বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের ধন-সম্পত্তির খবর এখন বিদেশেও বহুল প্রচারিত। প্রচারিত তাদের অর্থ পাচারের খবরও। কিছুদিন পর পরই বণিক বার্তা এসবের ওপর দারুণ দারুণ প্রতিবেদন ছাপে। পিলে চমকে যাওয়ার মতো ঘটনা। এই যেমন অক্টোবরের একটি খবর।  আলোচ্য দৈনিকটি এ খবরের শিরোনাম করেছে, আরব আমিরাতে গোল্ডেন ভিসা নীতি লুফে নিচ্ছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। তথ্যসমৃদ্ধ খবরে বলা হয়েছে, কারা কারা এ ভিসা সংগ্রহ করেছেন, কত টাকা দিয়ে। কী কী ব্যবসা তারা সেখানে করছেন তার খবরও আছে। খবরটি থেকে জানা যাচ্ছে, গোল্ডেন ভিসাধারী ব্যক্তি এবং তার পরিবারের লোকেরা সেখানে ১০ বছরের রেসিডেন্সিয়াল সুবিধা পান। আগে অনেক দিরহাম লাগত। কিছুদিন ধরে এর পরিমাণ শিথিল করা হয়েছে। এখন লাগে দুই মিলিয়ন (২০ লাখ) দিরহাম। কারা এ ধরনের ভিসা লুফে নিচ্ছেন? প্রতিবেদক সাইফ সুজনের সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী এ ধরনের গোল্ডেন ভিসাধারীদের মধ্যে আছেন ব্যাংক পরিচালক, পোশাক ব্যবসায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের শীর্ষ টার্মিনাল অপারেটর, রেল ও সড়কের সামনের সারির ঠিকাদার। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের বড় ও মাঝারি অনেক পুঁজিপতিই এখন আমিরাতের গোল্ডেন ভিসাধারী। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সম্পত্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডের নাগরিকদেরও বাংলাদেশীরা পেছনে ফেলে দিয়েছে। আমাদের ব্যবসায়ীরা ১১ কোটি ৭৬ লাখ ৭০ হাজার দিরহামের সম্পত্তি কিনে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। বলা হচ্ছে চীনের মতো দেশকেও বাংলাদেশীরা সম্পত্তি ক্রয়ে পেছনে ফেলে দিয়েছেন। তারা কী কী ব্যবসায় ঢুকছেন? তাদের রয়েছে আবাসন, রেস্টুরেন্ট, বেকারি ও স্বর্ণ ব্যবসা। প্রতিবেদনের তথ্য মতে দুবাইয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন এমন প্রায় সবারই সেখানে ফ্ল্যাট-বাড়ি-সম্পত্তি রয়েছে। কার নেই—এই হচ্ছে প্রশ্ন।

বিদেশে বাংলাদেশীদের ধন-সম্পত্তি অর্থ পাচারসংক্রান্ত খবর পড়ি আর ভাবি, কোন বাংলাদেশে আমরা বসবাস করছি। দেশের চার কোটি লোক দুই বেলা ভাত পায় না, রয়েছে নগর দারিদ্র্য, পকেট দারিদ্র্য রয়েছে তীব্র আয়-বৈষম্য, আঞ্চলিক বৈষম্য রয়েছে বেকারত্ব, ছদ্ম বেকারত্ব, কর্মহীনতা, চাকরিচ্যুতি, ব্যবসাচ্যুতি—আর এর মধ্যেই একশ্রেণীর ব্যবসায়ী, আমলা ও প্রভাবশালী লোক বিদেশে অর্থ পাচার করে গড়ে তুলছে সহায়-সম্পদ। পাঠিয়ে দিচ্ছে ছেলেমেয়ে ও পরিবারের অন্যদের সেসব দেশে—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ, দুবাই, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে। এতেই অনেক প্রশ্ন জাগে মনে প্রথমত, সরকার কি তাহলে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে, ঋণ সুবিধা, ঋণের সুদ মওকুফ, কর মওকুফ, কর হ্রাস ইত্যাদি সুবিধা দিয়ে বিদেশের নাগরিক তৈরি করছে যারা অর্থ বানাচ্ছে এখানে, সরকারি নানা সুবিধা ভোগ করছে এখানে আর নাগরিক হচ্ছে উন্নত দেশে, দুবাইয়ে। তাহলে সরকার কি আত্মঘাতী নীতি অনুসরণ করছে, যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে অথচ এর সুবিধার সবটাই নিয়ে দেশ থেকে ভাগবে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী। দ্বিতীয় প্রশ্ন, তারা বিদেশে ঘর-বাড়ি-ব্যবসা করার জন্য ডলার কোথায় পায়? টাকা দিয়ে তো সেখানে সম্পত্তি ব্যবসা করা যাবে না। ডলার পায় কোথায়? দেশ থেকে তো একটা ডলারও সরকার অনুমোদিত পন্থা ছাড়া পাঠানো সম্ভব নয়।

