ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় বলতেই আমরা বুঝি, এ স্থানের সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের শিক্ষিত সমাজ ও এর শিক্ষার্থীদের একটা আদর্শিক সম্পর্ক, যা একটা জাতির ‘শিক্ষা ও সংস্কৃতি’র মান তুলে ধরে। সে অর্থে রাষ্ট্র বা সমাজের শিক্ষক এবং সমাজকেও অনেকটাই চেনা যায়।

শিক্ষক শুধু শিক্ষার্থীর শিক্ষক নয়, তিনি সমাজ ও জাতির শিক্ষক। কারণ শিক্ষকের কাছ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষার্থীরা সমাজ এবং জাতির কাণ্ডারি হিসেবে তার ঝাণ্ডা বহন করে। শিক্ষার্থীরাই আগামীকালের সমাজ নির্মাতা, রাষ্ট্রের কর্ণধার ও দেশের পরিচালক। এছাড়া সমাজের অনেক মানুষ অনেক সময় বিভিন্ন বিষয় সৎ এবং উপযুক্ত পরামর্শের জন্য শিক্ষকদের শরণাপন্ন হয়। এসব দিক থেকে বিবেচনা করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও সুরাজনৈতিক দায়িত্ব অপরিসীম।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান তার একটা রচনায় বলেছিলেন, ‘শান্তির সংজ্ঞায়ন: ব্যক্তি, সমাজ, দেশ ও পৃথিবীর আলোকে শান্তি এবং তাদের আন্তঃসম্পর্ক’ এ নামের রচনায় লিখেছেন,  ‘সকল জীবের প্রথম চাহিদা শান্তি। মানব জীবনেরও প্রথম দাবি শান্তি। জীবন শান্তির জন্য। জীবনের সকল অভাব পূরণ করার লক্ষ্যই হলো শান্তি নিশ্চিতকরণ। অন্য কথায় বলা যায়, জীবনের জন্য যা কিছু প্রয়োজন হয় তা শান্তিবিধানের জন্যই হয়ে থাকে। জীবনের চাহিদা স্থিতিশীলতা। এ গতিশীলতাই শান্তি। জীবনের চাহিদা ভোগ। এ ভোগই শান্তি। জীবনের চাহিদা, অজানাকে জানা, এটাই শান্তি। জীবনের চাহিদা, পৃথিবীকে ঘুরে দেখা, এ দেখাই শান্তি। জীবনের চাহিদা, স্নেহ-মায়া-মমতা-ভালোবাসা পাওয়া। এগুলোই শান্তি।’

এ শান্তির পথ কোনটা হবে, কীভাবে তৈরি হবে, যারা সমাজে আমরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের একটু সৌভাগ্য অর্জন করি, এটা তাদের কাছ থেকেই জাতি এবং সমাজের শেখার কথা। এ শিক্ষার একটা কেন্দ্রস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ডক্টর আন্দালিব রাশদী তার, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস ও স্মৃতি’ প্রকাশিত গ্রন্থে পঞ্চাশের দশকের একজন শিক্ষক এ জি স্টকের কথা বলতে গিয়ে লেখেন, (১৯৪৭-৫১)  একদিনও অসুস্থ হননি, ধর্মঘটের দিনও অনুপস্থিত থাকেননি ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক এজি জেরোলডিন স্টক। তাকে নিয়ে তার ছাত্রছাত্রী ও সহকর্মীরা কমই লিখেছেন।

চল্লিশের দশকের শেষ দিকের ছাত্র জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী তাকে স্মরণ করেছেন, ‘দেশ বিভাগের অল্প কিছুদিন পূর্বে এসে যোগ দিয়েছেন এজি স্টক, মধ্য ৪০ বয়সী, মধ্যম উচ্চতার ও হালকা গড়নের মহিলা, মুখে এক মাতৃসুলভ হাসি, পোশাকে একটু বেখেয়ালি ভাব—সব মিলিয়ে কেমন যেন একটা জিপসি জিপসি ভাব। সদ্যঅবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. এমএন রায় এর জায়গায় এসেছেন।’ ১৯৫২ সালে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যখন ইংরেজি অনার্সের ছাত্র হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঢুকলেন তখন বিভাগের প্রধান ছিলেন এজি স্টক। তিনি ১৯৪৭ সালে যোগ দিয়েছিলেন, তবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের আগেই চলে গেছেন।

