করোনা মহামারীতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষ। এ তালিকার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও কৃষক। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, করোনার প্রভাবে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া এ জনগোষ্ঠীর জন্য বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। শনিবার আয়োজিত এক অনলাইন বৈঠকে অংশগ্রহণকারী আলোচকরা বলেছেন, করোনার কারণে দুই ধরনের দরিদ্র তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে যারা আগে থেকে দরিদ্র ছিল তারা আরো দরিদ্র হয়েছে। যারা আগে দারিদ্র্যসীমার বাইরে ছিল তাদের আয় কমে যাওয়ার কারণে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। করোনায় মানুষের আয়ও কমেছে। উৎপাদনশীল খাত চাঙা করতে জনগণের ভোগ ধরে রাখতে হবে। আর সেজন্য মানুষের হাতে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়ানো জরুরি, যে নীতি অনেক দেশ করে সফল হয়েছে।

করোনায় মানুষের আয় ও ভোগ কমেছে। বেকারত্ব, পুষ্টিহীনতা, স্কুল থেকে ঝরে পড়া ও সামাজিক অস্থিরতা বেড়েছে। এ অবস্থায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকারের ব্যয় বাড়াতে হবে। করোনার ক্ষতি মোকাবেলায় বাজেটে তিন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। এর মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে জরুরি প্রয়োজন অনুযায়ী তাত্ক্ষণিকভাবে। এর বাইরে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি খাতওয়ারি পদক্ষেপ থাকতে হবে। শুধু পদক্ষেপ থাকলেই হবে না, এগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী বাস্তবায়ন করাও জরুরি। করোনাসংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে বরাদ্দ অবশ্যই বাড়াতে হবে। শুধু বরাদ্দ দিলেই হবে না, এগুলোর ব্যবহারও বাড়াতে হবে। সে বিষয়ে যথাযথ দিকনির্দেশনা থাকাও জরুরি। এর বাইরে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে খরচ বাড়াতেই হবে। যাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ‘স্পেন্ডিং প্রায়োরিটি’। এ আর্থিক সংকট করোনার জন্য ঘনীভূত হয়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদ এটাও বলছেন, এখন অর্থনীতিতে প্রণোদনা দেয়ার থেকে মানুষের কাছে অর্থ পৌঁছানো অনেক বেশি জরুরি। অর্থনীতিবিদরা তিনটি গ্রোথ ইঞ্জিনের কথা বলে থাকেন। তার মধ্যে একটি হলো বেসরকারি ভোগ। দ্বিতীয়টি, বেসরকারি ব্যয়। তৃতীয়টি হলো রফতানি। এসবই এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে বিকল্প অর্থাৎ চতুর্থটি হলো সরকারি খরচ। সরকারি খরচ মানে ‘সরকারি বিনিয়োগ’। এক্ষেত্রে ব্যয় মানে বাজারকে তেজি করার জন্য সরকারকে টাকা খরচ করতে হবে, যাতে বাজারে পণ্যের দাম বহাল থাকে। এজন্য সম্প্রসারণমূলক বাজেট দরকার। ঋণ করে অর্থাৎ বাজেটের ঘাটতি বাড়িয়ে ব্যয় করলেও সমস্যা হবে না।

