[গতকালের পর]

পাকিস্তানের রাজনীতি সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশ আমাদের দরকার। তবে আমার মতে, স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো সামরিক বাহিনী থাকতে পারবে না।’

১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে আমি পাকিস্তান থেকে ঢাকায় ফিরে আসি। এরপর আমি যখনই সময় পেতাম অধ্যাপক রাজ্জাকের বাড়িতে যেতাম। সে সময় আমার কিছু বন্ধু-বান্ধবকে, যেমন—আনিসুজ্জামান, নূরুল হক, প্রয়াত বিচারপতি হাবিবুর রহমান এদের কাউকে কাউকে নিয়ে গিয়েছি স্যারের বাড়িতে।

স্যারের কাছে গেলেই বহু কিছু জানা যেত। একই সঙ্গে তিনিও আমাদের কাছে অনেক কিছু জানতে চাইতেন। এ আলাপচারিতা আমার কাছে খুবই ভালো লাগত। রাজ্জাক স্যারের অত্যন্ত ভক্ত ছিলেন প্রয়াত বিচারপতি হাবিবুর রহমান।

ফজলে হাসান আবেদ যখন প্রথম ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেন এর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ছিলেন তিনজন কবি সুফিয়া কামাল, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ও ব্যারিস্টার ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী। একসময় ফজলে হাসান আবেদ স্থির করলেন তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয় করবেন। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ভাবলেন এবং আমাকে বললেন, ‘চলুন আমরা আমেরিকা ঘুরে দেখে আসি।’ আমি প্রশ্ন করলাম, ‘আর কে যাবে?’ তিনি বললেন, ‘ব্র্যাকের অ্যাডভাইজার বোর্ডের সদস্য ফারুক চৌধুরী আমাদের সঙ্গে যাবেন।’ কথা অনুযায়ী আমরা তিনজন যুক্তরাষ্ট্রে গেলাম। এটা সম্ভবত ১৯৯৫-৯৬ সালের কথা। আমরা হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, ইয়েল ইউনিভার্সিটি, পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটি, স্কিডমোর কলেজ ও অ্যামহার্স্ট কলেজে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা, গঠন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করলাম। দেশে ফেরার পর আমার স্ত্রী জানাল, আমাকে রাজ্জাক স্যার খুঁজেছিলেন। স্যারকে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলে তিনি পরদিনই যেতে বললেন।

স্যারের বাড়িতে যাওয়ার পর তিনি বললেন, ‘আমেরিকাতে গেছিলেন ক্যান?’

আমি বললাম, ‘স্যার, ব্র্যাক একটি ইউনিভার্সিটি করবে সেজন্য নানা বিষয়ে জানতে আমাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন ফজলে হাসান আবাদ।’

শুনে স্যার হাসতে হাসতে বললেন, ‘আবেদরে বলেন ইউনিভার্সিটি না কইরা একশটা ভালো হাইস্কুল করুক। সেইটা দেশের জন্য অনেক মঙ্গলজনক হইব।’

অনেকেই হয়তো জানেন, আবার অনেকেই জানেন না, রাজ্জাক স্যার ঢাকায় একটি হাইস্কুল করতে চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি তিনজনকে ঠিকও করেছিলেন, যারা তার স্কুলে যোগদান করবেন। তারা হলেন— বদরুদ্দীন উমর, সরদার ফজলুল করিম ও আনিসুজ্জামান। তাদেরকে স্যার বলেছিলেন, ‘তোমরা আমার স্কুলে জয়েন করবে।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি।

স্যারের সঙ্গে আমার বহু বিষয়ে আলোচনা হতো। এর মধ্যে কিছু বিষয় আমি উল্লেখ করতে চাই।

একবার আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রথম মিটিং হয় ১৮৮৫ সালে। সে সময় সভাপতি ছিলেন উমেশ চন্দ্র ব্যানার্জি। কিন্তু সে সময় মুসলমানরা রাজনীতি বিষয়ে কিছু করেনি। তখন তো আলীগড়ের স্যার সৈয়দ আহমেদ, মোহাম্মদ আলী, শওকত আলীরা ছিলেন।’

