিং সিস্টেমের পাশাপাশি স্বচ্ছ মনিটরিং সিস্টেম করতে হবে।

গ্যাস চুরি ঠেকাতে জোনভিত্তিক মিটার বসানোর কাজ শেষ। এখন শুধু চালু করার পালা। মনিটরিংয়ের আওতায় আসা এসব মিটারে কী পরিমাণ গ্যাস বৈধভাবে খরচ হচ্ছে এবং কী পরিমাণ অবৈধভাবে যাচ্ছে বা সিস্টেম লস হচ্ছে, তা জানা যাবে। জোনভিত্তিক এসব মিটারে গ্যাসের ব্যবহার কী পরিমাণ হচ্ছে, তা উঠে আসবে। ব্যবহারের সঙ্গে বৈধ গ্রাহকের গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ হিসাব করলেই কী পরিমাণ চুরি হচ্ছে তাও জানা সহজ হয়ে যাবে। পেট্রোবাংলা বলছে, সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক যে মান আছে তা বজায় রাখাই পেট্রোবাংলার লক্ষ্য। আর ওই লক্ষ্য পূরণে এরই মধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। তার মাধ্যমে ব্যাপক হারে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ করা হচ্ছে। তাছাড়া একটি বছরকে তিনটি প্রান্তিকে ভাগ করে সিস্টেম লস কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সন্তোষজনক ফলও পাওয়া যাচ্ছে। সরকার বলছে, বিদ্যুতের মতো এবার গ্যাস বিতরণেও সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডাটা অ্যাকুইজিশন বা স্কাডা পদ্ধতির প্রবর্তন করা হচ্ছে। শুধু গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়নই নয়, এর সঙ্গে গ্যাসের চুরি এবং অপচয়ও রোধ সম্ভব বলে মনে করছে তিতাস। কোম্পানিটি বলছে, স্কাডা পদ্ধতি প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পুরনো পাইপলাইনও বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে ঢাকার গ্যাস বিতরণ আধুনিকায়নের সঙ্গে চুরি এবং অপচয় বন্ধ হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানি সূত্র বলছে, স্কাডা হচ্ছে একটি আধুনিক বিতরণ ব্যবস্থা। এখানে গ্যাসের পাইপলাইনগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটর করা সম্ভব। কোথায় কী হচ্ছে তা একটি জায়গায় বসেই বোঝা সম্ভব। ফলে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। একই সঙ্গে কোন এলাকায় কী পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে, গ্রাহকের চাহিদার অতিরিক্ত গ্যাস কোনো পাইপলাইনে যাচ্ছে কিনা, গেলে তা কোথায় যাচ্ছে তাও বোঝা যাবে। কী পরিমাণ গ্যাস চুরি হচ্ছে তা শনাক্ত করার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, পাশাপাশি চুরি ও সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তিতাসে ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে। দুদক গ্যাস-সংযোগে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ না করা, অবৈধ সংযোগ দেয়া, মিটার টেম্পারিং করা, কম গ্যাস সরবরাহ করেও সিস্টেম লস দেখানো এবং বাণিজ্যিক গ্রাহককে শিল্প শ্রেণীর গ্রাহক হিসেবে সংযোগ দেয়াসহ ২২টি বিষয়কে প্রতিষ্ঠানটিতে দুর্নীতির উৎস বলে তারা চিহ্নিত করেছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, চিহ্নিত দুর্নীতির উৎস বন্ধে তেমন সক্রিয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে না। সিস্টেম লসের বোঝা সরকার ও বৈধ গ্রাহকের ঘাড়ে চাপে। এতে সরকারের ভর্তুকি ও ব্যক্তির ব্যয় বাড়ছে।

রাষ্ট্রীয় বিতরণ কোম্পানিগুলো চাইলে এসব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা কঠিন কিছু নয়। এক্ষেত্রে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। যেহেতু কোম্পানির বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের একটি চক্রের যোগসাজশে অবৈধ সংযোগের বিস্তার ঘটাছে, তাই দ্রুত তদন্ত করে প্রথমে নিজ কোম্পানির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি এসব অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর ওই স্থানে নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে গ্যাস চোর চক্র পুনঃসংযোগ না নিতে পারে। সারা দেশে কয়েক লাখ অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর এসব সংযোগ চলছে, যা রাষ্ট্রের জন্য বড় ক্ষতি। অন্যদিকে পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহারকারী গ্রাহক কম গ্যাস ব্যবহার করে বেশি বিল দিচ্ছেন। তাই রাষ্ট্রের স্বার্থে দ্রুততম সময়ে সব অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ ও গ্যাস চুরি বন্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।