একজন মা তার সন্তানকে কতটা ভালবাসেন, সেটা মা নিজেও বোঝেন না। কখনো কখনো অনুভব করেন হয়তোবা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্তান সেটা অনুভব করে না, যতক্ষণ মা কাছে থাকেন, পাশে থাকেন। পৃথিবী থেকে মা চলে গেলে তখন মনে হয় মা তো ছিলেন, আর কখনো ফিরে আসবেন না। মাকে আর দেখবো না। চোখের কোন ভিজে যায়। মহান সৃষ্টিকর্তা বলেছেন, আমার পরে আমি তোমাকে যদি কাউকে সেজদা করবার নির্দেশ দিতাম, সেটা হতেন তোমার মা। ইসলাম ধর্মে বলে, মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।
শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) উনার কাছে একদিন এক ব্যক্তি এসে আকুতি করে বলল হে মুহাম্মদ, আমি জীবনে অনেক অন্যায় করেছি, পাপ করেছি। আপনি সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছে দোয়া করেন আল্লাহ যেন আমাকে ক্ষমা করে দেন। মুহাম্মদ (সা.) বললেন, তুমি তোমার মায়ের কাছে যাও। আগন্তুক বলে, হে মুহাম্মদ আমারতো মা নেই, উনি মারা গেছেন। মুহাম্মদ (সা.) কথা শুনে বললেন, তাহলে তুমি তোমার মায়ের কোন নিকট বোনের কাছে যাও। আগন্তুক বলল তার মায়ের নিকট কোন বোন নেই। এভাবে বলতে বলতে মুহাম্মদ (সা.) আগন্তুককে বললেন, তাহলে তুমি তোমার মায়ের কোন বান্ধবী বা দূর সম্পর্কের পরিচিত কারোর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাও, যে তোমার মাকে চিনতেন। তাকে গিয়ে বল, সে যেন তোমার জন্য দোয়া করেন। এই ঘটনায় বোঝানো হয়েছে মাকে সর্ব সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কত উঁচু মর্যাদায় সৃষ্টি করেছেন, সম্মানিত করেছেন এবং মহিমান্বিত করেছেন।
মা আমাদের দশ মাস গর্ভে ধারণ করেন অনেক কষ্ট এবং মমতা নিয়ে। জন্মের পর মায়ের দুধ মুখে দিয়ে সেই শিশু বয়সের পুষ্টি অর্জন করি। এই ঋণ কিছুতে মেটানো বা পুরন কোনদিন করতে পারব না। সন্তান বৃদ্ধ হলেও মা’ই কেবল তাকে বুকে আটকে ধরেন এবং পরম স্নেহে সন্তানের গালে কপালে চুমু খান। এটা কেবল মা’ই করতে পারেন। পৃথিবীতে এমন আর কেউ করেন না। মা নিজে না খেলেও সন্তানের খাওয়া যাতে নিশ্চিত থাকে তার চেষ্টা করেন সব অবস্থাতে। কখনো বাবা তার নিজ সন্তানকে ছেড়ে যান, কিন্তু মা কখনো সেটা করেন না। ব্যতিক্রম যা সেটা আলোচনার বিষয় না। স্নেহ, ভালোবাসা, আদর, মায়া এসবের শিক্ষা সন্তান প্রথম তার মায়ের কাছ থেকেই পায়। মায়ের কাছে সন্তান প্রথম শেখে মমতা ও মানবিকতা কাকে বলে। সন্তান অধিকাংশ সময়ই মায়ের এই অবদানকে ভুলে যায় অথবা হালকা করে দেখে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এবং সংস্কৃতিতে এই মায়েদের নানাভাবে দেখি। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া বলতে পাক-ভারত উপমহাদেশের মায়েদের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পশ্চিমী দুনিয়ার সমাজে দেখি না। আমাদের মা তার সন্তানের প্রতি যে আকুলতা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, সংবেদনশীলতা, দুর্বলতা, আবেগ দেখা। বিশ্বের অনেক দেশের মা’দের থেকে সেটা ভিন্ন। আমাদের মা তারা যেভাবে তার সন্তানকে দুর্যোগে কষ্টে সুখে-দুখে ধরে রাখেন এবং সন্তানের যে কোন কল্যাণে বা বিপদ মুক্তির জন্য সৃষ্টিকর্তার দরবারে হাত তুলে মুনাজাত করেন, আকুল হৃদয়ে কাঁদেন, আকুতি ব্যাক্ত করেন, এইরকম মা পৃথিবীতে কম।
আমাদের মা নিজেরা দুর্বল এবং অসুস্থ থাকলেও রাত জেগে সন্তানের জ্বর কাশি বা সর্দি হলে, পাশে বসে তার শুশ্রূষা করেন। সেই মা যদি ঘরের বাইরেও কাজ করেন তা হলেও তার সন্তানের জন্য তার কোন ব্যকুলতা, আকুলতা কমে না। এর পাশে যদি আমরা উন্নত বিশ্ব-সমাজের মাকে দেখি, সেই মা ভীষণ ব্যস্ত ঘরে-বাইরে সর্বত্র। সেই মা তার সন্তানকে বড় হতে দেন বা বড় করেন শয্যাপাশে না রেখে, পাশের রুমে রেখে। সন্তান বড় হতে থাকে বেবিসিটার-এর সান্নিধ্যে এবং তাদের পরিচর্যায়। মায়ের থেকে সন্তানের একটা বিচ্ছিন্নতা বা দরুত্ব এভাবে শুরু। হয়তো এ কারণেই পশ্চিমা সংস্কৃতিতে মাদার্স ডে বলে একটা বিষয় আছে। আমাদের কাছে প্রতিদিনই মাদার্স ডে। মাদার্স ডে এক ধরনের বাণিজ্য সংস্কৃতি। এই দিনে সন্তানেরা মাকে নিয়ে নামীদামি রেস্তোরায় খেতে যায়।
পশ্চিমের এই মাদার্স ডে ধীরে ধীরে বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে যাচ্ছে।বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম না। বুর্জোয়া সংস্কৃতি কোথায় না ছোবল মারছে, এখন এরা মা-বাবাকে নিয়েও টানছে। সন্তান ও মা-বাবার মধ্যে এতে এক অদৃশ্য দুরুত্ব তৈরি হয়। কোথায় এই দুরুত্বের বা টানাটানির শেষ তা জানি না। তবে এতটুকু বোঝা যায়, আমাদের মা বিশেষ করে বাংলাদেশের কোন মা বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনে তাঁকে স্মরণ করার এই হইচই হয়তো পছন্দ করেন না। একেবারে সাম্প্রতিক সময়ের মা তাদের অনেকের এই ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গিটা কি, সেটা অস্পষ্ট। মাদার্স ডে স্মরণ করে ফুল, গ্রিটিংস কার্ড এসবের বাণিজ্য এই বিশেষ দিনে বাড়ে, কিন্তু এটা কি মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা কে কতটুকু বাড়ায়, তা ভাবায় বৈকি!
আমরা দেশকে ভালবেসে মা বলে ডাকি। লক্ষণীয় যে আমরা মাতৃভূমি বলি, জন্মভূমি বলি কিন্তু পিতৃভূমি বলিনা। এখানেও মা অনেক সম্মানের, অনেক উঁচুতে। এই মায়ের তুলনা পৃথিবীর কোন কিছুর সাথেই সমান করে দেখা যায় না। আমাদের সাহিত্য, গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক এই সবে মাকে নিয়ে অনেক গল্প আছে, গান আছে, কবিতা আছে, নাটক আছে। উল্লেখ করতেই হয়, এ বিষয়ে বিখ্যাত রুশ লেখক Ekhan Neya ওরফে ম্যাক্সিম গোর্কির সুপরিচিত উপন্যাস (MATB)মাদার বা ‘মা’ এর কথা।
উল্লেখ না করলেই নয়, আমাদের জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক আনিসুল হকের ‘মা’ উপন্যাসটির কথা। উপন্যাসে গল্পকার আনিসুল হক আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একজন মা এবং সন্তানের পরস্পরের প্রতি পরস্পরের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং উৎকণ্ঠা এসবের বর্ণনা করেছেন চমৎকারভাবে এবং সেটা হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছেন পাঠকের কাছে। এই গল্পে একজন আদর্শ মা তার সন্তানকে কীভাবে সৎ পথে, ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতে সাহস যুগিয়েছেন এবং সন্তানের এসব কাজে জীবন মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও মা তার আঁচলে ঢেকে রাখেন নি কেবল, বরং একজন মা হিসেবে দেশমাতৃকার প্রতি সন্তানের কর্তব্যকেও উৎসাহিত করেছেন। একজন আদর্শ মা-ই পারেন এভাবে প্রয়োজনে সন্তানকে আদর্শিক পথে চলতে উৎসাহ ও প্রেরণা দিতে। প্রসঙ্গে মনে পড়ল, ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ানের সেই বিখ্যাত উক্তি, “তোমারা আমাকে একজন ভালো মা দাও, আমি তোমাদের একটি ভালো রাষ্ট্র/জাতি দিব”।
মা তার সন্তানকে বিশেষ করে আমাদের অঞ্চলের মা সন্তানের ব্যাপারে তার জীবনে যে ত্যাগ স্বীকার করেন, যে কষ্ট করেন এবং যেভাবে সন্তানকে সমস্ত বিপদ আপদ থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করেন, এর কোন বিনিময় হয় না, বিনিময় ভাবাও যায় না। বিশ্বে মায়ের কোনো বিকল্প নেই, বিকল্প হবেও না। অনেকে বলেন, একজন বাবার জন্য তার জীবনের সবচেয়ে বড় বোঝা, কঠিন বোঝা কাঁধে তার সন্তানের লাশ। একজন সন্তানের জন্য তার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যথা, ভারী বোঝা মায়ের লাশ তার কাঁধে। সেই মাকে কবরে শুইয়ে দেয়া বা চিতায় দেখা। পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কি-বা হতে পারে। কখনো কখনো বাবা হারিয়ে যায় হয়তোবা অন্য কোন ঘরে কিংবা সংসারে, কিন্তু মা হারান না কখনোই সন্তানের থেকে।
মায়েদের কোন সাপ্তাহিক ছুটি নাই। মা’রা কখনোই আরাম কেদারায় বসে সময় কাটান না, বাবারা কাটান যেভাবে। আধুনিক সময়ের মা যারা বাইরে কাজ করেন, তারা প্রতিদিন ঘরে ফিরে সন্তানের সারাদিনের সবকিছুর খবর নেন, সন্তানের পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রাম এবং পরের দিনের যাবতীয় প্রয়োজনীয় সবকিছু তৈরি করা নিয়ে ক্লান্ত মা অক্লান্তভাবে হাসিমুখে কাজ করেন ক্লান্তিহীনভাবে। এই সময়ের সন্তানেরা তাদের মায়েদের এই কষ্টকে কতটা বোঝে, কীভাবে দেখে জানিনা। কিংবা সন্তানেরা বিষয়টাকে গ্রান্টেড মনে করে কি-না তাও জানিনা। তবে এটা জানি এই মায়েদের