ড. শামসুল আলম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। ২০০৯ সালের ১ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। সিনিয়র সচিব পদে দীর্ঘ এক যুগ চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালন করে ২০২১ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। ড. শামসুল আলম ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শেষে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালে ব্যাংককের থাম্মাসাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ ও ১৯৯১ সালে ইংল্যান্ডের নিউ ক্যাসল আপন টাইন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক অবস্থা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো কী কী? কিছু সমস্যার পেছনে বহির্বিশ্বের প্রভাব রয়েছে সত্য কিন্তু অভ্যন্তরীণ দুর্বল নীতি ও তদারকির অভাবের বিষয়টি কী এড়িয়ে যাওয়া যায়? এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্য বেশি বলে অভিযোগ করছেন অনেকে। আপনার অভিমত কী?

বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরা, বৈদেশিক রিজার্ভের পতন ঠেকানো কিংবা কিছুটা সময়ের জন্য আপাতত ধীরগতি করা, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন এগিয়ে নেয়া, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, খাদ্যসামগ্রীর উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা। কভিডের পুনঃউত্থানজনিত চাহিদা বৃদ্ধি ও ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধজনিত সমস্যায় পৃথিবীর সব দেশের মতো বাংলাদেশও নিপতিত। অভ্যন্তরীণ দুর্বল নীতি বলে কিছু নেই। সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রজ্ঞাশীল নীতি পরিচালনার মাধ্যমেই আমরা ইতিহাসের সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিলাম, মাথাপিছু আয়ে ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলতে পেরেছি, সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোয় এসব দেশকে পেছনে ফেলতে পেরেছি। তদারকির অভাব হলে গত দেড় দশকে বাংলাদেশে ভৌত অবকাঠামোগত খাতে এত বিস্ময়কর দৃশ্যমান উত্থান কেমন করে হলো? স্মরণ করুন: দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিল প্রকল্প, কুড়িল-বাড্ডা ফ্লাইওভার, বনানী-মিরপুর ফ্লাইওভার, যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার, ঢাকা-মাওয়া ফ্লাইওভার, পদ্মা সেতুসহ সব দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা, ছয় লেন-চার লেন সব মহাসড়ক, যা দেড় দশক আগেও ছিল অকল্পনীয়।

বাংলাদেশে মাছাপিছু আয় বেশি হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন ডলারে প্রতি কেজি চালের দাম বাংলাদেশে ভারত (চাল রফতানিকারক দেশ) ও পাকিস্তানের চেয়েও কম। চাল প্রতি কেজি বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৬৯, শূন্য দশমিক ৭৯ এবং পাকিস্তানে শূন্য দশমিক ৮২ ডলার; আটা প্রতি কেজি বাংলাদেশে শূন্য দশমিক ৪৫, ভারতে শূন্য দশমিক ৭১ এবং পাকিস্তানে শূন্য দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার, ব্রয়লার মুরগি বাংলাদেশে প্রতি কেজি ১ দশমিক ৫৯, ভারতে ৮ দশমিক ৭৮ ও পাকিস্তানে ২ দশমিক ৫৫ মার্কিন ডলার।

 

ডলারসংক্রান্ত সমস্যা তৈরির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ভ্রান্ত পদক্ষেপ এবং বিভিন্ন সময়ে ভুল নির্দেশনাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে আপনার অভিমত কী?

বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য যথার্থ নয় বলে মনে করি। ডলারসংক্রান্ত সমস্যা কোনো ভ্রান্ত পদক্ষেপে বা ভুল নির্দেশনায় হয়নি। তাহলে এটা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে কেন হয়নি? ডলার বা বিনিময় হারের যে অস্থিরতা তা যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণেই ঘটেছে। আমেরিকার ‘ফেডে’র বারবার নীতি সুদহার বাড়ানোর কারণেও আমাদের ডলারে টান পড়েছে।

 

ডলার সংকটের পেছনে আমদানির অতিরিক্ত উল্লম্ফন ও অর্থ পাচারকে দায়ী করছেন অনেকে। সরকারের পক্ষ থেকেও মাঝেমধ্যে অর্থ পাচার নিয়ে কথা বলা হলেও বিষয়টি কেন তদন্ত করে দেখা হচ্ছে না?

আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং সমস্যা আশির দশক থেকেই শুনে আসছি। অর্থ পাচার অভিযোগও কোনো নতুন বিষয় নয়। ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও দুদক এখন অনেক বেশি সক্রিয় এবং দৃশ্যমান। এসব বিষয়ে বিদেশী সূত্র থেকে ব্যবহারযোগ্য তথ্য পাওয়া দুরূহ। উচ্চ মহলে বিস্তৃত এ পুঁজি পাচার সমস্যা উঁচুমানের দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার নিশ্চয়তা প্রদান ব্যতীত কোনো দেশেই থামানো যায়নি। যে দেশে পুঁজিনিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি, সে দেশ থেকে পুঁজি পাচার সবচেয়ে কম।

 

ডলারের রিজার্ভের তথ্য নিয়ে আইএমএফ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে কেন? এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাক করে হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সরকার কি রিজার্ভ ও ভল্টে রক্ষিত স্বর্ণের আন্তর্জাতিক অডিট করাবে?

ডলার রিজার্ভের হিসাব নিয়ে কখনো কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। রিজার্ভ থেকে রফতানি সহায়তা ও বিনিয়োগ ঋণ প্রদানের পর এখন রিজার্ভ হিসাবে অসামঞ্জস্যতার কথা কতিপয় অর্থনীতিবিদ বলেছেন, আইএমএফও বলতে চাইছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের খাতায় যে রিজার্ভ সেটা অলস থাকুক আর বিনিয়োগে যাক এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঞ্চিত সম্পদ। একেবারে পূর্ণ অবলোপন ছাড়া এ সম্পদ কেন বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে না? এতে অসামঞ্জস্যতা কোথায়? রিজার্ভ পরিমাণ প্রতিনিয়ত ঘোষিত হচ্ছে—যা প্রকৃত ট্রানজাকশনের ভিত্তিতে, তো সেটার আবার অডিট হতে হবে কেন? বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ কোথায় ব্যবহূত/বিনিয়োগ করেছে তার স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশিত। হ্যাকিংয়ের সঙ্গে অডিট হওয়ার সম্পর্ক নেই। হ্যাকিং হওয়াটা ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা অবশ্যই। যাদের অবহেলায় হ্যাকিং হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

 

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং এর প্রভাব থেকে দরিদ্র মানুষকে রক্ষায় সরকারের পদক্ষেপের ঘাটতি ও দুর্বলতা রয়েছে বলে অনেকে বলছেন। আর কী কী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে?

প্রথম থেকেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার তত্পর। যেহেতু মূল্যস্ফীতির কারণ দেশজ নয়, আমদানীকৃত পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশে দাম বাড়ছিল, সেজন্য চালসহ প্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর আমদানি কর দ্রুত এবং ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা হয়। পরিস্থিতির সুযোগে মজুদদারি করে যেন কেউ দাম না বাড়াতে পারে, সেজন্য ব্যক্তিমালিকানাধীন পণ্যগুদামে হানা দেয়া হয়েছে। কিছু আড়তদারকে জরিমানা করা হয়েছে। পূজা-পার্বণের সময়গুলোয় গরিবের মাঝে বিনামূল্যে চাল বিতরণ করা হয়। টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা বিস্তৃত করা হয়েছে। কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ সহায়তা সরকার দিয়ে যাচ্ছে। দরিদ্রদের জন্য এত বেশি সমর্থন ও সহায়তা অতীতে দেখা যায়নি। সারা দেশে বিস্তৃত কোটি ভোক্তা, বিতরণের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা নেয়া হয়। লাখো-কোটি জনতা জড়িত, বিতরণে কোথাও ত্রুটি থাকবে না, আমাদের আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় একেবারে দুর্বলতা থাকবে না, এটা কী করে ভাবা যায়। তবে পরিবীক্ষণ ও জবাবদিহিতা আরো বাড়াতে হবে, সেটা অস্বীকার করা যায় না। বাজেট ব্যবস্থাপনায় অর্থের অপ্রতুলতা রয়েছে। বিশেষভাবে কভিড সময় থেকে সরকার সাধ্যমতো গরিবকে সহায়তা করে যাচ্ছে।

 

তথ্য, পরিসংখ্যান ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থার সত্যতা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। ৫০ বছর পেরিয়ে আসা একটি দেশের পরিসংখ্যানগত দুর্বলতা কি আমাদের ভোগাবে না?

বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস স্বাধীনতার পূর্বকাল থেকেই প্রতিষ্ঠিত এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশনার আইনগতভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় প্রতিষ্ঠান। পূর্বানুমতি সাপেক্ষে তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি অনুমোদন করিয়ে কোনো প্রশাসনিক সংস্থা/প্রতিষ্ঠান (যেমন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর) প্রশাসনিক সংস্থা তথ্য সংগ্রহ করতে পারে নিজেদের পরিবীক্ষণ ও কর্ম বিশ্লেষণের প্রয়োজনে। তবে তা প্রতিবেদন হিসেবে প্রকাশনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বিবিএস। বিবিএস যাচাই-বাছাই ও প্রকাশনার আগেই কখনো কখনো দেখা যায় প্রশাসনিক এজেন্সি তথ্য (যেমন ফসল উৎপাদন তথ্য) আগাম প্রচার করে ফেলে বা ঘোষণা দেয়। সেক্ষেত্রে চাহিদার পরিমাণ ও উৎপাদন তথ্যে ফাঁরাক তৈরি হয়, যা মূল্যে সঠিকভাবে চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে বাজার দামে প্রতিফলিত হয় না। তখনই কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। তখন দেখা যায় ‘অনেক উৎপাদন’ সত্ত্বেও বাজারে এমনকি উৎপাদন মৌসুমের পরই দাম কেবলই বাড়তে থাকে। বিবিএস তথ্য সংগ্রহের আগে তথ্য সংগ্রহ ও নমুনা পদ্ধতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করে, তাছাড়া জাতিসংঘের স্ট্যাটিসটিক্যাল কমিশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃত তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে। বিবিএস বহু রকমের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও প্রকাশ করে থাকে, যা ব্যবহার করে আমাদের সব নীতি পরিকল্পনা তৈরি হয়ে থাকে। মোটা দাগে বিবিএসের তথ্য-উপাত্ত নির্ভরযোগ্য ও সঠিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায়, যা আন্তর্জাতিকভাবেও ব্যবহূত হয়ে থাকে। প্রশাসনিক এজেন্সিগুলোর উচিত বিবিএসের মাধ্যমে তাদের তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা, তাহলে অনেক বিভ্রান্তির সুযোগ কমে যাবে। বিবিএসের বর্তমান চ্যালেঞ্জ হলো যথাসময়ে তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, ভিত্তি বছর যেখানে প্রয়োজন হালনাগাদ করা। এ চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।

 

বর্তমান জ্বালানি সংকটের জন্য বিশেষজ্ঞরা অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতিকে দায়ী করছেন। স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে আরো জোর দেয়া প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন কি? 

অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভরতার কারণ আমাদের গ্যাস সম্পদের অপ্রতুলতা। অফুরন্ত গ্যাস রিজার্ভ থাকলে এত আমদানিনির্ভর হতে হতো না। ব্যাপক কয়লা উত্তোলনে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ছিল। ফুলবাড়ীতে খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনে যাওয়া যায়নি, কারণ সংশ্লিষ্ট ছয়টি উপজেলা ডেবে যাওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায়নি। বর্তমান যুদ্ধকালীন বিশ্ব সংকটে বাইরের এ ঝড় আমাদের নতুন শিক্ষা দিয়ে গেল। গ্যাস অনুসন্ধান চেষ্টাকে আমরা জোরদার করেছি। সিলেটে নতুন একটি কূপে ব্যবহারযোগ্য গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। ভোলার প্রাপ্ত গ্যাসকেও এলএনজিতে রূপান্তরের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আমাদের সৌরবিদ্যুতে ব্যাপকভাবে যেতে হবে। প্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প নেয়া হয়েছে উন্নয়ন অবকাঠামোর অপর্যাপ্ততার কারণে। ভৌত অবকাঠামোগত অপর্যাপ্ততা অনেক কমে আসছে। বিশ্ব সংকট কেটে না যাওয়া পর্যন্ত মেগা প্রকল্প নেয়া হয়তো আর সম্ভব হবে না।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে কি?  ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্তে সুদের হার ৬-৯ শতাংশ করার পরও বিনিয়োগ বাড়েনি। এমনকি উচ্চমূল্যস্ফীতির এ সময়েও সেটি প্রত্যাহার করা হচ্ছে না কেন?

ব্যবসা-বাণিজ্য মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কেন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে? মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকার ‘রেফারির’ ভূমিকায় থাকে। তবে খেলার নিয়ম যেন কেউ না ভাঙে সেটা দেখার দায়িত্ব সরকারের। রেফারি হিসেবে সরকার বাজার কুশীলবদের গভীর পর্যবেক্ষণে রাখবে যাতে কেউ ফাউল না খেলে, মানে পণ্য তৈরি ও বিক্রয়ে কোনো প্রতারণার সুযোগ না নিতে পারে, না ঠকাতে পারে, কারো সঙ্গে চুক্তি যদি থাকে তা না ভঙ্গ করতে পারে, অন্যের সম্পদে হস্তক্ষেপ না করতে পারে। এ তদারকি করাই আইনের শাসন, ব্যত্যয় হলেই ‘রেফারি’ ব্যবস্থা নেবে। সরকারের সিদ্ধান্ত না মানার সুযোগ নেই। বাজারের হাত সরকারের হাতের চেয়ে কখনো ব্যর্থ রাষ্ট্র ছাড়া শক্তিশালী হতে পারে না। সব বাজারকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজ করতে দিতে হবে।

বাজার শৃঙ্খলার ব্যত্যয় ঘটালে দক্ষ রেফারি হিসেবে বাজার কুশীলবদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই পারে। সরকার আস্থা রাখে যে ব্যবসায়ীরা নিয়মের কোনো রকম ব্যত্যয় ঘটাবে না, বাজারমূল্য এককভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে না। বাজার কার্যক্রম প্রতিযোগিতার পরিমণ্ডলে পূর্ণ সক্রিয় থাকলে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবন নিশ্চিত হতে পারে। দেশে বিনিয়োগের হার ক্রমান্বয়েই বাড়ছে যে কারণে প্রবৃদ্ধির হার ইতিবাচক।

সত্য যে ৬-৯ শতাংশ সুদের হার বর্তমান উচ্চমূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারে টাকার মূল্যমান কমে যাওয়ায় প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় দক্ষ। সুদের হার পুনর্বিন্যাসে তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করি।

 

প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সময়ক্ষেপণের কারণে দুর্নীতির প্রকোপ বাড়ছে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এক্ষেত্রে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?

প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির প্রকোপ আগের চেয়ে কমেছে। প্রকল্পের নামে এখন আর ‘খাম্বা সিনড্রোম’ নেই। এ বিশ্ব সংকটকালেও জুলাই-সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে বিগত দুই বছরের চেয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার বেশি। প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে প্রকল্প পরিচালকদের সঙ্গে এবং সচিবদের সঙ্গে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় দ্রুতই পর্যালোচনা সভায় মিলিত হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে এখন তদারকি বেড়েছে। সে কারণেই বাস্তবায়নের হার ভালো।

 

সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকটের কথা বলা হচ্ছে। সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় সরকার কী করছে?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলে কখনো দুর্ভিক্ষ হবে না। দুর্ভিক্ষ এখন অতীতের ইতিহাস। বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের কথা উঠেছে। আফ্রিকার অনেক দেশের জন্য এ সম্ভাবনা বাস্তব। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের সম্ভাবনার কথা বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন এ কারণে যেন আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করি। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে সচল রাখার সব পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। আমাদের সতর্কভাবে এগিয়ে যেতে হবে, অভাবিতভাবে যুদ্ধ থেমে না গেলে, বিশ্ব সংকট খুব সহসাই কেটে যাবে বলে মনে হয় না।