উত্তরে স্যার বললেন, ‘মাঝখানে একটা পরিবর্তন হয়েছিল। ১৯০৫ সালে যে অবিভক্ত বাংলা তৈরি হয়েছিল সেখানে ঢাকা ছিল রাজধানী এবং কলকাতা ছিল ভারতের রাজধানী। কিন্তু ১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জ দিল্লি সফরের সময় সেটা রদ করায় বঙ্গভঙ্গ হলো এবং ভারতের রাজধানী হলো নয়াদিল্লি, কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন করা তখনই সম্ভব হয়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে রাজধানীর অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সব কাজই আটকে যায়। ফলে রাজধানী কলকাতাতেই থেকে যায়। পরবর্তীকালে ১৯৩১ সালে রাজধানী দিল্লিতে সরিয়ে নেয়া হয়।’

স্যার আরো বললেন, ‘১৯১১ সালে পঞ্চম জর্জের বঙ্গভঙ্গ করার পেছনে মূল কারণ ছিল ব্রিটিশদের ডিভাইড অ্যান্ড রুলস পলিসি। এই পলিসি ভারতে খুব বেশি করে প্রয়োগ করা হয়। স্যার সৈয়দ আহমদ খান অল ইন্ডিয়া এডুকেশন কনফারেন্স করলেও তিনি খেলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর প্রথম সভাপতি ছিলেন স্যার সলিমুল্লাহ। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ পরিবর্তিত হওয়ার পর কলকাতা রাজধানী হিসেবে ভারতে রয়ে গেল। একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই থেকে গেল পূর্ব বাংলায়।’ এ বিষয় সম্পর্কে তিনি আমাকে পরে আরো বিস্তারিত বলেছেন।

একটা বিষয় স্যার আমাকে বলেছিলেন, তা হলো ‘দ্যাখেন, হিন্দু-মুসলমান হইলেও সবাই কিন্তু এক রকম হয় না।’ যেমন মওলানা আবুল কালাম আজাদ ভারতে রয়ে গেলেন দেশটির প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে। আল্লামা ইকবাল এক অর্থে ছিলেন পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা জিন্নাহর পিতা। কিন্তু সেটাও তখন হয়ে ওঠেনি। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গের পর মুসলিম লীগের মধ্যে রাজনীতি ছড়াতে শুরু করে। স্যার সৈয়দ আহমদ আলীগড়ে ১৮৮৬ সালে মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯৮ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

রাজ্জাক স্যারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ‘দ্বিজাতি তত্ত্বের ধারণাটি কী ছিল স্যার সৈয়দ আহমদ খানের? তিনি মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক দেশ আশা করেছিলেন?’

স্যার বললেন, ‘ঠিকই ধরছেন। ওইটা থেকে পাকিস্তান-দাবির বিষয়টি আসছে।’

১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠন হয়েছিল বিশেষ করে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য। পরবর্তীকালে ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব এবং ১৯৪৬ সালে দিল্লি প্রস্তাবে ‘স্টেটস’ থেকে ‘স্টেট’ হয়ে গেল। এ বিষয়ে স্যার আমাকে বিস্তারিত বলেছিলেন।

বদরুদ্দীন উমর আমাকে বলেছিলেন, ‘রাজ্জাক স্যারকে আমরা সক্রেটিস বলতে পারি।’

আমি জানতে চেয়েছিলাম, ‘কেন?’

