ড. জাহিদ হোসেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনৈতিক অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শেষে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি ও ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রধান, কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অন ইস্ট সেন্ট্রাল ইউরোপের স্টাফ অ্যাসোসিয়েট, যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস ও ফ্রেমিংহ্যাম স্টেট কলেজের লেকচারার হিসেবে পাঠদান করেছেন। প্রস্তাবিত বাজেটের নানা দিক নিয়ে তিনি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা 

গত দুই বছর ছিল কভিডের সময়কাল। সে সময়ে সবাই বাজেটে কভিড মোকাবেলাকে প্রাধান্য দিতে বলেছিলেন। এখন চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়ন। বাজেটে বিষয়গুলো কতটা আমলে নেয়া হয়েছে বলে মনে করেন?

মূল্যস্ফীতি সমস্যার স্বীকৃতি বাজেট বক্তৃতায় আছে। মূলত এটাকে ১ নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডলার সংকট ঠিক ওই ধরনের গুরুত্ব পায়নি বাজেট বক্তৃতায়। এখন আমি স্বীকৃতি দিলাম কিন্তু ব্যবস্থাটা কী নিলাম, সেটাই হলো বড় প্রশ্ন। সেক্ষেত্রে দুটো দিক রয়েছে। আমি প্রথমে মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে বলি। মূল্যস্ফীতির জন্য দুই ধরনের পদক্ষেপ বাজেটে আছে। একটা ইতিবাচক আরেকটা নেতিবাচক। ইতিবাচক হলো, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি যে পরিমাণে আছে তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আমাদের মতো অন্যান্য দেশ ভারত, পাকিস্তান বা ইস্ট এশিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে ঠিক মাঝামাঝি পড়ে। মানে মূল্যস্ফীতি ঠিক বেশিও না, একেবারে কমও না। আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতির সংক্রমণ যেসব পণ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশে পড়ে, মোটাদাগে সেগুলো হলো জ্বালানি ও সার। সরকার নভেম্বরে ডিজেলের দাম সমন্বয় করেছিল। তখন জ্বালানি তেলের দাম ছিল ৮৫ ডলার প্রতি ব্যারেল। সেটি এখন ১১০ থেকে ১২০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। এর পরে দাম সমন্বয় করা হয়নি। আর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এ কারণে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার এখন পর্যন্ত কিছু করেনি। এতদিন ভর্তুকি দিয়েই সামাল দিয়েছে। প্রাক্কলিত বাজেটে ভর্তুকি বাবদ যত অর্থ ধরা হয়েছিল, সংশোধিত বাজেটে তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকিতে বড় ধরনের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সেক্ষেত্রে যেটা মনে হচ্ছে যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রভাব অভ্যন্তরীণ বাজারে যেন সংক্রমিত না হয়, সেজন্য যে প্রস্তাবগুলো এসেছে সেগুলো পুরোপুরি গ্রহণ করা হবে না; নইলে ভর্তুকি এত বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না। সেদিক থেকে এটি ইতিবাচক। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের দাম যদি বেড়ে যায়, তবে তা অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলবে। কারণ এগুলো ছোঁয়াচে বেশি। আইফোনের দাম বাড়লে এটা অতটা ছোঁয়াচে নয়। এটা পণ্যের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে কোনো অবদান রাখে না। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়লে এটা পরিবহন খাত, শিল্প খাত, সেবা খাত, কৃষি খাত প্রভৃতির ওপর প্রভাব ফেলে। সেদিক থেকে আমি বলছি বাজেট ইতিবাচক।