তাহলে কী করে তারা মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম সুবিধা নেয়, দুবাইয়ের গোল্ডেন ভিসা সংগ্রহ করে, কানাডায় বিজনেস ভিসা নেয় অথবা সিঙ্গাপুরে এশিয়ার শ্রেষ্ঠ ধনীতে পরিণত হয়। এসব কি অনুমোদিত কোনো পন্থায় হয়? ডলার পায় কোথায়? এর উত্তর সোজা। বাংলাদেশের শিক্ষিত যত লোক বিদেশে যায়, বড় বড় চাকরিতে যায়, উচ্চতর পেশায় যত লোক বিদেশে যায়, তারা দেশে ডলার পাঠায় খুবই কম। তাদের অর্জিত ডলার তারা বিদেশেই রাখে। তাহলে ডলারটা পায় কোত্থেকে? হুন্ডি করে? আগে তাই মনে হতো। হুন্ডিকেই প্রথম মাধ্যম হিসেবে মনে করা হতো, যার মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার হয়। এখনো তা আছে। তবে প্রধানতম মাধ্যম নয়। প্রধানতম মাধ্যম হচ্ছে আমদানি-রফতানি। আজকাল বড় বড় আমদানিকারক ও বড় বড় রফতানিকারক রয়েছেন। তারা হরহামেশাই আন্ডার ইনভয়েসিং (মূল্য কম দেখানো) এবং ওভার ইনভয়েসিং (মূল্য বেশি দেখানো) করে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। বিদেশে ব্যবসার অফিসের নাম করে, বাজারজাতের নাম করে, বিনিয়োগের নাম করে তারা অর্থ পাচার করেন। ‘হুন্ডি’ ব্যবসাও অবশ্যই রয়েছে। আমাদের গরিব কৃষকের ছেলেমেয়েরা যারা বিদেশে কাজ করেন, রোজগার করেন তারা ১ ডলার রোজগার করলে ‘দেড়’ ডলার দেশে পাঠাতে চান। সেসব দেশে তারা থাকতে চান না। একশ্রেণীর ব্যবসায়ী/হুন্ডিওয়ালা তাদের কাছ থেকে ওইসব দেশেই ডলারটা নিয়ে নেয়। বিনিময়ে বাংলাদেশে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের পরিবারকে তা টাকায় পরিশোধ করে দেয়। এটাও হুন্ডি, খুবই কার্যকর হুন্ডি। এতে সরকারিভাবে দেশে ডলারের প্রবাহ হ্রাস পায়। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে টান পড়ে। কার্ব মার্কেটের সৃষ্টি হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী, আমলা, প্রভাবশালী লোকজন তিন ধরনের অপরাধ করছে। দেশে অবৈধভাবে অর্থ রোজগার করছে, ঘুষ-দুর্নীতি করছে, দ্বিতীয় অপরাধ তারা হুন্ডি অথবা আন্ডার/ওভার ইনভয়েসিং করে বিদেশে সেই টাকা পাচার করছে। তৃতীয়ত, তারা বিদেশে সম্পত্তি করছে, ব্যবসা করছে, যা বিনা অনুমতিতে তারা করতে পারে না। অথচ দেখা যাচ্ছে এ ঘৃণ্য কাজ সমানে করা হচ্ছে। মাননীয় হাইকোর্ট এ ধরনের অর্থ পাচারকারীদের তালিকা সরকারের কাছে বহু দিন ধরেই চাইছেন বলে জানি, কিন্তু তার ফল কি আমরা জানি না। মাঝখানে পত্রিকায় দেখেছিলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলছেন, তাদের কাছে নাকি এমন কোনো তথ্য নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও তাই বলেন। অথচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী একবার বলেছিলেন তার কাছে যে তথ্য আছে তাতে তার চমকে যাওয়ার মতো অবস্থা। অবিশ্বাস্য সব নাম। আবার আন্তর্জাতিকভাবেও অনেক সময় বাংলাদেশীদের নাম ছাপা হচ্ছে খবরের কাগজে, যাদের বিদেশে ধন-সম্পত্তি রয়েছে। দেশেও কিছুুদিন আগে একটি খবরের কাগজে এক বড় ব্যবসায়ীর কথা ছাপা হয়েছে, যার সিঙ্গাপুরে প্রচুর সম্পত্তি রয়েছে। এসবের আইনগত ভিত্তি কী তা আমরা জানি না। আজকাল ইউটিউবে বিদেশে বাংলাদেশীদের ঘর-বাড়ির ছবি দেখানো হয়। কানাডার মতো দেশে একবার বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের ফ্ল্যাট-বাড়ি ক্রয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এছাড়া দৈনিক খবরের কাগজগুলোর প্রতিবেদকদের কাছে অপ্রকাশিতব্য অনেক তথ্য রয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে সরকার কেন এ অবৈধ সম্পদের মালিকদের তথ্য দিতে পারবে না? একবার সংসদে অর্থমন্ত্রী বিরোধীদের কাছে টাকা পাচারকারীদের তথ্য চেয়েছিলেন। বিরোধীরা দিয়েছেন কিনা জানি না, তবে বোঝা যায়, সরকার এ সম্পর্কে অসহায়। অসহায় বলেই সরকার বিদেশের সম্পত্তি সম্পর্কে ঘোষণা দিতে আহ্বান করেছে। কিছু কর দিয়ে তা সাদা করতে বলেছে। জানি না এর ফল কী হবে? তবে একটা জিনিস ভাবাই যায়, এ ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগ-প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়, মাননীয় হাইকোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও। বাংলাদেশীরা বিত্ত বানাচ্ছে আর তা পাচার করছে, দেশে কিছুই রাখছে না। কীভাবে তা সম্ভব? সম্ভব কারণ বিদেশে ‘থায়িদ্বার’ আছে। আমরা গ্রামে চুরির ক্ষেত্রে শুনতাম ‘থায়িদ্বার’-এর কথা। চোরেরা গরিব। চুরির মাল রাখবে কোথায়? একজন ধনীর কাছে রাখত যিনি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। তার বাড়িতে চুরির মাল থাকলে ধরার কোনো কায়দা নেই। চুরি কখনো সম্ভব হতো না, উত্সাহিত হতো না যদি ‘থায়িদ্বার’ না থাকত। বিদেশে অর্থ পাচারের ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে।