তিনি বললেন, ‘কিছু না লিখেও অন্যদের বিদ্যা ও জ্ঞান চর্চার জন্য স্যার উদ্বুদ্ধ করতেন। তার শিক্ষা ছিল সক্রেটিসের মতোই মৌখিক শিক্ষাপদ্ধতি।’

রাজ্জাক স্যার তার একমাত্র লিখিত বক্তব্য দিয়েছিলেন ১৯৮০ সালে ঢাকায়, এর শিরোনাম ছিল ‘স্টেট অব দ্য নেশন’। ১৯৮১ সালে এটি প্রকাশিত হয়। সে সময় আমি ঢাকায় ছিলাম এবং স্যারের বক্তব্য শুনতে পাই। এটা নিয়ে স্যারের সঙ্গে আমার আলোচনাও হয়। এ বক্তব্যে দুটি অংশ ছিল। একটি ছিল ‘ডিসকাশন অন ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিকস’। সেখানে স্যার বলেছিলেন, বাংলাদেশের সম্পদ হচ্ছে এর ভূমি, জনগণ, কর্মী, ভৌগোলিক অবস্থান, নদীসমূহ এবং কৃষি ও উত্পাদনে তাদের প্রভাব। তিনি বলেছিলেন, এ নদীগুলোকে ভবিষ্যতের জন্য এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করা উচিত যাতে এগুলোকে আমরা কাজে লাগাতে পারি। কারণ আমরা জানি না কখন বন্যা হবে, কখন ফসল নষ্ট হবে।

বর্তমান সরকার প্রণীত ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ মূলত সে ১৯৮০ সালে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক যা ভেবেছিলেন, তারই প্রতিচ্ছবি।

অর্থনীতি সম্পর্কে অধ্যাপক রাজ্জাক বলেছিলেন, বাংলাদেশের প্রধান সম্পদ হলো ভূমি ও পানি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজনীতিতে যে বিভক্তি সৃষ্টি হলো সে সম্পর্কে রাজ্জাক স্যার তার ‘স্টেট অব দ্য নেশন’ বক্তৃতায় বলেছেন, ‘What holds us together makes us a nation is the exclusive passion to identify ourselves with this nation and nothing else. This, I believe, is what makes Bangabandhu the central figure of our time.’ তারপর তিনি আবার বললেন, ‘The difference between Bangabandhu on the one hand and Jinnah and Gandhi on the other. The window had forced an indivisible fusion between himself and the nation.’ এ বিষয়টি আমার কাছে খুব আশ্চর্য লেগেছিল। তিনি আরো যোগ করলেন, মধ্য এশিয়া বা মিডল ইস্ট থেকে অনেকে বাংলাদেশে আসত কিসের জন্য? বাংলাদেশ একসময় বাণিজ্যে খুব উন্নত ছিল, সেজন্যই তারা লাভের উদ্দেশ্যে এ দেশে আসত।

বাংলাদেশ সম্পর্কে অধ্যাপক রাজ্জাক আরো এক জায়গায় বলেছিলেন, ‘Even in Bangladesh, size of family goes down as the income goes on increasing. Population is the problem, but also it’s largest asset for productivity purposes.’ তিনি আরো বলেছিলেন, ‘The conditions of citizens is very poor in Bangladesh.’ যারা গ্রাম থেকে আসে তাদের জন্য মানিয়ে নেয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অধ্যাপক রাজ্জাক আরো বলেছেন, ‘Public expenditure and education was not adequate.’ তিনি আরো বলেছিলেন, ‘‘There is discrimination between men and women, between rural and urban population.’ ওই বক্তৃতায় তিনি আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন, সেটা হলো, ‘Most of the southern, most of the South and Southeast Asian countries in the Middle East and also in Latin America, majority of the people in the developing world were under military rule in some form or other, for some period, however short the period is. Military rule is a disaster, particularly in the legacies it leaves. I think such foresight was incompatible. That is what happened in Bangladesh in the eighties and in the nineties.’

(জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠের আয়োজনে ২৯ জানুয়ারি ২০২২ বেঙ্গল শিল্পালয়ে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের অপ্রকাশিত অভিসন্দর্ভ Political Parties in India গ্রন্থের প্রকাশনা উত্সবে প্রদত্ত বক্তৃতার বাংলা পাঠ) [শেষ]

 

মো. সাইদুজ্জামান: বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা সচিব, সাবেক অর্থমন্ত্রী ও সিপিডি ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান সদস্য