স্বাভাবিক সময়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য বাজেটের যে গুরুত্ব, তা করোনা উদ্ভূত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়াটাই স্বাভাবিক। দারিদ্র্য নিরসনে প্রতি বছর বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বড় বরাদ্দ থাকে। কিন্তু এ বরাদ্দে প্রচুর অপচয় হয়। এ অপচয় রোধে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা আরো বাড়ানো যায়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত পুনরুজ্জীবিত করতে হলে হতদরিদ্র, কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্ন জনগোষ্ঠী এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিতদের সুরক্ষা দিতে বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি ও বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে বরাদ্দ দেয়া উচিত। জীবন বাঁচানোর তাগিদে প্রান্তিক মানুষের হাতে সরাসরি কিছু টাকা পৌঁছে দিতে হবে। চাহিদা দুভাবে বাড়ানো যেতে পারে। প্রথমত, মানুষের হাতে, বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের হাতে সরাসরি কিছু টাকা পৌঁছে দেয়া যেতে পারে। গ্রহীতা এ টাকা ভোগ্যপণ্যের ওপর সরাসরি খরচ করে পণ্যের চাহিদা বাড়াবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারি বিনিয়োগ বাড়লে দেশে যে শুধু পণ্যের চাহিদা বাড়বে তা নয়, সরকারি বিনিয়োগের ফলে দেশের পরিকাঠামোর উন্নতি ঘটবে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগও খানিকটা বাড়তে পারে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি, অমর্ত্য সেনসহ অনেকে বলছেন, সরকারের আর্থিক ঘাটতি কম রাখার চেষ্টা করার কোনো প্রয়োজন নেই, মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছাতে হবে। হতদরিদ্র, কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত জনগণকে সুরক্ষা দিতে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি ও বাজারে মুদ্রা সরবরাহের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করছে বিশ্বের অন্যান্য দেশ।

সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজ সবার জন্য বলে দাবি করা হলেও সমতলে কিংবা পাহাড়ে, প্রান্তিক কিংবা মূলধারার অনেক দরিদ্র মানুষ যে এ সহায়তা পায়নি, তা গণমাধ্যমের অনুসন্ধানেও এসেছে। করোনা মহামারীজনিত লকডাউন এবং অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে দরিদ্র আরো দরিদ্র হয়েছে, দারিদ্র্য কাটিয়ে ওঠা অনেকেও আবার দরিদ্র হয়ে সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে আছে। বিশেষত পাহাড় ও সমতলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অবস্থা আরো শোচনীয়ই হওয়ার কথা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মহামারী চলাকালে দরিদ্রদের কল্যাণে সরকারি কৌশল নির্ধারণের বিষয়টি ফের ভাবনার প্রয়োজন। করোনার আগে যখন জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২১.৮ শতাংশ তখন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত জেলাগুলোতে তা ছিল ৬০ শতাংশের ওপর। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগোষ্ঠীর গড় আয় জাতীয় গড় থেকে কম। সমতলের দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কার্যত ভূমিহীন। পার্বত্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মানুষের ভূমি অধিকার বলে তেমন কিছুই নেই। বনভূমি-কৃষিজমি-জলাভূমির নির্বিচার অধিগ্রহণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এমনিতেই তাদের জীবন ও জীবিকা সংকটাপন্ন, যা করোনাকালে বহুগুণ বেড়েছে। তাই তাদের জন্য স্বতন্ত্র প্রণোদনা প্যাকেজ ও রেশনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সরকারের উচিত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন করে আর্থিক প্রণোদনা এবং খাদ্যসহায়তা প্রকল্প শুরু করা এবং সে সহায়তা যেন সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে তা নিশ্চিত করা। উচিত হবে, আসন্ন বাজেটেও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট ও বর্ধিত বরাদ্দের পরিকল্পনা ঠিক করে রাখা। বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতির প্রতিকারে স্থানীয় প্রশাসন ও এনজিওগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি মধ্যমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার পরামর্শ দিয়েছেন।

অনলাইন বৈঠকে অংশগ্রহণকারী আলোচকরা কিছু সুপারিশও তুলে ধরেছেন। তারা বলেছেন, শোষণ-বঞ্চনা-দারিদ্র্য-প্রান্তিকতার নিরন্তর শিকার ক্ষুদে পারিবারিক কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে, তাদের ক্ষেত্রে গড় উন্নয়ন বরাদ্দ জাতীয় উন্নয়ন বরাদ্দের চলমান গড় থেকে অন্তত দ্বিগুণ বেশি হওয়া উচিত। পাশাপাশি যেসব প্রান্তিক গ্রামীণ ভূমিহীন, খামারি, কুটির শিল্প ও ক্ষুদ্র্র অকৃষিকাজে নিয়োজিত নারী কভিড-১৯ সংকটের শিকার হয়ে দুরবস্থায় রয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে। নারী কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন ও স্বীকৃতি এবং তাদের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে। আগামী বাজেট ঘোষণা ও বাস্তবায়নে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে বৈকি।