কয়েক বছর ধরে আলুর দাম কম এবং আলুচাষীরা এ নিয়ে বারবার সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ব্যর্থ হয়েছেন। করোনা পরিস্থিতিতে বেশি দাম পেয়ে এবার তারা বেজায় খুশি। পেঁয়াজ ও চালের পর বাজারে আলুর বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী, যা অস্বাভাবিক একটি বিষয়। আলুর এমন কদর আগে কখনই হয়নি। করোনায় স্বল্প আয়ের ভোক্তারা পড়েছেন মহাবিপদে। তারা একদিকে কাজ হারিয়ে পথে বসেছেন, অন্যদিকে চাল, পেঁয়াজ ও আলুর দাম বৃদ্ধিতে মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা। এ অবস্থা কীভাবে সামলাবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। সাধারণভাবে ভোক্তারা ভাবছেন পেঁয়াজ ও চাল নিয়ে ব্যবসায়ীরা এবং মিল মালিকরা যোগসাজশ করে বাজারে ডিজিটাল সিন্ডিকেট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছেন। তাদের মতো হিমাগারে আলু রাখা চাষী ও ব্যবসায়ীরা রাতারাতি ধনী হওয়ার নেশায় আলু মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারদর বাড়িয়ে দিয়েছেন। সরকার তাদের কারসাজি নিয়ন্ত্রণের জন্য হিমাগারে কেজিপ্রতি মূল্য ২৩ টাকা, পাইকারি পর্যায়ে কেজিপ্রতি ২৫ টাকা ও খুচরা বাজারে তা ৩০ টাকায় বেঁধে দিয়েছে। এই বেঁধে দেয়া দাম আবার পরিবর্তন করে যথাক্রমে ২৭, ৩০ ও ৩৫ টাকা করা হয়েছে। চাল, পেঁয়াজ ও আলু কোনোটিই বেঁধে দেয়া দামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে না। এখন বিপাকে পড়েছে ভোক্তা ও সরকার উভয়ই, তবে লাভবান হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। আসলে দাম বাড়ার বিষয়টির হিসাব কিন্তু এতটা সহজ নয়।
দেশে শাকসবজির যে মোট চাহিদা, তা রাতারতি পরিবর্তন হয় না। বিভিন্ন কারণে পরিবর্তন হয় শুধু শাকসবজির জোগানে, আর সেটির কারণেই দামের ওঠানামা দেখা যায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অন্যান্য বছর আলুর দাম কম থাকায় এবার আলু উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কম হয়েছে। করোনায় ত্রাণসামগ্রীর সঙ্গে আলু যোগ করায় জোগানে টান পড়েছে। এবার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় সাত লাখ মেট্রিক টন আলু সরবরাহ করা হয়েছে। আলু রফতানি বেড়েছে। বারবার বন্যায় শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যার কারণে আলুসহ সবজির যে মোট জোগান, সেটি মোট চাহিদার তুলনায় কমে গেছে। এ কারণে সবজির দাম বাড়বে, এটি স্বাভাবিক। বাজারে অন্যান্য সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সবজির চাহিদা পূরণে বিকল্প সবজির জন্য বাধ্য হয়ে মানুষ আলুর প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়েছে। বাজারে আলুর মোট চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এর দাম বাড়ছে। এছাড়া করোনা পরিস্থিতিতে পরিবহন ভাড়াও বেড়েছে। আর তাই আলুর দাম কেজিপ্রতি বাজারভেদে ৫৫-৬০ টাকা, যা এ দেশে আলুর জীবনে দেখা সর্বোচ্চ দাম। এখানে বলে রাখা ভালো যে দেশে আনুমানিক ৫০০টি আলু হিমাগার থাকলেও চালু আছে প্রায় ৪০০টি এবং সেখানে প্রায় ৫৫ লাখ টন আলু রাখা যায়, তবে এ বছর সেখানে ৪৫ লাখ টন আলু রাখা হয়েছিল।
সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তর তাদের কাছে থাকা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য দিয়ে জানাচ্ছে, দেশে আলু উৎপাদন বেড়েছে এবং ২০১৮-১৯ সালে উৎপাদন হয়েছে ৯৬ দশমিক ৫৫ লাখ টন, যা ২০১৭-১৮ সালের উৎপাদনের চেয়ে প্রায় ১ লাখ টন কম (০.৯২ শতাংশ কম)। ২০১৯-২০ সালের পরিমাণ সেখানে এখনো সন্নিবেশিত করা হয়নি। কৃষি সম্প্রসারণের তথ্য মোতাবেক ২০১৯-২০ সালে আলু উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৯ লাখ টন, যা তার আগের বছরের তুলনায় ১ লাখ টন বেশি। সাধারণভাবে বাজারে আলুর চাহিদা প্রায় ৮০ লাখ টন। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ কোটি ৪৮ লাখ ডলারের আলু রফতানি হয়েছে, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ৯ লাখ ডলারের কিছু বেশি। পরিমাণগত হিসাবে আলু রফতানি হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৭৬০ টন। সুতরাং তারা নিশ্চিত যে দেশে আলুর যথেষ্ট মজুদ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের কারসাজিতেই আলুর দাম বেড়েছে। আর তাই তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করে দাম বেঁধে দিয়েছে এবং বাজার তদারকি জোরদার করেছে। কিন্তু বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে আলু বিক্রি হচ্ছে না বললেই চলে। বাণিজ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনদিনের মধ্যে দাম না কমলে টিসিবির মাধ্যমে ২৫ টাকা দরে খোলাবাজারে আলু বিক্রি করা হবে। পরবর্তী সময়ে অবশ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এনে ৩৫ টাকা দরে খোলাবাজারে আলু বিক্রির কথা বলা হয়েছে।
এবার অর্থশাস্ত্রের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে আসি। আলুসহ অন্যান্য সবজির যে বাজার কাঠামো, সেটি এক ধরনের পিউর কম্পিটিটিভ মার্কেট, যেখানে বাজারে সবজির (আলুসহ) দামের ওপর সাধারণভাবে একক কোনো বিক্রেতা বা ক্রেতার কোনো ধরনের প্রভাব থাকে না। অর্থাৎ দাম বাড়াতে বা কমাতে পারে না। দাম নির্ধারণ হয় বাজারে জোগান ও চাহিদার মাধ্যমে। ধরে নিচ্ছি সরকারের বক্তব্য সঠিক। দেশে আলুর জোগান চাহিদার চেয়ে বেশি। তাহলে ব্যবসায়ীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দাম বাড়ালে ভোক্তারা আলুর ব্যবহার কমাবেন। এছাড়া দেড় মাস পরেই নতুন আলু বাজারে আসতে শুরু করবে, তাহলে কোন ভরসায় ভালো দাম পাওয়া সত্ত্বেও চাষী ও ব্যবসায়ীরা হিমাগারে আলু মজুদ রাখবেন, যা পরে অবিক্রীত থেকে যেতে পারে। দাম বাড়লে তারা হিমাগার থেকে বেশি পরিমাণে বিক্রি করবেন এবং বাজারে আলুর সরবরাহ বাড়লে দাম কমে আসবে। দেশে অসংখ্য আলুর হিমাগার রয়েছে। খুব বেশি ঝুঁকি তারা নেবেন না, কারণ আলু অবিক্রীত থাকলে পচে যাবে। সুতরাং চাষী বা ব্যবসায়ী পর্যায়ে আলু মজুদ করার বিষয়টি অর্থনৈতিক ব্যাখ্যায় টিকে না। অন্যদিকে যদি মনে করি আলু ব্যবসায়ীদের অনুমান সঠিক, তাহলে আলুর কম উৎপাদন, করোনায় সরকারিভাবে ত্রাণসামগ্রীতে (দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী জুলাই পর্যন্ত মোট ১২২.৯৮ কোটি টাকা এবং ২.১১ লাখ টন মোটা চাল বিতরণ করা হয়েছে) আলু না দেয়া হলেও স্থানীয়ভাবে অনেকে আলু কিনে ত্রাণের সঙ্গে দিয়েছেন এটা সত্য, আলু রফতানি বেড়েছে এটা ঠিক, বন্যায় অন্যান্য সবজি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে তাও ঠিক, সাধারণ ভোক্তারা আলুর প্রতি বেশি নির্ভরশীল হয়েছেন এটাও বাস্তবতা। তাই বাজারে আলুর যে জোগান, তা প্রকৃতপক্ষেই কম। ফলে দাম বাড়ছে হু-হু করে। ব্যবসায়ীদের ব্যাখ্যার সঙ্গে বাজারদর বৃদ্ধির সম্পর্ক অর্থনীতির