নভেল করোনাভাইরাস বুঝতে কি অনেকটা সময়ক্ষেপণ হলো? পারলাম না কৌশলী হতে এর প্রবেশ ঠেকাতে। সংক্রমণ ঠেকাতে স্বাস্থ্য অধিদফতর হিমশিম খাচ্ছে। সমন্বয়হীনতা সবার নিকট স্পষ্ট। তবে সরকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় সর্বোচ্চটা করেছে ত্বরিৎ গতিতে এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে। 

পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়ে শুরু করলেও এখন তা পৌঁছেছে ৯৫ হাজার ৬ শত ১৯ কোটি টাকায়। সঙ্গে দুই মাসের সুদ মওকুফের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। ত্রাণ বিতরণে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু অনিয়ম হলেও তা প্রায় কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ব্যবহার না করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ব্যবহার করলে বেশি ভালো হত বলে অনেকের ধারণা। 

আসলে মূল সমস্যা মনে হচ্ছে অন্য জায়গায়। দেশে একসময় টাকা দিয়ে সার কিনতে এসে গুলি খেয়ে মরতে হয়েছে কৃষকদেরকে। জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সাবেক মাননীয় কৃষি মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী ঘোষণা করেছিলেন এবং প্রমাণ করেছেন যে সার কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যায়, যা অদ্যাবধি বহাল রয়েছে। 

কিছু মতবিরোধ থাকলেও দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। সরকারের সার্বিক কার্যক্রমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অন্যান্য দেশের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আসছিল। 

করোনা মহামারী সরকারের সব সাফল্যকে ধাক্কা দিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু একথাও সত্য যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অত্যন্ত ভালভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল। চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী এবং সব স্তরের মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রাণঘাতী করোনার সংক্রমণ বিস্তার আয়ত্তের মধ্যেই চলছিল।

তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু খামখেয়ালিপনার কারণে এবং সরকারের ব্যবসায়ীদের বেশি গুরুত্ব দেয়ার কারণে করোনার লাগাম টেনে ধরা বোধ হয় সহজ হবে না। করোনায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ কম সময়ব্যাপী নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রয়েছে। আর একটু ধৈর্য্য ধরে এগোতে পারলে মরণঘাতক করোনাকে ধরাশায়ী করা যেত বলে অনেকের অভিমত। 

করোনা মোকাবেলায় যাদের পরামর্শ সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে তা হলো চিকিৎসক সমাজ, কিন্তু তাদের পরামর্শ উপেক্ষিত হচ্ছে, এটা স্পষ্ট। ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদরা করোনায় প্রাণহানির প্রতি একটু বেশি উদাসীন মনে হচ্ছে। লকডাউন শিথিল করার পক্ষে যারা বেশি উৎসাহী তারা হলেন পোশাক মালিক সমিতি, দোকান মালিক সমিতি, রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতি, পরিবহন মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ।

কারণ ঈদ হচ্ছে ব্যবসায়ীদের সারা বছরের মুনাফা অর্জনের টার্গেট এবং অতি মুনাফার টার্গেট। তারচেয়ে আরও বেশি তৎপর ঠিকাদাররা, যারা সারা বছর কাজ না করলেও মে ও জুন মাসে তাদের দক্ষতা অনেক বেশি বেড়ে যায় এবং তার কারণ যেকোনভাবেই হোক না কেন চূড়ান্ত বিল জুনেই পাওয়া যায়। 

এসবের পেছনের কাহিনীটা সবারই কমবেশি জানা। মার্কিন পুঁজিবাদী অর্থনীতির মতো অতিদ্রুত শ্রমিকদেরকে কাজে ফিরিয়ে আনার নামে সবার জীবনকে আশংকায় ফেলা মোটেও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের পরিচয় নয়। সরকারের ঘোষিত ত্রাণ সুষ্ঠুভাবে দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে আর কিছু দিনের লকডাউনে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে এতটা ভঙ্গুর অবস্থানে আমাদের দেশের অর্থনীতি নেই। 

এজন্য একটু ধৈর্য ধরার প্রয়োজন। ধীরে ধীরে সব কিছু সচল করতে হবে এতে কারো দ্বিমত নেই, কিন্তু তার ফাঁকে শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে মানুষের অতিরিক্ত প্রাণহানির আশংকার নীতি পরিহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আমাদের সামনে উদাহরণ হলো সিঙ্গাপুর, জাপান এবং জার্মানির নীতি, যেখানে লকডাউন তুলে পুনরায় বহাল করতে হয়েছে। যুক্তরাজ্য কিন্তু এখনো লকডাউন না তুলে নেয়ার নীতিতে বহাল আছে। 

কৃষক যদি সার পেয়ে সন্তুষ্ট থাকে তাহলে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীরা পিপিই পেয়ে অস্বীকার করবেন এটা হতে পারে না। মাননীয় কৃষি মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক যদি দেশের কৃষিকে সঠিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসতে সমর্থ হন, তাহলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেন পারছেন না? দুর্বলতা কোথায়? বিকল্প কি একেবারেই নেই? 

