আমাদের সামাজিক জীবনে ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য করে চলতে হয়। এক্ষেত্রে নৈতিক মানদণ্ডে রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে শাস্তির মুখোমুখি হওয়া খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। মূলত সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বসবাসের উপযোগী সামাজিক কাঠামো বজায় রাখতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অপরাধী চিহ্নিত হওয়া নাগরিকদের সংশোধনের জন্য কারাগারে প্রেরণ করা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে একজন নাগরিক যেন তার মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন সেটি তদারকির দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়।
এটা সত্য, মানুষের
ভেতর অপরাধপ্রবণতা কাজ করে। এজন্য
আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে
ফেললে বা লোভের বশে মানুষ অপরাধের
দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু
একজন অপরাধীকে
‘অপরাধী’ বলার
আগে আইন-আদালতের মাধ্যমে
তার অপরাধ
প্রমাণিত হতে হয়। এর আগে আদালত
অপরাধের জন্য
অভিযুক্ত ব্যক্তিকে
রিমান্ডের জন্য
কারাগারে প্রেরণ
করতে পারেন
অথবা সংশ্লিষ্ট
ব্যক্তির পক্ষে
জামিন আবেদন
মঞ্জুর করে আদালতে অপরাধ
প্রমাণিত হওয়ার
পর কারাদণ্ড
দিতে পারেন
বা বেকসুর
খালাস ঘোষণা
দেয়ার অধিকার
রাখেন। এক্ষেত্রে
কারাগারে শাস্তি
ভোগ করার
সময় আদালতের
আদেশের ভিত্তিতে
অপরাধী সাব্যস্ত
ব্যক্তি বেঁচে
থাকার জন্য
উপযুক্ত খাবার
কারা কর্তৃপক্ষ
থেকে পেয়ে
থাকেন।
শাস্তি ভোগের এ পুরো প্রক্রিয়াতেই একজন নাগরিকের ন্যূনতম মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হয়। সে হিসেবে মৌলিক অধিকার খাদ্যের ক্ষেত্রে কারাবন্দিদের জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জাতীয় খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকা অনুসারে পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসের উপযোগী খাবার সরবরাহ করা হয় না এমন চিত্র বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবরে উঠে এসেছে।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারাগারগুলোয় বর্তমানে ৮৪ হাজারেরও বেশি বন্দি রয়েছেন। তাদের সকালের নাশতায় বৈচিত্র্যের পাশাপাশি বিশেষ দিনের খাবারের মান উন্নয়ন হলেও দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতি রয়ে গেছে। কারাবন্দিদের দুপুর ও রাতের খাবারে সবজি ও মাছ-মাংসের মতো পুষ্টিকর খাবারের উপস্থিতি জাতীয় মানদণ্ডের চেয়ে অনেক কম। আবার তাদের খাদ্যতালিকায় ডালের প্রয়োগ প্রয়োজনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। নিয়মানুযায়ী একজন কারাবন্দি দুপুর ও রাতে খাবার পেয়ে থাকেন। প্রতি বেলায় তাদের ভাত, ডাল ও সবজি পরিবেশন করা হয়। এর মধ্যে এক বেলা মাছ বা মাংস দেয়া হয়। খাবারের ক্ষেত্রে কয়েদি ও হাজতি বন্দিদের জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকে। এক্ষেত্রে জাতীয় খাদ্যগ্রহণ নির্দেশিকায় বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত পুষ্টিকর খাবারের প্লেটের মান রক্ষা করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের অপরিমিত খাবার পরিবেশন কারাবন্দিদের খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এছাড়া পুষ্টিবিদদের মতে অপর্যাপ্ত খাদ্যাভ্যাস থেকে পুষ্টিহীনতার পাশাপাশি নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
কারা কর্তৃপক্ষের সরবরাহকৃত খাবারে কম পুষ্টি থাকার পাশাপাশি বন্দিদের ক্ষুধাও মেটে না। এক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে কারাগারের ভেতরে থাকা ক্যান্টিনে খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সেখানে খাবারের দাম অনেক থাকায় সবার পক্ষে কারা ক্যান্টিন থেকে খাবার কিনে খাওয়া সম্ভব হয় না। এটা অধিকাংশ বন্দির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, তারা কারা কর্তৃপক্ষের সরবরাহকৃত খাবার খেয়েই জীবনধারণ করে থাকেন।
এক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষ বন্দিদের খাবারের মেনুতে পরিবর্তন আনার কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন কতটুকু হয়েছে সেটি প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। সে সঙ্গে তাদের পক্ষ থেকে পুষ্টিবিদদের সঙ্গে পরামর্শ করে বন্দিদের খাবারের মেনু সমন্বয় করার কথা বলা হলেও অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে বাস্তবে তা কার্যকর হবে কিনা এ বিষয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
একজন
মানুষ আদালতের
রায়ে শাস্তি
পেলেও তাকে
তো বেঁচে
থাকার জন্য
প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর
খাবারটুকু দিতে
হবে। না হলে সংশোধনাগার হিসেবে কারাগার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়ে
যাবে। অথচ
কারাগারগুলোয় বন্দিদের
কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে
বিভিন্ন উদ্যোগ
চালু রয়েছে।
বন্দিদের পুনর্বাসনের জন্য এসব উদ্যোগ
সফল করার
জন্য হলেও
পুষ্টিকর খাবার
নিশ্চিত করা
উচিত। মোটকথা,
একজন মানুষ
তার চেনা
পরিবেশের বাইরে
এসে বন্দি
অবস্থায় থাকছে,
স্বজনদের কাছ
থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যে মানসিক
যন্ত্রণা পাচ্ছে
সেটি কিন্তু
অনেক বড় বিষয়। এর বাইরে তাকে
যদি খাবারের
কষ্টও দেয়া
হয় তা রীতিমতো অমানবিক।
এক্ষেত্রে রাষ্ট্র
একজন বন্দিকে
পুষ্টিকর খাবার
থেকে বঞ্চিত
করার অধিকার
রাখে না, বরং বিচারের
মুখোমুখি হওয়া
কারাবন্দি ব্যক্তি
রাষ্ট্রের নাগরিক
হিসেবে কারা
কর্তৃপক্ষের কাছ
থেকে পুষ্টিকর
খাবার পাওয়ার
অধিকার রাখেন।
কারণ কারাবিধি
অনুযায়ী একজন
সুস্থ মানুষকে
শাস্তি প্রদান
করা হয়।
এজন্য ফাঁসির
রায় বাস্তবায়ন করার আগে কনডেম
সেলে থাকা
আসামির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়।
অর্থাৎ রাষ্ট্র
একজন অসুস্থ
নাগরিককে শাস্তি
প্রদান করে
না। এজন্য
কারাগারে কেউ
অসুস্থ হয়ে
পড়লে তাকে
পুলিশি প্রহরায়
হাসপাতালে চিকিৎসা
প্রদান করা
হয়। এটা
অসুস্থতার সর্বশেষ
স্তর হলেও
তার আগে
একজন কারাবন্দি যেন সুস্থ থাকেন
সেটা তো নিশ্চিত করতে
হবে। কারণ
একজন মানুষ
স্বাভাবিকভাবে বেঁচে
থাকলে তখনই
তার শাস্তি
নিশ্চিত করা
যায়। পাশাপাশি
জেলখানায় কোনো
কয়েদির অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে সেটি
কারা কর্তৃপক্ষের সততাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আমরা বিচারের মুখোমুখি কারাবন্দিদের মানবাধিকার প্রাপ্তির বাস্তবায়ন দেখতে চাই। কারণ অপরাধী পরিচয়ের আগে একজন বন্দির মূল পরিচয় সে একজন মানুষ। আর মানুষ হিসেবেই তার মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে অপরাধীকে শাস্তি দিতে গিয়ে রাষ্ট্র যদি তাকে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না দেয়, তাহলে রাষ্ট্র নিজেই কিন্তু দোষী সাব্যস্ত হয়।
বিশ্বব্যাপী এখন অপরাধীদের বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর কারাগারে এখন পুষ্টিকর খাবারসহ নানা সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মূলত পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা করার মানসিকতায় একজন নাগরিককে সংশোধন হওয়ার সুযোগ দিতে হয়। এজন্য স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে একজন স্বাধীন মানুষকে বন্দি করাই আসলে অনেক বড় শাস্তি। এর সঙ্গে বন্দিকে পুষ্টিকর খাবারের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য শোভনীয় নয়। আমরা প্রত্যাশা করব, পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার সরবরাহের মাধ্যমে কারা কর্তৃপক্ষ বন্দিদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করবে এবং কারাগারকে প্রকৃত অর্থে সংশোধনাগার হিসেবে গড়ে তুলবে।










