কেইনসীয় তত্ত্ব মোতাবেক সুদের হার মূলধনের উৎপাদনশীলতা কিংবা সঞ্চয়ের ত্যাগ স্বীকারের ওপর নির্ভর করে না, এটা নির্ভর করে সমাজে নগদ পছন্দ বা টাকার চাহিদা ও জোগানের ওপর। যে সুদের হারে টাকার চাহিদা ও জোগান পরস্পর সমান হয়, তাই ভারসাম্য সুদের হার। বাজার অর্থনীতির এ নিয়মকে উপেক্ষা করে ২০২০ সালে ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার ৯ শতাংশ এবং পরবর্তী সময়ে আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশে বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। করোনার সময়ে হয়তো এটি ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে নেয়া পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকলে ভারসাম্য নষ্ট হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগ সুদের হার বেঁধে দেয়ার প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা সম্পন্ন এবং ফলাফলে সেটিই উঠে এসেছে। এতে দেখা যাচ্ছে সুদহার বেঁধে দেয়ায় ব্যাংকগুলো কৃষি, সিএমএসএমইর মতো ঋণ বিতরণে নিরুৎসাহিত হয়েছে। বিপরীতে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী হয়েছে শিল্প খাত। বর্তমানে বেসরকারি খাতের ব্যাংকঋণের প্রায় ৬০ শতাংশই বড়দের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে। একই সঙ্গে দেশের মূল্যস্ফীতির হারও রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। ব্যাংকগুলোয় ঋণের চাহিদা বাড়ছে। বিপরীতে আমানত প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। ব্যাংকে তারল্য স্বল্পতাও দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত মুদ্রানীতির কার্যকারিতাও দুর্বল হয়ে এসেছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষক দল বলেছে, বাজারভিত্তিক সুদ ব্যবস্থাই হতে পারে বিদ্যমান চাহিদা ও জোগানের অসামঞ্জস্য দূর করার একমাত্র সমাধান। গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। এক্ষেত্রে হঠাৎ করে সুদের হার পুরোপুরি বাজারের হাতে ছেড়ে না দিয়ে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বিবেচনাপূর্বক এটি উন্মুক্ত করতে হবে।
অর্থনীতির সূত্র মোতাবেক ভারসাম্য সুদের হার যেভাবেই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন এটা সর্বজনবিদিত, ঋণের সুদহার নির্ধারণে উদ্যোক্তার ঋণের চাহিদার তীব্রতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, আমানতকারী বা সঞ্চয়কারীর আকাঙ্ক্ষাও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। সঞ্চয়কারীরা চান বেশি সুদ উপার্জন করতে, উদ্যোক্তারা চান কম সুদে ঋণ পেতে। ব্যাংক উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজারই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। পণ্যের দাম কী হবে, বাজারে ওই পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহই তা ঠিক করে। ওই হিসাবে সুদের হারও বাজারই ঠিক করে দেয়ার কথা। কিন্তু জনস্বার্থে সব পণ্যের দাম ঠিক করার ক্ষেত্রে সরকার লাগামটা ছেড়ে দেয় না। ২০২০ সালে যে পরিস্থিতিতে ঋণের সুদের হারের সঙ্গে সঙ্গে আমানতের সুদের হারের সর্বোচ্চ হার বেঁধে দেয়া হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকে ভিন্ন। একদিকে করোনা মহামারীর বিলম্বিত অভিঘাত আঘাত হানতে শুরু করেছে, অন্যদিকে বিশ্ব পরাশক্তির পারস্পরিক রেষারেষি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধকেও হার মানিয়েছে। আজকাল জোট বা দেশগুলো যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তাই বিশ্বব্যাপী বিশেষত দরিদ্র বিশ্বের দেশগুলোয় ব্যাপক মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমতে কমতে অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খরচ করছে। নিম্ন আয়ের মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে নাভিশ্বাস উঠেছে। আর তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এরূপ পরিস্থিতিতে জনসাধারণের আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো সময়ের দাবি। ব্যাংক আমানতের সুদের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের আয় বৃদ্ধি সম্ভব। বিশেষত নিম্ন আয়ের সুদভোগী জনগণ কিছুটা হলেও সুফল পেতে পারে। বিনিয়োগকারীদের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে, যাতে তারাও স্বল্প সুদে ঋণ পেতে পারে।
ব্যাংকঋণের সুদহার বেঁধে দেয়ার রীতি বহুলভাবে চর্চিত হতো লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয়। আর আফ্রিকার দেশগুলোতেও সুদহার বেঁধে দিয়ে অর্থনীতিতে গতি আনার চেষ্টা হয়েছে। যদিও এক্ষেত্রে সুফলের চেয়ে কুফলই বেশি দেখা গিয়েছে বিশ্বের দেশে দেশে। করোনা পরিস্থিতি উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক খাতে ঋণের চাহিদা বেড়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে সাড়ে ৯ শতাংশে ঠেকেছে। এ অবস্থায় সব পক্ষ থেকেই ঋণের সুদহার তুলে দেয়ার দাবি উঠেছে, আইএমএফও সেটি বলছে। গুটিকতক রাষ্ট্র ছাড়া বিশ্বের কোনো দেশেই সুদের হার নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় না। রাশিয়া, কিউবার মতো দেশগুলোয় সুদের হার নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়, সেখানে প্রতিটি বিষয়ই সরকার নির্ধারণ করে দেয়। চীনে একসময় সুদের হারের ওপর ক্যাপ আরোপ করা হতো। তারাও এখন বাজারমুখী। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ায় সুদের হার বাজার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশেও এতদিন বাজারের চাহিদা-জোগানের মাধ্যমে সুদের হার নির্ধারিত হয়ে এসেছে। তাতে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে জানা যায় না, বরং সে সময়ই বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগ ও সঞ্চয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এর ফলও অর্থনীতি পেয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৭-৮ শতাংশে উঠে গিয়েছিল। আর বিনিয়োগ শুধু সুদের হারের ওপর নির্ভর করে না। অন্যান্য ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে। বিশ্বব্যাংকের ডুইং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশের খারাপ অবস্থার পেছনে সুদের হারের তেমন ভূমিকা নেই; বরং চাঁদাবাজি, ঘুস, দুর্নীতি, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে সেখানে দায়ী করা হয়েছে। অন্যান্য ব্যয় কমিয়ে আনা গেলে সুদ বাবদ ২-৩ শতাংশ বাড়তি ব্যয় কোনো সমস্যাই তৈরি করার কথা নয়।
বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে সুদের হার খোলাবাজারে ছেড়ে দেয়া বা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেয়ার পেছনে যথেষ্ট অর্থনৈতিক যুক্তিও বিদ্যমান। প্রচলিত অর্থশাস্ত্রমতে বাজারে তারল্য বা অর্থের সরবরাহ বেশি থাকলে বাজারে সুদের হার কমবে। মানুষের হাতে টাকার সরবরাহ বেশি হলে ব্যাংক তুলনামূলক কম সুদে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। জনগণও ভোগের উপযুক্ত ক্ষেত্র না পেয়ে কম সুদেই বিভিন্ন ব্যাংকে সঞ্চয় করে থাকে। কিন্তু অর্থনীতিতে দ্রব্য মূল্যস্তর, মূল্যস্ফীতি এবং আয় বৃদ্ধি পেলে সুদের হার বৃদ্ধির কথা। অনেক সময় শেষোক্ত তিনটি কারণ যথা—মূল্যস্তর ও মূল্যস্ফীতি এবং মাথাপিছু আয় বাড়ার যৌথ কারণে বাজার সুদের হার বৃদ্ধি পায়। সেক্ষেত্রে বাজারে আর্থিক অর্থ সরবরাহজনিত তারল্য যতটুকু না সুদের হার কমায়, অন্যান্য কারণ তথা দ্রব্যমূল্য স্তর, মূল্যস্ফীতি এবং জাতীয় আয় বাজার সুদের হার তার চেয়ে বেশি হারে বাড়ায়। এতে বাজারে বর্ধিত সুদের হার বিরাজ করে।