নেতিবাচক দিক যেটা হলো, ধরে নেয়া হয়েছে যে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতিটা পুরোপুরি আমদানীকৃত। এখানে আমার মনে হয়, ডায়াগনসিসে কিছুটা অসংগতি আছে। কারণ যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আর মূল্যস্ফীতি একই সঙ্গে বাড়ছে, সেখানে চাহিদার বৃদ্ধি ছাড়া এটা সম্ভব না। আবার যদি শুধু আমদানি পণ্যের দাম বাড়ত তাহলে মূল্যস্ফীতি বাড়ত কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ত না। শুধু চাহিদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি আর প্রবৃদ্ধি একই সঙ্গে বাড়তে পারে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, করোনা-পরবর্তী আমাদের অর্থনীতিতে চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু এটা বাজেটে ঠিক এক লাইন, একটা ফুটনোটের মতো আছে। সব ক্ষেত্রেই এমনকি সংবাদ সম্মেলনেও বলা হলো, আমদানীকৃত মূল্যস্ফীতিতে আমাদের কিছু করণীয় নেই। চাহিদার একটা বৃদ্ধি তো ঘটেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। উদাহরণের জন্য খুব বেশি দূরে তাকাতে হবে না। কক্সবাজারের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে মানুষ ভ্রমণ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে, বাজারে কেনাকাটা বাড়িয়ে দিয়েছে। চাহিদায় একটা তাপ আছে। তাপটা কমানোর জন্য বাজেটে যেটা করণীয় ছিল সেটা হলো, বাজেট ঘাটতিকে সংযত পর্যায়ে রাখা। অন্তত চলতি অর্থবছরে যে পরিমাণ ঘাটতি রয়েছে, এটি যেন তার চেয়ে বেশি না বাড়ে। সেখানে প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি বেড়েছে। সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এটি বেশি ধরা হয়েছে। বাজেট ঘাটতি মানে কী? আয় ও ব্যয়ের পার্থক্যটাই ঘাটতি। আয় করছেন মানে অর্থনীতি থেকে টাকা তুলে আনছেন। তুলে আনার চেয়ে যদি বেশি অর্থ প্রদান করেন তাহলে এক্সপানশন হবে। এটা তো চাহিদায় যোগ হওয়ার কথা। যে তাপ আছে সেখানে কিছু পানি ঢালার কথা, ঠাণ্ডা করার কথা। সেখানে বাজেটে উল্টো বাতাস দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল চাহিদার প্রবৃদ্ধি কমানো ও জোগান বাড়ানো। সেটি বাজেটে অনুপস্থিত।

এখানে বিশ্লেষণের ঘাটতি আছে। জোগান আমরা কীভাবে বাড়াচ্ছি? সেটা করছি আমদানি কর বাড়িয়ে। অর্থ সচিব যে ব্যাখ্যাটা দিয়েছেন, আমরা আমদানি কর অনেক বাড়িয়েছি, যাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ে। কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। জোগানের ইকুয়েশনটা কী? উৎপাদন + আমদানি। আপনি আমদানি কমানোর চেষ্টা করছেন কীভাবে? কর বাড়িয়ে? কর বাড়লে অভ্যন্তরীণ জোগান কীভাবে বাড়বে? কর বাড়ার কারণে পণ্যের মূল্যটা বাড়বে। সেজন্যই তো অভ্যন্তরীণ জোগান বাড়বে। সেক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি তো কমল না, চাহিদার প্রবৃদ্ধি তো কমল না, জোগান বাড়ল বটে, তবে সেটি মূল্যস্ফীতির কারণে বাড়ল। কাজেই আমরা জোগান বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমাচ্ছি—কথাটি যৌক্তিক নয়।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে এবং টাকার অবমূল্যায়ন হচ্ছে। এক্ষেত্রে কী যথাযথ পলিসি গ্রহণ করা হয়েছে?

বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক দিন চেষ্টা করেছে রিজার্ভ থেকে ডলারের জোগান দিয়ে টাকার মান ধরে রাখার জন্য। সেটা করতে গিয়ে দেখা গেল রিজার্ভ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। তারপর মুদ্রাবাজার সরাসরি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলো। ডলারের দাম স্থির করে দেয়া হলো। এটিও কাজ করল না। আন্তঃব্যাংকের বাজার অকার্যকর হয়ে পড়ে। রেমিট্যান্সে বড়সড় ধাক্কা পড়বে বুঝতে পেরে এ পথও ছেড়ে দেয়া হলো।

