কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত গবেষণার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। কভিড মহামারীতে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত গবেষণার গুরুত্ব ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে করোনার মতো অন্য মহামারী দেখা দিলে তা মোকাবেলায় টেকসই পদ্ধতি আবিষ্কার এবং রোগতত্ত্ব ও রোগ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে যথাযথ গবেষণার কাজে আমাদের জোরালোভাবে সম্পৃক্ত হতে হবে। তাই করোনা বাস্তবতায় সমন্বিত স্বাস্থ্যবিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়নে বাড়তি গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক। যদিও বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমরা দেখছি বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যয়সংক্রান্ত নীতিমালায় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত তা কার্যকর করতে পারেনি। কেন পারেনি, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
কয়েক বছর ধরে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি হচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের ব্যয় প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলংকা, ভুটান ও মালদ্বীপের চেয়েও কম। স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা নিশ্চিত করতে যে জাতীয় স্বাস্থ্য পরিকাঠামো, অবকাঠামো, প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, সেটি এখানে শক্তিশালীভাবে গড়ে ওঠেনি। কভিড-১৯ বাস্তবতায় বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো আরো স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। মানুষ যেমন নতুন নতুন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তেমনি অনেক পুরনো রোগও আবার নতুন আঙ্গিকে ফিরে আসছে। তাই ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বিনিয়োগকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের চাহিদা নিরূপণ, মেডিকেল সরঞ্জামের সরবরাহ এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা দানকারীদের প্রশিক্ষণেরও দরকার রয়েছে। চীন যেমন ‘হেলদি চায়না ২০৩০’ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের লক্ষ্য স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা কার্যক্রমে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বাস্থ্যশিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা। স্বাস্থ্য গবেষণায় ভারতের বিনিয়োগও অনেক। উদাহরণ হিসেবে শ্রীলংকার কথাও বলা যায়। স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ বরাদ্দ রাখে দেশটি।
একথা সত্যি যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশে চিকিৎসাসেবা অনেকটাই সম্প্রসারিত হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে আছি। ফলে স্বাস্থ্য খাতে যেমন বরাদ্দ বাড়াতে হবে, তেমনি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও দক্ষতা ও স্বচ্ছতা থাকতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই শুধু গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি, অর্থনীতিসহ জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রই বিরাট সংকটের মুখোমুখি পুরো দেশ। এখান থেকে পরিত্রাণ লাভে স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা বৃদ্ধি এবং দক্ষতার সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নের স্থিতিশীলতা বজায় রাখাটাও গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে অধিকারভিত্তিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং মহামারীর বিপদসংকুল পরিস্থিতি সুদৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করা সহজতর হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের বেশি হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ এখনো জিডিপির ১ শতাংশের কম। স্বাস্থ্য গবেষণায় বরাদ্দ আরো কম। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত জাতীয় অগ্রাধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলিত থেকে গেছে। তাই স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও মেডিকেল কলেজগুলোকে উন্নত মানের এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনতে হবে। বর্তমানে তথ্য ও উপাত্তকে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিদ্যমান পরিস্থিতির একটি প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। গবেষণার অভাবে আমাদের স্বাস্থ্য খাতে একটি বিশাল ডাটা বা তথ্যবিভ্রাট রয়েছে। বেশির ভাগ স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ হয় না। যার কারণে স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত অবস্থা বোঝা ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তথ্যের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তাই রোগ, রোগী, তার সামাজিক-পারিবারিক অবস্থান, তার জিনগত বৈশিষ্ট্য, নানা কর্মসম্পাদন ইত্যাদির আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে গবেষণা জরুরি। পরিবেশ ধ্বংস বা দূষণের কারণে কী পরিমাণ মানুষের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি বা দেশের পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে, গবেষণায় গুরুত্ব দিতে হবে এ বিষয়গুলোয়ও। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালী করতে বিশেষ বরাদ্দ, জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল ও ডায়ালাইসিস সেন্টার, নতুন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রযুক্তি ব্যবহারের নানামুখী প্রয়াস লক্ষণীয়। আমাদের প্রযুক্তির সর্বোত্তম ও সচেতন ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যা স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধির মাধ্যমেই সম্ভব। তাই স্বাস্থ্য গবেষণার অর্থ ব্যয়সংক্রান্ত নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এ কাজে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা জরুরি।
স্বাস্থ্য গবেষণা ব্যয়সংক্রান্ত নীতিমালা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সত্ত্বেও ব্যবহার করতে না পারা হতাশাজনক। তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের অধিকাংশ ক্ষেত্রে গবেষণায় বরাদ্দ কম আবার যতটুকু বরাদ্দ করা হয়, সেটুকুও ব্যয় হয় না। গবেষণাগার হিসেবে খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা এক্ষেত্রে আরো করুণ। বাজেট ঘোষণা হয়েছে ৭ মাসের বেশি। এ সময়ে শুধু নীতিমালা তৈরি হয়েছে, অবশিষ্ট সময়ে বাজেটে বরাদ্দকৃত স্বাস্থ্য খাতে গবেষণায় বরাদ্দ ব্যয় করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে গবেষণা বাবদ বরাদ্দের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন ও তা অনুমোদন হওয়ার আগেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল কাজটি এগিয়ে রাখা। এতে নীতিমালা অনুমোদন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গবেষণা শুরু করা যেত। নীতিমালাতেই গবেষণা ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন যথাযথ স্থানে যথাযথ গবেষকের কাছে এ অর্থ পৌঁছে দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।










