প্রাথমিক
শিক্ষা থেকে
আমরা সমাজের
নানা ধরনের
সংজ্ঞা শিখে
এসেছি। মাধ্যমিক
ও উচ্চমাধ্যমিকে
এসে ওই
সংজ্ঞার বাস্তবতা
উপলব্ধি করেছি।
সেই থেকে
অদ্যাবধি নতুন
নতুন সংজ্ঞা
উদহারণসহ দেখে
আসছি অথবা
শুনে আসছি।
যত রকমের
সংজ্ঞা শুনেছি
বা জেনেছি,
মৌলিকভাবে অর্থের
ভিন্নতা পাইনি।
বরং অর্থ
মিল রেখে
ওই সংজ্ঞার
বহুরূপতা প্রকাশ
পেয়েছে। প্রকৃত
অর্থে সমাজ
হলো এমন
একটা ব্যবস্থা
যেখানে অনেক
মানুষ একসঙ্গে
বসবাস করবে,
একে অন্যের
সুখ-দুঃখের
ভাগীদার হবে।
আমার যতটুকু
জানা, সমাজের
সংজ্ঞার মধ্যে
কোথাও পাইনি
যে, সহযোগিতা
ব্যতিরেকে একে
অন্যের অপকার
বা ক্ষতি
করবে। তাহলে
আমাদের সমাজে
এত চুরি,
ডাকাতি, খুন,
কেন হয়?
অন্যের সম্পদ
লুণ্ঠন, সম্মানহানির
মতো ঘটনা
কেন ঘটে?
যদি এসব
বন্ধ না
হয়, যুগ
যুগ ধরে
যদি এসব
চলতে থাকে,
তাহলে কি
আমাদের সমাজের
সংজ্ঞা নতুন
করে লিখতে
হবে? যা-ই
হোক, নতুন
সংজ্ঞা লেখার
আগে সমাজ
ব্যবস্থার স্বাভাবিক
সংজ্ঞাটা জেনে
নিই।
সমাজ ব্যবস্থা
হচ্ছে মানুষের
মানবীয় গুণাবলিতে
বিকশিত একটা
ফলাফলের নাম।
পৃথিবীর মানবসভ্যতার
শুরু থেকে
সমাজ ব্যবস্থার
অস্তিত্ব পাওয়া
যায়। একেক
যুগে, একেক
শতাব্দীতে, একেক
অঞ্চলে একেক
রকম সমাজ
ব্যবস্থা ছিল।
অনেক সময়
এটা নির্ভর
করে জাতি-বর্ণ-গোত্র
এবং নিজেদের
রুচি ও
চিন্তা-চেতনার
ওপর। বাংলাদেশের
মতো ছোট
একটা দেশে
বিভিন্ন জাতি
ও গোষ্ঠীর
সমাজ ব্যবস্থা
বিভিন্ন। কোনোভাবে
এটা এক
নয়। এমনকি
অঞ্চলভেদে এর
বহুরূপটা লক্ষণীয়।
টেকনাফের সমাজ
ব্যবস্থা এবং
তেঁতুলিয়ার সমাজ
ব্যবস্থার রূপ
এক নয়।
তেমনিভাবে আফ্রিকান
সমাজ ব্যবস্থা
ও ইউরোপের
সমাজ ব্যবস্থার
রূপ এক
নয়। এশিয়ার
সমাজ ব্যবস্থা
এবং আমেরিকার
সমাজ ব্যবস্থার
রূপও এক
নয়। এত
অমিলের মাঝে
মানুষ কীভাবে
অন্য সমাজের
সঙ্গে মিশে
যেতে পারে।
এটা জানার
জন্য অনেক
বেশি পড়াশোনার
দরকার আছে
বলে মনে
হয় না।
সমাজ ব্যবস্থার
রূপের ভিন্নতা
আছে কিন্তু
লক্ষ ও
উদ্দেশ্য এক
এবং অভিন্ন।
ভালো থাকা,
মিলেমিশে থাকা,
একে অন্যের
সহযোগিতা করা,
সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা
রক্ষা করা,
সবাই মিলে
সব ধরনের
খারাপ কাজের
বিরুদ্ধে থাকা
বা প্রতিহত
করা—এসব
দিক থেকে
কোনো ভিন্নতা
নেই। সংক্ষিপ্তভাবে
সমাজ ব্যবস্থার
সংজ্ঞা, বহুরূপতা,
অভিন্ন লক্ষ্য
ও উদ্দেশ্য
আলোকপাত করার
পর একই
প্রশ্ন আবার
আসছে। যদি
সমাজ ব্যবস্থার
উদ্দেশ্যে হয়
ভালো থাকা,
মিলেমিশে থাকা,
একে অন্যের
সহযোগিতা করা,
সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা
রক্ষা করা,
সবাই মিলে
সব ধরনের
খারাপ কাজের
বিরুদ্ধে থাকা
বা প্রতিহত
করা, তাহলে
আমাদের সমাজে
কেন এত
বিশৃঙ্খলা? কেন
এত অসহযোগিতা
এবং কেনইবা
এত অমিল?
