বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ছিল কার্যত স্বাধীনতার ঘোষণা। পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য নানা কথার মারপ্যাঁচে যেভাবে স্বাধীনতার ডাক দিলেন তাতে বাঙালিই সঠিক মেসেজটি পেয়ে যায়। নানা রাজনৈতিক ভেদবুদ্ধির কারণে এই গৌরবময় অধ্যায়কে ধোঁয়াটে করার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো মহল অপচেষ্টা করলেও ইতিহাসের সত্যকে আড়াল করা যায় না। তাই প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের সামনে ইতিহাসের ক্যানভাস থেকে বাস্তবতাকে তুলে ধরা।
বঙ্গবন্ধুর অভ্রভেদি জনপ্রিয়তা তখন। সে সময় এদেশে কার্যত ইয়াহিয়া খানের প্রশাসন স্থবির হয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশই ছিল একমাত্র পালনীয়। ৮ মার্চ বঙ্গবন্ধু ভাষণের সূত্রে আওয়ামী লীগ জনগণের জন্য পালনীয় একটি নির্দেশনামা জারি করে। নির্দেশগুলো ছিল নিম্নরূপ—
১. সরকারকে কেউ খাজনা ও ট্যাক্স প্রদান করবে না, ২. সচিবালয়, সরকারি ও আধাসারকারি অফিসসমূহ, হাইকোর্ট ও অন্যান্য কোর্টে পূর্ণ ধর্মঘট পালন করতে হবে। তবে পরিস্থিতি সাপেক্ষে সময়ে সময়ে উল্লিখিত দপ্তরগুলোর কোনো কোনো শাখাকে ধর্মঘট থেকে অব্যাহতি দেয়া হতে পারে, ৩. রেলওয়ে ও পোর্টগুলোয় যথারীতি কাজ চলবে। মানুষ মারার জন্য সৈন্য কিংবা রসদ পরিবহন করা হলে রেলওয়ে বা বন্দরের কর্মীরা কোনো সহযোগিতা করবে না। রেডিও, টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রে আওয়ামী লীগের সব বিবৃতি এবং আন্দোলনের বিস্তারিত খবরাখবর প্রচার করতে হবে, না করা হলে এসব সংস্থায় কর্মরত বাঙালি কর্মচারীগণ কাজ করবেন না, ৪. শুধু স্থানীয় এবং আন্তঃজেলা টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা চালু থাকবে, ৫. সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে, ৬. ব্যাংকগুলো স্টেট ব্যাংকের মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো উপায়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে টাকা-পয়সা পাঠাতে পারবে না, ৭. প্রতিদিন ঘরে ঘরে কালো পতাকা ওড়াতে হবে, ৮. ওপরে যেসব সেক্টরের নাম করা হয়নি সেগুলোর ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হলো তবে পরিস্থিতি সাপেক্ষে এর যে কোনোটিতে সম্পূর্ণ অথবা আংশিক ধর্মঘট ঘোষণা করতে হতে পারে, ৯. প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, থানা, মহকুমা এবং জেলা পর্যায়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে।
এইদিন সরকার একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। তাতে বলা হয়, ‘চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, ফিরোজ শাহ কলোনি এবং অয়্যারলেস কলোনিতে দাঙ্গাকারীদের হাতে ৭৮ জন নিহত এবং ২০৫ জন আহত হয়।’ কিন্তু এই বানোয়াট বিজ্ঞপ্তিটি জনগণ বিশ্বাস করেনি। চট্টগ্রামের পুরো ঘটনাটি পরিকল্পনামাফিক সাজানো হয়েছিল। কিছুসংখ্যক অবাঙালি সৈন্য আগে থেকে এসব কলোনিতে এনে রাখা হয়েছিল। বিহারি এবং অবাঙালি সৈন্যরাই এই হত্যাকাণ্ড চালায়। শুধু চট্টগ্রামেই নয়, সৈয়দপুরেও বিহারিদের হাতে অনেক বাঙালি নিহত হয়। হতাহতের খবর সামরিক সরকার আড়াল করে রাখে। পরদিন তাজউদ্দিন আহমদ এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ও তীব্র নিন্দা জানান।
এই উত্তাল পরিস্থিতি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করা হলো জেনারেল টিক্কা খানকে। এর আগে বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ দমনের জন্য গণহত্যা করার দুর্নাম ছিল টিক্কা খানের। জেনারেল টিক্কা খানকে শপথবাক্য পাঠ করানোর জন্য কোনো বিচারপতি পাওয়া যাচ্ছিল না। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বিচারপতি সিদ্দিকী শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনায় অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন।