তত্ত্বকে সমর্থন করে। তাহলে মূল সাংঘর্ষিক বিষয় দাঁড়ায় আলুর জোগান নিয়ে। জোগানের যে হিসাব দেখানো হচ্ছে, আসলে কি তা সঠিক? উৎপাদন বিষয়ে সরকারের দুই সংস্থার হিসাবের সংখ্যাগত পার্থক্য স্পষ্ট। তাহলে ব্যবসায়ীদের দোষারোপ করার আগে খাতা খুলে যোগ-বিয়োগ ঠিকভাবে করা হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা-নীরিক্ষা করা বেশি জরুরি, অন্যথায় শুধু একে অন্যকে দোষারোপ করেই যেতে হবে; যা মোটেও উন্নত দেশ বা অর্থনীতির সংস্কৃতি নয়।
তাহলে করণীয় কী? এক কথায় করণীয় বলার সুযোগ নেই। স্বপ্লমেয়াদে দ্রুত বর্ধনশীল সবজি উৎপাদনে কৃষক ভাইদের পরামর্শ দিতে হবে এবং প্রয়োজনে তাদের তাত্ক্ষণিক ভিত্তিতে বীজ, কম্পোস্ট সার ও ঋণের সুবিধা দিতে হবে, যাতে তারা বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবজি উৎপাদনে লেগে যেতে পারেন। বাড়ির আঙিনায় হয় এমন শাকসবজি চাষে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। অন্যান্য সবজি উৎপাদন বাড়লে জোগান বাড়বে। ফলে দাম কমে আসবে এবং আলু অন্যান্য সবজির কিছুটা বিকল্প হওয়ায় এর দামও সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। এরই মধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য টিসিবির মাধ্যমে খোলাবাজারে আলু বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে, যদিও সরকারের গুদামে কোনো আলু নেই। সরকারকেও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া দামেই কিনতে হবে। ফলে ভর্তুকি দিয়ে আলু বিক্রি করতে হবে। মুষ্টিমেয় অসাধু মধ্যস্বত্বভোগীর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন রোধ করা এবং সুযোগ বুঝে অনৈতিকভাবে যদি কেউ আলু মজুদ করে ভোক্তাদের বিপাকে ফেলতে চায় তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতেই হবে। আর দীর্ঘমেয়াদে যা করণীয় তা হলো, আলুর জোগান ও চাহিদা সঠিকভাবে নিরূপণ করতে হবে, যার মাধ্যমে বাজারে দাম নির্ধারণের বিষয়টি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে। বন্যা, খরা, পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং করোনার মতো যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সবজি উৎপাদন বাড়ানোর অগ্রিম পরিকল্পনা থাকতে হবে এবং দেশে একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে উৎপাদক, ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা পরস্পরের প্রতি আস্থাশীল থাকবেন, যা সারা বছর বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে। সত্যি কথা বলতে কি, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে দাম নির্ধারণ করে দেয়া, ব্যবসায়ীদের ভয়-ভীতি, ধরপাকড়, জরিমানা ইত্যাদি করে দীর্ঘমেয়াদে খুব একটা সুফল পাওয়া যায় না। বরং তাদেরকে আইনের বাধ্যবাধকতা অনুধাবন করিয়ে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে সেবামূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করা অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত।
বর্তমানে প্রচারমাধ্যম খুবই সক্রিয়, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সহজেই বাজার তথ্য পেয়ে থাকে। তবে প্রচারের ভাষা, তথ্য উপস্থাপনের প্রকৃতি ও বিশ্লেষণ সমাজের সাধারণ মানুষকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। প্রচারমাধ্যমগুলোর এ বিষয়ে বিশেষভাবে নজর দেয়া দরকার।










