শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালে সড়ক পরিবহন আইন পাস করে সরকার। দীর্ঘ চার বছর ঝুলে থাকার পর সম্প্রতি সড়ক আইনের বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাতে আবার উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও শিক্ষার্থীদের দাবির অধিকাংশই উপেক্ষিত বলে বণিক বার্তায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ফলে নতুন আইনেও সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার আশা করা যাচ্ছে না। দুঃখজনক বিষয় হলো বিধিমালায় চালকদের দক্ষতা, ফুটপাত হকারমুক্ত রাখা, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে মানুষকে সচেতন করা, বাস স্টপেজ তৈরি, অবৈধ পার্কিং বন্ধ, ট্রাফিক সিগন্যালের উন্নয়নসহ অনেক বিষয়ই আমলে নেয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের নয় দফা দাবির অন্যতম ছিল ফিটনেসবিহীন ও লাইসেন্সবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করা। আন্দোলনের চার বছর পরও এর কোনোরটিই বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। এখনো গাড়ির চেয়ে লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা কম। সড়কে অবাধে চলছে ফিটনেসবিহীন গাড়ি। এমনকি সড়ক ও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনা হ্রাস কমিটির ১১১ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নে গঠিত টাস্কফোর্সও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। দুর্বল বিধিমালা দিয়ে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার আশা করা বাতুলতা মাত্র। জনমত জরিপের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিধিমালা যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু একটি জাতীয় সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো এবং দুর্ঘটনাকেন্দ্রিক অপরাধের বিচার ও শাস্তি প্রদানে একটি কার্যকর এবং ফলপ্রসূ আইনের প্রত্যাশা অনেক পুরনো। কিন্তু কোনো সরকার এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়েছে বলে মনে হয় না। ২০১৮ সালে রাজধানীতে এক বেপরোয়া বাসের চাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় ব্যাপক বিক্ষোভ প্রতিবাদের চাপে পুরনো আইন সংশোধন করে অপরাধের দণ্ডের মাত্রা বাড়ানোসহ কিছু কঠোর পদক্ষেপ রাখা হয় আইনে, কিন্তু প্রভাবশালীদের কারণে এক্ষেত্রে অগ্রগতি ধীর। বিআরটিএও সহযোগী নয়। এ আইন বাস্তবায়ন করতে হলে মূলে হাত দিতে হবে। বিআরটিএ স্বচ্ছ হলে সড়ক-মহাসড়কে নৈরাজ্য প্রায় কমে আসবে। যে প্রেক্ষাপটে আইনটি পরিবর্তন করা হয়েছিল, আদৌ সেই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে কিনা, ধারাগুলো পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে মালিকদের সুযোগ করে দেয়া হবে কিনা; এসব প্রশ্ন নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও। এছাড়া চালকদের বেতনকাঠামো এবং আট ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালানো, চালকদের দক্ষ করে তৈরি করার জন্য প্রশিক্ষণ, সড়কের ত্রুটি নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া, চালকদের বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেয়াসহ নানা বিষয় সম্পর্কে এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। এতদিন বিধিমালার কারণে আইন প্রয়োগ করা যায়নি, এখনো বিধিমালা চূড়ান্ত করা হলেও অনেক কাটছাঁট করায় ফল নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কোনো পরিবহন চালকই
রাস্তায় দুর্ঘটনা
ঘটাতে চাইবেন
না। কিন্তু
বাস্তবে সড়কে
অনুকূল অবস্থা
বিরাজ না করা, গাড়িগুলোর
ফিটনেস না থাকা এবং সর্বোপরি নির্দিষ্ট
শ্রমঘণ্টার পরিবর্তে
মালিকরা তাদের
চাপ দিয়ে
বেশি কাজ করিয়ে নেয়ার
কারণে চালক
ও তার সহকারীরা সবসময়
একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে থাকেন।
এখন নজিরবিহীন
ছাত্র আন্দোলনের
মুখে বেপরোয়াভাবে বা অবহেলা করে গাড়ি চালানো
থেকে সৃষ্ট
দুর্ঘটনায় কেউ গুরুতর আহত বা নিহত
হলে তিন বছরের কারাদণ্ড
বাড়িয়ে পাঁচ
বছর করা হয়েছে। পরিহাস
হলো, জেনারেল
এরশাদ সামরিক
শাসনামলে শ্রমিক
নেতাদের চাপে
এক্ষেত্রে সাত বছরের কারাদণ্ড
কমিয়ে তিন বছর করেছিলেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের
আমলে গঠিত
সরকারি কমিটির
সুপারিশ অনুযায়ী
সাত বছরের
বিধান বাস্তবায়ন
করা গেল না। এখন শাস্তি দুই বছর বাড়িয়ে
তাতে ‘সাফল্য’
দাবি করছে।
অথচ প্রতিবেশী
ও উন্নত
দেশে এখানে
১০-১৪ বছরের জেলের
বিধান আছে।
আবার এসব সত্ত্বেও বড় সত্যি হলো, তিন বছরের
সাজা বাস্তবে
কেউ খেটেছেন,
এ রকম নজির একেবারেই
বিরল। বিদ্যমান
আইনে সপ্তাহে
অনধিক ৪৮ ঘণ্টা কাজ করানোর বিধান
আছে। বাস্তবে
এর চরম লঙ্ঘন ঘটছে।
কারণ, মালিকরা
নানা কূটকৌশলে
শ্রমিকদের মাত্রাতিরিক্ত খাটাতে বাধ্য করছেন,
যা সড়ককে
দুর্ঘটনাপ্রবণ করার
অন্যতম মুখ্য
কারণ। অথচ এ বিধান
বিলোপের প্রস্তাব
করা হয়েছে।
বলা হয়েছে,
সরকার এটা প্রজ্ঞাপন দিয়ে
ঠিক করবে,
যা গ্রহণযোগ্য নয়। সড়কে যে নৈরাজ্য চলছে,
সেটা অবশ্যই
প্রধানত আইনের
ঘাটতি থাকার
কারণে নয়। তাই আইন পাসের চেয়ে
সরকার আইন বাস্তবায়নে কতটা
বিশ্বস্ততা দেখাতে
পারে, সেটাই
বড় চ্যালেঞ্জ।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধ এবং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে নানামুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। আশার কথা হলো, নানা প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস এবং অংশীজনদের সহযোগিতায় মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমে এলেও আঞ্চলিক, জেলা, উপজেলা এবং গ্রামীণ সড়কগুলোয় দুর্ঘটনা ঘটছে। বড় গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ তুলনামূলক কমলেও ছোট গাড়ি বিশেষ করে সিএনজি অটোরিকশা এবং মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে। অনেক দিনের প্রত্যাশিত আইনের কার্যকারিতা প্রশ্নের সম্মুখীন। তাই নতুন সড়ক পরিবহন আইনটি যদি কোনো মহলের চাপের মুখে ব্যাহত হয় এবং সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশ, দারিদ্র্য বিমোচন ও এসডিজি বাস্তবায়নের যে স্বপ্ন দেখছে সরকার তা পূরণ হবে না। লক্ষণীয়, জাতিসংঘের যেসব সদস্য রাষ্ট্র ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছিল, তার একটি বাংলাদেশ। অঙ্গীকার পূরণ দূরে থাক, বরং দিন যত যাচ্ছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। তার মানে এটা শুধু ফাঁপা অঙ্গীকার ছিল। দুর্ঘটনা রোধ বা কমিয়ে আনতে সত্যিকার অর্থে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষগুলো আদৌ কোনো কার্যকর পরিকল্পনা ও কৌশলই গ্রহণ করেনি। দেশে কী কী কারণে এত বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, কী কী পদক্ষেপ নিলে দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা সম্ভব—এসব বহুল আলোচিত বিষয়। এ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য মোটাদাগে কিছু কারণ বিদ্যমান। সেগুলো হলো চালকের অসতর্কতা, অসচেতনতা, বেপরোয়া বা অনিয়ন্ত্রিত গতিতে গাড়ি চালানো, ত্রুটিপূর্ণ রাস্তা, ফিটনেসবিহীন-ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন প্রভৃতি।
ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ভুয়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো বন্ধ করা হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমতে পারে, কিন্তু এক্ষেত্রে ফলপ্রসূ উদ্যোগ নেই। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের বিচার ও যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়নি অনেক ক্ষেত্রে। বলতে গেলে, এক্ষেত্রে একটি গভীরতর দায়মুক্তির সংস্কৃতি বিরাজমান। এটি দূর করতে হবে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সড়ক পরিবহন আইন প্রণীত হয়েছে। এতে দায়ীদের শাস্তি বাড়ানো হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। শাস্তি বাড়ালেই হবে না, যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ায় যেন কার্যকর করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি কারণ হলো ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থা। মহাসড়কগুলোয় বাঁক থাকার কারণে সামনের দিক থেকে আসা গাড়ি দেখতে না পেয়ে অনেক চালক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা দেশের সড়ক ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্ল্যাক স্পট চিহ্নিত করেছেন। সেগুলো সংশোধন করতে হবে। এছাড়া রাস্তার পাশে হাটবাজার স্থাপন ও ওভারব্রিজ না থাকাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। সঠিক প্রকৌশলগত জ্ঞানের ভিত্তিতে এসব ত্রুটি দূর করা গেলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে হ্রাস পাবে বৈকি। সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ মহাসড়কগুলোয় দ্রুতগতির যানবাহনের পাশাপাশি ধীরগতির যানবাহন চলাচল। গতির তারতম্য থাকায় দ্রুতগতির গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে ধীরগতির বাহন রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ে। ধীরগতির যানবাহন মহাসড়কে বন্ধ করতে বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাতে খুব একটা সুফল মেলেনি। এ ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হলে সার্বক্ষণিক তদারকি এবং ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে ট্রাফিক আইন অমান্য করার কারণেও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই আমাদের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরো উন্নত ও আধুনিক করতে হবে। সড়ক-মহাসড়কগুলোকে ডিজিটাল নজরদারির আওতায় নিয়ে আসা এক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হতে পারে।
প্রতিনিয়ত বেড়ে চলা দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের আর শৈথিল্যের সুযোগ নেই। সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের কাজ করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধের উপায় হিসেবে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের অনেক সুপারিশ-পরামর্শ রয়েছে। সেসব সুপারিশ বিআরটিএ, সড়ক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর কাছে রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেগুলো বাস্তবায়নের সক্রিয় উদ্যোগ নেয়া। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনাগুলোর বাস্তবায়ন দেখভাল করার জন্য কয়েকজনকে দায়িত্বও দিয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ। এখন সময় নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের। চালক ও যানবাহনের লাইসেন্স থেকে শুরু করে সড়ক এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিরাজমান পদ্ধতিগত ত্রুটি-দুর্বলতাগুলো দূর করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনার হার ক্রমে কমিয়ে আনা অসম্ভব নয়। আধুনিক, মানসম্পন্ন ও নিরাপদ সড়ক পরিবহন যেকোনো দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নকেও গতিশীল করে। পরিবহন খাত এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক যোগাযোগ ছাড়াও আন্তর্জাতিক অনেক বিষয় এখন পরিবহনে যুক্ত। তাই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এজন্য সময়ের ধারাবাহিকতায় সড়ক পরিবহন আইনে যে বিষয়গুলো সংযোজিত হয়েছে, তার কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি মনে করছি। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সমাধানের অযোগ্য কোনো বিষয় নয়। এজন্য দরকার ইতিবাচক চিন্তা ও সমন্বিত পদক্ষেপ।