সঠিক পদক্ষেপ হলো দাম বাড়তে দিলে ডলারের চাহিদা কমবে। জোগানটাও বাড়বে। বাজেট ঘাটতিও কিছুটা কমবে। আমরা যদি আরো কিছু করতে চাই, যাতে বিনিময় আর না বাড়ে তাহলে একটা করণীয় হলো আমদানির চাহিদা কমানো। এর জন্য বাজেট ঘোষণার আগেই কিছু পণ্যের ওপর রেগুলেটরি ডিউটি বাড়ানো হয়েছে। বাজেটেও অনেক ধরনের পণ্যের ওপর কর বাড়ানো হয়েছে। এতে বিলাসপণ্যের আমদানি চাহিদা হয়তো কিছুটা কমবে। তবে এক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির উভয় সংকটে চাপ বাড়বে।

আমাদের লক্ষ্য ডলারের চাহিদা ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানো। যেটি করলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাবে আর তা হলো কৃচ্ছ্রসাধন। বাজেট ঘোষণার আগে বলা হয়েছে ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ, গাড়ি কেনা কমানো হবে। কিন্তু বাজেটে এ-সংক্রান্ত ব্যয় সংশোধিত বাজেটের চেয়ে বেশি ধরা হয়েছে। তার চেয়ে বড় যে জায়গাটা ছিল সেটা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি। যেগুলোয় দেশীয় অর্থায়নের প্রকল্প আছে সেখানে প্রচুর আমদানি প্রয়োজন হবে। যেখানে বিদেশী অর্থায়ন নেই, সেখানে সরকার/ঠিকাদারকে ডলার ব্যয় করতে হবে।

বলা হয়েছে, এ ধরনের প্রকল্পে সরকার ধীরে যাবে, অন্যথায় প্রকল্প স্থগিত রাখা হবে। কিন্তু এডিপির ফাইন্যান্সিয়াল কম্পোন্যান্টে আমরা দেখলাম সেখানে ডমেস্টিক কম্পোন্যান্টের প্রবৃদ্ধি বেশ উচ্চ। গতবারের তুলনায় কমেনি। এডিপিতে মোট বরাদ্দ আছে, সেখানে বৈদেশিক মুদ্রায় কতটা ব্যয় হবে আর অভ্যন্তরীণ মুদ্রায় কতটা ব্যয় হবে, তার বিস্তারিত না থাকায় বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা যাচ্ছে না। ১০০ টাকার কাজে ৫০ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা দরকার। সেখানে ৪০ টাকা প্রজেক্ট এইড আছে। তাহলে ১০ টাকা ফরেন কারেন্সি আমার নিজের জোগাড় করা লাগবে। এটি যদি গত বছরের চেয়ে কম হতো তাহলে আমি বলতাম কৃচ্ছ্রসাধন করা হয়েছে। কিন্তু এ তথ্য নেই। ফলে বলা যাচ্ছে না প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থ ব্যয় করতে হবে কিনা। এসব বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এক্ষেত্রে কোনো প্রভাব রাখবে কি?

যেসব মেগা প্রকল্প নির্মাণভিত্তিক সেগুলোয় প্রচুর ম্যাটেরিয়াল আমদানি করতে হয়। আমদানি কর বৃদ্ধি ছাড়া ডলার ক্রাইসিস বা এক্সটারর্নাল ইমব্যালান্স সামাল দেয়ার কোনো পদক্ষেপ বাজেটে দেখিনি। আরেকটা ক্ষুদ্র পদক্ষেপ হয়তো আছে, তা হলো বিদেশী অর্থায়নের ক্ষেত্রে শুধু প্রকল্প সহায়তা নয়, ১৫ হাজার কোটি টাকার আরেকটা লাইন আছে। সেটাকে স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট লাইন বলে। এটা বাজেট সাপোর্ট। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ এটি দিয়ে থাকে। এটা কোনো ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত নয, সংস্কার কার্যক্রমভিত্তিক। এ ধরনের আলোচনা বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চলছে। এরই মধ্যে সরকার ২৫০ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে। আগামী অর্থবছরের দ্বিতীয় পর্যায়ে একই সিরিজের আরো ২৫০ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রী এক জায়গায় বলেছেন, এ ধরনের বাজেট সাপোর্ট ১ বিলিয়ন ডলারের জন্য কাজ করছে সরকার। এটা রিজার্ভে যোগ হবে। 

এক বিলিয়ন ডলার কিন্তু ছোট অংক নয়। সেক্ষেত্রে সেটি বাজেট বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। এটা নির্ভর করছে সংস্কার কার্যক্রমের ওপর। এছাড়া যারা সহায়তা দেবে তারা এটাকে অর্থায়নের যোগ্য মনে করছেন কিনা, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের অর্থ পেতে কিছু সংস্কার করতে হবে। কিছুটা টানাপড়েন হলেও শেষ পর্যন্ত এ অর্থ মিলবে। বাকি ৭৫০ মিলিয়ন ডলার কার থেকে নেয়া হবে? কোন পর্যায়ে আছে ইত্যাদি পরিষ্কার নয়। এছাড়া রিজার্ভ বাড়ানোর মতো বাজেটে স্বল্পমেয়াদে পদক্ষেপ নেই।

বাজেটের আরেকটি ভালো দিক হলো, গার্মেন্টবহির্ভূত খাত এবং গার্মেন্ট খাতকে আয়করের দিক থেকে সম্পূর্ণ একীভূত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তাদের মধ্যে বিদ্যমান কর বৈষম্যের অবসান হবে। সবুজ কারখানা হলে আরো ছাড় দেয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য এটি বিরাট প্রণোদনা। সেটা এ অর্থবছরে স্বল্পমেয়াদে কতটা ফল দেবে এটাই প্রশ্ন। আয়করের সুবিধা পেতে যারা গার্মেন্ট খাতে বিনিয়োগ করতেন তারা নতুন করে ভাববেন। এতে রফতানিতে বৈচিত্র্য আসবে। যারা এরই মধ্যে ফুড, সিরামিক, ফার্মাসিউটিক্যালস, অ্যাগ্রো প্রসেসিং শিল্পে আছেন, তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য যে বিনিয়োগ দরকার তা তারা পাবেন। তাদের প্রডাকশন কস্ট কমবে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ, শ্রমের ব্যয় বৃদ্ধি ইত্যাদি ক্ষেত্রে আয়করে ছাড় বড় প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে। কারণ এখানে নতুন বাজার খোঁজার কিছু নেই। বিনিয়োগের জন্য বেসরকারি খাতের নগদ অর্থ লাগবে। নগদ অর্থের জন্য সরকার দুটো জায়গায় ছাড় দিয়েছে। একটা হলো কর ব্যাপকভাবে কমিয়েছে। সোর্স ট্যাক্স কমিয়েছে। এতে রফতানির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। তবে স্বল্পমেয়াদে মোট প্রভাব সীমিত থাকবে। এছাড়া সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেই, যা বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবে, জোগান বাড়াবে।

বাজেটে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে একটি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এতে কি অর্থ ফেরত আসবে বলে আপনি মনে করেন?

আমরা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখি পাচারকৃত অর্থ নিয়ে আইএমএফের প্রচুর গবেষণা আছে। প্রণোদনা দিয়ে অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা গেছে এমন উদাহরণ খুব কম। অর্থমন্ত্রী ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণ বারবার বলেন। ইন্দোনেশিয়ার সরকার তিনবার চেষ্টা করেছে। ২৩-২৪ বছর আগে থেকেই তারা চেষ্টা করছে। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া কিছুটা ফল পেয়েছে। তবে কর আদায় বেশি হয়নি। কিন্তু অর্থ ফেরত এসেছে। কিন্তু দেশটি যে ডিজাইন বা পলিসি অনুসরণ করেছিল তা আমাদের দেশের পলিসির চেয়ে ভিন্ন। ইন্দোনেশিয়া সময় দিয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। প্রথম তিন মাসের মধ্যে অর্থ আনলে করের হার সর্বনিম্ন; পরের ছয় মাসের মধ্যে আনলে করের হার বেড়ে যাবে; শেষ তিন মাসে আনলে করের হার সর্বোচ্চ। দ্রুত অর্থ আসার জন্য তারা প্রণোদনা তৈরি করেছে। প্রথম তিন মাস বেস্ট টাইম—কোনো প্রশ্ন করা হবে না। নয় মাসের মধ্যে আর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে না কিন্তু করহার বেশি। সেই সঙ্গে তারা আরেকটা পদক্ষেপ নিয়েছিল সেটা হলো, ওইসিডির সঙ্গে একটা অ্যারেঞ্জমেন্ট আছে। ১৩০টি দেশ এর সঙ্গে জড়িত। তারা একে অন্যের সঙ্গে আর্থিক তথ্য আদান-প্রদান করে। ওই সময়ে ইন্দোনেশিয়া এ প্লাটফর্মে যুক্ত হয়। এর মাধ্যমে তারা বার্তা দিয়েছে, আমরা তোমাদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুযোগ দিয়েছি। এ সময়ের পরে আমরা তথ্য পাব তোমরা কোথায় কী করো? কার কত টাকা কোথায় আছে? ইন্টারপোলের মাধ্যমে আমরা ক্রিমিনাল প্রসিকিউশনে তোমাদের বিরুদ্ধে যাব। কাজেই একদিকে যেমন ইনসেনটিভ যেটা সাময়িক, অন্যদিকে থ্রেট! যেটা বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু বাংলাদেশ শুধু সুবিধা দিয়েছে, কোনো থ্রেট দিতে পারেনি। আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, একবার অর্থ বেরিয়ে গেলে সেটি আর ফেরত আসে না।

