করোনার টিকা যুগে প্রবেশ করেছে দেশ। চলছে টিকাদান। প্রাথমিকভাবে ৮০ ভাগ জনসাধারণকে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা সরকারের। চলমান টিকাদান কাজে প্রতিদিন ব্যবহূত সিরিঞ্জ-সুচ, ভায়াল, স্বাস্থ্যকর্মীদের মাস্ক, গ্লাভস, পিপিইসহ নানা সরঞ্জাম মিলে তৈরি হচ্ছে বিপুল ভ্যাকসিন বর্জ্য। এসব বর্জ্য ফেলা হচ্ছে যেখানে-সেখানে। বিভিন্ন ল্যান্ডফিলস, ইনসিনারেটর ও ইটিপির পাশাপাশি টিকাদানকেন্দ্রিক বর্জ্যগুলো এমনকি খোলা জায়গায়ও ফেলার খবর মিলছে। এটা বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণের অন্যতম বড় উপায় টিকাদান। এক বছরের ব্যবধানে বেশ কয়েকটি টিকা নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণ হয়েছে। দেশে দেশে চলছে সেসব টিকার প্রয়োগ। উন্নত দেশগুলো ব্যাপকভাবে টিকার কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় টিকাপ্রাপ্তি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সৌভাগ্যই বলা চলে। সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় উন্নত দেশগুলোর কাছাকাছি সময়ে টিকা পেয়েছে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে চলছে টিকাদান। চলমান টিকাদান কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে উত্পন্ন হচ্ছে বিপুল মেডিকেল বর্জ্য। তিন মাসের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও এসব বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়নি। হাসপাতালের চিকিৎসা বর্জ্য নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাইডলাইন থাকলেও সুনির্দিষ্টভাবে ভ্যাকসিন বর্জ্য নিয়ে নেই কোনো গাইডলাইন। ফলে এসব বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলায় জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ ও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এভাবে চললে ভবিষ্যতে তা হবে সাংঘাতিক বিপর্যয়ের। বিশেষজ্ঞরাও এ ব্যাপারে বারবার সতর্ক করছেন। কাজেই ভ্যাকসিন বর্জ্যের বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশ্বের সব মানুষকে করোনার টিকা প্রদান নিশ্চিত করাটা বিরাট কর্মযজ্ঞের ব্যাপার। এতে স্বভাবত তৈরি হবে বিপুল বর্জ্য। এটা আঁচ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বেশ আগেই সরবরাহ, লজিস্টিকস থেকে শুরু করে টিকাদান সৃষ্ট বর্জ্যের ব্যবস্থাপনার গাইডলাইন প্রণয়ন ও প্রকাশ করেছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে উৎস থেকে গন্তব্য পর্যন্ত বর্জ্যগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তার বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর উপায়-কৌশল তাতে সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সিডিসিও এ ধরনের গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে। আন্তর্জাতিক এসব গাইডলাইনের আলোকে দেশীয় বাস্তবতা উপযোগী করে অনেক দেশই নিজস্ব ভ্যাকসিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে। প্রতিবেশী ভারতও গত বছরের ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি গাইডলাইন প্রকাশ করেছে। সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে ওই গাইডলাইন অনুযায়ী ভ্যাকসিন বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করছে দেশটি। দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এ-সংক্রান্ত কোনো গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়নি। আপাতত বিদ্যমান মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা এবং মেডিকেল বর্জ্যের আদর্শ কর্মপদ্ধতি অনুসারে কাজটি চলছে। এক্ষেত্রে বার্নিং পি, ইনসিনারেটরসহ প্রচলিত পদ্ধতিগুলোই কভিড-১৯ টিকাদানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানো হচ্ছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় ও অন্য পক্ষগুলোর সমন্বয়হীনতায় সেটিও যথাযথভাবে পরিপালন হচ্ছে না বলে খবর মিলছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে উন্মুক্ত পরিসরেও, যা তৈরি করছে নতুন শঙ্কা। 

লক্ষণীয় বিষয় হলো বিদ্যমান বিধিমালায় চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে। অথচ হাসপাতালসহ অন্য স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। আবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মতো স্থানীয় সরকারগুলো। সংগ্রহ থেকে ডাম্পিংয়ের প্রতিটি পর্যায়ে লোকবল ও অন্য লজিস্টিক সাপোর্টের অপ্রতুলতায় সংস্থাগুলো এক্ষেত্রে অনেকটাই সক্ষমতাহীন। এর মধ্যে চলমান টিকাদান কার্যক্রম বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজটি আরো জটিল করে তুলছে। বিধিমালায় এখতিয়ার চিহ্নিতকরণে দুর্বলতার কারণে কে পালন করবে মূল ভূমিকা তা নিয়ে আছে দোলাচল। ফলে কাজটি হচ্ছে দায়সারাভাবে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর এখতিয়ার ও দায়িত্ব চিহ্নিতপূর্বক ভ্যাকসিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রণয়ন প্রথমত দরকার। খবরে প্রকাশ, বর্জ্য সংগ্রহের বিধিবিধান ঠিকভাবে পরিপালন করার অভাবে অনেক পরিচ্ছন্নতাকর্মীই জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। করোনার সময় এ হার আরো বেড়েছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে তাদের ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

দেশের চিকিৎসা বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা বরাবরই নাজুক। টিকাদান কর্মসূচি এটি আরো চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে। স্থানীয় সরকার ও বেসরকারি কিছু সংস্থার মাধ্যমে ভ্যাকসিন বর্জ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বটে, কিন্তু বিজ্ঞানসম্মতভাবে সেগুলো কীভাবে ধ্বংস করা হবে তার দিকনির্দেশনা অনুপস্থিত। এতে বাড়ছে ঝুঁকি। বিশ্বের উত্তম চর্চাগুলো অনুসরণ করে এক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। 

পর্যায়ক্রমিকভাবে দেশের সবাইকে করোনার টিকা প্রদানের বিষয়টি একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। দিন যত যাবে এ-সংক্রান্ত বর্জ্য বাড়বে। যথাযথভাবে সামলানো না গেলে টিকা বর্জ্য থেকে নানা রোগ ছড়াতে পারে বলে এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। এটাকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। একটি সময়োপযোগী গাইডলাইনের আলোকে টিকা বর্জ্যের ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কভিডের পরিপ্রেক্ষিতে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক। এটা ইতিবাচক। কাজেই অর্থ সংকট হওয়ার কথা নয়। সক্ষমতা বাড়াতে এটাকে কাজে লাগাতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও 

সব পক্ষের সমন্বয়ে দেশে চিকিৎসা বর্জ্যের টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা।