ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের নিচের তলায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ। আমরা যারা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়তাম তারা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কয়েকজন শিক্ষকের নামের সঙ্গে ভীষণভাবে পরিচিত ছিলাম। যেমন ড. মীজানুর রহমান শেলী, অধ্যাপক বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, অধ্যাপক তালুকদার মুনীরুজ্জামান। আমি ভীষণ গর্ববোধ করতাম যখন তাদের সঙ্গে ড. নাজমা চৌধুরী এবং ড. রওনক জাহান আপার নামটাও উঠে আসত। সে জায়গাটা থেকে আমাদের কাছে রওনক আপা, নাজমা আপা ছিলেন আইকনিক ব্যক্তিত্ব।
রওনক আপার সঙ্গে প্রথম পরিচিত হই, ‘পাকিস্তান: ফেইলিউর ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’ বইটির মাধ্যমে। শিক্ষার্থী হিসেবে বইটি আমরা পড়েছি। পড়তে গিয়ে উপলব্ধি করেছি তিনি চমত্কার ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে অধ্যয়ন সূত্রে বৈদেশিক নীতি, নিরাপত্তা বিশ্লেষণ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমি বেশি কাজ করি। সে সময় জাতীয় ও বৈদেশিক রাজনীতির বিষয়গুলো আমাদের পাঠ্যসূচিতে তেমন না থাকলেও ‘বাংলাদেশ ফরেন পলিসি’ নামে একটি বিষয় ছিল, এটি পড়তে গিয়ে আমরা তখন রওনক আপার ‘পাকিস্তান: ফেইলিউর ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’ বইটি পড়ি। বইটি যদিও তার আগে থেকেই আমাদের হাতে এসেছে। লাইব্রেরি ও সেমিনারে পেয়েছিলাম বলে বইটি আমরা আগে থেকেই নাড়াচাড়া করেছি, কিন্তু সাবজেক্ট হিসেবে পড়তে শুরু করার পর বাংলাদেশের জন্ম ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের নীতির বিষয়টি আমরা অনেক ভালোভাবে বুঝতে পারি। কেননা রওনক আপা অনেকগুলো তত্ত্ব, তথ্য ও সংখ্যা দিয়ে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেকের লেখা
পড়ে আমাদের
চিন্তা ও মননের জায়গাগুলো তৈরি হয়। শিক্ষার্থীরা তাই সবসময় তাদের
আদর্শ ব্যক্তিত্বকে খোঁজার চেষ্টা করে।
তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি
করেছেন। বিষয়টি
আমার কাছে
অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে সময়
আমরা অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনে বড় হয়েছিলাম। সে জায়গা থেকে
আপার কাজ,
পড়াশোনা আমাকে
ভীষণভাবে মুগ্ধ
করেছিল। আমরা
সবাই কিন্তু
পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের নীতির বিষয়টি
জানতাম, কিন্তু
রওনক আপা
যখন আমাদের
চোখের সামনে
ফ্যাক্ট ও ফিগারগুলো তুলে
ধরলেন, তখন
বৈষম্যের বিষয়টি
আরো স্পষ্ট
হয়।
আপা
বিষয়গুলো বিভিন্ন
বিশ্লেষণের মাধ্যমে
তুলে ধরতে
পারেন। তার
বিশ্লেষণ করার
গভীরতা ও প্রক্রিয়া থেকে
আমরা অনেক
কিছু শিখেছি।
আমি আপার
সরাসরি শিক্ষার্থী না হলেও তার
বইগুলো সম্পর্কে
আমি বরাবরই
আগ্রহী ছিলাম।
রওনক আপা
খুব নির্ভয়ে
ও নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম,
যা এখন
অনেকটাই কঠিন
হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় অনেক বিশ্লেষণের মধ্যে তলিয়ে যেতে
হয়। বিভিন্ন
তথ্য-উপাত্ত
নিয়ে আসতে
হয়। আমি
জোর দিয়ে
বলতে পারি,
আমার মতো
অনেককেই আপা
তা শিখিয়েছেন।
হয়তো অন্যান্য লেখার মধ্যেও বাংলাদেশের প্রতি বৈষম্যের বিষয়গুলো রয়েছে। কিন্তু রওনক আপা আমাদের প্রেক্ষিত নিয়ে লিখেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতির অনেক বিশ্লেষণ করেছেন, তা আমাদের বুঝতে অনেক সাহায্য করেছে। একজন শিক্ষাবিদ ও পণ্ডিত হিসেবে তিনি খুবই উঁচুমানের। আন্তর্জাতিকভাবে তিনি ভীষণ সমাদৃত ও পরিচিত। যা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া।
