২০২০ সালের ২৬ এপ্রিল একটি বিখ্যাত জাতীয় দৈনিকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বাংলাদেশী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৫ টির বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে স্থান করে নেয়ার খবর প্রচারিত হয়। এটি অবশ্যই দেশের সব শিক্ষাবিদের জন্য গর্ব করার মত এক মুহূর্ত। আমিও গর্বিত। কিন্তু একইসঙ্গে এই একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই মুহূর্তের চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কেও আমি উদ্বিগ্ন। আমার মতে, এই চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে - করোনভাইরাস, ইউজিসি আর আর্থিক চ্যালেঞ্জ। আজ, আমি একের পর এক এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি।
প্রথমত, করোনভাইরাস সরকারকে দেশব্যাপী সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অস্থায়ীভাবে বন্ধের উদ্যোগ নিতে বাধ্য করেছে। সমস্ত একাডেমিক প্রতিষ্ঠানে শারীরিক উপস্থিতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই সংস্থাগুলো সম্ভবত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
এটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনলাইনে ক্লাস নিতে এবং মূল্যায়ন করতে বাধ্য করেছে। তাদের হাতে অন্য কোন বিকল্পও ছিল না। কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় যাতে তাদের ক্লাস এবং মূল্যায়ন সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য এড-টেক সলিউশনগুলোতে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছে। বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন, যেমন - জুম, গুগল ক্লাসরুম, মাইক্রোসফট টিমস, ইত্যাদি তাদের জীবনকে কিছুটা হয়ত সহজ করেছে। তবে, পাঠ্যক্রমিক চ্যালেঞ্জ এবং ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যাগুলো অমীমাংসিতই থেকে গেছে।
ঢাকার বাইরে অবস্থিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি যে, রাজধানীর বাইরে এই চ্যালেঞ্জগুলো আরও প্রকট। কিছু কিছু সমস্যা ঢাকাবাসীদের কাছে এতটাই আদিমতর যে তারা হয়ত এই বিষয়গুলো বিশ্বাসই করতে পারবেন না।
যেমন- ঢাকার বাইরে বসবাসরত অনেক শিক্ষার্থীর বাড়িতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগই নেই। তারা তাদের অনলাইন ক্লাসের জন্য মোবাইল পরিষেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। এই তথাকথিত ৪ এবং ৪.৫ জি এর যুগে সেই অঞ্চলগুলোতে ইন্টারনেটের গতি এতটাই দুর্বল যে কোনও ভিডিও কনফারেন্সে (অথবা অনলাইন ক্লাসের) স্ক্রিনে কিছু নড়তে দেখলে আমি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে যাই! কখনও কখনও আনন্দে মরে যেতেও ইচ্ছে হয়! (এই কথাগুলো যে হতাশার বহিঃপ্রকাশ, তা অবশ্যই আমার বিজ্ঞ পাঠকেরা বুঝতে পারছেন)। কখনও কখনও কম্পিউটার অথবা মোবাইল স্ক্রিনের মাঝামাঝি একটি চিরঘূর্ণায়মান বৃত্ত (যা কিনা কানেকশনের জন্য অপেক্ষা করার সময়কে নির্দেশ করে) ক্লাসের পুরো সময় ধরেই ঘুরতে থাকে। জীবনকেও তখন ঘূর্ণায়মান মনে হয়। এই সব ক্ষেত্রে যে কোনও ইন্টারনেটভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে (যেমন- জুম) ক্লাস পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
ইউটিউব এবং ফেসবুক লাইভে সমস্যা হলো শিক্ষার্থীরা তৎক্ষণাত প্রশ্ন জিজ্ঞাসার সুযোগ পান না। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আমি আমার শিক্ষার্থীদের মুখগুলোও দেখতে পাই না। এই মুখগুলো আমাকে তাদের আলোচনার বিষয়টি বোঝার স্তর সম্পর্কে একটি রিয়েল-টাইম ধারণা দেয়। দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগগুলো তাদের জন্য আলোচনার সময় প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতেও অসুবিধার সৃষ্টি করে। স্ক্রিন শেয়ার করা একই কারণে প্রায় অসম্ভব। সুতরাং, একটি উদাহরণ, এমনকি একটি স্লাইড প্রদর্শন করাও বেশিরভাগ সময়ই অসম্ভব হয়ে পড়ে। অধিবেশনগুলোর বেশিরভাগই তাই শিক্ষকদের একতরফা চিৎকার হিসেবেই রয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে, এই অনিশ্চিত সময়ে, তাই পরিবর্তিত পাঠশাস্ত্র এবং স্ব-শিক্ষার উপযুক্ত উপকরণ প্রয়োজন। তাই প্রত্যেক শিক্ষককেই উপকরণ তৈরি করতে এবং নতুন পাঠশাস্ত্র রপ্ত করতে প্রচুর বেগ পেতে হচ্ছে। তার ওপর যুক্ত হয়েছে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। যেটা আমার দ্বিতীয় পয়েন্ট- ইউজিসি।
ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জীবনকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রাথমিকভাবে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনলাইনে পরীক্ষা নেয়া থেকে বিরত থাকতে বলে একটি নির্দেশিকা সরবরাহ করে। পরে অবশ্য ইউজিসি এবং বেসরকারি ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিদের সঙ্গে বৈঠকে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনলাইন পরীক্ষাসহ সকল একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কার্যক্রম তাদের নিজ নিজ একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুসারে পরিচালনা করতে পারবে।
তবে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ইউজিসি একটি নির্দেশিকা প্রণয়ন করবে। যে নির্দেশিকাটি ইউজিসি গত ৭ই মে তারিখে প্রকাশ করেছে। এই নির্দেশিকা বলছে যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে ক্লাস নেয়া অব্যাহত রাখবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরে পরীক্ষা নেবে। ইউজিসি কি গ্যারান্টি দিতে পারে যে শিগগিরই স্বাভাবিকীকরণ ঘটবে? এই নির্দেশিকায় অবশ্য দ্বিতীয় একটি বিকল্পও দেয়া হয়।
দ্বিতীয় বিকল্পটি কেবল সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য প্রযোজ্য যেগুলো প্রায় ৭০ শতাংশ ক্লাস এরই মধ্যে নিয়ে নিয়েছে। এই বিকল্প ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের হাতে থাকা মূল্যায়নের উপাদানগুলোর ওপর ভিত্তি করে গ্রেড প্রদান করার অনুমতি দেয়। আমার মতে, এই দুটি বিকল্পই অবাস্তব।
প্রথম বিকল্পের ক্ষেত্রে, জুনের মধ্যে পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক না হয় তবে শিক্ষার্থীদের পরবর্তী সেমিস্টারে বর্তমানের পাশাপাশি পরবর্তী সেমিস্টারের পরীক্ষা দিতে হবে। এটি তাদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করবে। তদুপরি, শিক্ষার্থীরা যখন পরীক্ষা দিবে তখন এই সেমিস্টারের কোর্সের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ থাকবে না।
কারণ, সেমিস্টার তো আগেই শেষ। এটি বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের জন্য ঝামেলার সৃষ্টি করবে। তাদেরকে দুটি সেমিস্টার একসঙ্গে পাস করতে হবে। তাই, একটি সেমিস্টারে কমপক্ষে আট থেকে দশটি কোর্স পড়তে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা এইচএসসি স্তরের মতো নয়। চাপ এত বেশি, যে পৃথিবীর কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ই তার শিক্ষার্থীদের সেমিস্টারে আটটি কোর্স নিতে দেয় না। সুতরাং, এই ধরনের অবাস্তব পরিকল্পনাটি কেবল শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপই বাড়াবে।
দ্বিতীয় বিকল্পটি সেই তুলনায় ভালো। কিন্তু, কমপক্ষে ৭০ শতাংশ ক্লাস সম্পন্ন করার শর্ত এটিকেও অবাস্তব করে তুলেছে। সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় কেন একই নীতির আওতায় আসবে না? আসলে, এই অপ্রয়োজনীয় নির্দেশিকা দেয়ার পুরো বিষয়টিই আমার কাছে ভুল বলে মনে হয়।
অতীত অভিজ্ঞতা বলে যে, ইউজিসি প্রায়শই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নীতি প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়, আর বরাবরই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করে। বর্তমানে, এই সংস্থাটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য এক বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, তারা কেবল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই তাদের অবাস্তব দিকনির্দেশনা অনুসরণ করার জন্য চাপ দিচ্ছে।
