দেশে মজুদকৃত গ্যাস শেষ হয়ে আসছে। ফলে অনেক দিন থেকেই চাহিদামাফিক গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে না। তাই অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। উপরন্তু শিল্প ও কল-কারখানায়ও রেশনিং করা হয়েছে। এ অবস্থায় গ্যাসের বিদ্যুৎকেন্দ্রে তেল ও এলএনজি ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু তেল, এলএনজি ও কয়লার মূল্য ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে। তাতে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। এমন অবস্থার মধ্যে গ্যাসের সংস্থান না করেই আরো সাড়ে আট হাজার মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরই মধ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে সাতটির আর বাকি তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সমীক্ষার কাজ চলমান। যেখানে বিদ্যমান গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্ধেকের বেশি সক্ষমতার জ্বালানি সংস্থান করা যাচ্ছে না, সেখানে গ্যাসকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ পরিকল্পনা যৌক্তিক নয়। জ্বালানির বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণপূর্বক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। নতুন করে স্থানীয় গ্যাসের রিজার্ভ আবিষ্কৃত না হলে এ ধরনের পরিকল্পনা হবে আত্মঘাতী, যেমনটি ঘটেছে আমদানিনির্ভর জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনায়।

গ্যাসের বর্তমান সংকট মোকাবেলায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থা আরো নাজুক হওয়ার যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের কারণে গ্যাসের দাম আকাশচুম্বীর পাশাপাশি সরবরাহে রয়েছে চরম ঘাটতি। ইউরোপের মতো উন্নত দেশগুলো হন্যে হয়ে গ্যাসের তালাশ করছে। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলোর উৎপাদন দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ২০২৩ সাল নাগাদ গ্যাস উৎপাদনে বড় ধরনের ধ্বস নামতে পারে বলে শঙ্কা করা হচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও অনেক ক্ষীণ। দেশীয় উৎস থেকে সামান্য পরিমাণে গ্যাসের জোগান বাড়াবে তা দিয়ে বর্তমান সংকট সামাল দেয়া কঠিন পড়বে। তার পরও কেন নতুন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস দিতে পেট্রোবাংলা চুক্তি করতে চাইছে না। কারণ তারা গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা দেখতে পাচ্ছে না। কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস দেয়ার চুক্তি করতে পেট্রোবাংলাকে চাপ অব্যাহত রেখেছে। অতীত থেকে ধারণা করা হচ্ছে হয়তো প্রভাবশালীদের চাপে গ্যাস সরবরাহ চুক্তি হয়েই যাবে। কিন্তু আদৌ কি গ্যাস সরবরাহ হবে, নাকি আগেরগুলোর মতোই বসে বসে ক্যাপাসিটি চার্জ তোলার জন্য এমন পাতা ফাঁদে পা দিচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বেসরকারি মালিক যেকোনোভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে পারলেই হয়। এরপর গ্যাস দিতে না পারার দায় সরকারের কাঁধে চাপিয়ে বসে বসে ডলার গুনতে থাকবে। যেভাবে এখন অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। যে কারণে লাফিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অনেক কাজ হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু সর্বত্র সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকৃত সুফল ঘরে তুলতে পারছে না। দেখা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়ে বসে আছে, সঞ্চালন লাইনের অভাবে (পায়রা) বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে মাসে মাসে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। আবার লাইন নির্মাণ করে বসে রয়েছে (মাতারবাড়ী) বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোনো হদিস নেই। কয়েক বছরে ধরেই বলা হচ্ছিল, সঞ্চালন লাইনের কারণে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে কেন সমন্বয় করা গেল না। এর দায় কার! দায়ী কাউকে কি কোনো শাস্তি দেয়া হয়েছে, তার নজির নেই।

দেশে উৎপাদিত গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ সরবরাহ করা হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। এছাড়া সার কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গৃহস্থালি (আবাসিক), সিএনজি এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গ্যাস ব্যবহার করে। এ অবস্থায় গ্যাস খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত। বিষয়টি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) একটি প্রতিবেদনেও উঠে এসেছিল। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে গ্যাস খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছিল, দেশে গ্যাসের চাহিদার সঙ্গে উৎপাদনের বড় ধরনের ফাঁরাক রয়েছে, যা নিরসনে উদ্যোগ নেয়া উচিত। অভিযোগ রয়েছে, দেশে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুদ থাকলেও তা উত্তোলনে নেয়া হচ্ছে না কার্যকর উদ্যোগ। গ্যাস সংকট নিরসনে গড়িমসি করলে জনদুর্ভোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে আসবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর অনাবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র পড়ে থাকলেও নোয়াখালীর সুন্দলপুরে মাঝারি মানের একটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য নেই। গ্যাস সংকট নিরসনে উৎপাদন বৃদ্ধির যেকোনো বিকল্প নেই, তা বলাই বাহুল্য। সরকার অবশ্য দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে জোর প্রচেষ্টা শুরু করেছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সাল নাগাদ দেশীয় কূপ থেকে অন্তত ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করার পরিকল্পনার পাশাপাশি উৎপাদন বৃদ্ধিকল্পে বাপেক্সের হাতে দীর্ঘমেয়াদি আরো বেশকিছু প্রকল্প রয়েছে। এক্ষেত্রে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও আবিষ্কারে ত্রি মাত্রিক সার্ভে সম্পন্ন করে প্রয়োজনীয়সংখ্যক কূপ খনন করা হলে সুফল পাওয়া যেতে পারে।