তিনি কোনো বিষয় নিয়ে কথা বললে, তার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি থাকবে এবং যে দৃঢ়তা নিয়ে উনি কথা বলেন আমরা তা শুনে অনেক বেশি বিশ্বাস অনুভব করি। আমার একটা বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়েছিল নিউইয়র্কে। আপাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমি ভীষণ আনন্দিত ও উৎসাহিত হয়েছিলাম। আপার সঙ্গে কিন্তু আমার তেমন কোনো গবেষণাকাজও করা হয়নি। কিন্তু রওনক আপার মতো একজন জ্ঞানী ও পণ্ডিত মানুষ আমার বইয়ের প্রকাশনা উপলক্ষে এসেছেন—যা আমার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। সেদিন তার বক্তব্যে বলেছিলেন যে তিনি ভীষণ গর্ববোধ করছেন, তার দেশের ও তার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজনের বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান এখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আপার মুখে এমন কথা শোনার পর আমি তার সঙ্গে একধরনের সংযোগ উপলব্ধি করি। গবেষকদের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি ও প্রতিটি বিষয়কে গুরুত্বসহকারে নেয়ার প্রবণতা সম্পর্কে বুঝতে সচেষ্ট হই। জ্যেষ্ঠ গবেষক ও শিক্ষাবিদরা পাশে এসে দাঁড়ালে তরুণ গবেষকদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার জায়গা তৈরি হয়—সেদিন আমি বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম।
আমি আজ আমার জীবনের বিভিন্ন ধাপের কথাগুলো বলছি। আপার সঙ্গে বিভিন্ন সময় দেখা হয়েছে। আমি সিপিডির ভারত-বাংলাদেশ ডায়ালগ প্রোগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম, বিভিন্ন সময়ে আমার দিল্লিতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে, ঢাকায়ও অংশ নিয়েছি। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর বিভিন্ন ডায়ালগে প্রফেসর রেহমান সোবহানের নেতৃত্বে দিল্লি সফরেও গিয়েছি। সেখানে আপাও থাকতেন। আমার বক্তব্যের সঙ্গে হয়তো প্রফেসর রেহমান সোবহানের বক্তব্যের দ্বিমত থাকছে, কিন্তু সবসময় দেখতাম যে আপা বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করতেন যে আমি কী বলার চেষ্টা করছি। এ ধরনের ডায়ালগ প্রোগ্রামে বেশির ভাগ সময়ই পুরুষের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ বেশি থাকত। এখানে যারা অংশ নিতেন তারা অনেক উঁচুমানের গবেষক, শিক্ষাবিদ ও কূটনৈতিক। তাই অনেক সময় আপা আমাকে সুযোগ করে দিতেন যেন আমি আমার বক্তব্য তুলে ধরতে পারি।
মহামারীর
মধ্যে ইউপিএল
থেকে উইমেন
অ্যান্ড ওয়ার্ক
ইন সাউথ
এশিয়া নামে
আমরা একটি
গ্রন্থ প্রকাশ
করি। এ উপলক্ষে ওয়েবিনারের মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন
অনুষ্ঠান করি।
এখানে রওনক
আপা একটি
সেশনের নেতৃত্ব
দিয়েছিলেন। সে সময় তার
জ্বর ছিল।
তা সত্ত্বেও
তিনি উপস্থিত
ছিলেন, অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এবং
প্রতিটি পেপারের
ওপর তার
মতামত তুলে
ধরেন। এমন
শারীরিক অবস্থায়ও
তিনি তার
কাজের ক্ষেত্রে
ছাড় দেননি।
আপার সহযোগিতা
ছাড়া অনুষ্ঠানটি আমরা এত ভালোভাবে
করতে পারতাম
না। আপা
কিন্তু তার
শারীরিক কারণ
দেখিয়ে অংশগ্রহণ
নাও করতে
পারতেন, কিন্তু
তিনি তা করেননি। উপস্থিত
আমরা সবাই
বুঝতে পারছিলাম
যে আপার
শরীরটা ভালো
না। বেশ
লম্বা সেশন
ছিল। সুন্দরভাবে সেশনটি শেষ করে
আপা বললেন,
এখন আমি
বিশ্রাম নেব।
রওনক জাহান আপা একজন সত্যিকারের গবেষক ও শিক্ষাবিদ। কেউ কিন্তু একজন ভালো গবেষক বা পণ্ডিত হতে পারেন না, যদি তিনি একজন ভালো মানুষ না হন। একজন গবেষককে তার কাজের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল হতে হয় এবং তিনি যে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন ও কথা বলছেন তার সত্যতা থাকতে হয়। আপাকে আমি এ ধরনের প্রতিশ্রুতিশীল, সত্যিকারের পণ্ডিত ও গবেষক হিসেবেই জানি।
ড. আমেনা মহসিন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
বিভাগ, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়