প্রতি কখনো কখনো সেই সন্তান কারণে বা অকারনে রেগে যায় এবং মাকে কঠিন ভাষায় কথা শোনায় বা দুর্ব্যবহার করে। মা নীরবে শোনেন। হয়তোবা সবার আড়ালে একটু কাঁদেন, সন্তান তাকে বুঝলো না এই কষ্ট নিয়ে। ধর্মেও বলা হয়েছে, সন্তান তার বৃদ্ধা মা তার কোনরকম আচার আচরণে মুখে কিংবা ভঙ্গিতে এতোটুকু উহ শব্দটিও যেন না করে। অনেক সময়ই দেখি এই বৃদ্ধা মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিই। মাকে নিজের সাথে রাখিনা নানা কারণে। কারণ সেটা যত বড়ই হোক, মায়ের সাথে তার তুলনা করা বা ভাবা স্বাভাবিক বলে বিশ্বাস করা কঠিন। মা তার সন্তানের কষ্টে জায়নামাজে বসে সৃষ্টিকর্তার কাছে চোখের জলে প্রার্থনা করেন সন্তানের কষ্ট যেন দূর হয়। আমরা সেই চোখের জলও দেখিনা।
গল্পকার আনিসুল হক তার ‘মা’ উপন্যাসে মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আজাদের এবং তার মা মোসাম্মৎ সাফিয়া বেগম-এর কথা বর্ণনা করেছেন হৃদয়স্পর্শ করা ভাষাতে। হৃদয় ছুঁয়ে যাবার কারণ, গল্পটি সত্য। আমাদের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে আমাদের মায়েদের কি ভূমিকা ছিল, আনিসুল হকের ‘মা’ গল্পটি এর একটি দর্পণ। আমাদের মা সে যেখানেই থাকেন, সন্তান থেকে দূরে থাকেলেও, মায়ের কাছে সন্তান তার বুকের ভেতরে থাকে সারাক্ষণ। সন্তান থাকে মায়ের প্রার্থনার শুরুতে এবং শেষে যতদিন মা বেঁচে থাকেন। বাংলাদেশের মায়েদের মতো বিশ্বে অনেক কম মা-ই আছেন, সন্তানদের প্রতি তাদের আকুলতা, ব্যাকুলতা, স্নেহ মায়া-মমতা ইত্যাদি প্রকাশের তুলনাতে।
যে কোনো সংকট, বিপদ এবং চ্যালেঞ্জে প্রমাণ হয় ভালবাসার রূপ ও রূপান্তরের স্তর বিন্যাস। একাত্তরে প্রমাণ করেছি দেশমাতৃকার প্রতি আমাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার। মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে শত্রুমুক্ত করেছিলেন তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে, দেশ মা’কে আঁকড়ে ধরে। এটা ২০২০ সাল। বিশ্ব আজ এক মহা সংকটে। অদৃশ্য বিশ্ব ব্যাধিতে আক্রান্ত পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ প্রান্ত। এই মহা ক্রান্তিকালে আমাদের সব মা-কে যেন নিরাপদে রাখি, সুস্থ রাখি। ভয় ও দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখতে পারি। কোন অবস্থাতেই যেন মাকে নিজের কাছ থেকে দূরে না সরিয়ে দেই। মাকে কতটা ভালবাসি সন্তান হিসেবে সেই পরীক্ষায় যেন সফলতার সাথে উত্তীর্ন হতে পারি। পরম করুণাময় আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।
পৃথিবীতে অনেকেরই মা নেই। মাকে হারানোর কষ্ট তারা যেভাবে বুঝবেন এবং বলেন ‘মাকে বড় মনে পড়ে’। যাদের মা সৃষ্টিকর্তার অপার করুণায় বেঁচে আছেন, যে সন্তানেরা তাদের মাকে কাছে দেখে, কাছে পায়। সেই সন্তানেরা মায়ের এই অপূর্ণতা বুঝতে পারবে না। এটাই স্বাভাবিক। বিশ্বে অনেক সম্পদের পূরণ হতে পারে, শূন্যস্থান পূরণ হতে পারে, কিন্তু মায়ের শূন্যস্থান কি পূরণ হয়! কখনোই না। মা যাদের বেঁচে নেই তারা হয়তো পল্লী কবি জসিম উদ্দিনের ‘মুসাফির’ কবিতার মতো করে বলে,
‘নয়ন ভরিয়া আছে আঁখিজল, কেহ নাই মুছাবার,
হৃদয় ভরিয়া কথার কাকলি, কেহ নাই শুনিবার।’
লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক










