করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি টালমাটাল। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে, মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে। ডলার সংকটে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানো হবে না বলে প্রতিশ্রুতি মিললেও দ্রুতই তা বাড়ানো হবে বৈকি, অতীত অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। পাইকারি দাম বাড়ানো হচ্ছে—এমন খবরে বিতরণ কোম্পানিগুলোও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদন তৈরি করা শুরুও করে দিয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। শেষ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর এ বোঝা জনগণকেই বহন করতে হবে। প্রশ্ন হলো, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য এখন উপযুক্ত সময় কিনা। কারণ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের স্বল্পতায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ধুঁকছে। মানুষও উচ্চমূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা। দুঃখজনক বিষয় হলো, ‘লোকসান’ কমানো ও ‘ভর্তুকি’র দোহাই দেয়ার পুরনো রীতিতেই এগোচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ, যা পরিহার করা প্রয়োজন। সিস্টেম লস, অব্যবস্থাপনা, ভুল পরিকল্পনা, দুর্নীতি বন্ধ না করে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে এ খাতে শৃঙ্খলা আসবে না। বলতে দ্বিধা নেই, আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে তৈরি করা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা আত্মঘাতী হয়েছে। ভ্রান্ত পরিকল্পনা পরিবর্তন না করে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি কোনো যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয়।
বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নের প্রধান বাধা নীতি-পরিকল্পনায় দুর্বলতা। সরকার বাস্তবতার নিরিখে পরিকল্পনা নেয়নি। ভোক্তার স্বার্থ না দেখে ব্যবসায়িক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। প্রায় শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছে। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের ক্ষমতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষমতা স্বল্প হওয়ায় কম বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে এবং বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যয় বাড়ছে। ফলে আর্থিক ঘাটতি বাড়ায় ভর্তুকি ও মূল্যবৃদ্ধি দুটিই বেড়ে চলেছে। প্রকৃত অর্থে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন হয়নি। বরং শতভাগ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। ঢাকার বাইরে ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। কারণ বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা। আবার বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে। অভিযোগ রয়েছে, ভর্তুকি কমানোর জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনও এখন কম করা হয়। বাস্তবে দেখা যায়, সক্ষমতা উন্নয়নে মান রক্ষা না হওয়ায় চাহিদার তুলনায় উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণক্ষমতা পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ন্ত্রণে নেই।
গ্যাস, কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি— তিনটিই হলো বাংলাদেশের নিজস্ব জ্বালানির প্রধান উৎস। এ উৎসের সদ্ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলা করার পরামর্শ দেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। তাত্ক্ষণিক নানা পদক্ষেপ নিয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতে পারে, কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হয় না। বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে যেকোনো মূল্যে দেশে নিজস্ব জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলেই কেবল সফলভাবে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলা করা যেতে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মানুষ যখন তীব্র মূল্যস্ফীতির সঙ্গে টিকে থাকার সংগ্রাম করছে, ঠিক তখনই জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বাড়িয়ে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে বাজারে নিত্যপণ্যের দামও হু হু করে বেড়ে গিয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যেমন থমকে গিয়েছিল, একইভাবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আয়ের ওপরও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বহু মানুষ কাজ হারিয়েছে, অনেকের ব্যবসাও বন্ধ হয়েছে। ফলে আয় কমে এসেছে দেশের একটি বড় অংশের মানুষের। এমন পরিস্থিতিতে তাদের স্বস্তি দিতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোই উত্তম, কিন্তু অতীতে দেখা গিয়েছে পাইকারিতে দাম বাড়লে খুচরায়ও বাড়ে। প্রত্যাশা থাকবে, বিদ্যুৎ বিভাগ এ মুহূর্তে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াবে না। ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন ব্যয় কমিয়ে আনতে সচেষ্ট হতে হবে।
বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, ২০২২ সালের পর থেকে বিদ্যুতের দাম কমানো হবে, কিন্তু সে প্রতিশ্রুতিও রক্ষা হয়নি। একাধিক বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু উৎপাদন ব্যয় কমেনি। এটি যে ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনাগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ তাতে সন্দেহ নেই। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বড় আকারে বেড়েছে। সরবরাহও স্বাভাবিক জায়গায় নেই। এ অবস্থায় সব দেশেই জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মজুদ, সরবরাহ কমেছে, সংকট বেড়েছে, দাম বেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামাল বা উপকরণ হিসেবে জ্বালানি তেল ও গ্যাস ব্যবহূত হয়। কয়লাও ব্যবহূত হয়। কয়লার দামও বেড়েছে। বলা যায়, সব দেশেই বিদ্যুৎ উৎপাদন অধিক ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে। সেক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানো ছাড়া উপায় কী? আবার এও সত্য, দুই বছরের অতিমারী এবং রাশিয়ায়-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতি এবং মানুষের অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে যেকোনো ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি অনাকাঙ্ক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। এদিকে লক্ষ রেখেই কিছুদিন আগে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের তরফে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছিল, দাম বাড়ানো ‘আত্মঘাতী’ হবে। অর্থনীতি এখন চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে। একদিকে ডলারের সংকট অন্যদিকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এ সময় জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যাহত, শ্লথ এবং কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে জনগণের জীবনযাত্রা আরো দুর্বিষহ হয়ে যাবে। এরই মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এতটাই বেড়েছে, সাধারণ মানুষ বিভিন্ন ব্যয় কাটছাঁট করছে। বিদ্যুতের দাম যখন গ্রাহক পর্যায়ে বাড়ানো হবে তখন সব জিনিসের দাম আরো এক দফা বা একাধিক দফা বাড়বে।
রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধারণাটি জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী। কোম্পানিগুলো থেকে সরকার উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনেছে। ১০ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ দিয়ে তাদের তেল আমদানির সুযোগ করে দিয়েছে, বিদ্যুৎ ব্যবসার পাশাপাশি তেলের ব্যবসাও দিয়েছে। তাছাড়া উৎপাদন করুক বা না করুক সরকারকে ভাড়া গুনতে হচ্ছে। একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী রেন্টাল, কুইক রেন্টালের নামে অসাধু ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা মুনাফা করে যাচ্ছে। পিডিবির সক্ষমতা বাড়ালে তারাই এ বাড়তি বিদ্যুৎ উত্পন্ন করতে পারত, কিন্তু সে পথে হাঁটেনি সরকার। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রয়োজন না থাকলেও সেগুলোকে বসিয়ে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ অর্থ দেয়া হচ্ছে। এ কারণেই পিডিবির ঘাটতি বাড়ছে। এ ধরনের কাজের দায়ভার চাপানো হচ্ছে জনগণের ওপর। সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিপিসির দেয়া তেলে চলতে পারলেও বেসরকারি কেন্দ্রগুলো নিজেরা পৃথকভাবে তেল আমদানি করে। ফলে সেখানে অনেক বেশি বাড়তি খরচ হয়। এসব খরচ বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া নিজেরা তেল আমদানির নামে বহু রকমের দুর্নীতি হয়। চুক্তির প্রথম মেয়াদেই প্রদত্ত ক্যাপাসিটি চার্জে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় উশুল হয়েছে অথচ এরপর চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও সে চুক্তির মেয়াদ বারবার বাড়ানো হয়েছে। মালিকদের ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া অব্যাহত রাখা হয়েছে। প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি বাদ দেয়া হয়েছে। অথচ চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো অব্যাহত রাখা হয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে কম দামে সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো হয়েছে। অথচ সেই গ্যাস ব্যক্তি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দিয়ে সেখান থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। নিজস্ব গ্যাস ও কয়লা সাশ্রয়ী মূল্যে উত্তোলন ও ব্যবহারের দিকে গুরুত্ব না দিয়ে আমদানীকৃত কয়লা, এলএনজি ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে কৌশলে বিদ্যুৎ খাতের এমন সব উন্নয়ন হয়েছে, যা ভোক্তা বা গণবান্ধব নয়।










