সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘কামনা থেকে ভ্রান্তি জন্মে, আর ভ্রান্তি থেকে জন্মে অধর্ম।’ চারদিকে তাকিয়ে দেখি, দেশের মানুষগুলো আজ নিজেদের কামনা পূরণ করতে গিয়ে আদর্শ-মতবাদ-নীতি কোনো কিছুকেই ধরে রাখার মতো মানসিকতার মধ্যে থাকতে পারছে না। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক, প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তাপূর্ণ নেতৃত্ব কোনো কিছুই এদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। বরং এসবকে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে রেখে এক শ্রেণীর মানুষ নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে দ্বিধাহীন চিত্তে এগিয়ে চলেছে। শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে নয়, আগামী চৌদ্দপুরুষের অভিজাত জীবন নিশ্চিত রাখতেই যখন যেখানে যা প্রয়োজন তা-ই করছে। এরা দেশ ও জাতির কল্যাণের আস্ফাালনের প্রতিটি পদক্ষেপের মধ্যে ঢেউ গোনার ব্যবস্থা করে নেয়। যত দিন যাচ্ছে ততই এরা সাহসী হয়ে দলে ভারী হচ্ছে। এরফলে দেশে স্বল্প সময়ের মধ্যেই ৫৪০ জন কোটিপতি হিসাবধারী হয়ে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করছে।

দেশে এখন একটা অদ্ভুত অধর্মের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। কেউ কারো চেয়ে পিছিয়ে থাকতে চাইছে না। কয়েক বছর ধরে একই কাজ পুনরাবৃত্তিকভাবে একজনের পর আরেকজন করে চলেছে। জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে এসব কাজের সংবাদ ব্যাপকভাবে প্রকাশ ও প্রচার হলে বিভিন্ন মহলে সামান্য নড়াচড়া হয় মাত্র, তারপর আবার এ গোষ্ঠীকে আবার একই কাজে ব্রতী হতে দেখা যাচ্ছে। ব্যাপারটা এমন অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছে যেখানে জবাবদিহিতা দায়বদ্ধতা তো অনেক পরের কথা, সামান্য লোকলজ্জার কোনো ভয়ও কাজ করে না। তবে সাধারণ জনগণকে বুদ্ধি ও বাহুবলে একটা সময় পর্যন্ত চুপ করিয়ে রাখা সম্ভব হলেও তা যে চিরদিন রাখা যাবে এমনটা ভাবার কিন্তু কোনো কারণ নেই। অথচ কামনা থেকে অধর্মের পথে চালিত হওয়া ব্যক্তিরা সাধারণ জনগণকে অবজ্ঞা করেই নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে নিবেদিত রয়েছে। আমরা এখন উন্নত দেশের কাতারে শামিল হওয়ার দৌড়ে রয়েছি, তাতেই বোধ হয় এমন ঘটনা চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৭০ টাকা বা ২ হাজার ৮১৪ মার্কিন ডলার। দেশের প্রতিজন নাগরিক মাসে আয় করে ২০ হাজার টাকার কিছু বেশি।

সরকারের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের মাথাপিছু আয়ের অংশটাই সম্মানী হিসেবে দেয়া হয়ে থাকে। অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে রাখা মানুষের জন্য মাথাপিছু সরকারি বরাদ্দ এতটাই লজ্জাজনক যে তা উল্লেখ করা যুক্তিযুক্ত নয়। এদিকে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির তথ্যানুসারে করোনাকালের প্রথম ৬৬ দিনে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৬ কোটি ৮০ লাখ হয়েছে। সাধারণ জনগণ মনে করে, প্রাথমিক পর্যায়ে দরিদ্র মানুষের যদি মাথাপিছু আয়ের অংশটা সামাজিক সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রদান করা হতো তাহলে আজকের আকাশছোঁয়া বৈষম্য কিছুটা হলেও ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারত। এখন মাথাপিছু যে অর্থ দেয়া হয়ে থাকে তাতে সামাজিক সুরক্ষা সুদূর পরাহত, তবে এ বলয় দেশ-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি সৃষ্টিতে সহায়ক। সরকার যদি সামাজিক সুরক্ষার নামে একটা সম্মানজনক সম্মানীর ব্যবস্থা করত তাহলে সাধারণ জনগণ ক্ষমতাবানদের অধর্ম নিয়ে এতটা ভাবত না।

