কৃষি এ উপমহাদেশের মানুষের আদি পেশা। নারীদের মাধ্যমে কৃষিকাজ শুরু হয়েছিল বলে জানা যায়। সময়ের পরিক্রমায় সেই আদি কৃষি এখন আধুনিক কৃষি বা বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশ কৃষি খাত থেকে অর্জিত হয় এবং পুরো শ্রমশক্তির ৪৬ শতাংশ কর্মসংস্থান এ খাতের মাধ্যমে হয়। দেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর হলেও মোট জাতীয় উৎপাদনে কৃষির প্রতিনিধিত্ব কমে আসছে। আমাদের দেশের অর্থনীতিতে উন্নয়ন যত হয়েছে, তার মূলে রয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ; যা মানুষ শুরুতে করেছে প্রকৃতির নিয়মে। সময় পেরিয়েছে, মানুষ জয় করতে শিখেছে প্রকৃতির নিয়মকে। ফলে সে গতি বেগবান করে একজনের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ছড়িয়ে দিয়েছে অন্যদের কাছে। এটি ত্বরান্বিত করতে মানুষ গভীর চিন্তাভাবনা করেছে। সে চিন্তার সঙ্গে মানুষ সংযুক্ত করেছে বিজ্ঞানকে, আর আদতে তার নামই গবেষণা। তাই তো বলা হয়, গবেষণার মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের উদ্ভাবন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান কৃষিতে গতি আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বিএডিসি থেকে শুরু করে বিএআরসি ও জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেম তার সময়ে এবং তার নিজস্ব পরিকল্পনায় হয়েছে। কৃষি গবেষণায় যারা অগ্রগামী, তাদের দিয়ে কৃষির উন্নয়নে করণীয় ঠিক করতে মতবিনিময় করেছেন এবং সবুজ বিপ্লবে দেশের কৃষিকে সম্পৃক্ত করে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তিনি বীজ, সার, সেচসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণের মূল্য কৃষকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন। ১৯৭২ সালে এ দেশে খাদ্যশস্যের মোট উৎপাদন ছিল এক কোটি টনের কিছু বেশি। বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে চার কোটি টন। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ শতাংশ হারে।

কৃষি উৎপাদন ও সম্প্রসারণে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। তিনি ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে কৃষিবিদদের সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর মর্যাদায় উন্নীত করার ঘোষণা দেন। সত্যি কথা বলতে কি, এ দেশে কৃষির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের যাত্রার উল্লম্ফন তার মধ্য দিয়েই বিস্তার লাভ করা শুরু করেছিল। এর মাধ্যমে তিনি কৃষির উন্নয়নে দেশ-বিদেশের কৃষি গবেষকদের সংযুক্ত করতে পেরেছিলেন। তিনি যথার্থই বুঝতে পেরেছিলেন জনসংখ্যাধিক্য দেশ হিসেবে সারা দেশের মানুষের খাদ্য জোগাতে হলে কৃষির ওপর জোর না দিয়ে গত্যন্তর নেই। বঙ্গবন্ধুর সময়ে কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার সমন্বয় হওয়ায় কৃষি উৎপাদন ও সম্প্রসারণে প্রচণ্ড গতি পায় এবং সাধারণ মানুষের খাদ্যাভাব পূরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে থাকে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং জমির ফসল নিবিড়তা অধিকতর বৃদ্ধি পাওয়ায় গতানুগতিক চাষাবাদ পদ্ধতির মাধ্যমে বর্ধিত খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। কৃষকসমাজের সমৃদ্ধি অর্জন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, গ্রামীণ সম্প্রদায়ের টেকসই স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে সুযোগ সৃষ্টি এবং সম্পদের সুষ্ঠু ও সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় তত্কালীন রাষ্ট্রপতির এক অধ্যাদেশবলে ১৯৭৩ সালে জাতীয় পর্যায়ে কৃষি গবেষণা সমন্বয়, পরিকল্পনা, গবেষণার বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের জন্য সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

পরবর্তী সময়ে কৃষির উন্নয়নে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে ওঠে। তাদের সমন্বয় করার জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল গঠিত হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। পরিকল্পনা ও সম্পদের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে জাতীয় কৃষি গবেষণা সক্ষমতা জোরদারকরণ বিএআরসির দায়িত্ব, যা একই ছাতার নিচে দেশের পুরো কৃষি গবেষণাকে সম্পৃক্ত করার প্রয়াসে জাতীয়ভাবে বৃহত্তর সমন্বয় সাধন মাত্র। এতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, যেমন কৃষি বন ও পরিবেশ, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ, পল্লী উন্নয়ন, শিক্ষা, শিল্প, বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইত্যাদির সমন্বিত কার্যক্রম যুক্ত হয়েছে। সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মত্স্য অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কৃষি সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। দেশে বর্তমানে ১২টি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা কৃষির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা ও কিছু সম্প্রসারণের কাজ করে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল আইন, ২০১২-এর আওতায় বিএআরসিকে সর্বোচ্চ সংস্থা হিসেবে গণ্য করে ১২টি গবেষণা ইনস্টিটিউট তার অধীনে রেখে জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেম পুনর্গঠন করা হয়, যাতে দেশে গবেষণা ও সম্প্রসারণ আরো গতি লাভ করে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও এবং বেসরকারি খাত গবেষণা সহযোগিতার সঙ্গে মাত্রাভেদে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে। উল্লিখিত সংস্থাগুলোর মধ্যে ছয়টি স্বায়ত্তশাসিত ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন এবং বাকিগুলো আলাদাভাবে স্বীকৃত।