অধ্যাপক স্টকের কিছু গোপন ফাইল ঘেঁটে তত্কালীন রাষ্ট্রের গোয়েন্দা বাহিনী খুঁজে পান, এজি স্টক ’৫১ সালে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ছাত্রদের অসন্তোষ এবং সরকারবিরোধী মনোভাবের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক ছাত্রদের কোনো ন্যায্য এবং যুক্তিশীল দাবির প্রতি এখন আর সহানুভূতিশীল হন না। এটাও একটা কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এখন যতটা না শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত, তার চেয়েও বেশি অপরাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

১৯৯৮ সালে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই কনভেনশন উপলক্ষে একটা গ্রন্থ বের হয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারের সম্পাদনায়, এর প্রকাশক ছিলেন বাংলাদেশের শিপিং ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম ব্যক্তিত্ব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের সাবেক ছাত্র এবং তত্কালীন ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাইর মহাসচিব শ্রদ্ধেয় দীন মোহাম্মদ খান। বইটির নাম ‘চোখের দেখা প্রাণের কথা।’ এ স্মরণিকা গ্রন্থে অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের একটা রচনায় আছে, ‘বদলেছে তবু বদলায়নি’। স্যার লিখেছেন: ‘আমাদের কালে, পঞ্চাশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল একটি মধ্যবিত্ত প্রতিষ্ঠান। এখনো অবশ্য তাই আছে। কিন্তু পার্থক্য রয়েছে। পূর্ববঙ্গে তখন বিত্তবান বলতে তেমন কেউ ছিল না। মধ্যবিত্তই কর্তৃত্ব করত। এখন বিত্তবানরা আছে এবং তাদের ছেলেমেয়েদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ে না, যারা পড়ে তারাও মনমরা থাকে, বাইরে যেতে চায়, সুযোগ খোঁজে। না পারতে এসেছে। আমাদের সময়টা ছিল উঠবার সময়। যারা উঠবে এবং সকলেই আশা রাখত উঠবার, তারা সবাই বেশ খুশি মনে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ত। সিঁড়ি ছিল খোলা। ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয় একটা পরিত্যক্ত সম্পত্তি। শিক্ষকদের অনেকে চলে গেছেন, বা যাবেন; ছাত্ররাও বেশকিছু গেছে চলে। কিন্তু ওই সম্পত্তি পড়ে থাকেনি, সম্পত্তি পড়ে থাকে না। উঠতি মধ্যবিত্ত অতিদ্রুত নিজেকে সেখানে প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশ বিভাগের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে দালানগুলোয় শিক্ষকরা বাস করতেন, সেগুলো চলে গেল মন্ত্রীদের দখলে। জগন্নাথ হলের মিলনায়তন পরিণত হয়েছে প্রাদেশিক আইনসভার সরকারি ভবনে।’

আমার বন্ধু ড. এম এ মোমেনের এক রচনা থেকেও জেনেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী ছিলেন লীলাবতী নাগ। আমরা হয়তো এ নামের সঙ্গে পরিচিত না অনেকেই। কিন্তু ইতিহাস তো তাকে বাদ দেয়নি। জোর করে কেউ যেমন ইতিহাস হতে পারে না, একইভাবে ইচ্ছা করলেই কাউকে ইতিহাস থেকে বের করাও যায় না। লীলাবতী নাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে এমএ ভর্তি হন। ওই সময় তাকে অনেকেই প্রগতিশীল বলে দাবি করেছেন। লীলাবতী সে দলেরই একজন ছিলেন। লেখক আন্দালিব রাশদী উল্লেখ করেছেন, অনেকের মতে, লীলাবতী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী ছাত্রী হলেও, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে জীবন বোধ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকে, লীলাবতীর মধ্যে সেটা ছিল না। লীলাবতী নাগ সবসময়ই তার আচার-আচরণে একটা শালীনতা বজায় রাখতেন। তিনি সবার শ্রদ্ধা অর্জন করেন।

ক্লাসে লীলাবতী একমাত্র মেয়ে। অধ্যাপকরা লীলাবতীর এক ধরনের আনন্দ লক্ষ করতেন সেটা ছিল লীলাবতী নাগ একাগ্র চিত্তে এবং নিবিষ্ট মনে অধ্যাপকদের প্রতিটা কথা বোঝার চেষ্টা করতেন। শিক্ষা ছাড়া নারী মুক্তি অলীক স্বপ্ন থেকে যাবে, লীলাবতী বিশ্বাস করতেন। অনেক দিন অজ্ঞান অবস্থায় থাকার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী ছাত্রী, লীলাবতীর জীবনাবসান ঘটে বলে জানা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের আবাসিক হলগুলোর একটা হলের নাম লীলাবতীর নামে থাকলে এ বিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রছাত্রীও হয়তো তাকে আরো একটু চিনতে পারত।