সাধারণ জনগণ অবাক বিস্ময়ে দেখত ক্ষমতাবান দায়িত্বপ্রাপ্তদের ২ কোটি টাকার টিনের ঘরে ৩৭ হাজার টাকার একটা পর্দা, ৬ হাজার টাকার একটা বালিশ, ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকার একটা চেয়ার, ১ কোটি ২১ লাখ টাকার টয়লেটসহ নানা জিনিসপত্রে ভরা। টিনের ঘর ঘিরে আছে ৬ লাখ টাকার একটা কলা গাছ, ৬২ লাখ টাকার একটা নারকেল গাছ। একপাশে ১ কোটি টাকার গভীর নলকূপ। এখান থেকে বের হয়ে তারা দল ধরে বিদেশে খিচুড়ি রান্না শিখতে যাচ্ছে, পুকুর কাটা দেখতে যাচ্ছে, কেউ আফ্রিকায় পয়োনিষ্কাশন দেখতে যাচ্ছে তো আরেক দল আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ায় চর দেখতে যাচ্ছে, গ্রাম উন্নয়ন দেখতে যাচ্ছে। এখানে একটা কথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন, একজনের ৬ হাজার টাকার একটা বালিশ কেনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই অন্যজনের ২৮ হাজার টাকায় একটা বালিশ কেনার উদ্যোগ দেখা যায়। তবে গুগল তথ্যভাণ্ডারের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে দামি বালিশ ৭২ লাখ টাকা। দেশ যেভাবে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে হাঁটছে তাতে অচিরেই ৭২ লাখ টাকার সর্বোচ্চ দামি বালিশটি কেনা হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সবশেষে দায়িত্বপ্রাপ্তদের এসব কর্মকাণ্ড বিষয়ে সাধারণ জনগণকে আকর্ষিত-অবগত করানোর জন্য রয়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটা এলইডি ডিসপ্লে এবং ১০ কোটি টাকার টিকেটিং সিস্টেম।

কামনা থেকে যে অধর্মের জন্ম তার একটা সীমা থাকা প্রয়োজন। এ সীমা নির্ধারণের দায় রাজনীতির। কিন্তু আমাদের রাজনীতি মসনদ কেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ার ফলে ক্ষমতার দাপট ও নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জনকেই সবাই দায়িত্ব জ্ঞান করেছেন। সবাই সাধারণ মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনকে আস্ফাালনের মধ্যে রেখে নিজ এবং পরিবারের স্বার্থরক্ষায় নিবেদিত। আর এ দৌড়ে যোগ্যতা-দক্ষতা-মেধা এবং নীতি আদর্শের অনুশীলনহীন মানুষ নিজেদের সামনের কাতারে তুলে এনেছেন। এদের কোনো আত্মমর্যাদা বোধ নেই, তাই বিবেকের কাছে অনুগত থাকার প্রয়োজনও তারা বোধ করে না। দেশের রাজনীতি যেমন আজ কাড়াকাড়ি-মারামারির রাজনীতি তেমনি দেশের অন্য ক্ষেত্রগুলোও একই পথে হেঁটে চলেছে। এমন বাস্তবতায় এটা আশা করা কোনোভাবেই উচিত হবে না যে পরিশীলিত রুচির সৌজন্য নিয়ে মানবতার অনুসারীরা দেশ ও জনকল্যাণে নিবেদিত হবে, বরং দেশে আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অদ্ভুত অদ্ভুত ব্যবহার ক্রমে রাড়ছে। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবান্ধব রাইড বসানোর উদ্যোগও গ্রহণ করা হচ্ছে। চিন্তা-চেতনার শূন্যতা আমাদের কোথায় নিয়ে চলেছে তা ভেবে দেখার সময় কি এখনো হয়নি? লাগাম টানার সময় কি হয়নি এখনো? দেশ ও জাতির প্রভু ভাবা এ মানুষের দল একবার পেছনে ফিরে দেখলেই কেবল সবাই উপকৃত হতে পারে।

সাধারণ জনগণ হিসেবে সংকীর্ণ মানসিকতা থেকেই এসব ভাবনা আসে কিনা জানি না। সরকারের পক্ষ থেকে পদ্মা সেতু হয়েছে, মেট্রোরেলের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে, স্বপ্নের মধ্যে আছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, ঢাকা-কক্সবাজার বুলেট ট্রেন, শরীয়তপুর ও নোয়াখালীতে বিমানবন্দর, দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, দ্বিতীয় মহাকাশ স্যাটেলাইট স্থাপন, যমুনায় রেল সেতু ইত্যাদিসহ আরো কত কিছু। এসব কিছু ভাবনায় রয়েছে একটা নির্দিষ্ট কেন্দ্রের সেখানে জনসম্পৃক্ততা নেই। দেশে বর্তমানে চলমান প্রকল্প ভাবনাগুলোর সবই মেগা প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন হবে। উন্নত দেশের কাতারে যাওয়ার জন্য হয়তো এমন সব প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা আছে। তবে এর মধ্যে কতটা জনকল্যাণ আছে তা সাধারণ জনগণের বোধগম্য নয়। যেমন বোধগম্য নয় সরকারের রিজার্ভের ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যবসায়ীদের দিয়ে দেয়া। সরকার ও কর্তৃপক্ষ খুব ভালো করেই জানে এ বিদেশী মুদ্রা আর ফেরত আসবে না। বিত্তহীন মানুষগুলো পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় মালয়েশিয়ার রাবার বাগানে শ্রম দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠায় আর সে মুদ্রায় বিত্তবানদের বিদেশে সেকেন্ড হোম হয়, সন্তানদের লেখাপড়াসহ ভবিষ্যৎ তৈরি হয়। দেশের অনাহারী অনক্ষর মানুষ একে কামনা থেকে অধর্ম হিসেবে বিবেচনা করলে কতটা যুক্তিযুক্ত হবে তা বিচারের ভার সুধীমহলের।

সাধারণ জনগণ সব সময়ই নিজের যে কোনো ১ টাকার কাজ ১২ আনায় করার চেষ্টা করে থাকে। সবসময় পারে—এমন দাবি করা যাবে না। তবে ১ টাকার কাজ তারা ৩ টাকায় করে না। সে নিজস্ব অর্থায়নে হোক আর বিদেশী সাহায্যেই হোক, সর্বত্র একই অবস্থা। সাধারণ জনগণকে কেন ১ টাকার কাজে ৩ টাকা ব্যয় হয়েছে তার নানা কৈফিয়ত দিতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পেশাজীবীর জীবন উৎসর্গ করা দেখে অপরাপর বন্ধুরা তাকে সাধুবাদ জানায়। সাধারণ জনগণও সংশ্লিষ্টদের সবাইকে সাধুবাদ জানাতে চায়। কিন্তু পারে কি? সরকার জনগণের করের টাকায় আটটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে। দেশের মেধাবী সন্তানরা এখানে বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকেন। এ বিশেষজ্ঞরা একটা বঙ্গবন্ধু সেতুর অভিজ্ঞতা নিয়ে পদ্মা সেতু করতে পারে না। বিদেশ থেকে সবকিছু করে আনতে হচ্ছে। তার পরও কোনো প্রকল্প সময়ে এবং প্রাক্কলিত ব্যয়ে শেষ হয় না। প্রকল্প জীবনকাল পেলেও না হয় কথা ছিল। পদ্মা সেতুর কথাই যদি ধরি। পদ্মা সেতুতে সমস্যা হলে মাটি পরীক্ষা করা হলো। ফিজিবিলিটি প্রতিবেদন তৈরি হলো, ২০ দেশের মেধা ব্যবহার করা হলো। আমার দেশের একজন মানুষও কি ব-দ্বীপের এবং জলসম্পদের চরিত্র জানে না? তাহলে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় কোন কাজে লাগে? তাই দেশের সাধারণ মানুষকে বোকা ভেবে অধর্ম হচ্ছে কিনা ভাবা প্রয়োজন। যেহেতু ধর্ম থেকে অধর্মের দূরত্ব বিপরীতমুখী মাত্র। তাই সাধারণ জনগণ ধাঁধার মধ্যে পড়ে যায়।

 

এমআর খায়রুল উমাম: প্রাবন্ধিক

সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)