বাংলাদেশে এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়নের ফলে এখন চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু এটা আশীর্বাদ হিসেবে আসেনি, এসেছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বোঝা হিসেবে। ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক গবেষণাপত্রে এ চিত্র ফুটে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা একে মহাপরিকল্পনার দুর্বলতা হিসেবেই দেখছেন। এক দফা সংশোধনও করা হয় মহাপরিকল্পনা ২০১৬ সালে। তাতেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। পরিকল্পনায় বিদ্যুতের চাহিদা, বিতরণ ব্যবস্থা, সঞ্চালন লাইনের সংস্কার ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষিত ছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংস্থান কীভাবে হবে, তার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার অনুপস্থিত ছিল লক্ষণীয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও ছিল অনেক বেশি। এটি মেটাতে গিয়ে একদিকে সরকারকে বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভোক্তা ও উৎপাদকদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপাতে হয়েছে। সঞ্চালন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহও নিশ্চিত করা যায়নি। কয়লা ও জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে জোর দেয়ায় পরিবেশের জন্য তা ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। বিদ্যমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনাকে আবারো পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক, তবে সেটি টেকসই জ্বালানি মিশ্রণ, ব্যয়সাশ্রয়ী, পরিবেশসহায়ক, উন্নত সঞ্চালন ব্যবস্থা ও মানসম্পন্ন সেবা প্রদানের মতো বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে প্রণীত হতে হবে। চাহিদা ও পরিবেশের বিবেচনা ছাড়া শুধু উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুত্খাত অর্থনীতির বোঝা হয়ে দাঁড়াবে

মহাপরিকল্পনাগুলোয় জ্বালানি মিশ্রণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিল না। পরিবেশের বিষয়টি ছিল উপেক্ষিত। পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান, ২০১৬-এ বলা হয়েছিল, মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫০ শতাংশ আসবে কয়লা থেকে। বিশ্বে কয়লা ‘ডার্টি এনার্জি’ হিসেবেই পরিচিত। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অধিক পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, বিষাক্ত ভারী ধাতু মারকারিসহ বিবিধ ক্ষতিকর কণা নিঃসরণের জন্য দায়ী। এগুলো বায়ুমণ্ডলে গিয়ে সালফিউরিক অ্যাসিড ও নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করে, যা বৃষ্টির মতো ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি-২০১৫ অনুযায়ী, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করে দিয়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। চীন, ভারতসহ অনেক দেশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। সর্বোপরি সে কয়লা আমদানীকৃত। কয়লার আন্তর্জাতিক বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নির্মাণের অগ্রগতিও আশানুরূপ নয়। তাই ঘটনাপ্রবাহে শঙ্কা জাগছে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নির্মাণ শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই বিশ্বে কয়লার ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ার কথা। আর সেটা হলে দেশের বিশাল অর্থ গচ্চা যাবে। ইউনেস্কো, যুক্তরাষ্ট্র, ইইউসহ পরিবেশবাদী সংগঠন ও ব্যক্তিদের পরামর্শ-অনুরোধ উপেক্ষা করে সুন্দরবনের সন্নিকটে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দিকেও কর্তৃপক্ষ ঝুঁকেছে, যা কাম্য নয়।