বিদ্যুৎ খাতের যে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, সেখানেও সিদ্ধান্তহীনতা বিদ্যমান। একবার উত্তরে ছুটছে, কিছুদূর যাওয়ার পর মনে হলো দিক ভুল হয়েছে ঠিক বিপরীত দিকে ছোটা শুরু। প্রথমে বলা হলো, গ্যাস ফুরিয়ে আসছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা হবে প্রধান উৎস। রিভাইস করে বলা হলো, দেশীয় কয়লা তোলা হবে না, আমদানিনির্ভর কয়লা হবে প্রধান উপজীব্য। যখন কয়লা নিয়ে বিশ্বব্যাপী নেতিবাচক প্রচারণা, তখন বাংলাদেশ এক লাফে কয়লা থেকে বেরিয়ে এলএনজির পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতাকে কখনো বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এখনো বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় না নিয়েই নতুন করে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে, যা কাম্য নয়। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে দীর্ঘদিন অনুসন্ধান না থাকায় আমদানি ছাড়া এখন আর কোনো বিকল্প নেই। দেশে যে হারে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে এবং জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের যে চাহিদা বেড়েই চলেছে, তাতে সহজ হিসাব হলো আমদানি করা। তবে আমদানিতে অতিমাত্রায় নির্ভর হয়ে পড়লে দেশের জ্বালানি খাত বিপাকে পড়বে। পাশাপাশি বিশাল সম্পদ বছরের পর বছর অনাবিষ্কৃতই থেকে যাবে।

কয়েক বছর ধরেই গ্যাস সংকটের কথা উঠলেই আমদানির কথা বলে আসছে পেট্রোবাংলা। আমদানিকে যেভাবে সামনে আনা হয়েছে বাস্তবতা মোটেই অনুকূলে নয়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট) ১ হাজার এমএমসিএফডি এলএনজি আমদানি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এই এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা ছিল ২০১৪ সালে। বাস্তবায়ন হতে আর পাঁচ বছর বেশি সময় লেগে যায়, ২০১৮ সালের আগস্টে প্রথম ইউনিট ৫০০ এমএমসিএফডি আনতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয় ইউনিট এসেছে ২০১৯ সালের এপ্রিলে। সাগর উত্তাল হলেই সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এলএনজি আমদানি বাড়াতে মাতারবাড়ীতে ১ হাজার এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন ল্যান্ডবেজড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা। এখনো টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করা যায়নি। অন্যদিকে মাতারবাড়ী ও পায়রায় পৃথক দুটি এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, সেগুলো এখন কাগজে সীমাবদ্ধ। চুক্তির পর ১৮ মাসের অধিক সময় প্রয়োজন পড়বে। অর্থাৎ ঘাটতি বেড়ে গেলেও বাড়তি এলএনজি আমদানির ‍পথ প্রায় বন্ধ। এর সঙ্গে রয়েছে অস্থিতিশীল আন্তর্জাতিক বাজারদরের ইস্যু।

বাংলাদেশ ভূখণ্ডে স্বাধীনতার পর মাত্র ৬৮টি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে, ত্রিপুরা তার স্বল্প আয়তনে কূপ খনন করেছে ১৬০টি। ত্রিপুরা ১৬০টি কূপ খনন করে মাত্র ১১টি গ্যাসফিল্ড আবিষ্কার করেছে। বাংলাদেশে গত ১১০ বছরে মাত্র ৯৫টি কূপ খননের মাধ্যমে ২৮টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে। বাংলাদেশের সফলতার হার উচ্চ হলেও এখন তিমিরেই রয়ে গিয়েছে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান। ১৯৯৫ সালের জ্বালানি নীতিমালায় বছরে চারটি অনুসন্ধান কূপ খননের কথা বলা হলেও কোনো সরকারই তা মেনে চলেনি। বাংলাদেশের প্রমাণিত রিজার্ভ ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। অন্যদিকে ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ ২ হাজার এমএমসিএফডি আমদানি করতে পারবে। ইউরোপের যে অবস্থা আমরা ওদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারব না। এখনই গ্যাস অনুসন্ধানে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত। বিশ্ব জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে এলএনজিনির্ভর হওয়ার চরম ঝুঁকিপুর্ণ হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ও এলএনজি ত্যাগ করে তদস্থলে দেশীয় গ্যাসভিত্তিক করতে হবে। সেজন্য দেশের আবিষ্কৃত সব গ্যাস উত্তোলন ও ব্যবহার এবং নতুন গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। খবরে প্রকাশ, হাইড্রোজেন আফ্রিকার জ্বালানি খাতে অভ্যুত্থান ঘটাতে চলেছে। ইউরোপেও হাইড্রোজেন প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বর্তমানে বিভিন্ন দেশে ১২টি হাইড্রোজেন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এছাড়া পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে আরো কিছু প্রকল্প। হাইড্রোজেন সাধারণত প্রাকৃতিক গ্যাস বা পানির অণু থেকে সংগ্রহ করা হয়। ইলেক্ট্রোলাইসিস নামে পরিচিত একটি প্রক্রিয়ায় এটি উৎপাদন করা হয়।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার ‘স্পট মার্কেট’ থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ করে দেয়ার কারণেই মূলত এ সংকট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলার সংকট। বস্তুত ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ডলার সংকটের কারণে এলএনজি আমদানি করতে পারছে না জ্বালানি বিভাগ। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, গ্যাস সংকটের কারণে সম্প্রতি প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যেতে পারেনি, যে কারণে দেশব্যাপী লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়েছে। যদিও দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস আমদানিসংক্রান্ত যেসব চুক্তি রয়েছে, তা থেকে আপাতত গ্যাস আমদানি অব্যাহত রেখে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে জ্বালানি বিভাগ, তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে কিংবা দীর্ঘমেয়াদি হলে এ সংকট দিন দিন বাড়বে, যা বলাই বাহুল্য। এ প্রেক্ষাপটে গ্যাস সংকট আরো প্রকট হওয়ার আগেই সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনাকে নতুন করে সাজাতে হবে।