অনেকেই বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসকদের একটা উপহার ছিল। ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে যখন বঙ্গভঙ্গ ব্যবস্থা রদ করা হয়, তখন পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মুসলমান সমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ তখন বিক্ষুব্ধ মুসলমান সমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। বঙ্গভঙ্গ রদের খেসারত হিসেবে বড়লাট তখন ঢাকায় একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন। এটাও উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে ঢাকার নবাব পরিবারের একক অবদান অনেকখানি। বিশেষ করে নবাব সলিমুল্লাহর অবদান সবচেয়ে বেশি। মুসলিম রাজনীতির বিশিষ্ট নেতা ছিলেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের কারণে ঢাকা হয়েছিল পূর্ববঙ্গ এবং আসামের রাজধানী। তখন এই নতুন রাজধানী শহরের সচিবালয়ের জন্য একটা বড় ভবন নির্মিত হয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ভবনটির নিচতলা পরিণত হয় আর্টস ফ্যাকাল্টিতে এবং দোতলা ব্যবহূত হয় মুসলমান ছাত্রদের হোস্টেল রূপে, যা মুসলিম হল নামে পরিচিতি পায়। কার্জন হলে ক্লাস হতো ঢাকা কলেজের, যা পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবনে রূপ নেয়। বর্তমান শহিদুল্লাহ হল ছিল ঢাকা কলেজের হিন্দু হোস্টেল। সাংবাদিক এবং গবেষক, মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ঢাকা কলেজের ১৮ হাজার বই নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির সূচনা হয়েছিল।

অনেকের মতে, ৮৭৭ জন ছাত্র, ৬০ শিক্ষক, তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু। প্রথম চ্যান্সেলর ছিলেন ওই সময় বাংলার গভর্নর, আরল অব রোনালডসে। বলা যেতে পারে, একেবারে শূন্য থেকে তৈরি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ এবং রচিত হয় তার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। ভারতবর্ষের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নানা গুণী-জ্ঞানী শিক্ষাবিদরা এসেছেন শিক্ষক হিসেবে।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে খ্যাতি লাভ করেছেন এমন অনেকেই তখন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্র। সব মেধাবী তরুণ গঠন করেন হল ইউনিয়ন। সেসব হল ইউনিয়নের একটা বড় কর্মসূচি থাকত বিতর্ক প্রতিযোগিতা। নীলক্ষেত এলাকাটা ছিল তখন নবাবদের বাগানবাড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ ছাত্র এমনকি শিক্ষকরাও আসতেন সাইকেলে চড়ে। সাধারণ যানবাহন হিসেবে ব্যবহার হতো ঘোড়ার গাড়ি, যা টমটম নামে পরিচিত ছিল। মুসলমান ছাত্রদের প্রধান পোশাক ছিল আলীগড়ী পাজামা, শেরওয়ানি ও রুমি টুপি। তবে কোনো কোনো মুসলমান ছাত্র ধূতি-পাঞ্জাবিও পরতেন। হিন্দু ছাত্ররা তো পরতেন। আবাসিক হলের পরিবেশ ছিল শান্ত। রাত ১০টার পরে হলের বাতি নিভিয়ে দেয়া হতো। আদব-কায়দা এবং জুনিয়র সিনিয়র ভাবটা বজায় থাকত পুরো মাত্রায়।

একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে নানা সাহিত্য পত্রিকাও বের হতো। এমনকি মধ্য সত্তর দশকে আমরাও যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, এ দিকটা তেমন চোখে পড়েনি। একসময় মুসলিম হল থেকে প্রকাশিত হতো সাহিত্যপত্র ‘পিস’। সম্পাদনা করতেন মো. শহিদুল্লাহ। জগন্নাথ হলের সাময়িকী ‘বাসন্তিকা’ তখন সম্পাদনা করতেন বুদ্ধদেব বসু। বাসন্তিকা পত্রিকায় লিখতেন, মন্মথ রায়, বুদ্ধদেব বসু, অজিত দত্ত, আশুতোষ ভট্টাচার্য প্রমুখ্য, যারা পরবর্তী পর্যায়ে বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন গৌরবের সঙ্গে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় যারা শিক্ষকতা করেছেন যেমন—সরদার ফজলুল করিম, ড. নাজমুল করিম, অধ্যাপক রওনক জাহান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, মেহের কবীর, আব্দুর রাজ্জাক, বুদ্ধদেব বসু, রমেশচন্দ্র মজুমদার, ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, আজিজুল হক, ড. মিজানুর রহমান শেলী, মোকাম্মেল হক, জোবাইদা মির্জা— এমন অনেক শিক্ষক। শিক্ষকদের আমরা ধীরে ধীরে হারিয়েছি, সেসব শূন্যস্থান পূরণ হয়েছে খুব কম। যাদের পূরণ করার কথা ছিল তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে প্রবেশ করেও বেশি দিন নিয়োজিত ছিলেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক, সরদার ফজলুল করিম স্যার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ১৯৩০ সালের পরে অধ্যাপক রাজ্জাকের সক্রিয় ভূমিকা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্র ও শিক্ষকদের সমস্যা এবং তাদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা করা। সমাধান খুঁজে বের করা।