সংশ্লিষ্ট নীতি এখানে কেন এল সেটার ব্যাখ্যা দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। যে এখান থেকে টাকা নিয়ে গেছে, তার টাকাটা অবৈধ ছিল। এটিও সত্য, সব অর্থ আবার অবৈধ নয়। অনেকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটানোর জন্য যেতে বাধ্য হয়েছে। জটিলতা কী? আমাদের এখানকার ক্যাপিটাল কন্ট্রোল সিস্টেম। বাইরে বিনিয়োগ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হয়। ক্যাপিটাল কন্ট্রোল এড়িয়ে বাইরে অর্থ নিয়ে যাওয়া অবৈধ কাজ। তাও বুঝলাম আপনার পরিষ্কার সাদা টাকা। প্রশ্ন হলো, অবৈধ পথে বিদেশে ঢুকল কীভাবে? সেখানে নিশ্চয়ই কোনো বৈধ পথ আছে টাকা প্রবেশের। সে যদি বৈধ পথে ঢুকে থাকে তাহলে তার ওখানে অস্তিত্বের সংকট নেই। তাহলে সে কেন ১০ বা ১৫ শতাংশ ট্যাক্স দেবে। আপনি বলছেন, টাকাটা রেখে দেন। ইমমুভেবল অ্যাসেটের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে। মুভেবল অ্যাসেটের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ দিতে হবে। ফেরত আনেন ৭ শতাংশ দিতে হবে। সব ক্ষেত্রেই ট্যাক্স দিতে হলে টাকা আনব কেন? যে কারণে অর্থ চলে গিয়েছিল, সে কারণ তো বদলায়নি। তার ওখানে কোনো থ্রেট নেই, এখানেও কোনো থ্রেট নেই। তাহলে অর্থ আনার বা ঘোষণা দেয়ার কোনো দরকারও নেই।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ভারত বলেছে পিকে হালদারের টাকাটা তারা ফেরত দিতে সহযোগিতা করবে। কানাডিয়ান সরকার বলেছে পদক্ষেপ নেবে যেন অবৈধ বিনিয়োগ না হয় বা বেগম পাড়ার মতো ঘটনা না ঘটে। আর কানাডায় বাংলাদেশীদের অবৈধ বিনিয়োগের জন্য ব্যবস্থা নেবে। তাহলে প্রশ্ন হলো, ওখানে যারা অলরেডি আছে, তারা কি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে? কানাডা সরকার বলছে, আমরা ব্যবস্থা নেব? তাহলে কানাডা সরকার ব্যবস্থা নিলেই তো হয়। এখানে ১০ বা ১৫ শতাংশ ট্যাক্স দিলে কি কানাডিয়ান সরকার বিশেষ কোনো সুবিধা দেবে? কানাডিয়ান সরকার তাদের আইন দিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশ সরকারের কানাডিয়ান সরকারের আইন তো পরিবর্তন হবে না। বাংলাদেশে কর দিলে কানাডায় অর্থ বৈধ হবে না।

