প্রণোদনা, সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচির সুবিধাভোগীসহ সরকারের অন্যান্য কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে ২০২৫ সালের মধ্যে অ্যাকাউন্টিং সিস্টেমের মধ্যে আনতে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলের খসড়া অনুমোদন করেছে সরকার। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় এনে তাদের জীবন ও জীবিকার মানোন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মূল বিষয় হচ্ছে ডিজিটাইজেশন ও ইনোভেশনের মাধ্যমে একটি টেকসই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। আলোচ্য উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে হবে। জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশলের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও এজেন্সিগুলো ব্যাংক, অ-ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান, পুঁজিবাজার মধ্যস্থতাকারী, মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারী এজেন্সি—এগুলোকে গ্রাহকবান্ধব করে সেবা নিশ্চিত করতে এ কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তার জন্য প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা কাঠামো, ব্যয়, সেবার মান প্রভৃতি বিষয়েও দৃষ্টি রাখতে হবে। সর্বোপরি অনিয়ম বন্ধে তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে অনেক বিষয় ও মন্ত্রণালয় জড়িত। সবাইকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন করতে দায়িত্ব দিতে হবে।

আর্থিক সেবা-সহায়তার প্রসার ও উন্নয়নের আর্থিক সেবার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও যারা এসব সেবা থেকে বঞ্চিত, তাদের প্রতি দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। আর্থিক সেবা-সহায়তার আওতার বাইরে থাকার নানা কারণ রয়েছে। চাহিদাগত দিক থেকে সচেতনতার অভাব, স্বল্প আয় ও স্বল্প সম্পদ, সামাজিক বর্জন, শিক্ষার অভাব ইত্যাদি আর্থিক সেবা-সহায়তা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। সরবরাহগত দিক থেকে আর্থিক সেবাবহির্ভূত থাকার সাধারণ কারণগুলো হলো, ব্যাংক শাখা থেকে খানার দূরত্ব, শাখার কর্ম-সময়, জটিল ডকুমেন্টেশন ও অন্যবিধ প্রক্রিয়া, গ্রাহক অনুপযোগী সেবা-পণ্য, স্টাফদের মনোবৃত্তি ইত্যাদি। এসবের ফল হলো উচ্চ লেনদেন খরচ ও লাভজনকতা কম হওয়া। পক্ষান্তরে ঋণের অন্যান্য উেসর চেয়ে অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও সহজলভ্যতা ও অনানুষ্ঠানিক বাজারের অন্যান্য বিদ্যমান সুবিধার কারণে অনানুষ্ঠানিক ঋণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ব্যাংক শাখার ব্যাপক বিস্তার, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং এমএফআই ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও দেশের বয়স্ক মানুষের বড় অংশ এখনো আর্থিক সেবাবহির্ভূত। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ সেবা-সহায়তা প্রাপ্তির বিবেচনায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অবস্থা এখনো খারাপ। যেমন জিডিপিতে গ্রাম এলাকায় বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষকদের অবদানের তুলনায় ব্যাংকসেবায় তাদের অন্তর্ভুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এটি বাড়ানো প্রয়োজন।

নরডিক দেশগুলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে এগিয়ে রয়েছে। এছাড়া এগিয়ে রয়েছে কানাডা ও নেদারল্যান্ডস। এ দেশগুলোর প্রতিটিই শতভাগ স্কোর করেছে, অর্থাৎ এসব দেশের প্রত্যেক নাগরিকেরই একটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং কেনিয়ার নারী পরিচালিত পরিবারগুলোয় অন্তত ২০ শতাংশ সঞ্চয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণে ভারতও সাফল্য দেখিয়েছে। ২০১১ সালে মাত্র ৩৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব ছিল। ২০১৪ নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩ শতাংশে। বর্তমানে এ হার ৮০ শতাংশ। তার পরও এটা মনে রাখা দরকার, ভারতের ৪৮ শতাংশ ব্যাংক হিসাব নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে। দেশটিতে নগদ অর্থের পরিবর্তে স্মার্টকার্ডের মাধ্যমে হস্তান্তর করায় পেনশন পেমেন্টের তহবিল জালিয়াতি প্রবলভাবে কমে গেছে। ভারত সরকার মোট আর্থিক অন্তর্ভুক্তি অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি চূড়ান্ত প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল আগেই। পদক্ষেপগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের দুর্বল অংশগুলোকে সাশ্রয়ী মূল্যে ব্যাংকিং পরিষেবা প্রদান করা। এর সুফলও তারা পাচ্ছে। বাংলাদেশও কিছু উদ্যোগ নেয়ায় করোনার সময়ে ফল পেয়েছে। এমএফএসের মাধ্যমে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে সরকার নগদ সহায়তা প্রদান করেছিল মধ্যস্বত্বভোগীর সহায়তা ছাড়াই। প্রযুক্তির মাধ্যমে অর্থ প্রদান করায় অনিয়ম ধরা পড়েছে দ্রুতই। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রম এগিয়ে নিতে কৌশল ও দর্শন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে প্রেক্ষাপট থেকে জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল প্রণয়ন তাত্পর্যপূর্ণ। দ্রুতই এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া উচিত। এরই মধ্যে অনেক সময় অতিবাহিত হয়েছে। করোনা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গুরুত্ব অনুভবে সহায়তা করেছে। তাই কালক্ষেপণ না করে দ্রুতই কৌশল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে স্টেকহোল্ডারদের মতামতও বিবেচনায় নিতে হবে।

