স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল—এ বাগধারাটি মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে উপলব্ধি করে। আর অসুস্থতা থেকে পরিত্রাণ পেতে মানুষ চিকিৎকেসেবার দ্বারস্থ হয়। যেহেতু স্বাভাবিক জীবনের জন্যই সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন, সেহেতু চিকিৎকেকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আর একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের চিকিৎকের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হয়। যদিও চিকিৎকেসেবা সরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও চলে গিয়েছে। কিন্তু তার পরও বেশির ভাগ মানুষ এখনো স্বাস্থ্যসেবার জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর নির্ভরশীল। কারণ বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয়বহুল চিকিৎকেসেবা সবার পক্ষে গ্রহণ সম্ভব নয়। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে মানুষকে এখনো সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভর করতে হয়। এক্ষেত্রে জনগণের চিকিৎকেসেবা সহজলভ্য হওয়ার কথা থাকলেও হাসপাতালগুলোয় যেন ভোগান্তির শেষ নেই। বিশেষ করে চলমান বিদ্যুৎ সংকটের সময় লোডশেডিংয়ের ফলে স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত উৎপাদন না থাকায় দেশব্যাপী চলা লোডশেডিংয়ের কারণে অন্তত পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্দিষ্ট সময় ধরে স্বাস্থ্যসেবা দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে জেনারেটর সচল না থাকায় স্থানীয়রা উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। লোডশেডিংয়ের সময় অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম বাদ দিয়ে অন্যান্য সেবা দেয়া হয়। এছাড়া অপারেশন থিয়েটারে সার্জারি চলাকালে বিদ্যুৎ চলে গেলে আইপিএস বা টর্চের সাহায্যে কাজ শেষ করা হচ্ছে। এতে বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
দেশের আট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সারা দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪৮৩টি জেনারেটর রয়েছে। এর মধ্যে ১৮৭টি জেনারেটর অচল, যার মধ্যে বেশ কিছু মেরামতযোগ্য ও বাকিগুলো সম্পূর্ণ বিকল। সব মিলিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় থাকা ৩৮ দশমিক ৭২ শতাংশ জেনারেটর অচল হয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রায় ৫০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটরই নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা কমপ্লেক্স থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে থাকে। তাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয়দের জন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিকল্প নেই। এ কারণে চিকিৎকেসেবার জন্য সেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গ্রামাঞ্চলে প্রসূতিদের সেবার জন্য উপজেলা হাসপাতালগুলোই নির্ভরতার জায়গা। এছাড়া সার্জারির জন্য সেখানকার অপারেশন থিয়েটারগুলোকে কার্যকর রাখা জরুরি।
স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে দেশের
মানুষের ৬৩-৭০ শতাংশ
বাড়তি ব্যয়
হয়। সরকারি
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রয়োজনীয় সেবা
না পেলে
এ ব্যয়
বাড়তে থাকবে।
এ অবস্থায়
সবার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য
সরকারের আন্তরিক
সদিচ্ছা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে
৪৯৪টি উপজেলার
সদর উপজেলা
বাদে বাকিগুলোয়
৩১. ৫০ ও ১০০ শয্যার উপজেলা
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
রয়েছে ৪২৬টি।
২০১১ সালের
পর গঠিত
রাঙ্গাবালী, গুইমারা,
ডাসার, কর্ণফুলী,
ঈদগাঁও, লালমাই,
চৌহালি, শায়েস্তাগঞ্জ ও মধ্যনগর—এসব উপজেলায় এখনো
কোনো স্বাস্থ্য
কমপ্লেক্স স্থাপন
করা হয়নি।
তার মানে
প্রয়োজনের তুলনায়
পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য
কমপ্লেক্স এখনো
নির্মিত হয়নি।
তার ওপর যেসব উপজেলায়
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
আছে, সেখানে
বিদ্যুৎ সংকটের
ফলে চিকিৎকেসেবা ব্যাহত হচ্ছে। সব মিলিয়ে সারা
দেশের উপজেলা
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটরের প্রায় ৪০ শতাংশ অকেজো
পড়ে আছে।
অন্যদিকে সচল জেনারেটরগুলোর জন্য
প্রয়োজনীয় জ্বালানি
বরাদ্দ মিলছে
না। এমন বেহাল দশায়
অপারেশন থিয়েটারে
আইপিএস চালিয়ে
অস্ত্রোপচার খুবই
ঝুঁকিপূর্ণ হলেও
কতর্ব্যরত চিকিৎসকরা
এভাবেই কাজ করতে বাধ্য
হচ্ছেন। কারণ
অস্ত্রোপচারের সময় হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে গেলেও মাঝপথে
তা বন্ধ
করা যায় না। কোথাও
বিদ্যুৎ না থাকলে বড় সার্জারি এড়িয়ে
যাওয়া হচ্ছে।
এক্ষেত্রে জরুরি
প্রয়োজন থাকলেও
চিকিৎসকরা নিরুপায়
হয়ে পড়েন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় একদিকে অচল জেনারেটর, অন্যদিকে বিদ্যমান জেনারটেরগুলোর জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানির বরাদ্দ নেই। ফলে প্রয়োজন থাকলেও জেনারেটর বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কিছু উপজেলায় দিনের অর্ধেকেরও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। এ সময় অচল জেনারেটরের কারণে হাসপাতালেও বিদ্যুৎ থাকছে না, ফলে চিকিৎকেসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা নিতে আসা মানুষ চরম ভোগান্তির সম্মুখীন হচ্ছে। এভাবে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না করা হলে জনমনে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতি বিরূপ মনোভাব ফুটে উঠবে, যা আখেরে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। বিদ্যুৎ সংকট এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হওয়ায় এর ধাক্কা সব খাতেই পড়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে যে প্রভাব পড়ছে তার ফল মোটেও সুখকর নয়। তাই বড় কোনো বিপর্যয় ঘটার আগেই এক্ষেত্রে প্রশাসনের নজর দিতে হবে।
যেসব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর নেই বা বিকল, সেখানে জেনারেটরের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি অন্যান্য হাসপাতালে অচল হয়ে যাওয়া জেনারেটরগুলোকে সচলের উদ্যোগ নিতে হবে। সে সঙ্গে জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলও বরাদ্দ করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে জেনারেটরের জন্য আবেদনসহ যেসব আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলো সম্পাদন করতে গিয়ে কালবিলম্ব বা জটিলতার মধ্য দিয়ে যেন যেতে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এটা মনে রাখতে হবে, সবার ওপরে মানুষের জীবন। এভাবে সময়মতো বিদ্যুৎ না থাকার ফলে যদি জরুরি অস্ত্রোপচারের অভাবে কারো জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে, এর ফল জনরোষ ছাড়া ভিন্ন কিছু হবে না।
পুরো বিশ্ব যখন সংকটে, সে সময়ে আমরাও এর বাইরে থাকব না। এজন্য সংকটের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই আমাদের সবকিছু অব্যাহত রাখতে হবে। যেহেতু চলমান সংকটেও জেনারেটরের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে, তাই প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে উপজেলা হাসপাতালগুলোয়ও জেনারেটর ব্যবহার করে বিদ্যুতের জোগান দেয়া সম্ভব হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি জেনারেটরগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। আমরা আশা করি, জনস্বার্থ বিবেচনায় সরকার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় লোডশেডিংয়ের সময়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।