৯ মার্চ যেদিন টিক্কা খান নিয়োগ পেলেন একই দিন বিকালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা মওলানা ভাসানী পল্টন ময়দানে এক সভায় বক্তৃতা করেন। এখানেই তিনি আন্দোলনের ১৪ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও চলমান আন্দোলনকে সমর্থন ও একাত্মতা ঘোষণা করে বলেন, “...নির্বিচারে গণহত্যা করে ‘জালিয়ানওয়াবাগে’র মর্মান্তিক ইতিহাস রচনা করে প্রবল পরাক্রমশালী বৃটিশ সরকারের শেষ রক্ষা হয় নাই...ইয়াহিয়াকে বলি অনেক হয়েছে, আর নয়। তিক্ততা বাড়িয়ে আর লাভ নেই। ‘লাকুম দ্বীনকুম ওলিয়া দ্বীন’-এর নিয়মে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার করিয়া লও।...আমি শেখ মুজিবের সাথে মিলে তুমুল অন্দোলন শুরু করব। খামোখা কেউ মুজিবকে অবিশ্বাস করবেন না, মুজিবকে আমি ভালো করে চিনি।” মওলানা ভাসানি এ ধরনের বক্তব্য প্রদানের কারণ ছিল। এ সময় প্রগতিশীল ধারার কর্মীরা স্বাধিকার আন্দোলনের মূল স্রোত থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এ কারণে এই প্রবীণ নেতা চেয়েছিলেন এদের দূরত্ব কিছুটা কমিয়ে আনতে।
একই দিনে রাজশাহীতে নতুন করে কারফিউ জারি করা হয়। অবস্থা অনেকটা ঘোলাটে হয়ে পড়েছিল। এই সত্যটি স্পষ্ট হয় যখন জানা গেল জাতিসংঘের সে সময়ের মহাসচিব উথান্ট ঢাকায় নিয়োজিত জাতিসংঘের স্থায়ী কমিটির প্রতিনিধিকে নির্দেশ দেন যাতে এখানকার সব কর্মচারী ও তাদের পরিবারকে সরিয়ে নেয়া হয়। একই সঙ্গে জাপান এবং পশ্চিম জার্মানির সরকারও তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার জন্য ঢাকায় বিমান পাঠান। এমন একটি সময়ে খবর আসে ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে বেশকিছু বিস্ফোরক দ্রব্য খোয়া গেছে।
এক রকম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে ৯ মার্চ অতিবাহিত হয়। ১০ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বিবৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এখানে তিনি বলেন, ‘কোন অশান্ত এলাকা থেকে নিজ কর্মচারীদের সরিয়ে নিলেই জাতিসংঘের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আজ আমরা গণহত্যার মুখোমুখি। এই হুমকি এ দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের মৌলিক অধিকার তথা জাতিসংঘের মানবাধিকারসংক্রান্ত সনদ লঙ্ঘনের হুমকি।’
১০ মার্চ আরেকটি ঘটনা ঘটল নারায়ণগঞ্জে। জেলখানা থেকে ৪০ জন কয়েদি বেরিয়ে যায়। এ সময় নিরাপত্তারক্ষীরা গুলিবর্ষণ করলে ২৫ জন কয়েদি আহত হয় এবং একজন মারা যায়। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে এদিন পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করেন।
এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি শাসক ও সেনাবাহিনীর অফিসাররা ঘন ঘন সভা করতে থাকেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাকিস্তানি জেনারেল মিঠ্ঠা খান চট্টগ্রামে আসেন। ততক্ষণে বাঙালিদের হত্যা করার নীলনকশার সূত্রে করাচি থেকে অস্ত্রবোঝাই জাহাজ ‘সোয়াত’ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। চট্টগ্রামে তখন বাঙালি অফিসার ব্রিগেডিয়ার মজুমদার কর্মরত ছিলেন। তাকে নির্দেশ দেয়া হয় এমভি সোয়াত থেকে অস্ত্র খালাসের ব্যবস্থা করতে। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার মিঠ্ঠা খানকে জানান এ নির্দেশ দিলে জনগণ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে পারে। জনরোষের মুখোমুখি হতে পারি আমরা। তবু শক্ত অবস্থানে থাকতে চান জেনারেল মিঠ্ঠা খান। তিনি সোজা জানিয়ে দেন রক্ত ঝরলেও একে পরোয়া করা যাবে না।
পূর্ব পাকিস্তানে বিশেষ করে ঢাকায় ১১ মার্চ একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে খুব শিগগির ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসছেন। এ দিনই বরিশালে জেল ভেঙে কয়েদি পালানোর ঘটনা ঘটে। এখানে নিরাপত্তারক্ষীদের গুলিতে দুজন মারা যায় এবং ২০ জন আহত হয়। পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় ৪০ জন কয়েদি।
