শাব্দিক অর্থে স্বজনপ্রীতির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Nepotism যা এসেছে ইতালি শব্দ Nepotismo থেকে। আবার Nepotismo এসেছে ল্যাটিন মূল শব্দ Nepos থেকে যার অর্থ হচ্ছে ‘ভাগ্নে’ ‘নাতি-নাতনি’ বা আত্মীয়তার বন্ধন। শব্দগত অর্থে Nepotism এর মাঝেই স্বজনপ্রীতির লোকচুরি লুকিয়ে আছে। আর এই স্বজনপ্রীতির জন্য শত মেধার মৃত্যু হয়ে যায় প্রকাশ্যে, নির্বাক, অগোচরে। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে প্রাচীনকালে স্বজনপ্রীতির প্রভাব বেশি ছিল না। তখন সবাই সবার জন্য ছিল, একে অপরের সহযোগিতায় জীবন বাঁচতো। তারা খাদ্য যোগাড় করতো পেটের তাগিদে বাঁচার জন্য। ধীরে ধীরে মানুষ সভ্য হতে থাকে এবং সভ্যতার বিকাশ শুরু হয়। প্রাচীন সমাজ এবং দাস সমাজের মানুষ যদিও বর্বর ছিল কিন্তু স্বজনপ্রীতির উপস্থিতি ছিল খুবই কম। মধ্যযুগের সামন্ত সমাজ ব্যবস্থার শুরু থেকে ১৭ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত স্বজনপ্রীতির উৎপত্তি ও বিকাশ কাল হিসেবে ধরা হয়।

মধ্যযুগে ক্যাথলিক পোপরা শাসনতন্ত্রের মূলে ছিল। তারাই মূলত প্রকৃত শাসনকার্য পরিচালনা করতো । রাজা নামে মাত্র প্রধান ছিলেন। সেই সময় তারাই প্রকৃত শাসক হয়ে উঠেছিল। একদিকে পোপরা ছিল ধর্মগুরু অন্যদিকে ছিল অভিজাত (Elite) শ্রেণীর লোক। সেই সময়ে কিছু ক্যাথলিক পোপ সতীত্ব ব্রত পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা বিবাহ বর্জন করে শুধুমাত্র ধর্ম-কর্মে মন নিবেশ করে। যদিও এই সতীত্ব ব্রত পালনের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতা লাভ। এই ব্রত পালন ও বিবাহ না করায় তাদের নিজস্ব কোনো বৈধ সন্তান ছিল না। তাদের কোন বৈধ সন্তান না থাকায় আবার অন্যদিকে ধর্মগুরু হওয়ার কারণে অবৈধ সন্তান কে স্বীকৃতি না দেয়ায় তাদের পরবর্তী শাসককে হবে তা অনিশ্চিত ছিল। এই সমস্যা সমাধানে বিশপ ও ক্যাথলিক ধর্মগুরুরা তাদের ভগ্নিপুত্র এবং ভ্রাতৃপুত্রদের নির্বাচন করতো। তারা প্রায়ই তাদের ভগ্নিপুত্র অথবা আত্মীয়-স্বজনদের পছন্দমতো পথ দিয়ে থাকতেন। শুধুমাত্র তাদের আত্মীয়-স্বজনরাই শাসনকার্য অংশ নিতে পারতো। তাই এর সূত্রপাত রাজনীতি দিয়ে শুরু হয়েছিল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বজনপ্রীতি বলতে শুধু নিজের মানুষের প্রতি ভালোবাসা বুঝায়, সকলের যোগ্যতা অনুযায়ী প্রাপ্য না দিয়ে নিজের ভালোবাসার মানুষকেই প্রাপ্যটা বেশী দেয়াকে বুঝায়। অর্থাৎ কোনও একটি পেশাতে অনেক যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্বেও নিজের পরিচিতি ও জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে নিজের কাছের লোকের সুবিধা দেয়া। কারণ স্বজন বলে কথা। স্বজনকে যেমন সবাই ভালোবাসা দিতে চায় আবার তাদের কাছে ভালোবাসা পেতেও চায়। এ ভালোবাসা নিজের বাড়িতে বা স্বজনের বাড়িতেই কেবল গ্রহণীয়। তবে নিজের পছন্দসই লোক নিয়োগ দেয়া অনেক সময় স্বজনপ্রীতির মধ্যে পরে না। বর্তমানে প্রাইভেট কোম্পানিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কর্তা ব্যক্তিরা সাধারণত নিজস্ব রেফারেন্সের মাধ্যমেই কর্মী নিয়োগ করতে পছন্দ করে। নিজস্ব রেফারেন্সের মাধ্যমে নিয়োগ হলে নিজেদের মধ্যে বুঝাপড়া ভালো হয় যার ফলশ্রুতিতে কাজের গতি বাড়ার সাথে সাথে প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধি পায়। আমার নাতিদীর্ঘ পেশাগত জীবনেও রেফারেন্সের মাধ্যমে এমন অনেক লোক নিয়োগ করেছিলাম যারা শুধু পারফরমেন্স না শিষ্টাচারেও অপূর্ব। এমন একজনের কথা আমার না বললেই নয়। আমার পূর্বতন কোম্পানির ঊর্ধ্বতন নির্বাহীর এক আত্মীয়কে আমি আই টি সেকশনে এন্ট্রি লেভেলে নিয়োগ দেই। তাকে নিয়োগ দেয়ার পর তার বস্ ভগরে গিয়েছিল। তার বস ভেবেছিল, সে কোন কাজকর্ম করবে না বরং স্পাই হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু সেই কোম্পানির দীর্ঘ সময়ে আমি তাকে দেখেছি একজন দক্ষ, ভদ্র এবং সৎ একজন কর্মী। তার আত্মীয় যে কোম্পানির ঊর্ধ্বতন একজন তার বিন্দুমাত্র ভাব তার মধ্যে ছিলো না। আমার মনে হয়েছে তার আত্মীয় থাকায় সে আরও সংযত হয়েছে। তাই রেফারেন্সর মাধ্যমে যোগদানের অর্থ এই নয় যে কোনো বিষয়ে তাদের সুবিধা প্রদান করতে হবে। প্রায় প্রত্যেক অধস্তন সহকর্মী প্রত্যাশা করে তার ঊর্ধ্বতনের কাছে থেকে কিছু অসমুচিত সুবিধা আদায় করতে। 

তাই ব্যবসায়ে সহকর্মী নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সহকর্মী নির্বাচনে স্বজনপ্রীতি করলেও তারা যাতে অসমুচিত সুবিধা আদায়ের কোনো সুযোগ না নিতে পারে সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। একজন সুবিধাবাদী সহকর্মী ব্যবসায়ে শুধু অকার্যকরই নয় সে ব্যবসায়ে বয়ে আনে ক্ষতি যা ব্যবসাকে দিন দিন নামিয়ে নিয়ে যায় অনেক নিচে। এসব সুবিধাভোগীর জন্য অনেক মেধাবীরা নিজ থেকে চলে যায় আবার অনেকে যেতে বাধ্য হয়। মেধাবীদের ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে সে কোম্পানির দীর্ঘ মেয়াদী সুফল কখনো আসে না। তাই কর্মক্ষেত্র হবে সবার জন্য সমান। শুধু প্রতিযোগিতা থাকবে পারফর্মেন্সের। অনেক করপোরেট বিভিন্ন অসঙ্গতির জন্য কিছু কর্মী মানসিকভাবে ভালো থাকে আবার অনেককে অস্থির থাকতে হয়। যে কারণে তারা যেমন কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে না, তেমনি ব্যক্তি জীবনে ব্যাঘাত ঘটে তার কর্তব্য পালনে। আমরা শুনে থাকি 'স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন' তবে স্বাধীনতা রক্ষা করতে হয় নীতি দিয়ে, আর অনেক করপোরেটে চাকরি রক্ষা করতে হয় দুনীতির পরিবেশকে মেনে নিয়ে। এখানে স্বজনপ্রীতিটা দুর্নীতির প্রতিশব্দ বললে অনুচিত হবে না। কাজের জগতে এমন একটা ধারণা প্রচলিত যে, কর্মীরা  আসলে টাকার জন্য প্রতিষ্ঠানকে ছেড়ে যান না, তারা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ত্যাগ করতে চান। অনেক কর্মী আছে যারা সমমূল্যমান কোম্পানির চেয়ে বেতন কম পেলেও শুধু কাজের পরিবেশের উপর সন্তুষ্ট বিধায় কোম্পানি ছাড়তে ইচ্ছা পোষণ করে না। তাই বস বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যাই বলি না কেন তাদের স্বজনপ্রীতির মনোভাব বিসর্জন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হবে সমানপ্রীতি মনোভাব। কর্মক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি শুধু নিজের বা সুবিধাভোগীর জন্য নয় প্রতিষ্ঠানের জন্যও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এটি নিজের এবং কর্মীর উন্নয়নের পাশাপাশি  প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন এবং উন্নয়নকে প্রচন্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে। এটিতে ঊর্ধ্বতনের ম্যানেজিং ক্ষমতার দুর্বলতাও প্রকাশ পায়, যা তার নেতৃত্ব প্রদানকে ক্রমশ ব্যর্থ করে। একটি নেতার যোগ্যতার প্রভাব পরে তার পুরো দলের উপর। নেতার দর্শন, ব্যক্তিত্ব ও অভিজ্ঞতা তার পেশাগত জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নেতা হলেন একজন মানুষ যিনি  আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে একদল মানুষকে একটি নির্দিষ্ট ফলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রভাবিত করেন। এই বিষয়টি কোনও খেতাব বা প্রথাগত কর্তৃত্বের উপর নির্ভরশীল নয়।