বাস্তবিক সমাজ
ব্যবস্থা কি
আমরা প্রতিষ্ঠা
করতে পারিনি?
নাকি আমাদের
সামাজিক নিরাপত্তা
নেই? এসব
প্রশ্নের উত্তর
জানার আগে
সামাজিক নিরাপত্তার
সংজ্ঞা নিয়ে
একটু জানা
দরকার।
একজন মানুষের
সামাজিক নিরাপত্তা
আছে মানে,
সামগ্রিকভাবে সে
নিরাপদ। কারণ
সামাজিক নিরাপত্তার
সব সংজ্ঞাকে
একত্র করলে
দেখা যায়,
যে যেখানে
বসবাস করছে,
সে যে
পেশা-শ্রেণীর
হোক না
কেন সে
নিরাপদে থাকবে।
নিরাপদে ঘুমানো,
তিন বেলা
খাবারের নিশ্চয়তা
থাকবে, নিরাপদ
চলাফেরার, মত
প্রকাশের স্বাধীনতা,
ন্যায়বিচার, পড়াশোনার
সুযোগ-সুবিধা
থাকবে এবং
সমাজের মানুষ
সেই সুযোগ-সুবিধা
ভোগ করবে।
চুরি, ডাকাতি,
হত্যা, খুন,
অন্যের সম্পদ
লুণ্ঠন, অপবাদসহ
সব ধরনের
খারাপ কাজ
ওই সমাজ
থেকে দূরে
থাকবে। সামগ্রিকভাবে
নাগরিকের সব
প্রাপ্য অধিকার
সামাজিক নিরাপত্তার
প্রত্যক্ষ বা
পরোক্ষ অংশ।
আর যে
সমাজে মানুষ
নিরাপদে চলাফেরা
করতে পারে
না, নিরাপদে
ঘুমাতে পারে
না, তিন
বেলা খাবার
পায় না,
নিজের চিন্তা-চেতনা
বা মত
প্রকাশ করতে
পারে না,
মজলুম তার
প্রাপ্য ন্যায়বিচার
পায় না,
অভাবের তাড়নায়
কোমলমতি শিশুরা
পড়াশোনা করতে
পারে না,
চুরি, ডাকাতি,
হত্যা, খুন,
অন্যের সম্পদ
লুণ্ঠন, অপবাদ
ইত্যাদি খারাপ
কাজ চলতে
থাকে, তাহলে
আমাদের বুঝতে
হবে আমরা
নিরাপদ সমাজে
বসবাস করছি
না এবং
আমাদের সামাজিক
নিরাপত্তা নেই।
আমরা কি
নিরাপদ সমাজে
বসবাস করছি?
এবং আমাদের
কি সামাজিক
নিরাপত্তা আছে?
এ প্রশ্নগুলোর
উত্তর আমরা
পেয়ে যাব
যদি আমরা
সামাজিক নিরাপত্তার
সংজ্ঞার আলোকে
আমাদের সমাজের
বর্তমান অবস্থা
নিরীক্ষা করি।
মানুষ সামাজিক
জীব এবং
মানুষ নিয়েই
সমাজ। সুতরাং
সমাজ ভালো
চলবে, সমাজে
মানুষ ভালো
থাকবে এটাই
স্বাভাবিক। আমাদের
সমাজে অনেক
ভালো কাজ
হচ্ছে, কাজ
করার অনেক
ভালো মানুষ
আছে। আমরা
সেদিকে না
গিয়ে সমাজের
কিছু অপ্রত্যাশিত
কর্মকাণ্ড তুলে
ধরতে চাই।
একদিন একটা
ভাড়া গাড়ি
নিয়ে কিছু
মেহমান এলেন,
আমি ড্রাইভারকে
ডেকে বললাম,
আপনি নিচে
বসে আছেন
কেন? উপরে
চলে আসেন,
বাসায় এসে
বসেন। ড্রাইভার
আমাকে বলল,
আমি যদি
বাসায় গিয়ে
বসি, আমার
গাড়ির লুকিং
গ্লাসগুলো চোর
নিয়ে যাবে।
আমি শুনে
খানিকটা অবাক
হলাম—এটাও
চুরি হয়!
আমাদের গ্রামের
বাড়িতে আমার
এক আত্মীয়
আমাদের জমিতে
আলু চাষ
করেছে। বেশ
আলু হলো,
সামান্য কিছু
অংশের আলু
উত্তোলন করে
আমাদের অনেক
আলু দিয়েছে।
হঠাৎ একদিন
আমার মা
আমাকে ফোনে
বললেন, আবুল
বারাকাতের (ছদ্মনাম)
আলু খেতের
সব আলু
চুরি হয়েছে।
সামান্য কিছু
আলু সে
উত্তোলন করেছে,
বাকি আলু
রাতের আঁধারে
চোর চুরি
করে নিয়ে
গেছে। ওই
লোকটা, আমার
যতটুকু জানা,
অনেক কষ্ট,
পরিশ্রম এবং
অনেক টাকা
ব্যয় করে
আলু চাষ
করেছে।
পুকুরের মাছ
চুরি হয়
এটা অনেক
প্রচলিত কথা
যেটা অনেক
শুনেছি। খুব
কাছের এক
ভাই একটি
পুকুর লিজ
নিয়ে মাছ
চাষ করতেন,
হঠাৎ এক
রাতে তিনি
দেখেন এক
লোক তার
পুকুরের মাছ
জাল দিয়ে
ধরছে। মাছ
চুরি করলে
হয়তোবা ধরা
পড়বে, যার
জন্য পুকুরে
বিষ দিয়ে
মাছ মেরে
ফেলার অনেক
বাস্তব নজির
দেখেছি। বিভিন্ন
জায়গায় বৈদ্যুতিক
তার চুরির
কথা অহরহ
শোনা যায়।
আমার গ্রামের
বাড়ি থেকেও
বৈদ্যুতিক তার
চুরি হয়েছে
বলে জেনেছি।
অনেক দিন
পরে প্রিয়
মাতৃভূমি বাংলাদেশে
গিয়ে চট্টগ্রাম
শহরের বিখ্যাত
একটি মসজিদে
নামাজ আদায়
করতে গেলাম।
জুতা খুলে
ভেতরে নিয়ে
যাওয়ার কথা
স্মরণে ছিল
না। নামাজের
পর বের
হয়ে দেখি
আমার জুতা
নেই। আরো
অবাক হবেন,
আমার বিয়ে
উপলক্ষে কেনাকাটার
জন্য বের
হয়ে একটা
মসজিদে মাগরিবের
নামাজ পড়তে
গিয়ে মসজিদ
থেকে বের
হয়ে দেখি
আমার জুতা
নেই। চার
তলা একটা
বাড়ির দ্বিতীয়
তলায় আমার
ঘনিষ্ঠ এক
আত্মীয়ের বাসা,
নিচে অনেক
বড় লোহার
গেট, আছে
চৌকস নিরাপত্তা
কর্মী। সবার
চোখ ফাঁকি
দিয়ে তার
দ্বিতীয় তলার
বাসার দরজার
সামনে থেকে
তিন জোড়া
জুতা চুরি
করে নিয়ে