আর্থিক সেবার উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারকে অধিকতর সৃজনশীল জ্ঞান সৃষ্টির চেষ্টা করতে হবে। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য যেসব সেবাপণ্য রয়েছে, সে সম্পর্কে যেসব প্রতিষ্ঠান এসব পণ্য জোগান দেয়, তাদের সম্পর্কে সফল ও উদ্ভাবনীমূলক মডেল গ্রহণের তৃণমূল পর্যায়ের বাস্তবতা বোঝা, সৃষ্টিশীল ধারণাগুলোর সফলতা কোন উপাদানগুলো নিশ্চিত করে এবং কাঙ্ক্ষিত জনগোষ্ঠীর বাইরে থেকে কেন অনেকে এগুলো গ্রহণ করে তা জানা। এর অন্তর্ভুক্ত হবে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য পণ্য উন্নয়ন ও পরীক্ষা করা। প্রযুক্তি কীভাবে খরচ কমাতে সাহায্য করতে পারে এবং কীভাবে বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদানকারী কার্যকর উপায়ে এসব দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছতে পারে, তা চিহ্নিত করার জন্য উপায় বের করতে মোবাইল নেটওয়ার্কের অপারেটরদের ও অন্যান্য বেসরকারি খাতের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সরকারকে প্রাসঙ্গিক সংগঠনগুলোকে উৎসাহিত করা উচিত। দেশের সব মানুষের সঞ্চয়, পেমেন্টস, ঋণ, বীমা ও অন্যান্য আর্থিক সেবায় প্রবেশ থাকা উচিত। ব্যাপক পরিসরের আর্থিক সেবার লভ্যতা নিশ্চিত করা গেলে সেবা গ্রহণকারী ও সেবা প্রদানকারী উভয়েই উপকৃত হবে।

আর্থিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী উপকৃত হওয়ার সম্ভাব্য দুটি উপায়ের কথা বলা যেতে পারে। প্রথমত, লেনদেন খরচ সর্বনিম্ন করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয়ে অভ্যস্ত করা যেতে পারে। ফলে তারা প্রচলিত পদ্ধতিতে বাড়িতে নগদ অর্থ সঞ্চয় না করে অন্তত কোনো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয় করবে এবং এর সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে। দ্বিতীয়ত এবং সম্ভবত আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, যত বেশি মানুষ ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের আওতায় আসবে ও লেনদেন করবে, তা পরবর্তী সময়ে তাদের লেনদেনের ইতিহাস সংগ্রহ করে একটি ক্রেডিট প্রোফাইল তৈরিতে সহায়ক হবে। সেই সঙ্গে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যাংকিং চ্যানেল তৈরি করতে হবে। এ যাত্রাপথে কিছু প্রতিকূলতার সম্মুখীনও হতে পারে। এক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করতে হলে অবশ্যই উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রক দৃশ্যকল্পের বিষয়ে সর্বদা তত্পর থাকতে হবে। তথ্য-উপাত্ত ও প্রযুক্তির নিরাপত্তার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকিং ও ঋণের ইকোসিস্টেমের ওপর জোরালো দৃষ্টি দিতে হবে, যাতে গ্রাহকদের সুরক্ষার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোয় অসদাচরণ ও জালিয়াতির বিষয়টিও সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।