শিশুরাই আগামীর রূপকার। যেকোনো জাতির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং গুরুত্ব দেয়ার বিকল্প নেই। বিশ্বায়ন ও বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার ধারণার বিস্তারের ফলে প্রতিটি শিশুর সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার ব্যাপারে রাষ্ট্রগুলোকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। গোটা বিশ্বের শিশুদের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য শিশু অধিকার সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ সনদে উল্লেখিত অধিকারগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি সদস্যদেশকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। প্রতিটি রাষ্ট্রে শিশুদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার মাধ্যমে গোটা বিশ্বের কাঙ্ক্ষিত উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব। নির্দিষ্ট কোনো দেশের শিশুরা অবহেলিত হলে গোটা বিশ্বের সামগ্রিক লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্যই শিশুদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সনদে উল্লেখিত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে বাধ্য। এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাষ্ট্রের অঙ্গীকারের মধ্যে পড়ে। এছাড়া বাংলাদেশ অন্যান্য মানবাধিকার দলিলেও স্বাক্ষরকারী দেশ। জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রায় তিন কোটিরও অধিক শিশু। তাদের বেড়ে ওঠার সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে সেটি কেবল বাংলাদেশের জন্যই চ্যালেঞ্জ নয়, বরং গোটা বিশ্বের জন্যই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এতে বিশ্বব্যাপী শিশুদের জন্য যে কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করা হয়েছে তা ব্যহত হবে। 

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের ৩১ নং ধারায় উল্লেখিত শিশুদের পর্যাপ্ত খেলাধুলা, বিনোদন, বিশ্রামসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়ার অধিকার রাষ্ট্রগুলোকে নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। কেননা এসব কর্মকাণ্ডের অনুপস্থিতিতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিকভাবে বেড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হয়। 

বাংলাদেশে অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে শহরাঞ্চলের শিশুদের সঠিক বিকাশের ক্ষেত্রগুলো সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। জনবহুল দেশ হওয়ার ফলে বাংলাদেশের নগরায়নে নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা রাখার যে জরুরি প্রয়োজন ছিল সেটিও গুরুত্ব পায়নি। ওয়ার্ল্ড ভিশনের এক রিপোর্ট অনুযায়ী জনসংখ্যার অনুপাতে ঢাকায় যেখানে ২ হাজার ৪০০ খেলার মাঠ থাকা প্রয়োজন সেখানে মাঠ রয়েছে মাত্র ২৩৫টি। আরো দুর্ভাগ্যের বিষয় শিশুদের প্রবেশাধিকার রয়েছে মাত্র ৪২টি মাঠে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে প্রবেশাধিকার থাকা মানেই যে শিশুবান্ধব তা হলফ করে বলা যায় না। খেলার মাঠ না থাকায় একদিকে শিশুরা বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে, আবার মাদক, কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এদিকে শিশুদের জন্য যে কয়টি খেলার মাঠ আছে সেগুলোতেও শিশুদের জন্য সুযোগ-সুবিধা অপ্রতুল। 

ঘটনাটি খুব বেশিদিন আগের নয়, কলাবাগানের একটি খেলার মাঠে সরকারের স্থাপনা নির্মাণের প্রতিবাদে একজন কিশোরকে তার মাসহ জেলহাজতে যেতে হয়েছিল। পুলিশি হয়রানির শিকার হয়েছিল ওই খেলার মাঠে খেলতে আসা অন্যান্য শিশুও। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে সিটি করপোরেশনের আওতাধীনে যেসব পার্ক কিংবা খেলার মাঠ রয়েছে সেগুলোয় স্থানীয় প্রভাবশালীরা হরহামেশাই বিভিন্নভাবে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। তাছাড়া সংস্কারের নামেও এ মাঠগুলো অনেক সময় বন্ধ থাকে। এ পার্ক কিংবা মাঠগুলো অনেক সময় অবৈধভাবে কনস্ট্রাকশনমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ইজারাদারদের কাছে থাকে, যার ফলে শিশুদের প্রবেশাধিকার ব্যাহত হয়। তাছাড়া বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ বিড়ি-সিগারেট বিক্রেতা ও উদ্বাস্তু লোকদের অভয়ারণ্য হচ্ছে এসব খেলার মাঠ ও পার্ক। ভেতরেও মাদকাসক্তদের মাদক সেবন চলে প্রকাশ্যেই, যেগুলো দেখার জন্য নজরদারি কম। এসব পার্ক যদিও শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত, কিন্তু সেখানে শিশুদের নিয়ে গেলে বিভিন্ন ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই ভিক্ষুকের বিড়ম্বনা অভিভাবকদের ব্রিবত করে। দেখা গেছে, তারা ভিক্ষা না পেলে শিশুদের নিয়ে বাজে মন্তব্য করে। ভ্রাম্যমাণ হকারদের অনেকেই বেলুন কিংবা শিশুদের বিভিন্ন ধরনের খেলনা নিয়ে এসেও উত্ত্যক্ত করে।