কিছু শিক্ষাবিদ প্রায়শই যুক্তি দেখান যে ইউজিসির একচোখা নীতিগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাধীনতাকে দমন করে আসছে। কমিশনের সমস্ত সদস্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসাকে তারা এর একটি কারণ হিসেবে মনে করেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে সমস্যাগুলোর মধ্য দিয়ে যায় সেগুলো সম্পর্কে তাদের সামান্যই ধারণা রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য তথাকথিত পরীক্ষার নির্দেশিকা তৈরি এই যুক্তিকেই শক্তিশালী করছে।
ইউজিসি সম্ভবত ভুলে গেছে যে পরীক্ষা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। কেস এবং গবেষণাভিত্তিক ওপেন-বুক এবং টেকহোম পরীক্ষা পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃত। প্রকৃতপক্ষে, এই পরীক্ষাগুলোর বৈধতা একটি ক্লোজ্ড-বুক পরীক্ষার চেয়ে অনেক বেশি। ক্লোজ্ড-বুক পরীক্ষায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে এসে তাদের স্ক্রিপ্টগুলোতে বমি করে।
সুতরাং, আমি বিশ্বাস করি যে ওপেন-বুক এবং টেকহোম পরীক্ষাগুলোর ফলাফল বেশি বিশ্বাসযোগ্য। তবে, ল্যাব পরীক্ষা অনলাইনে পরিচালিত করা অসম্ভব । সুতরাং, শুধু ল্যাব পরীক্ষা স্থগিত করে পেছানো যেতে পারে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেন সমস্ত মূল্যায়ন আলাদা সেমিস্টারে নিয়ে যাবে? এটি শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির সামঞ্জস্যতা নষ্ট করবে।
কভিড-১৯ নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বিশাল বড় বাধা। তাদের নতুন বাধার দরকার নেই। মূল্যায়নের বিষয়ে যতদূর সম্ভব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে দিন। ইউজিসি গ্র্যাজুয়েটদের সনদ দিচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দিচ্ছে। এই মুহূর্তে আমাদের বাক্সের বাইরে চিন্তা করা দরকার। আমাদের চিন্তাধারাকে অবশ্যই এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বাক্সবন্দি করা উচিত নয়।
আমি মনে করি না যে অনলাইন পরীক্ষা দেয়ার জন্য ইউজিসির কোনো ধরনের নির্দেশিকা দেয়ার কোনো প্রয়োজন আছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদরা কীভাবে তাদের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করতে চান, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিক। ব্লুমের ট্যাক্সোনমি অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হলে চিন্তার কিছুই নেই। চিরাচরিত বাক্সবন্দি মানসিকতা এই সঙ্কটের সময় কাজ করবে না। শর্তাদিসহ নীতিমালা তৈরি করে ইউজিসি কেবল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্কুল ও কলেজের স্তরে নামিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের পরীক্ষার পদ্ধতি বাছাইয়ের ব্যাপারে স্বাধীনতা পাচ্ছে। এটা কি কোনো বিচারে পক্ষপাতমুক্ত কাজ? বিচারের ভার পাঠকের ওপর ছেড়ে দিলাম।
সবশেষে, করোনভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি সংগ্রহ করতে পারছে না। কেউ কেউ নিজে থেকেই করছে না। তাই অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষকদের আংশিক বেতন দিতে বাধ্য হচ্ছে। কেউ কেউ একদমই বেতন দিতে পারছে না। সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ধনী নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসিকে অবশ্যই এইসব সঙ্কটাপন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পরিবার সম্পর্কে ভাবতে হবে। তারা বেতনভোগী কর্মচারী। অন্য কোনও উপার্জনের উৎসও তাদের নেই। তারা কীভাবে তাদের পরিবার চালাবেন? এছাড়া ঈদ দরজায় কড়া নাড়ছে। শিক্ষকরাও পিতামাতা। তারা যদি তাদের বাচ্চাদের জন্য নতুন কাপড় কিনতে ব্যর্থ হয় তবে তাদের কেমন লাগবে?
নতুন কাপড় সম্পর্কে ভুলে যান। কিছু শিক্ষকদের এত কম বেতন দেয়া হয় যে তারা তাদের বেতন দিয়ে খুব সহজে মাসিক ব্যয়ও নির্বাহ করতে পারেন না। তাদের যথেষ্ট সঞ্চয়ও নেই।
তাই শিক্ষা ক্ষেত্রেও সরকারের উদ্দীপনা প্যাকেজ দরকার। এই মুহূর্তে সরকারের কিছুটা সাহায্য এই মানুষ গড়ার কারিগরদের অনেকটা সহায়তা করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।
লেখক: মো. কামরুল বারী, সহকারী অধ্যাপক ও প্রধান, বিবিএ এবং এমবিএ প্রোগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিশ্ববিদ্যালয়