পরিকল্পনার বিপত্তি হচ্ছে চাহিদার ভ্রান্ত প্রক্ষেপণ। পরিকল্পনায় প্রকৃত চাহিদার চেয়ে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে অনেক বেশি, পরিকল্পনা তৈরির সময়ই বিশেষজ্ঞরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তখন সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল, অর্থনীতি বড় হচ্ছে, চাহিদা বাড়বে। কিন্তু সেটি হয়নি। ভুল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা নেয়া মানে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের বোঝা হয়ে ওঠা। বাস্তবে সেটিই হয়েছে। অলস পড়ে থাকা এ কেন্দ্রগুলো থেকে সরকার যে পরিমাণ বিদ্যুৎ নেবে বলে চুক্তি করেছিল সেটি নেয়ার দরকার না হলেও চুক্তি অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ঠিকই দিতে হয়েছে। দেশে যে হারে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, সে হারে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। ফলে আগের ব্যবস্থা দিয়েই বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে। এতে সরবরাহে চরম ব্যাঘাত ঘটছে। নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়া ছাড়াও শিল্পের ক্ষতি হচ্ছে। বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই শিল্পোদ্যোক্তারা ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও শিল্প মালিকরা নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুতে প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। এতে গ্রিডের অনেক বিদ্যুৎ অব্যবহূত থাকছে। সরকার বলে আসছে, শিল্পে এ বিদ্যুৎ ব্যবহার করা গেলে সংকট সামাল দেয়া সহজ হতো। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, দেশব্যাপী দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার কারণে বিতরণ কোম্পানিগুলো শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে পারছে না। এ কারণে ব্যবসায়ীরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা চাইছেন। চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অনেক অর্থের দরকার, যেটি বরাদ্দ নেই। অন্যদিকে উৎপাদন অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারার কারণে সক্ষম বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যেকোনো পণ্যের উৎপাদন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার মার্কেটিংয়ের ব্যবস্থা করাও জরুরি। তবুও পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকেই শুধু গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এটি অদূরদর্শিতারই পরিচয়ক।

বৈশ্বিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি জোগানোতেই বেশি দৃষ্টি দিয়েছে। ভিয়েতনামে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জলবিদ্যুতের অবদান ৪১ শতাংশ। বাকি ২ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে খুব সামান্য পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করে। এখন দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহারে আরো বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একইভাবে কম্বোডিয়াও গতানুগতিক দেশীয় জ্বালানি উেসর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্প খাতের জ্বালানি চাহিদা মেটাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায়ও সমরূপ অবস্থা। দেশটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার প্রাধান্য থাকলেও ধীরে ধীরে জলবিদ্যুৎ ও জিওথার্মালের ব্যবহার বাড়ছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে বাংলাদেশেরও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কয়লা ছেড়ে জ্বালানির নবায়নযোগ্য উেসর পক্ষে কথা বলছে। নবায়নযোগ্য ও স্থানীয় জ্বালানির উৎস ব্যবহার করলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংকট ও জ্বালানি সরবরাহ ক্ষেত্রের আঘাত থেকে রক্ষা পাবে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিবেশ দূষণ এড়ানো যাবে।

বিপিডিবি প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ লোকসান দিচ্ছে। করোনার কারণে প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আয় আরো কমবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদকদের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পরিশোধ করে যাচ্ছে বোর্ড। সরকার বিপিডিবিকে ভর্তুকি বা ঋণ দেয়ার কারণ হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন বা ক্রয়মূল্যের চেয়ে খুচরা বিক্রিমূল্য কম। এর মানে হলো করদাতাদেরই শেষ পর্যন্ত এ বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে সম্পদের অপচয় হচ্ছে। অর্থনীতির ভাষায় বিদ্যুৎ খাতে সরকারি ব্যয় ইতিবাচক রিটার্ন প্রদান করছে না। এর সুযোগ ব্যয় অপেক্ষাকৃত বেশি। চাহিদার সঙ্গে উৎপাদনের সামঞ্জস্যহীনতা ও পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি উপেক্ষা করে টেকসই বিদ্যুৎ খাত গড়ে তোলা যাবে না। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনাকে তাই সাজাতে হবে ব্যয়সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন, দেশীয় জ্বালানিনির্ভর, পরিবেশসহায়ক ও মানসম্পন্ন সরবরাহের বিষয়টি কেন্দ্রে রেখে। বিদ্যুতের সম্ভাব্য চাহিদা, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, পরিবেশ এবং কেন্দ্র নির্মাণে দীর্ঘদিন বাংলাদেশ যে পথে হেঁটেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এখনই ভুল সংশোধন না করলে অর্থনীতির ক্ষত আরো বড় হবে, যা সামাল দেয়া সবার জন্য কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।