এক্ষেত্রে দুটো ফলের কথা বলা হয়েছে, তার প্রথমটা হলো রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি। দ্বিতীয়টি হলো, ডলারের জোগান বৃদ্ধি। এ দুটোর কোনটা হবে? এটা পরিষ্কার না যে কেন হচ্ছে? নির্দিষ্ট কেউ যদি থেকে থাকেন, যিনি এ সুযোগ দিলে অর্থটা নিয়ে আসবেন, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু কথা হলো, ওই ধরনের আইন কি এই বিশেষ ধরনের টার্গেট জুরিসপ্রুডেন্সের সঙ্গে মিলে? দর্শন, বিজ্ঞান যা-ই বলেন, মিলে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা কি সংকেত দিচ্ছি যে আপনি অর্থ পাচার করে ফেরত আনলে নৈতিকতার বিচারে পার পেয়ে যাবেন?

করোনার সময়ে দেখেছি অনেক দেশের সরকারের ব্যয় বিশেষ করে জনপ্রশাসন ব্যয় কমিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে এটা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। আগামীতে এটি সরকারের জন্য বোঝায় পরিণত হবে কি?

আমাদের দেশে কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতির তুলনায় সরকারি পে অ্যান্ড অ্যালাউন্স বেশি বেড়েছে। এটাকে যদি যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে চান যেন রেভিনিউ শেয়ারের সঙ্গে সঙ্গে না বাড়ে সেটার জন্য জনপ্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কার লাগবে। প্রশাসন এখন অনেক মাথাভারী হয়ে গেছে। এডিশনাল সেক্রেটারি, জয়েন্ট সেক্রেটারির সঙ্গে সেক্রেটারির ক্যাটাগরিতে নতুন করে সিনিয়র সেক্রেটারি তৈরি হয়েছে। এখানে সংখ্যাটা সবচেয়ে বেশি। অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি/ডেপুটি সেক্রেটারি বা তার নিচে লোকবল আগে বেশি ছিল। গত কয়েক বছরে দলে দলে ব্যাচভিত্তিক প্রমোশন দেয়া হয়েছে। এ পর্যায়ে গেলে অনেক কিছু বেড়ে যায়। বেসিক পে থেকে শুরু করে ভাতা, গাড়ি-বাড়ি, তেল সবকিছু বাবদ সরকারের ব্যয় বেড়ে যায়। এখন যাকে প্রমোশন দেয়া হয়েছে, তাকে তো আর নামিয়ে দেয়া যাবে না। প্রতি বছর কিছু কর্মকর্তা রিটায়ার্ড করছেন। খেয়াল রাখতে হবে ওটা যাতে আর না বাড়ে বা রিপ্লেস না হয়। এক্ষেত্রে যে ব্যাচভিত্তিক প্রমোশন দিতে হবে—এমন নয়। প্রমোশন থাকতে হবে নইলে তো মোটিভেশন থাকবে না। এটা পারফরম্যান্স বেজড হতে হবে। সিনিয়রিটি বেজড নয়। এখানে যদি শৃঙ্খলা না আনা হয়, তাহলে এখান থেকে বের হতে পারবেন না।

সুদ পরিশোধ আর প্রশাসনিক ব্যয় এখন ট্যাক্স রেভিনিউর ৫০ শতাংশের বেশি। যেমন ধরেন স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি নতুন প্রতিষ্ঠান। এখানে আগে থেকে কাজ করছে কারিগরি বিভাগ। তাই এখানে এ বিভাগকে কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে একীভূত করা যেত। যাদের নতুন করে যোগ করেছি তাদের কাজ কী? আগে যারা কাজ করত তাদের সঙ্গে মার্জ করতে পারতাম। এখানে নতুন বিভাগ যোগ হলে পুরনোটাও চলতে থাকে। এতে টেকনিক্যাল ত্রুটিও দেখা দেয়, ব্যয়ও বেড়ে যায়। এমন অনেক বিভাগ আছে, বর্তমান সময়ে যাদের কোনো প্রয়োজন নেই। জনপ্রশাসন সংস্কার না করলে এর সমাধান কঠিন হয়ে পড়বে। ভবিষ্যতে এর গ্রোথ সামলানো কঠিন হবে। কারণ পেনশন সুবিধা অনেক বাড়ানো হয়েছে।