অনেক ইতিহাসবেত্তার মতে, সে রকম দাঙ্গা বা হাঙ্গামা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে কোনো বৈরী প্রভাব ফেলতে পারেনি।তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাও ছিল না । অনেকের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন সব ধরনের সাম্প্রদায়িক কলুষমুক্ত পরিবেশ বজায় ছিল। এমনকি রোজার মাসেও আবাসিক ছাত্রদের হলে ডাইনিং রুম খোলা থাকলেও মুসলিম ছাত্ররা কোনো আগ্রাসী বা অপ্রগতিশীল আচরণ করতেন না। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্র ছিল তরুণ ও প্রগতিশীলদের নেতৃত্বাধীন।

এনসি সেনগুপ্ত সম্ভবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের প্রথম প্রভোস্ট ছিলেন। তার স্মৃতিকথায় যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতে গিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে তিনি হতাশা ব্যক্ত করেছেন, তবে সুনির্দিষ্ট হতাশার কোনো ব্যাখ্যা এনসি সেনগুপ্ত দেননি। জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট হিসেবে তার স্মৃতি অনেক মধুর বলেছেন। এনসি দত্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগেই এখানকার আইনের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগপত্র পান। সে পদের সঙ্গে তাকে জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট হিসেবেও দায়িত্ব নেয়ার কথা বলা হয়েছিল। এ কাজের জন্য তাকে বিনা ভাড়ায় বাড়ি এবং মাসিক আরো দেড়শ টাকা ভাতা দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

এনসি সেনগুপ্তকে জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট হিসেবে বাড়তি ভাতা দেয়ার কথা বলা হলে সেটা তিনি গ্রহণ করতে অস্বীকার করে বলেন, এ টাকাটা যেন হলের দরিদ্র ছাত্রদের কল্যাণে ব্যবহার করা হয়। এনসি সেনগুপ্ত বলেন, টাকাটা হলের গরিব ছাত্রদের বৃত্তি হিসেবে দেয়া হোক। এ রকম শিক্ষক এবং গুরুজন অথবা অভিভাবক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কম দেখেছে বলা যায়। ‘হঠাৎ মনের মধ্যে একটা প্রবল ধাক্কা খেলাম। আরে সব যে একেবারে সমভূমি হয়ে গেছে। ১০ নম্বর বাংলো সম্পূর্ণ উধাও।’ কথাগুলো লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রী খোদেজা খাতুন তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে স্মৃতিচারণায়। খোদেজা খাতুন লিখেছেন, তার মনের মধ্যে ছায়াছবির মতো জাগ্রত হলো ১০ নম্বর বাংলো যেখানে তিনি আবাসিক ছাত্র ছিলেন।

১৯৩৫-৩৯ পর্যন্ত খোদেজা খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। ওই সময় সেই বাংলোয় খোদেজা খাতুন থাকতেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীসংখ্যা বিশেষ করে আবাসিক ছাত্রীসংখ্যা খুবই নগণ্য ছিল, কেবল ছাত্রীদের জন্য কোনো আবাসিক হল ছিল না তাই। ছাত্রদের জন্য মাত্র তিনটি হল ছিল—ঢাকা হল, সলিমুল্লাহ হল এবং জগন্নাথ হল। ছাত্রীরা তখন নিজেদের সুবিধামতো যেকোনো হলে সংযুক্ত হতে পারত। আবাসিক ছাত্রীদের বেলায়ও তাই। তবে তারা অবস্থান করত ওই ১০ নম্বর বাংলোয় যার নাম ছিল, ‘ইউনিভার্সিটি উইমেন্স রেসিডেন্স’। তখন আবাসিক ছাত্রীসংখ্যা ছিল আটজন, পরে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ জনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটা ক্লাসে সর্বমোট ৫০ জনের কম ছাত্রী পড়ত। [চলবে]

 

মাহমুদ রেজা চৌধুরী: সমাজ ও রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র (১৯৭৬-৮১)