এসব পার্ক ও মাঠে বয়স কিংবা লিঙ্গভেদেও শিশু-কিশোরদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা কদাচিৎই নজরে আসে। কিংবা যতটুকু আছে এগুলো প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। মেয়েশিশুদের জন্য আলাদা কোনো খেলার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে এবং মেয়েশিশুদের জন্য খেলার মাঠে নির্ধারিত কোনো স্থানও নেই। 

শিশুদের জন্য চিত্তাকর্ষক ব্যবস্থাসম্পন্ন যে কয়েকটি বিনোদন পার্ক রয়েছে সেগুলোয় প্রবেশাধিকারের জন্য বড় অংকের টাকা খরচ করতে হয়। ফলে সাধারণ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুরা এ সুবিধাগুলো উপভোগ করতে পারে না। অথচ সরকারিভাবে কিছু বিনোদনমূলক পার্ক একটা নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে থাকা শিশুদের ন্যায্য দাবি।

অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হয়। কিন্তু বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য আলাদা করে খেলার মাঠ নেই বললেই চলে। জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য খেলার মাঠের নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ থাকলেও অনেক বছরে পার্কটি তৈরি হয়নি। সেখানে কেবল সাইনবোর্ড লাগিয়েই দায়িত্ব সারা হয়েছে। 

খেলাধুলা কীভাবে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে তার জলজ্যান্ত উদাহরণ চীন। কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর চীন খেলাধুলা ও সাঁতারের ওপর বেশ জোর দিয়েছিল। যেটি পরে জাতিগতভাবে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী দেশ ও পরিশ্রমী জাতি হিসেবে বিশ্বস্বীকৃতি পেয়েছে। 

শিশুদের সার্বিক বিকাশে নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যেন খেলাধুলার পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত হয় সেদিকে দৃষ্টি দেয়া জরুরি। একটা পরিকল্পিত নগরীর রূপরেখায় শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, ফুটপাতে নিরাপদে হাঁটার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। উন্নয়নশীল বিশ্বে পা দিতে যাওয়া দেশের রাজধানীতে কয়েক লাখ পথশিশুর উপস্থিতি কাম্য নয়। তাদের জন্যও পর্যাপ্ত খাবারদাবার, থাকার জায়গা, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের দিকে সঠিক নজর না দেয়ার কারণে শহরে অপরাধ বাড়ছে, ছিনতাই-রাহাজানি বাড়ছে, মাদকাসক্তি ও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি বিস্তৃত হচ্ছে। বসবাসযোগ্য নিরাপদ শহর তৈরি করতে চাইলে পথশিশুদের দিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে।

শিশুদের সুস্বাস্থ্য ও সুষ্ঠু মানসিক বিকাশে খেলার মাঠ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের স্বাধীন ও আত্মনির্ভর মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে খেলাধুলার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই খেলার মাঠ নিয়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা চাই। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে একদিকে যেমন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঠিক ও সম্ভাবনাময় হয়ে বেড়ে ওঠা ব্যাহত হবে, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ বাধাগ্রস্ত হবে। 

তানিয়া সুলতানা: সহকারী পরিচালক, এসওএস শিশু পল্লী