ডিপার্টমেন্ট বন্ধ করে দিলে এর লোকজন পছন্দ করবে না। প্রমোশন বন্ধ করে দিলে যারা মেধার ভিত্তিতে পান না, যোগ্যতা নেই, তারা বলবেন, আমাদের কলিগ পেয়েছে, আমরা কেন পাব না? তার এসিআর আমার এসিআরে কোনো পার্থক্য নেই। দেনদরবার করতে থাকবে। আপনি সংস্কার করতে চাইলে যারা অ্যাফেক্টেড হবে, তারা প্রতিরোধ করবে। সেটা যদি ঠেকাতে না পারেন তাহলে সংস্কার ঝুলে থাকবে। এখানে রাজনৈতিক ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন, এটা আমরা করবই, ক্যাবিনেট বলেছে, এটা করতে হবে। ক্যাবিনেট সিদ্ধান্ত নেবে আমলারা শুধু বাস্তবায়ন করবেন; আমলাদের পলিসি ডিসিশন নেয়ার কথা না। ব্যুরোক্র্যাসির নিয়ম হলো, সরকার যা বলবে তারা তাই করবে। প্রশাসনিক ব্যাপারে যদি আমলাদের কথা প্রাধান্য পেয়ে যায় তাহলে আর সংস্কার হবে না।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কিন্তু রাজস্ব বাড়ছে না কেন?

বাজেটে রাজস্ব বাড়ার ক্ষেত্রে দুটো জায়গা থেকে আশা করতে পারি। প্রথমত, করহার যদি বাড়ানো হয়। দ্বিতীয়ত, করের আওতা যদি বাড়ানো হয়। আমদানি কর বৃদ্ধি ছাড়া অন্য সব জায়গায় করহার কমেছে। করের অন্যান্য হারও তুলনামূলকভাবে কমেছে। সেক্ষেত্রে সরকার রফতানিতে সোর্স ট্যাক্স বাড়িয়েছে। এখান থেকে বড়জোর ৫ হাজার কোটি টাকা কর আহরণ হতে পারে। কিন্তু বাজেটের মোট রাজস্ব বৃদ্ধি দরকার ৪৪ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ আসবে কোত্থেকে? সরকার কাঁচামালের ওপর সোর্স ট্যাক্স কমিয়েছে, করপোরেট ইনকামের ওপর কর কমিয়েছে, কিছু আমদানি কর কমিয়েছে। কিছু ভ্যাট রেট কমানো হয়েছে। এটি স্থানীয় উৎপাদনে উৎসাহ দেয়ার জন্য। তাহলে করহারের হ্রাস-বৃদ্ধিতে সমান সমান। সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা রফতানি থেকে পাবে সরকার কিন্তু ভ্যাট হার কমানো, আয়কর কমানো ও শুল্ক কমায় নিট কর আহরণ কমবে।