প্রশ্ন হলো সুদের হার কমানো বা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থা কোনো ভূমিকা নেবে কি? উত্তর সম্ভবত না। এর কারণ হলো, ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান হচ্ছে অর্থবাজারে মধ্যস্থতাকারী। ব্যাংক কম খরচে অর্থ সংগ্রহ করতে পারলে কম সুদে ঋণ দেবে আর বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করলে ঋণের ক্ষেত্রে বেশি সুদ ধার্য করবে। এ কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংক যখন সুদ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করে তখন তারা শুধু ঋণ বা আমানতের সুদহার নিয়ে ব্যস্ত থাকে না। তাদের সুদ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য থাকে যাতে নিট সুদ মার্জিন অক্ষত থাকে। এরূপ পরিস্থিতিতে ব্যাংক কখনোই নিজস্ব উদ্যোগে ঋণ বা আমানতের সুদের হার পরিবর্তন বা কমানো-বাড়ানোর উদ্যোগ নেবে না। সুদের হার কমানো বা বাড়ানোর কারণে যদি তাদের মোট আয় অথবা মুনাফায় হেরফের হতো, সেক্ষেত্রে ব্যাংক অবশ্যই উদ্যোগী হতো। তাহলে করণীয়টা কী? নির্ধারিত নয়-ছয় সুদের হারের কারণে উদ্যোক্তারা যেমন কম সুদে ঋণ পাচ্ছে, সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ঝুঁকিটাও রয়ে যাচ্ছে। কম সুদে ঋণ নিয়ে অনেকে তুলনামূলক অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ করছে। এক্ষেত্রে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ার পাশাপাশি দেশীয় পণ্য ও সেবার বাজারে মূল্যস্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এ দেশের অধিকাংশ জনসাধারণ এর নেতিবাচক অভিঘাতের সম্মুখীন হচ্ছে। অন্যদিকে বেঁধে দেয়া আমানতের সর্বোচ্চ হার বেঁধে দিলেও সর্বনিম্ন কোনো হার বেঁধে না দেয়ায় ব্যাংকের যথেচ্ছাচার লক্ষণীয়। মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশ। ফলে আমানতকারীরা অর্থ হারাচ্ছে আর ঋণগ্রহীতারা শূন্য শতাংশে অর্থ পাচ্ছে অর্থাৎ অর্থ সস্তা হয়েছে। বিদ্যমান অবস্থায় বিনিয়োগ ভুল খাতে প্রবাহিত হওয়ার শঙ্কা থাকে।
সুদের হার কত হবে, তা বাজার ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত। বাজারকে হস্তক্ষেপ করলে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থনৈতিক শক্তি আবেগ-রাগ-অনুরাগ দিয়ে নির্ধারিত হয় না, আর্থিক পারঙ্গমতাই এর নির্ধারক। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অসম বণ্টন ইত্যাদি ব্যবস্থাকে যেমন রাতারাতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না, সুদের হারকেও কাঙ্ক্ষিত স্তরে আনার জন্য সুদের নিয়ামকগুলোকে আগে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আনার প্রচেষ্টা জরুরি। এটা ঠিক বাজার একেবারে খুলে দিলে সুদের হার অনেক বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কেস টু কেস যাচাই করে ব্যবস্থা নিতে পারে। যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা ভালো না, তারা অধিক সুদে অর্থ সংগ্রহ করছে কিনা, সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটর করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি উচ্চসুদে আমানত সংগ্রহ ও স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করে তাদের হিসাব-নিকাশ খতিয়ে দেখতে হবে। কোনো ব্যাংক যদি ঋণের সুদের হার অতিরিক্ত চার্জ করে সেটিও বাংলাদেশ ব্যাংকের দেখতে হবে। স্প্রেড রেটও কমিয়ে আনতে হবে।










