বাংলাদেশে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের বিশেষ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) তিন দশক অতিক্রম করেছে। এরই মধ্যে ইপিজেডের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে আট। এখান থেকে রফতানি হয়েছে ৯৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। দেশের অর্থনীতিতে অন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অবদান ক্রমে বাড়ছে। বেসরকারি খাত উন্নয়নে সরকারের বিনিয়োগমুখী নীতি ও কৌশল গ্রহণের ফলে দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ মানচিত্রে ক্রমেই মোট বিনিয়োগের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছেন। ফলে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দিন দিন বাড়ছে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও বড় অবদান রাখছেন তারা। পাশাপাশি দেশের অগ্র ও পশ্চাৎ সংযোগকারী শিল্পের চাকাও সচল রাখতে সহায়তা করছেন তারা। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের ইপিজেডগুলো কাজ করছে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের মডেল হিসেবে। উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান বজায় রাখতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের জন্যও এটি অনুকরণীয় হয়ে উঠছে। আধুনিক বিশ্বে বিদেশী ক্রেতারা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সোশ্যাল কমপ্লায়েন্সের ওপর জোর দিচ্ছে। তাই ইপিজেডভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা বিদেশী ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী নিজস্ব প্রতিষ্ঠানেও সোশ্যাল কমপ্লায়েন্সের বিভিন্ন শর্ত মেনে চলার চেষ্টা করছেন। ফলে ইপিজেডে কর্মপরিবেশ অন্য কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক উন্নত। সব ধরনের কমপ্লায়েন্স সুযোগ-সুবিধা বহাল থাকায় শ্রমিকের মজুরি ও অন্য সুযোগ-সুবিধাও তুলনামূলক বেশি। এ মডেল অনুসরণ করে সরকার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যা বাস্তবায়নাধীন।

ইপিজেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করে স্থানীয় এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে আকর্ষণ বাড়াতে হবে। ইপিজেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করে যেমন বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াকরণ করে রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব, সে সঙ্গে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে আকর্ষণ বাড়াতে পারলে লাখ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে দেশেই। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এসে বিদেশীদের বিভিন্ন জটিলতায় পড়তে হয় দুর্নীতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতা, দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি কারণে। এসব সমস্যার সহজ সমাধান হতে পারে ইপিজেড। ইপিজেড সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরিচালিত হওয়ার ফলে এতে বিনিয়োগকারীরা সহজ শর্তে বিনিয়োগ এবং পণ্য উৎপাদন করতে পারবেন কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই। করোনার মধ্যেও সাড়ে ৩ কোটি ডলার বা প্রায় ৩০০ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ এসেছে ইপিজেডে। বিনিয়োগ জটিলতা কম থাকায় উদ্যোক্তাদের প্রথম পছন্দ ইপিজেড, তবে দেশের আটটি ইপিজেডে পর্যাপ্ত জমি বা জায়গা না থাকার কারণে অনেক বিদেশী কোম্পানি বিনিয়োগ করতে পারছে না। অনেক কোম্পানির বিনিয়োগের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও জমিস্বল্পতার কারণে বিনিয়োগ করতে পারছে না। উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের চাহিদা মেটাতে ইপিজেডের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। এর মধ্যে কয়েকটিকে ইপিজেড হিসেবে গড়ে তোলা গেলে আরো সুফল মিলতে পারে। উন্নতমানের টেকনোলজিনির্ভর অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। একটি দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধি করতে বৈদেশিক বিনিয়োগের বিকল্প নেই, সেই সঙ্গে নিজ দেশের বেকারত্ব, দারিদ্র্য দূর করতে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করা জরুরি। টেকসই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে সরকারকে এ বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে।

বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ ও ব্যাপক কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) সর্বোত্কৃষ্ট স্থান হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ধারণার প্রথম প্রচলন দেখা যায় আয়ারল্যান্ডে পঞ্চাশ দশকের দিকে এবং এটি পর্যায়ক্রমে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে। বিশ দশক পরে এশিয়ায় বিশেষ করে চীনের দক্ষিণ-পূর্ব সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে চীনের ডেং ঝিয়াপিং প্রদেশে ১৯৮০ সালে অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা করা হয়। চীনের একটি ছোট্ট গ্রাম শেনঝেনে সবচেয়ে সফল অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাত্র ২০ বছরের মধ্যে সেখানে ১০ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যার শহরে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করায় চীনের অন্যান্য স্থানেও বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এশিয়ার অন্যান্য দেশেও অর্থনৈতিক জোনের দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। বর্তমানে চীনে ১ হাজার ৫০০-এর বেশি, ফিলিপাইনে ৩১২, ভারতে ২২১, শ্রীলংকায় ১২ এবং বাংলাদেশে বর্তমানে আটটি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় ক্ষেত্রেই ইপিজেডে বিদেশী বিনিয়োগের সঙ্গে থাকে উন্নততর বিদেশী প্রযুক্তি। ফলে স্থানীয় শ্রমিক, কারিগর, প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপকরা প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুবিধা পান, অর্জন করেন উন্নততর কর্মকৌশল। দেশের যেসব এলাকায় ইপিজেড স্থাপিত হয়েছে সেগুলো একেকটি প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে, সেগুলোয় গড়ে উঠেছে নতুন নতুন রাস্তা, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস লাইন, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, ফায়ার ব্রিগেড, ডাকঘর, ব্যাংক ইত্যাদি ভৌত ও পরিষেবা সুবিধা।