দিনে দিনে এভাবে আন্দোলন দানা বাধতে থাকে। জনগণ স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ হয়ে পড়ে। তারা জীবনের পরোয়া না করে জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্দোলনে। এ সময় গোটা পূর্ব পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তান সরকারের হতে ছিল না। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই সব চলছিল। এ অবস্থায় ১১ মার্চ মওলানা ভাসানীসহ অনেক রাজনৈতিক নেতা বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেন। এসব রাজনৈতির ব্যক্তিত্ব এ সময় দেশের নানা স্থানে বত্তৃতা করে জনমত গঠন করছিলেন। লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী সবাই আন্দোলনের প্রতি নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করেন। এইভাবে দিনে দিনে স্বাধীনতা সংগ্রাম সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
পরদিন অর্থাৎ ১২ মার্চ অনেকটা বাস্তবসম্মত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল আসগর খান। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গণআন্দোলনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি অভিমত প্রকাশ করেন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের অদূরদর্শিতার কারণে পূর্ব পাকিস্তান যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তবে তা এসব নেতার জন্য একটি মহাঅপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হবে। এদিন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের বাঙালি সদস্য এবং পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের সদস্যবৃন্দ শেখ মুজিবের ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে নিজেদের একাত্মতা ঘোষণা করেন। এমন একটি অবস্থায় পকিস্তানের কয়েকজন নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য অনুরোধ জানান।
এই সূত্রে ১৩ মার্চ লাহোরে এসব নেতা একটি বৈঠকে মিলিত হন। তবে এ বৈঠকে অংশ নেয়নি ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি এবং কাইউম খানের মুসলিম লীগের নেতারা। প্রকৃত প্রস্তাবে ভুট্টো তখন পাকিস্তানি শাসকদের সঙ্গে বঙালিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া পর্দার অন্তরালে তিনি ইয়াহিয়া খানের রাজনৈতিক পরামর্শদাতার ভূমিকা পালন করছিলেন।
পূর্ব পাকিস্তানের বেসরকারি প্রশাসন এ সময় প্রায় ভেঙে পড়েছিল। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তখন আন্দোলনের জন্য মাঠে। এ অবস্থায় ১৩ মার্চ সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ ১১৫ নং সামরিক আইন আদেশ জারি করে। এতে যেসব বেসরকারি কর্মচারী প্রতিরক্ষা বাজেট থেকে বেতন পান তাদের ১৫ মার্চ বেলা ১০টার মধ্যে কাজে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। নতুন আইনে ঘোষণা করা হয় নির্ধারিত দিনের মধ্যে যারা যোগ দিতে ব্যর্থ হবে তাদের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। তবে রাজনৈতির বিশ্লেষকদের মতে প্রকৃত রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় না এনে এমন চরম আদেশ সুবিবেচনাপ্রসূত হয়নি।
বাস্তবেও দেখা গেল সাধারণ মানুষ বা কর্মচারী অমন আদেশকে গ্রহণ করতে পারল না। ১৪ মার্চ সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা সামরিক আইন আদেশটি অমান্য করে। পকিস্তানি ষড়যন্ত্র থেমে যায়নি। এদিন চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে আসা একটি খাদ্যশস্যবোঝাই জাহাজকে পাকিস্তান সরকার ফিরিয়ে দেয়। এতে অনেকের কাছে স্পষ্ট হয়, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর এটি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের একটি প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ।
১৪ মার্চ ভুট্টো একটি অদ্ভুত দাবি উত্থাপন করলেন। তিনি বললেন, পাকিস্তানের প্রত্যেক প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে আলাদাভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। কিন্তু তার এ দাবি পাকিস্তানের কোনো অংশের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হলো না। অনেকেই এর নিন্দা জানালেন। এই সময় এ ধরনের বিতর্ক ইয়াহিয়া খানের জন্য সুখকর ছিল। কারণ এতে আলোচনা করার জন্য একটি বড় সময় পাওয়া যাবে। তবে এই উত্তাল সময়গুলোই শেষ পর্যন্ত বাঙালিকে নিয়ে যায় ২৩ মার্চ হয়ে ২৫ মার্চের দোরগোড়ায়।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










