পৃথিবীর
বৃহত্তম অর্থনীতি
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক
সৌন্দর্যটা হলো
পৃথিবীর আধুনিকতম
উদ্ভাবনে বিনিয়োগ,
ভোগ আর
উৎপাদনের সঙ্গে
এ অর্থনীতি
জড়িয়ে থাকে।
এমনকি আধুনিকতম
প্রযুক্তির উৎপাদন
যদি ভিন্ন
দেশেও হয়,
হয়তো বৃহৎ
আমদানিকারকদের মধ্যে
একটা হয়ে
ওঠে এ
দেশটাই। তাই
খুব কাছ
থেকে এদেশে
বসবাসকারী মানুষেরা
বদলে যাওয়া
আধুনিকতাকে দেখতে
পায়। আর
ঠিক উল্টো
পিঠের কদর্যটা
হচ্ছে, গত
এক শতকের
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক
বিপর্যয়ের একটা
বড় অংশের
প্রারম্ভিক সংঘটনও
আমেরিকাতেই। ১৯৩০
সালের শেয়ারবাজার
থেকে তৈরি
হওয়া অর্থনৈতিক
মন্দা, ১৯৯০-এর
ডটকম বাবল
কিংবা ২০০৮-এর
আবাসন খাত
থেকে ছড়িয়ে
পড়া বিশ্বমন্দাগুলো
এখানেই শুরু।
সঙ্গে ক্রিপ্টোকারেন্সি
আর এনএফটি
বিপর্যয়ের মতো
তুলনামূলক ছোট
ছোট বুদবুদের
সমস্যা তো
আছেই। মাঝে
বিভিন্ন সময়
যুদ্ধ কিংবা
জ্বালানি সংকটের
সময়গুলোয়ও যুক্তরাষ্ট্রের
প্রত্যক্ষ বা
পরোক্ষভাবে সৃষ্টি
করা সংকটের
ঘনত্ব ধীরে
ধীরে পুরো
বিশ্বে ছড়িয়ে
পড়ে।
বাংলাদেশে ডটকম
বাবল বা
আবাসন খাতের
মন্দার প্রভাব
পড়েনি তেমন
একটা। তাই
প্রত্যক্ষভাবে এ
বিপর্যয়গুলোর প্রভাবের
মধ্যে পড়তে
হয়নি আমাকে
(অবশ্য এমনও
না যে,
বাংলাদেশের নিজস্ব
আর্থিক বিপর্যয়ের
ঘটনার অভাব
আছে!) গত
এক বছরের
বেশি সময়
পড়াশোনার উদ্দেশ্যে
যুক্তরাষ্ট্রে থাকায়
চোখের সামনেই
বড় ধরনের
কিছু বিপর্যয়
দেখা হয়ে
গেল। সাধারণ
ভোক্তা হিসেবে
বিপর্যয়গুলোর ভুক্তভোগীর
দিকেই পড়েছি
এবার।
সে বিপর্যয়গুলোর
একটা দিক
নিয়েই আলোচনা
করা যাক।
বিশ্বের অন্যতম
বৃহৎ গাড়ি
ক্রয়-বিক্রয়ের
বাজার হিসেবে
আমেরিকা কি
অবস্থায় আছে
এখন?