 নতুন প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ধারণা গবেষক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে সম্প্রসারণ এজেন্ট এবং তাদের মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে পৌঁছে। আবার অন্যদিকে কৃষক পর্যায়ে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এজেন্টের মাধ্যমে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা গবেষকের কাছে পৌঁছে। দুটি মাধ্যমেরই অস্তিত্ব বিদ্যমান। কারণ এগুলো উভয় পদ্ধতিতেই ধাবিত হয়। তবে মাঠ পর্যায়ে উদ্ভূত সমস্যাগুলো সমাধানে গবেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাজ করে এবং সেগুলোর সমাধান হিসেবে যারা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত, তাদের কাছে নতুন প্রযুক্তি পৌঁছে দেয়া সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থা ও ব্যক্তির যথাযথ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমাদের দেশে সম্প্রসারণ এজেন্ট আলাদা হওয়ায় সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য পৃথিবীর বহু দেশে (যেমন ভারত, আমেরিকা) গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্প্রসারণ ইউনিট সংযুক্ত থাকে। সম্প্রসারণ ইউনিট সংযুক্তির বিশেষ কারণ হলো, গবেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কৃষককে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে বোঝাতে পারবে বা পৌঁছাতে পারবে, তা অন্যরা পারবে না। আমাদের কৃষির উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে সব শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে সম্প্রসারণ বিভাগ চালু করা দরকার, যারা বিদ্যমান সম্প্রসারণ এজেন্টের সঙ্গে সমন্বয় করে নিবিড়ভাবে কাজ করবে। ফলে গবেষক বা গবেষণায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের উৎপাদনকারীদের সংযোগ সহজেই বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।

কৃষিতে প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষকরাই প্রধানত প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করেন। তবে তারা কৃষকের সমস্যা বা উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টি প্রাধান্য দেন। ফলে গবেষকদের ভাবনার সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের চাহিদার যোগাযোগ থাকার প্রয়োজন হয়। উভয়ের বিষয়গুলো দেখভাল করতে হয় সরকারি সংস্থার। সম্প্রসারণ বিষয়ে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি দেশী-বিদেশী অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থাও কাজ করে। এজন্য আমরা বিভিন্ন সময়ে কৃষির উন্নয়নে বিদেশী উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে বড় বড় প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেখি। এ দেশের কৃষির উন্নয়নে সেগুলোর প্রভাবও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশে কৃষির উন্নয়ন হচ্ছে। কৃষিতে সরকারের সানুগ্রহ দৃষ্টি থাকায় করোনা পরিস্থিতিতেও দেশের খাদ্য উৎপাদন পরিস্থিতি ভালো। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও মরণঘাতী করোনাভাইরাস হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু অনেক বিপর্যের আশঙ্কা থাকলেও কৃষির উৎপাদন অব্যাহত থাকার কারণে দেশে কোনো ধরনের খাদ্যাভাব পরিলক্ষিত হয়নি। করোনার অতিমারীর কারণে কিছু নতুন প্রযুক্তির চাহিদা তৈরি হচ্ছে, যেগুলো সমাধানে গবেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে যাচ্ছে। কৃষির উন্নয়নে সরকার তার সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে প্রযুক্তি সম্প্রসারণে আরো বেশি সমন্বয় সাধনে মনোযোগী হবে—এটা কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবারই বিশ্বাস। কৃষি অর্থনীতিনির্ভর দেশ হিসেবে কৃষির আরো উন্নয়ন ও কৃষিভিত্তিক শিল্প উন্নয়নের মাধ্যমে দেশ কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করবে, এটাও প্রায় প্রমাণিত সত্য। আর সে কারণেই কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে তাদের গবেষণা ও অন্যান্য কার্যাবলি সম্পন্ন করে যাচ্ছে। 

কৃষি সম্প্রসারণে, বিশেষ করে শস্য, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের বিভিন্ন উপখাতে বহুমুখীকরণ অত্যন্ত প্রয়োজন এবং সে লক্ষ্য পূরণে আশির দশক থেকে গবেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে আসছে। তবে তারা এখনো আকাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সফলতা পায়নি। গবেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির প্রাচুর্য থাকলেও বহু লাগসই প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে বা খামারি পর্যায়ে পুরোপুরিভাবে যাচ্ছে না, তার জন্যও গবেষণা হওয়া দরকার। পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদনে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন হতেই হবে এবং তার জন্য যান্ত্রিকীকরণ হবে উৎপাদনের প্রায় সব পর্যায়ে। চালু হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, যা উন্নত কৃষি অর্থনীতির পরিচায়ক। সঙ্গে যুক্ত হবে রোবটিক প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে অন্য এক বাণিজ্যিক কৃষির বিস্তার নিয়ে দেশ এগিয়ে যাবে। সবকিছু মিলিয়ে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, উন্নত প্রযুক্তি সম্প্রসারণে গুরুত্ব প্রদান সময়ের দাবি বৈ অন্য কিছু নয়। আরো একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, তা হলো গবেষকদের মূল্যায়ন এবং সমাজে তাদের সম্মানিত করার রেওয়াজ উল্লেখযোগ্যভাবে নেই। উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশেও গবেষকদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে, কারণ সম্প্রসারণে তাদের বিকল্প নেই। সময় এসেছে পরিবর্তনের এবং কৃষিশিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে সে পরিবর্তন সঠিকভাবে করতে পারলে অর্থনীতিতে উন্নত কৃষির সুফল অনিবার্য।

 

ড. মো. সাইদুর রহমান: অধ্যাপক, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ ও পরিচালক, কৃষি ব্যবসা ও উন্নয়ন শিক্ষা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