স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। কেন তার ব্যত্যয় হবে, তা জানার অধিকার মানুষের থাকা উচিত। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব সরকারের সাবেক মুখ্যসচিব ড. সাদাত হোসেন মৃত্যুর আগে একটি ভালো হাসপাতালে চিকিৎসা পাননি, যা তার ছেলের এক প্রকার আক্ষেপ, তাহলে অন্যদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। 

সে কারণে দেশের সাধারণ মানুষ ভুক্তভোগীদের পরামর্শ শুনতে চায় যেমন কভিট-১৯ এ আকান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা চিকিৎসক, নার্স, পুলিশবাহিনীর সদস্য, কর্মজীবী মানুষ, তাদের পরিবারের সদস্যরা কি মনে করেন। তারা কি চায় এখনই সবকিছু খুলে দেয়া হোক? এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৫শ’র অধিক ডাক্তার ও স্বাস্থ্য সেবাকর্মী, সাড়ে ৮শ’র অধিক পুলিশ বাহিনীর সদস্য এবং প্রশাসনের অন্যান্য পর্যায়ের সম্মানিত ব্যক্তিরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের সংক্রমণ মাত্রা এবং মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো করোনা মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য বিশ্বমানের পিপিই সরবরাহ করা এবং তাদের থাকা, খাওয়া, যাতায়াত এবং আবাসন নিশ্চিত করা, যাতে করে তারা সেবা প্রদানে উৎসাহী হন। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে আরো কঠোর নির্দেশনা দেয়া প্রয়োজন।

লকডাউন শিথিল করে শ্রমিকদের পোশাক কারখানায় ফিরিয়ে এনে কাজে লাগানো হয়েছে। সরকারের সঙ্গে অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও আসলে কি কারখানাগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে? স্থানীয় শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে? নাকি মোবাইলের মাধ্যমে এসএমএস করে শ্রমিকদের ডেকে আনা হচ্ছে। 

কারখানার মালিকরা যদি আন্তরিক হতেন তাহলে তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাসে করে তাদের শ্রমিকদেরকে আনতে পারতেন, যাতে সংক্রমণ না হয়। কিন্তু একটা কারখানার মালিককেও সে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। তাহলে তাদের কারখানায় স্থানীয় শ্রমিক দ্বারা স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী পরিচালিত হবে তার নিশ্চয়তা বিধান করা রীতিমত অসম্ভব মনে হচ্ছে। 

সত্যি বলতে কি দেশের ব্যবসায়ী সমাজের কেউ কেউ হয়তো প্রণোদনা প্রাপ্তির পাশাপাশি তাদের নিজস্ব ব্যবসার পুরোটাই ঠিক রাখতে চান। তারা চান না কাজ না করিয়ে একদিনেরও বেতন দিতে। আর সে কারণেই সরকারকে লকডাউন তুলে নিতে প্রভাবিত করছেন। 

একথা মনে রাখা দরকার যে ব্যবসার চুক্তি ঠিক রাখতে অতি সংক্রমণের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও যে শ্রমিকদের কাজে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে সেই শ্রমিকদের মধ্যে করোনা ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হলে সে চুক্তি আমদানিকারকরা শেষ পর্যন্ত রাখবেন কিনা। উন্নত দেশের পোশাক ব্যবহারকারীরা শ্রমিকদের কল্যাণের বিষয়ে যে অত্যন্ত সচেতন, তা আমরা সবাই জানি। 

লকডাউন শিথিল করা হলে মাঠে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা থাকবেন না, এটাই স্বাভাবিক। একই কারণে মাঠে সক্রিয় থাকবেন না পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও। তাহলে মানুষ কতটা ঘরে থাকবেন, এটা সহজেই অনুমেয়। 

ভারতে অনেকেই ‘হার্ড ইমিউনিটি তত্ত্ব’ প্রয়োগের পক্ষে। এ তত্ত্ব অনুসারে সমাজের তরুণ এবং কর্মঠ জনগোষ্ঠীকে (যেহেতু তাদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ কম হচ্ছে অর্থাৎ যাদের ইমিউনিটি বেশি) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করার মাধ্যমে করোনার ক্ষয়ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে কর্মের ক্ষেত্র খুবই সুনির্দিষ্ট হওয়া দরকার, দরকার কঠোর স্বাস্থ্যবিধির অনুসরণ, তা না হলে যুক্তরাজ্যের মত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে হবে। করোনার টিকা আবিষ্কার হলে ইমিউনিটি আরো বৃদ্ধি করা যেত, যা এখনো সম্ভব হয়নি। 

ইদানীং একটা প্রশ্ন অনেকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো, ৮ মার্চ এর পর দেশে আসা প্রায় ৬ থেকে সাড়ে ৬ লাখ প্রবাসীর প্রায় দুই মাস অতিবাহিত হলেও তাদের মাধ্যমে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বড় ধরনের কোনো সংক্রমণ কি হয়েছে? উত্তর হয়তো, না। তার কারণ তাদেরকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ও সামাজিকভাবে বাধ্য করা হয়েছে। অথবা ধরে নেয়া যায় যে যারা এসেছিল তাদের মধ্যে সীমিত সংখ্যক স্বল্প মাত্রায় সংক্রমিত ছিল, যার কারণে ব্যাপক খারাপ কিছু ঘটেনি। 

কিন্তু এখন যদি ব্যবসা বাণিজ্যসহ সার্বিক কর্মকাণ্ড পুরোদমে চালু হয়ে যায়, তাহলে সংক্রমণ যে ভয়াবহতায় রূপ নেবে না তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। সুতরাং আমরা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার (দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকার প্রতিবেদন মোতাবেক বাংলাদেশের অর্থনীতির ভীত দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে রয়েছে) এবং মানবিকতার আরেকটু নিদর্শন ধৈর্য সহকারে নিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাশা করি। 

মাদার অব হিউম্যানিটি বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার সর্বাগ্রে জনবান্ধব হবে, এটাই গণতন্ত্রকামী সব মানুষের আন্তরিক প্রত্যাশা। আর এ প্রত্যাশা পূরণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং মিডিয়ার তথ্য বিশ্লেষকদের পরামর্শ নিয়ে জনগণের কল্যাণের জন্য ব্যবস্থা নিবেন, এ প্রত্যাশা করছি। আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের দেশের মানুষের প্রতি সদয় হবেন। 

 লেখক: ড. মো. সাইদুর রহমান, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়