আমরা টাকাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করি মানিলন্ডারিং প্রিভেনশন আইনের মাধ্যমে। এ আইনে যতদূর জানি, ১০ লাখ জমা এবং তুলতে গেলেই ব্যাংক প্রশ্ন করে। বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্ট জমা দিতে হয়। আর বিদেশে? উন্নত ও তথাকথিত সভ্য দেশে ডলার/টাকা নিয়ে গেলে কোনো প্রশ্ন করা হয় না। তারা উন্নয়নশীল দেশের চোর, গুণ্ডা বদমায়েশ, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ এমনকি খুনিদেরও আশ্রয় দেয়। তারা এদের অর্থের ‘থায়িদ্বার’ হিসেবে কাজ করে। টাকা/ডলারকে তারা পূজা করে। টাকা তাদের কাছে লক্ষ্মী। টাকা/ডলারই সব তাদের কাছে। কিন্তু মুখে মুখে তারা সাধুতার কথা বলে, ট্রান্সপারেন্সির (স্বচ্ছতা) কথা বলে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে। তারা যুদ্ধ বাধায়, যুদ্ধ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তাদেরই কীর্তি। বর্তমান রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধও তাই। দুনিয়া ধ্বংস হোক, এতে তাদের কিছু আসে যায় না। ডলারের দাম বাড়ুক। কোনো বিচার-আচার নেই ডলারের ক্ষেত্রে। ব্রিটিশরা কতগুলো দ্বীপরাষ্ট্র রেখে দিয়েছে যেখানে কোনো কর লাগে না। যে কেউ গিয়ে ডলার রাখতে পারে। কোনো প্রশ্ন নেই। ওই ডলার আসে আমাদের মতো দেশে বিনিয়োগ হিসেবে অন্য দেশের মাধ্যমে। এই হচ্ছে অবস্থা।

আমরাই চোর চোর খেলছি। আর সব টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশে—এখন দুবাইয়ে। তাহলে করণীয়? কী করা যায়? যখন কিছুই হচ্ছে না, তখন একটা কাজ তো করা যায়। তা কী?

দেখা যাচ্ছে বিদেশের সরকারগুলো মুখে যাই বলুক আমাদের চোরদের টাকাকে তারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবেই। দেশের সরকারি সব প্রতিষ্ঠানও কিছু করতে পারছে না। এর মধ্যে একটা কাজ করা যায়। যারা বিদেশে টাকা পাচার করে তাদের অনেকেই সরকারি সাহায্য-সমর্থনপুষ্ট। সস্তায় ঋণ পান তারা। সুদ মওকুফ পান। ঋণ পরিশোধের জন্য সময় বেশি পান। কর অবকাশ ভোগ করেন। রেয়াতি সুবিধা পান। ইনসেনটিভের টাকা পান। দেখা যাচ্ছে আমাদের দেয়া এসব সুবিধা পেয়ে পেয়ে তারা বড় হচ্ছেন, আর টাকা পাচার করছেন। আমাদের খেয়েপরে আমাদেরই সর্বনাশ করছেন। আমরা তাদের ওই সব সুবিধা দেয়া বন্ধ করতে পারি। সরকার জানে, ব্যাংক জানে এরা কারা। তাদের সুযোগ দেয়া সীমিত করা হোক। সস্তায় ঋণ দেয়া বন্ধ করা হোক। অনেক বড় গ্রাহক যারা টাকা পাচার করছেন তারা গত ৫০ বছরে অনেক বড় হয়েছেন। অনেকেই অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি তৈরি করেছেন। অনেকেই ‘ওভারবরোড’ কোম্পানি। তাদের চিহ্নিত করে ক্যাশ জেনারেশনের সুযোগ বন্ধ করা হোক। এ কাজটি আমাদের হাতে আছে। আমরা চাইলেই তাদের অর্থায়ণ কমাতে পারি। তাদের বিদেশে টাকা পাচারের ক্ষমতা হ্রাস করতে পারি। ঠিকমতো কাজটি করতে পারলে অর্থনীতির কোনো অসুবিধা হবে না।

 

ড. আরএম দেবনাথ: অর্থনীতি বিশ্লেষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের সাবেক শিক্ষক