আশার দিক হলো, জিডিপির আকার বাড়লে একই রেটে বেশি কর আহরণের কথা। এ বছর রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য মাত্রার তুলনায় কম হলেও আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। এর বড় কারণ আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্যের বৃদ্ধি। কিছুটা টাকার অবমূল্যায়ন; টাকার অবমূল্যায়ন এপ্রিল পর্যন্ত খুব বেশি হয়নি। এর ভিত্তিতে আমদানিভিত্তিক কর আদায় বেড়েছে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, পণ্যের দাম যদি না বাড়ে তাহলে রাজস্ব বাড়বে কি? কর আদায়ের জায়গায় কমপ্লায়েন্সের যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, সেখানে দুই ধরনের নীতি পরিবর্তন হয়েছে। একটা হচ্ছে ধমক। বলা হচ্ছে আপনার যদি একটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার থাকে এবং আপনি কর ফাইল না করেন তাহলে আপনাকে অনেক বেশি জরিমানা করা হবে। ভ্যাটের ক্ষেত্রে কিন্তু উল্টোটা ঘটেছে। ভ্যাটের জরিমানা কমানো হয়েছে। দ্বিতীয় ধমক হলো, আনডিসপুটেড ট্যাক্স, যেগুলো পরিশোধ করা হয়নি। আনডিসপুটেড ট্যাক্স হলো, এনবিআরের সঙ্গে করের মামলা হয়েছে এবং এনবিআর জিতছে। তাহলে ট্যাক্স আনডিসপুটেড হয়ে গেল। এমন অনাদায়কৃত ২ হাজার কোটি টাকার মতো আছে। এটা না দিলে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। বিদ্যুৎ, পানি বন্ধ করে দেয়া হবে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ধমক দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে কিছু প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। ব্যক্তির ক্ষেত্রে ট্যাক্স রিটার্ন ফাইল না করা হলে বছরভিত্তিক জরিমানা গুনতে হতো। সেটি মওকুফ করে দেয়া হয়েছে। এটা প্রথম ইনসেনটিভ। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকেও একই ধরনের সুযোগ দেয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ভর্তুকি বাবদ বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটে প্রস্তাবিত বাজেটের চেয়ে বেশি ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরেও এমন হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। ভর্তুকিতে বরাদ্দ নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ কী?

ভর্তুকিকে বলা যেতে পারে Elephant in the room। ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ৮৪ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি। মানে প্রতি ৮ টাকায় ১ টাকা সরকার ভর্তুকি দেবে। এটা একটা বিরাট অংক। এখানে ভর্তুকির ক্ষেত্রে যেটা প্রয়োজন ছিল তা হলো, যা আছে সেগুলো থাকবে বিষয়টা এমন নয়। কাজেই এখানে একটা রিশাফলিংয়ের ব্যাপার ছিল।

কৃষিতে বিরাট ভর্তুকি রাখা হয়েছে, এটা রাখা গুরুত্বপূর্ণ। দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এটি জরুরি। এখানে ভর্তুকি বাড়ছে। খোঁজা উচিত ছিল কোথায় ভর্তুকি কমানো যায়। রেমিট্যান্সের আড়াই শতাংশ ভর্তুকি দরকার ছিল না। যে উদ্দেশ্যে এটি দেয়া হচ্ছে তা খুব বেশি অর্জিত হয়েছে বলে মনে হয় না। উদ্দেশ্য ছিল আনুষ্ঠানিক খাতে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়ানো। এখানে উদ্দেশ্য ছিল না রেমিট্যান্স যারা পায় ওইসব পরিবারে আর্থিক সাহায্য বাড়ানো। এখানে বিশ্লেষণ করতে হবে আগে ইনফরমাল মার্কেটে প্রিমিয়াম কেমন ছিল? পরের প্রিমিয়াম কেমন হলো?

মে মাসে ডলারের দাম বেড়েছে। এখন প্রতি ডলারে মানুষ ৫-৬ টাকা বেশি পাচ্ছে। ফলে নতুন করে প্রণোদনার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। বাজেটে সেখানে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। সরকার এটি তুলে নিতে পারত। তাহলে ভর্তুকি ৮৪ হাজার কোটি থেকে ৭৮ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসত।

দ্বিতীয় হলো রফতানিকারকরা এখন ডলারের দাম বেশি পাচ্ছেন। কাজেই ক্যাশ ইনসেনটিভ রাখার দরকার কী? সরকার এখানে সাশ্রয় করতে পারে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, সার, ডিজেল এগুলো বাদ দিলে ৮৪ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি আছে, যেখানে সাশ্রয়ের সুযোগ ছিল।

তৃতীয়ত, সরকার প্রণোদনা কর্মসূচির ৭৭ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। বাকিগুলো এ বছর বাস্তবায়ন করা হবে। পরিসংখ্যান কী বলছে? শিল্প খাতে পরপর দুই বছর ডবল ডিজিট প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। তাহলে তাদের সুদের ওপর ভর্তুকির প্রয়োজনটা কোথায়? এটা দেয়া হয়েছিল সাময়িক আপৎকালীন সহায়তা হিসেবে। এখন এটি তুলে নেয়া যায় কিনা তা বিবেচনা করা যেতে পারে।

 

শ্রুতলিখন: নোমান বিন হারুন