সরকারের লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা ইপিজেড সম্প্রসারণের মাধ্যমে সে গন্তব্যে পৌঁছতে কিছুটা সহায়ক হবে। খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, দেশের অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চারের ক্ষেত্রে ইপিজেডগুলোর ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের বিনিয়োগমুখী নীতি ও কৌশল গ্রহণের ফলে দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ মানচিত্রে ক্রমেই মোট বিনিয়োগের সঙ্গে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু করেছিলেন। এসব প্রতিষ্ঠানে দিন দিন বাড়তে থাকে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ। পথ প্রশস্ত হয়েছিল ব্যাপক কর্মসংস্থানের। কিন্তু একসময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা কারণে ধস নামা শুরু হয় এ ব্যবসায়। ইপিজেডগুলো বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে মডেল হিসেবে কাজ করছে। উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের জন্যও এর প্রতিষ্ঠান অনুকরণীয় হয়ে উঠছে। আধুনিক বিশ্বে বিদেশী ক্রেতারা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সোশ্যাল কমপ্লায়েন্সের ওপর জোর দিচ্ছেন। তাই ইপিজেডভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা বিদেশী ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী নিজস্ব প্রতিষ্ঠানেও সোশ্যাল কমপ্লায়েন্সের বিভিন্ন শর্ত মেনে চলার চেষ্টা করছেন। ফলে ইপিজেডে কর্মপরিবেশ অন্য কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক উন্নত। ইপিজেডগুলোর সঙ্গে সড়ক-মহাসড়ক সরাসরি যুক্ত হলে কর্মপরিবেশ আরো উন্নত হবে। এক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি দক্ষ জনসম্পদ জোগানের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এগুলো হলো—দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো। এ চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে মোকাবেলা না করতে পারলে এ ধরনের অঞ্চল গড়ে তোলা এবং পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে। অর্থনৈতিক অঞ্চল বিভিন্ন ধরনের হবে। সেখানে কারিগরি বিষয় প্রাধান্য পাবে এবং দক্ষ মানবসম্পদ প্রয়োজন হবে। তাছাড়া দেশে বিদ্যমান অনেক আইন-কানুন আছে, যেগুলো বিনিয়োগবান্ধব নয়। একটি দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ না থাকলে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। কোনো দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য ক্ষুদ্র বা মাঝারি ব্যবসা চালু এবং সেটা পরিচালনা করা কতটুকু সহজ বা কঠিন সে বিষয়গুলো কয়েকটি সূচকের আওতায় বিশ্বব্যাংক পরিমাপ করে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ডুয়িং বিজনেস-২০১৯ প্রতিবেদনে দেখা যায়, অধিকাংশ সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। এগুলো হলো— ব্যবসা শুরু, নির্মাণের অনুমোদন নেয়ার প্রক্রিয়া, বিদ্যুৎ সরবরাহ, সম্পত্তির নিবন্ধন, ক্রেডিট অর্জন, সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, কর প্রদান, বৈদেশিক বাণিজ্য, চুক্তির বাস্তবায়ন ও অসচ্ছলতা দূরীকরণ। পর্যালোচনায় দেখা যায়, দুর্বল অবকাঠামো ও ত্রুটিপূর্ণ ব্যবসায়িক পরিবেশ বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রধান অন্তরায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বৃহত্তর বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বেশকিছু নীতিগত ও প্রায়োগিক সংস্কার করতে হবে।

বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের প্রাথমিক ধাপ অতিক্রম করেছে। পুরোপুরি মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে দ্রুত ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে মোট জিডিপির ৩০-৩৩ শতাংশ বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। যেখানে বর্তমানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ৩০ শতাংশের নিচে ওঠানামা করছে। সুষম উন্নয়ন তথা টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। তাছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো ও ব্যবসায়িক পরিবেশ বিশ্বমানের হতে হবে। সফল দেশগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এসব অঞ্চলের সঙ্গে সমুদ্র ও স্থলবন্দরের কার্যকর সংযোগের ওপর সাফল্য নির্ভর করে। এজন্য বন্দরগুলোর অবকাঠামো ও দক্ষতার উন্নয়ন এবং সংযোগ সড়কের উন্নয়ন করতে হবে। সে সঙ্গে এসব অঞ্চলে শিল্প স্থাপনে রফতানি বহুমুখীকরণের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।