৪০০ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক চামড়াজাত পণ্যের বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা ২ শতাংশের কিছু বেশি। বাজারের বড় অংশ চীনের দখলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চামড়ার আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের প্রভাব কমতে শুরু করলে ধারণা করা হয় চামড়া শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটবে দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষত বাংলাদেশে। তবে সেটি হয়নি। এর অন্যতম কারণ চামড়া শিল্প বিকাশে সহায়ক পরিবেশের ঘাটতি। দেশের ট্যানারি শিল্পের যাত্রা উনিশশ চল্লিশের দশকে হলেও একটি পরিপূর্ণ চামড়া শিল্পনগরী এখনো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। আশা জাগিয়েছিল সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরী। এটি গড়ে তুলতে বিনিয়োগও করা হয়েছে বিপুল। দায়িত্ব দেয়া হয় বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনকে (বিসিক)। সমস্যার সৃষ্টি এখানেই কারণ বিসিকেরে এ-সংক্রান্ত কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। ফলাফল চামড়া শিল্পের নিম্নমুখী যাত্রা। এরই মধ্যে আরো দুটি চামড়া শিল্পনগরী তৈরির পরিকল্পনা করছে বিসিক। ওই প্রকল্পের অবস্থা সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর মতো হলে তা হবে আরো ভয়াবহ। প্রশ্ন হলো, বিসিকের মতো অভিজ্ঞতাহীন প্রতিষ্ঠানকে কেন বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ দেয়া হলো। বিসিক কাজ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প নিয়ে আর চামড়া শিল্প বৃহৎ শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। ক্ষুদ্র শিল্পের পরিকল্পনা দিয়ে বৃহৎ শিল্প সফল হওয়ার নজির খুব বেশি নেই। পরিস্থিতি উন্নয়নে বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ বা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের মতো স্বতন্ত্র বিশেষ কর্তৃপক্ষ গঠন করে চামড়া শিল্পনগরী উন্নয়ন ও তা পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হোক।  

বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে প্রথমে দরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা। এ কর্মপরিকল্পনায় সব অংশীজনের কার কী দায়িত্ব, চামড়া শিল্প কবে কোন পর্যায়ে পৌঁছবে তার একটি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা উচিত। বাংলাদেশের প্রধানতম রফতানি খাত গার্মেন্টস খাতের রফতানি আয়ের একটা বড় অংশ চলে যায় এর কাঁচামাল আমদানিতে। অথচ চামড়া শিল্পের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। চামড়া শিল্পের রফতানি আয়ের সিংহভাগ দেশেই থেকে যায়। কেননা, এর প্রধান কাঁচামাল কাঁচা চামড়া দেশীয় উপাদান। সেদিক থেকে চামড়া শিল্প একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। বাস্তবতা হলো, এ খাতটি যে পরিমাণ গুরুত্বের দাবি রাখে, সে পরিমাণ গুরুত্ব এ খাতটি পায়নি। ২০১৬-১৭ সালকে সরকারিভাবে ‘চামড়া বর্ষ’ ঘোষণা করা হয়েছিল। শিল্পমন্ত্রীর নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করে এ খাতের উন্নয়নে নিয়মিত সভা করার কথা ছিল, কোনোটিই হয়নি। ফলে দেশে উন্নতমানের চামড়া থাকা সত্ত্বেও প্রক্রিয়াকরণ ও পণ্য উৎপাদনে পরিবেশসম্মত কমপ্লায়েন্স না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি কমছে। পরিবেশসম্মত ট্যানারি শিল্পনগরী গড়ে তোলার অংশ হিসেবে ২০১২ সালে একটি চাইনিজ কোম্পানিকে ২৪ মাসের সময় দিয়ে সিইটিপি নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়া হলেও দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২১ সালে সিইটিপির কাজ শেষ হয়, যার সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সিইটিপি দৈনিক প্রায় ২৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য শোধন করতে পারে। কিন্তু কোরবানি ঈদের পর পরই ট্যানারিগুলো দৈনিক প্রায় ৫০ হাজার ঘনমিটার এবং স্বাভাবিক সময়ে ৩০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য তৈরি করে। ফলে পরিশোধন না করেই বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে। ডাম্পিং ইয়ার্ড বলতে কার্যকর কোনো অবকাঠামোই তৈরি করা হয়নি। এলডব্লিউজির সনদ পেতে সিইটিপি ও ডাম্পিং ইয়ার্ডের পুরোপুরি কার্যকারিতা নিশ্চিতকরণসহ অন্য আনুষঙ্গিক অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত মানদণ্ড নিশ্চিত করা আবশ্যক। বিদ্যমান সিইটিপি ও ডাম্পিং ইয়ার্ডের ক্যাপাসিটি দিয়ে প্রয়োজনীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রিসাইক্লিং, সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট যথাযথভাবে করা দুরূহ। সাভারের চামড়া শিল্পনগরী পরিবেশগতভাবে কমপ্লায়েন্ট না হওয়ায় এলডব্লিউজির সনদ লাভ ও নতুন  বাজার সৃষ্টি করা যায়নি। ফলে ইউরোপ ও আমেরিকার বৃহৎ ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য কিনছেন না। সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বাংলাদেশ।