২০২১ সালের
আগস্ট মাসে
পিএইচডি শুরুর
সময়টায় যখন
এদেশে এসে
পৌঁছি, তখনো
কভিড মহামারী
চলছে। তবে
টিকার প্রভাব
আর পরিস্থিতির
সঙ্গে অভ্যস্ততার
কারণে মানুষ
অনেকটা ধাতস্থ
হওয়া শুরু
করেছে। স্কুল-অফিস
খোলা শুরু
করায় পরিস্থিতি
স্বাভাবিকের দিকে
যাচ্ছিল বলেই
মনে হচ্ছিল।
তবে একটা
জিনিস স্বাভাবিক
হচ্ছিল না,
সেটা হলো
জোগানের সীমাবদ্ধতা
বা সাপ্লাই
শর্টেজ। এর
মধ্যে এ
বিষয়টা বহুল
আলোচিত, বিশ্বের
এক জায়গা
থেকে আরেক
জায়গায় পণ্য
আর কাঁচামাল
চাহিদা অনুযায়ী
উৎপাদন করতে
না পারা
আর উৎপাদিত
পণ্য পাঠাতে
না পারার
কারণে বহু
পণ্যের উৎপাদন
কমছে আর
দাম বাড়ছে।
এক পণ্যের
ক্রয়-বিক্রয়
যেহেতু অন্য
পণ্যের উৎপাদন,
ক্রয় আর
বিক্রয়ের ওপর
প্রভাব বিস্তার
করতে পারে,
তাই এ
সংকট তীব্রই
হয়েছে। কভিড-উদ্ভূত
সংকট কিছুটা
সারিয়ে তোলার
চেষ্টার সময়েই
ইউক্রেন যুদ্ধের
দামামায় সে
সংকট এর
মধ্যে আরো
প্রকট আকার
ধারণ করেছে।
এই সাপ্লাই
শর্টেজ এরই
এক বড়
প্রভাব পড়েছে
পুরো বিশ্বের
অটোমোবাইল খাতে।
গাড়ি উৎপাদনের
জন্য যা
যা দরকার,
উৎপাদনকারী দেশগুলো
অন্য একেকটা
দেশ থেকে
সেগুলো সংগ্রহ
করে থাকে।
গাড়ি তৈরির
এ কাঁচামালগুলো
আসে জাপান,
জার্মানি, চায়না,
কানাডার মতো
বিভিন্ন দেশ
থেকে। যুক্তরাষ্ট্র
এসব দেশ
থেকে যেমন
প্রস্তুতকৃত গাড়ি
আমদানি করে,
তেমনি নিজের
দেশে তৈরি
হওয়া গাড়ির
ব্র্যান্ডগুলোর জন্য
কাঁচামালও আমদানি
করে। কাঁচামালের
তীব্র সংকটের
এ সময়ে
গাড়ির উৎপাদন
স্বাভাবিক সময়ের
মতো হচ্ছে
না। বৈশ্বিক
এ সমস্যাকে
বলা হচ্ছে
‘সেমিকন্ডাক্টর
চিপ শর্টেজ’।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান
জেপি মরগান
বলছে, ২০২০
সালের শুরুর
দিকে যখন
পরিস্থিতি স্বাভাবিক
ছিল, তার
তুলনায় ২০২২
সালে গাড়ি
তৈরির কাঁচামালের
দাম বেড়েছে
১১৬ শতাংশ!
অবশ্যই এ
সমস্যার কিছু
অংশ সত্যিকারের,
কিছু অংশ
কৃত্রিমভাবে তৈরি
হতে পারে।
তবে সমস্যা
যেভাবেই তৈরি
হোক, তার
ফলের তীব্রতা
অনেক। যুক্তরাষ্ট্রে
তার প্রভাব
পড়েছে ভীষণভাবেই।
প্রেক্ষাপটটা আরেকটু
ভালোভাবে ব্যাখ্যা
করলে হয়তো
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য
সমস্যার তীব্রতা
বুঝতে সহজ
হবে। ভীষণ
রকম ভোগবাদী
অর্থনীতির এ
দেশে বড়
বড় শহর
ছাড়া গণপরিবহন
খুব সহজলভ্য
নয়। নিউইয়র্ক
সিটি, শিকাগো,
ওয়াশিংটন ডিসি,
অস্টিন কিংবা
ক্যালিফোর্নিয়ার বড়
শহরগুলোর মতো
কিছু জায়গায়
পাবলিক বাস
কিংবা ট্রেন
পাওয়া গেলেও
অনেক জায়গাতেই
মানুষকে চলতে
হয় নিজের
গাড়ি করে।
তাই এসব
এলাকার শত
অভাবী পরিবার
কিংবা যৎসামান্য
আয়ের শিক্ষার্থী
পর্যন্ত সবারই
চেষ্টা (অথবা
ইচ্ছা) থাকে
নিয়মিত চলাচলের
জন্য একটা
গাড়ি কিনে
ফেলার, তা
একটু বা
অনেকখানি পুরনো
হলেও। গাড়ির
শিল্পকে চাঙ্গা
রাখতে পুঁজিপতিদের
প্রভাবে ইচ্ছাকৃতভাবেই
এ ব্যবস্থাকে
চাপিয়ে দেয়া
হয়েছে, সেটা
খেয়াল করলেই
বোঝা যায়।
তা যাই
হোক, এখানের
সুবিস্তৃত হাইওয়েগুলোয়
হাজার হাজার
ভ্রমণকারী দেখে
মনে হয়,
এ ব্যবস্থাকে
এতদিন মেনেই
নিয়েছে অনেকে।
এ কারণেই
যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির
৩ শতাংশ
অটোমোবাইল শিল্পের।
প্রতি বছর
গড়ে ৬০০
বিলিয়ন ডলারের
গাড়ি বেচাকেনা
হয়। তবে
মহামারীর পর
থেকে নতুন-পুরনো
সব ধরনের
গাড়ির দাম
বেড়েছে দ্বিগুণেরও
অনেক বেশি
পর্যন্ত। বার্তা
সংস্থা সিএনবিসি
জানুয়ারি ২০২২-এর
এক রিপোর্টে
বলেছিল, গাড়ির
বাজারে গড়
মূল্যস্ফীতির পরিমাণ
২৫ শতাংশ।
স্বল্প আয়ের
মানুষ যেসব
গাড়ি কিনে
থাকে, ধাক্কাটা
তাদের গায়েই
লেগেছে সবচেয়ে
বেশি। কিছুটা
কম মূল্যের
নতুন গাড়ি
অর্ডার করলে
সেটা হাতে
পেতে সময়
লেগে যাচ্ছে
কয়েক মাস।
পুরনো মডেলের
ব্যবহূত যেসব
গাড়ি আগে
৩০০০ ডলারে
(বাংলাদেশী সাড়ে
৩ লাখ
টাকার সমান)
পাওয়া যেত,
তার দামও
এখন হয়ে
যাচ্ছে ৭০০০
ডলারের (৮
লাখ টাকার
বেশি) মতো।
বাজারের এসব
কর্মকাণ্ডের চেইন
রিঅ্যাকশন হচ্ছে
একে একে।
প্রথমত, যা
সেমিকন্ডাক্টর তৈরি
হচ্ছে, কোম্পানিগুলো
চাচ্ছে সেগুলো
বেশি দামি
গাড়ি উৎপাদনে
ব্যবহার করে
মুনাফার চালনা
ঠিক রাখতে।
তাই ছোট
আকারের কিছুটা
কম মূল্যের
নতুন গাড়ির
উৎপাদন কমে
গিয়েছে আশঙ্কাজনকভাবে।
দ্বিতীয়ত নতুন
গাড়ির উৎপাদন
কম আর
দাম অনেক
বেশি হওয়ায়
যেসব মানুষ
আগে পুরনো
গাড়ি কিনতে
চাইত না,
তারাও ঝুঁকছে
পুরনো গাড়ির
দিকে। পুরনো
গাড়ির এ
ব্যাপক চাহিদা
থাকায় ক্রমাগত
এর দাম
বাড়ছেই। তৃতীয়ত,
গণপরিবহন যেসব
জায়গায় নেই,
সেইসব জায়গায়
স্বল্প আয়ের
মানুষ পড়েছে
মহাবিপদে। তারা
গাড়ি কিনতে
পারছেন না,
আবার প্রতিদিনের
যাতায়াতেও পড়তে
হচ্ছে সমস্যায়।
এর প্রভাব
পড়ছে তাদের
কাজে আর
সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
চতুর্থত, স্বল্প
আয়ের মানুষের
জন্য যেহেতু
পুরনো গাড়ি
কেনা ছাড়া
উপায় নেই,
তাই প্রকৃত
মূল্যের অনেক
বেশি দাম
দিয়েই কিনতে
হচ্ছে পুরনো
গাড়ি। আর
পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে
ভাড়া গাড়ির
বাজারেও গাড়ির
অভাব দেখা
যাচ্ছে। ‘রোড
ট্রিপ’ ভ্রমণপিয়াসীদের
জন্য ব্যয়ের
মাত্রা বেড়ে
গিয়েছে। তাই
বলা হচ্ছে,
সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতেও
গাড়ির বাজারের
এ টালমাটাল
অবস্থা একটা
নেতিবাচক ভূমিকা
রাখছে।
অর্থনীতিবিদ জর্জ
একারলফ ১৯৭০
সালে কোয়ার্টারলি
জার্নাল অব
ইকোনমিকস জার্নালে
প্রকাশিত আর্টিকেলে
‘মার্কেট
ফর লেমনস’
নিয়ে ধারণা
দিয়েছিলেন। অর্থনীতির
প্রথম বর্ষের
শিক্ষার্থীদের শুরু
থেকেই এ
ধারণার গল্প
শোনানো হয়।
এ গল্প
দিয়েই শেষ
করছি। যুক্তরাষ্ট্রে
পুরনো গাড়িকে
কিছুটা কৌতুকপূর্ণভাবে
‘লেমন’
বলা হয়,
আর নতুন
বা অপেক্ষাকৃত
ভালো মানের
গাড়িকে বলা
হয় ‘পিচ’।
এখানে বলা
হয়েছিল, যেহেতু
একজন ক্রেতার
কাছে গাড়ির
মান আর
গুণাগুণ সম্পর্কে
বিক্রেতার তুলনায়
কম তথ্য
থাকে, তাই
নিজের খরচ
নিয়ে সচেতন
আর হিসেবী
ক্রেতারা তাদের
নির্ধারিত বাজেট
নিয়ে একসময়
পুরনো গাড়ির
দিকেই ঝুঁকে
পড়ে, কারণ
ভালো মানের
নতুন গাড়ির
দাম অনেক
বেশি। নতুন
গাড়ির বিক্রয়
তখন কমে
যায়। বিক্রেতারাই
প্রকৃতপক্ষে লাভবান
হয়, কারণ
দিনশেষে বিক্রেতাই
জানে, তার
বিক্রয়কৃত গাড়ির
ভেতরের কলকব্জার
প্রকৃত অবস্থা
কেমন। ক্রেতা
যে বাজেট
নিয়ে পুরনো
গাড়ির বিক্রেতার
কাছে হাজির
হয়, তা
ওই ‘লেমন’-এর
প্রকৃত দাম
থেকে অনেক
বেশিই হয়।
পুরনো গাড়ির
বাজার হয়ে
ওঠে ভীষণ
চাঙ্গা। এ
ধারণাটা নিয়ে
একারলফ অর্থনৈতিক
বিজ্ঞানে নোবেল
পুরস্কার পেয়েছিলেন।
বাংলাদেশের গাড়ির
বাজার ততটা
বড় না
হওয়ায় এ
ধারণার ব্যবহারিক
গুরুত্বটা অনুধাবন
করা কিছুটা
কঠিন। কিন্তু
একটু চিন্তা
করলেই বোঝা
যায়, পুরনো
গাড়ির বাজারে
ক্রেতার কাছে
আসলেই গাড়ির
খুঁটিনাটি নিয়ে
যথেষ্ট তথ্য
থাকে না।
বাইরে দিয়ে
ফিটফাট গাড়ি,
কিন্তু ভেতরে
নানা সমস্যায়
আক্রান্ত একটা
গাড়ি কিনতে
খরচ করে
ফেলতে হচ্ছে
সঞ্চয়ের অনেকখানিই।
সামগ্রিকভাবেই বিপর্যস্ত
এ অর্থনীতিতে
বর্তমান গাড়ির
বাজার দেখে
বোঝা যাচ্ছে,
দিনশেষে এ
বাজারের ভুক্তভোগী
স্বল্প আয়ের
ক্রেতাই!
নাহিয়ান বিন খালেদ: পিএইচডি গবেষক, অ্যাপ্লায়েড ইকোনমিক্স, মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র