গেছে। খুব
সম্ভবত পবিত্র
রমজানের শুরুর
কিছুদিন আগের
ঘটনা।
যা-ই
হোক জুতা
চুরি, মাছ
চুরি আর
আলু চুরির
ফিরিস্তির ইতি
টেনে এবার
বহির্বিশ্বে একটু
নজর দেয়া
যাক। পড়াশোনা
বা কাজের
সুবাদে আমার
এ অল্প
বয়সে পৃথিবীর
এক প্রান্ত
থেকে অন্য
প্রান্তের অনেক
দেশে যাওয়ার,
ঘুরে দেখার
বা বসবাস
করার সুযোগ
হয়েছে। অহরহ
এসব কাজ
কখনো কোনো
দেশে দেখিনি।
মালয়েশিয়ায় আমার
এক ক্লাস
ফ্রেন্ড ক্রিকেট
খেলে নিয়মিত
কেডসটা ক্যাম্পাস
মসজিদের সামনে
রেখে যেত।
পরদিন এসে
আবার ওই
কেডস দিয়ে
ক্রিকেট খেলত।
আমার ছেলের
বাইসাইকেল বাসার
বাইরে রেখে
আমরা বাংলাদেশ
থেকে ঘুরে
এসেছি। দোকানির
দোকানের অনেক
পণ্য বাইরে
রেখে চলে
যেতে দেখেছি।
অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের
কোনো লোহার
দরজা দেখিনি,
শুধু গ্লাস
ডোর লক
করা দেখেছি।
একজনের জিনিসপত্র
অন্যজন নিয়ে
যাবে, বাসার
সামনে থেকে
জুতাটা চুরি
হয়ে যাবে,
বাগান থেকে
ফলগুলো রাতের
আঁধারে নিয়ে
যাবে, রাতের
অন্ধকারে মেহনতি
কৃষকের ফলানো
ফসল হাতছাড়া
হবে, এসব
কোনো সভ্য
সমাজে, নিরাপদ
সমাজে বা
মানুষের সমাজে
ভাবা কঠিন।
সমাজের সংজ্ঞা,
সমাজ ব্যবস্থা
এবং সামাজিক
নিরাপত্তার আলোকে
আমাদের বর্তমান
সমাজ ব্যবস্থার
উল্লিখিত ঘটনাবলি
যদি মূল্যায়ন
করি, আমরা
সামাজিক নিরাপত্তা
বলয়ে বা
নিরাপদ সমাজে
বসবাস করছি—এটা
বলার বা
মনে করার
কোনো কারণ
নেই। জুতা
চুরি থেকে
পুকুর চুরি,
পুকুর চুরি
থেকে রাষ্ট্রের
সম্পদ চুরি।
এভাবে অংকুরিত
হয় ছোট
থেকে বড়
বড় সব
অপকর্ম। এগুলো
কীভাবে বন্ধ
হবে? এর
জন্য দায়ী
কে? এবং
এসব বন্ধ
করার উদ্যোগ
কে নেবে?
এ প্রশ্নগুলোর
উত্তর যথাযথ
কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই
দেবেন। কিন্তু
আমাদের যার
যার অবস্থা
থেকে সচেতন
হতে হবে,
এসব অপকর্মের
বিরুদ্ধে সোচ্চার
হতে হবে।
রাষ্ট্র তথা
রাষ্ট্রের আইন
প্রয়োগকারী সংস্থাকে
সহযোগিতা করতে
হবে, পরিশেষে
এসব সামাজিক
অপরাধ রোধ
করার উদ্যোগ
রাষ্ট্রকেই নিতে
হবে। অন্যথায়
সমাজ তার
সামাজিকতার স্বরূপ
হারাবে। সমাজের
মানুষগুলো সামাজিক
নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে।
সমাজ তার
নিরাপত্তার জন্য
ডুকরে কাঁদবে
এবং এর
দায় আমরা
সমাজের মানুষ
ও দায়িত্বশীলদের
নিতে হবে।
ড. এস এম
এমদাদ হোসাইন: সহকারী
অধ্যাপক
ইউনিভার্সিটি অব নিজওয়া, ওমান