সাম্প্রতিক সময়ে চামড়া শিল্পের জন্য খ্যাতি অর্জনকারী দেশের মধ্যে তুরস্ক অন্যতম। দেশটির ট্যানারি ও চামড়া শিল্পটি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে। কিন্তু তাদের চামড়া শিল্পনগরীগুলো পরিচালিত হয় বিশেষ আইনে। তুরস্কের টুজলা চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তুলতে ১৯৮২ সালে বিশেষ প্রটোকল প্রণয়ন করা হয়। চামড়া শিল্পনগরী উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার জন্য ট্যানারি মালিকদের নিয়ে বিশেষায়িত কোম্পানি গঠন করা হয়। ১৯৯২ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয় এবং ১৯৯৩ সাল থেকে কাজলিসিসমে থেকে পুরনো ট্যানারিগুলো নতুন শিল্প পার্কে স্থানান্তরিত হয়। পার্কটি এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যার ভেতরেই ট্যানারি সংশ্লিষ্ট কেমিক্যাল শিল্প-কারখানাসহ যাবতীয় উপকরণের কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে। এমনকি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থানও রাখা হয়েছে সেখানে। শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অর্থায়ন, পরামর্শ ও তদারকি করলেও পুরো কাজটি হয়েছে ট্যানারি মালিকদের তত্ত্বাবধানে। পার্কটির অভ্যন্তরে নির্মিত বর্জ্য পরিশোধনাগারটি নির্মাণ হয়েছে পুরোপুরি শিল্পনগরী কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে। এখানে সরকার কোনো বিনিয়োগ করেনি। ভবিষ্যতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও এর ধারণ ক্ষমতা বাড়ানো হবে ওই কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে। উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে বৈশ্বিক যাবতীয় চর্চা মেনে চলছে। এখানে সরকার তদারকি ছাড়া আর কিছুই করছে না শুধু তুরস্কের টুজলা নয় বুরশা চামড়া শিল্পনগরীও একইভাবে উন্নয়ন ও পরিচালিত হচ্ছে। শুধু তা-ই নয় ব্রাজিল, মিসর, মেক্সিকোতে গড়ে ওঠা চামড়া শিল্পনগরী উন্নয়ন ও পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি কর্তৃপক্ষ। ভারতের বানতলা চামড়া শিল্প কমপ্লেক্স পরিচালিত হচ্ছে স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটিই সেটি উন্নয়ন ও পরিচালনায় নিয়োজিত। সেখানে বাংলাদেশ বিসিকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে চামড়া শিল্পনগরীর উন্নয়নের মতো জটিল একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিচালনা করছে, যাদের চামড়া শিল্প নিয়ে কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। এটি ছিল সম্পূর্ণ ভুল একটি সিদ্ধান্ত। শিল্পনগরী উন্নয়ন ও সেটি পরিচালনায় উদ্যোক্তাদের বড় আকারে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। অথচ তাদের অধিকাংশের দাবিই সাভারে ট্যানারি শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার সময় উপেক্ষা করা হয়েছে।

সাভারে ট্যানারি শিল্পনগরী বাস্তবায়নে শিল্প মন্ত্রণালয় ব্যর্থতা স্বীকার করেছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু ব্যর্থতা স্বীকারই কি শেষ কথা? সাভার ট্যানারি শিল্পনগরী উন্নয়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগই নেয়া হচ্ছে না। প্রথমেই চাহিদা অনুযায়ী বর্জ্য পরিশোধন প্লান্টের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এরপর বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে ইতালির সান্তা কোরস সুলারনো চামড়া শিল্পনগরীর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। যে শিল্পনগরীতে ১০০ শতাংশ বর্জ্য রিসাইকেল করা হয়। সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরী ব্যবস্থাপনা ও নতুন অঞ্চল গড়ে তুলতে স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনেও এটি গঠিত ও পরিচালিত হতে পারে। বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ দুটো সফল প্রতিষ্ঠান দেশে কাজ করছে। উভয় প্রতিষ্ঠান সুন্দরভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এর আলোকে চামড়া শিল্পনগরী উন্নয়ন ও সেটি পরিচালনায় বিশেষ কর্তৃপক্ষ গঠন জরুরি। অবশ্যই চামড়া শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা, বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এটি গঠন করতে হবে। স্বাধীনভাবে সেটি পরিচালিত হতে হবে। সরকারি-বেসরকারি যৌথভাবে এটি পরিচালিত হতে পারে, প্রয়োজনে তুরস্কের আদলে স্বতন্ত্র কোম্পানিও গঠন করা যেতে পারে।

শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরে অবকাঠামোগত এখনো যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলো দ্রুত দূর করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সঠিক পরিকল্পনা নিতে হবে, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সংকট ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার অসংগতিগুলো সুসম্পন্ন করতে হবে। ব্যাংক ঋণপ্রাপ্তিতে সহজ শর্ত নিশ্চিত করতে হবে; সে সঙ্গে নিরসন করতে হবে যাবতীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। তাহলেই কেবল এ শিল্পের অগ্রযাত্রা ধরে রাখা সম্ভব। চামড়া সাধারণ কোনো শিল্প নয়, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী শিল্প। তাই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে সরকারের দায়িত্ব যত দ্রুত সম্ভব এ শিল্পের সমস্যাগুলো সমাধান করা। বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের বিকাশে এলডব্লিউজির সনদ অর্জনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার ও ট্যানারি মালিকদের মধ্যে সমন্বয় বজায় রেখে কাজ করে যাওয়া একান্ত প্রয়োজন। সক্ষম ট্যানারিগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ইটিপি নির্মাণ করার অনুমতি দেয়া যেতে পারে। এতে সিইটিপির ওপর চাপ কমবে এবং সক্ষম ট্যানারিগুলো ধীরে ধীরে মানসম্মত হওয়ার সুযোগ পাবে। তাছাড়া শিল্পনগরীর মালিকদের অংশে কোন কোন কারখানার কী কী পরিবেশগত মান বজায় রাখা প্রয়োজন, সে বিষয়ে মালিকদের একটি চেকলিস্ট প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। মালিকরাও তাদের করণীয় সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হতে পারবেন। অন্যদিকে নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।