দেশে চালের উৎপাদন বাড়েনি, এদিকে শুল্ক ছাড় দেয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে চাল আমদানি করা হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা আগামী বছর খাদ্য সংকটের যে আভাস দিয়েছেন, সেটি মোকাবেলা করতে হলে চালের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা চাল আমদানি করার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এ কারণে দেশে গত চার মাসে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে চাল আমদানি হয়নি। অথচ চাল আমদানি শুল্ক সাড়ে ৬২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পরও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা চাল আমদানি করছেন না। তাছাড়া প্রতিবেশী দেশ ভারতে চালের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, বাজারে চালের এখন চাহিদা নেই। এজন্য তারা চাল আমদানিতে উৎসাহ পাচ্ছেন না, কিন্তু আমাদের দেশের চাল উৎপাদনের রেকর্ড বলছে ভিন্ন কথা। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) সূত্রমতে, ২০২১-২২ বিপণন বর্ষে দেশে ১ কোটি ১৬ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে ৩ কোটি ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়, কিন্তু ২০২২-২৩-এ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ১ কোটি ১৫ লাখ হেক্টর জমিতে মোট ৩ কোটি ৫৬ লাখ ৫০ হাজার টন চাল উৎপাদন হবে। অর্থাৎ পূর্বাভাস অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় প্রায় দুই লাখ টন চাল কম উৎপাদন হতে পারে। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় চালের জোগান নিশ্চিত করতে হলে আমদানি করে ঘাটতি মেটাতে হবে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা এ কাজটিই করতে চাচ্ছেন না।
এছাড়া গত ১ বছরে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারিভাবে চালের আমদানিতে দুই দফায় প্রায় ৪৭ শতাংশ শুল্ক ছাড় দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে চাল ব্যবসায়ীরা যেন সহজে চাল আমদানি করতে পারেন, সরকারের পক্ষ থেকে সেভাবে প্রণোদনা দেয়া হলেও ব্যবসায়ীরা কেন চাল আমদানি করছেন না সেটি এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা বাজারে চালের সংকট দেখিয়ে মূল্যবৃদ্ধি করে অতিরিক্ত আয় করার ইচ্ছা লালন করছেন কিনা, সেটিও যাচাই করা উচিত। কেননা এর আগে চাল, চিনি ও তেলের ক্ষেত্রে এ অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। তাই ব্যবসায়ীরা যেন আবারো মজুদ করে চাল সংকটের কৃত্রিম অজুহাত না দেখাতে পারেন সেদিকে সরকারের কঠোর মনোযোগ প্রয়োজন।
প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে চাল আমদানি করা হলেও সে দেশে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন ভারতের চাল বিক্রি করে ব্যবসায়ীদের লোকসানে পড়তে হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ডলারের বিনিময় হার ৮৬ টাকা থাকার সময়েই এ লোকসান হয়েছে। সেখানে এখন ডলারের দাম ১০৬-১০৭ টাকা। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই ভারত থেকে চাল আমদানি করার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা আগ্রহ পাচ্ছেন না।
এখন অন্য যেসব দেশ থেকে চাল আমদানি করা হতো, সেসব দেশ থেকে তো চাল আমদানি অব্যাহত রাখা দরকার। কারণ বর্তমানে ডলারের মূল্যও সহনীয় পর্যায়ে আসতে শুরু করেছে। তাছাড়া প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য আমদানি করার জন্য খাদ্য অধিদপ্তর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে একাধিক এলসি খুলেছে। সে হিসেবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর চাল আমদানিতে অনীহার বিষয়টির যৌক্তিকতা যাচাই করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
আর প্রতিবেশী দেশ ভারত চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এ যুক্তি দেখিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমাদের অবশ্যই বিকল্প বাজার থেকে চাল আমদানি করে চালের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করতে হবে। আর চাল উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টি দীর্ঘ সময়ের একটি ব্যাপার। তাই চাল উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় করণীয় নির্ধারণের পাশাপাশি বর্তমান সময়ে চাল আমদানি স্বাভাবিক রাখার জন্য আশু করণীয় নির্ধারণে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের যেন লোকসান না হয় এবং ব্যবসায়ীরা যেন চাল মজুদ করে জনগণকে বিপদে না ফেলতে পারেন সেটিও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় একটি দেশ। সে হিসেবে ধান উত্তোলনের মৌসুমের সময় চাল আমদানি করা হলে ব্যবসায়ীদের লোকসানে পড়তে হবে, যা আমদানীকৃত ভারতীয় চালের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছে। তাই ব্যবসায়ীরা যেন চাল আমদানি করে লোকসানে না পড়েন সেটি বিবেচনা করতে হবে।
বর্তমানে সরকার ওএমএসের মাধ্যমে ৩০ টাকা কেজি দরে এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১৫ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করছে। এছাড়া বিভিন্ন মিলে সরকার নজরদারি বৃদ্ধি করায় তারা মজুদকৃত চাল বাজারে ছেড়ে দেয়ায় চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আছে। যেহেতু আমাদের চালের উৎপাদনের ক্ষেত্রে ঘাটতির পূর্বাভাস রয়েছে, সে হিসেবে অবশ্যই আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হবে। এর আগে ২০১৭ সালে দেশে হাওরে আগাম পানি চলে আসায় ফসলহানি ও বন্যার কারণে চাল উৎপাদন কম হয়েছিল। তখন শুল্ক তুলে নিয়ে সরকারকে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করতে হয়।
চাল উৎপাদনে সরকার দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ বললেও যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের সূত্রমতে বাংলাদেশ এখন বড় আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। শীর্ষ চাল আমদানিকারক দেশের তালিকায় বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। সে হিসেবে বর্তমানে বাজারে চালের সংকট না দেখা গেলেও পূর্বাভাস অনুযায়ী চাল কম উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকায় আমাদের অবশ্যই চাল আমদানি করতে হবে।
ভারতের কাছ থেকে পরিবহন সুবিধার কারণে এতদিন সহজে চাল আমদানি করা গেলেও বর্তমানে দেশটিতে চালের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চাল আমদানি করায় উৎসাহী হচ্ছে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারিভাবে ভারতসহ মিয়ানমার, ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ড থেকে ৫ লাখ ৩০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে।
আমরা বুঝতেই পারছি বর্তমান সময়ে চালের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। তবে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে চাল আমদানি করা যাচ্ছে না—এমনটি বলে ব্যবসায়ীরা যেন চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারেন সেদিকে সরকারের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। আবার চাল আমদানির ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ওপর দায় না চাপিয়ে সরকারকে উদ্যোগী হয়ে টার্গেটকৃত চাল আমদানির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। মোট কথা, চালের বাজার যেন নিয়ন্ত্রণহীন না হয়ে পড়ে, সেদিকে সরকারকে কঠোরভাবে নজর রাখতে হবে। সে সঙ্গে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটকে অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় চাল উৎপাদনের বিষয়ে ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারি উদ্যোগ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকার ভিত্তিতে দেশের চালের বাজার স্থিতিশীল থাকবে এবং সম্মিলিত এ প্রয়াসের ভিত্তিতেই দেশ খাদ্য সংকটে ভুগবে না এটিই আমাদের প্রত্যাশা।