করপোরেট এবং কর্মী ব্যবস্থাপনা একটি প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের জন্য মুখ্য ভুমিকা পালন করে। করপোরেটে কর্মী কর্মবান্ধব পরিবেশ না পেলে কর্মীর কাজ কখনো উপভোগ্য হবে না, বরং কর্মীর কাছে চাকরিটি  বিষের পেয়ালার মতো মনে হবে। যা কি'না  প্রতিষ্ঠানে এক সময় কর্মী ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। তাতে আর্থিকভাবে ক্ষতির পাশাপাশি ব্যবসায়ী সমাজে পরতে পারে নেতিবাচক প্রভাব। স্বজনপ্রীতির চকচকে পোশাকে নিজেকে বেশ সুন্দর মনে হলেও এই সৌন্দর্য বেশীদিন টিকে থাকে না। কর্মক্ষেত্র আমাদের জীবনেরই একটা অংশ। পারস্পারিক সম্পর্ক যদি মিথ্যা বা সন্দেহের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠলে ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয় তেমনি কোম্পানিকেও বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। যেখানে যতবেশী স্বজনপ্রীতি হবে সেখানে ততো হিংসা, বিদ্বেষ প্রশ্রয় পাবে এবং পারস্পারিক আস্থা ও বিশ্বাস উঠে যাবে, বাড়বে সন্দেহ। নিজেকে বাঁচাতে যেকোনো দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাবে। এভাবে এক সময় এ ধরণের অফিস থেকে মানবিক ও চারিত্রিক সব গুণাবলী মুছে যাবে। কর্মচারীরা এটিকে তাদের অনৈতিক কাজের অনুশীলনের উপযুক্ত সময় হিসাবে দেখতে পাবে, কারণ তারা বিশ্বাস করে যে তাদের কাছের বা আত্মীয় দ্বারা তাদের বিতাড়িত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একবার যদি স্বজনপ্রীতি নামক ভাইরাস কোনো প্রতিষ্ঠানে  ঢুকে তাহলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।

কিছু বড় বড় কর্মকর্তার নগ্ন প্রীতির ফলে অনেক যোগ্য লোকের ভোগান্তি হয়। বিশেষকরে যে প্রতিষ্ঠানগুলো মালিকপক্ষ সরাসরি তদারকি করে না সে সব প্রতিষ্ঠানে স্বজনপ্রীতির পরিণাম অনেক সময় ভূমিকম্পের মতো হয়। কোম্পানির মালিকপক্ষ বাধ্য হয় ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে। অনেকের চাকরি চলে যায় নিমিষে। যারা সুবিধাভোগী ছিলো তাদের অনেকেই নতুন করে চাকরি যোগাড় করতে হিমশিম খায়। এখানে অধস্তনরা যতটুকু না দায়ী, বেশী দায়ী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কারণ তাদের ব্যর্থ নেতৃত্বের কঠোর ভার অনেক দক্ষতা সম্পন্ন ভালো গুণাবলি লোকজনকেও নিতে হয়। কর্মক্ষেত্রের ওইসব নেতারা বেমালুম ভুলে যান কোম্পানিটা তার নন, তার যেমন অধিকার অন্যান্য সকল কর্মীর তেমনি অধিকার। তিনি শুধু পদাধিকার বলে কোম্পানির দেখভাল করার দায়িত্ব পেয়েছেন মাত্র।

লেখক: ব্যবস্থাপক, মানব সম্পদ ও প্রশাসন
মুন্ডিফার্মা (বাংলাদেশ) প্রাইভেট লিমিটেড