স্বনির্ভর কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উদ্যমী তরুণরা নানা রকম ব্যবসায়িক উদ্যোগ নেন। চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর দিনগুলো ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হয়। বেকারত্বের বোঝা না বয়ে নিজেই কিছু করার চেষ্টায় বর্তমানে উচ্চশিক্ষিত তরুণরাও এগিয়ে আসছেন। এক্ষেত্রে ডেইরি খামার চাহিদাসম্পন্ন ব্যবসা হলেও পশুখাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা চরম লোকসানে দিনাতিপাত করছেন। ফলে একপর্যায়ে তারা খামারগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, করোনা মহামারীর প্রভাব কমে যাওয়ার পর লোকসান কাটিয়ে গত বছর চট্টগ্রামের বেসরকারি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ডেইরি খামারগুলো ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। কিন্তু সম্প্রতি দফায় দফায় পশুখাদ্যের দাম বাড়ায় তারা আবারো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে এ অঞ্চলের তরুণ উদ্যোক্তারা একের পর এক ডেইরি খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। চিটাগং ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে গত দুই মাসে তিন শতাধিক খামার বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

অথচ করোনার পর নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে ডেইরি খামারমালিকরা তাদের কার্যক্রম ভালোভাবেই শুরু করতে সক্ষম হন। ফলে গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবসায় ভালো প্রবৃদ্ধিও এসেছে। এভাবে ডেইরি খামারে লোকসানের পেছনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও দায়ী। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর অন্যান্য জরুরি পণ্যের পাশাপাশি পশুখাদ্যের মূল্যও অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। পাশাপাশি খামারসংশ্লিষ্ট অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি খামারিদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে ওঠে। এ কারণে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য খামার পরিচালনার জন্য ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী ব্যয় সামাল দেয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে।

চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, গত ১৫ দিনে পশুখাদ্যের দাম বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ২৫০-৩০০ টাকা বেড়েছে। এছাড়া পশুর জন্য ব্যবহূত ওষুধের দাম ২০-২৫ শতাংশ বেড়েছে বলে ব্যবসায়ী ও খামারিরা জানিয়েছেন।

এ চিত্র আমাদের দেশের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের জন্য মোটেও উপযোগী নয়। এভাবে বর্ধিত মূল্যের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে লোকসানের মুখোমুখি হয়ে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলে তা সামগ্রিকভাবে আমাদের অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। কারণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্যের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করার যে প্রয়াসটুকু তারা নেন, তা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। এক্ষেত্রে ডেইরি খামার খুবই লাভজনক ও চাহিদাসম্পন্ন ব্যবসা হওয়ায় অনেক উচ্চশিক্ষিত তরুণ এক্ষেত্রে আগ্রহী হন। কিন্তু এভাবে লোকসানের সম্মুখীন হয়ে ব্যবসা ছেড়ে দিলে বর্তমান সময়ে তা খুবই নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য হবে।

এটা সত্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ডেইরি খামারের উৎপাদিত পণ্য হিসেবে দুধের চাহিদা কমে গিয়েছে। সেই সঙ্গে আটা-ময়দা, চিনি, নারকেলজাতীয় খাদ্যের দাম বাড়ায় দুধের চাহিদায়ও এর প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি খামারে উৎপাদিত দুধের প্রধান ক্রেতা স্থানীয় কারখানাগুলো থেকে অর্ডার কমে যাওয়াও এক্ষেত্রে প্রধান কারণ। এছাড়া জ্বালানি ও শিপিং ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমদানি মূল্য বেড়েছে। এ কারণে বর্ধিত মূল্যে বিক্রি করায় দুধের ক্রেতা কমে গিয়েছে।

প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে ব্যবসায়ীরা তো লোকসান দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখবেন না। এক্ষেত্রে বিশ্ব পরিস্থিতির দিকেও লক্ষ রাখতে হবে। সব মিলিয়ে আমদানি বাজার এখন আগের মতো লাভজনক অবস্থায় না থাকায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। তাই পশুখাদ্য হিসেবে পরিচিত পাতা ভুসি, চিকন ভুসি, মোটা কুঁড়া, মোটা কুঁড়া (আশুগঞ্জ), ছোলার ভুসি, লাল মটর, সাদা মটর, মুগ ডালের ভুসি, চিড়ার ভুসি, সাদা গম, লাল গম, ভাঙা ভুট্টা, সয়াবিন, সরিষার খৈল, সেদ্ধ খুদ, আতপ খুদ এসব খাদ্যের বাজার যেন স্থিতিশীল থাকে সেজন্য বর্তমান সময়ে বাজার তদারকি ও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে।

দুগ্ধশিল্প আমাদের জন্য অনেক সম্ভাবনাময় একটি শিল্প। আমরা অতীতেও দেখেছি ডেইরি খামারিরা গুঁড়ো দুধ আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর দাবিতে রাস্তায় দুধ ঢেলে প্রতিবাদ করেছেন। এক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ডেনমার্কের মতো ভর্তুকিও খামারিদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। তবে এটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কারণ আমদানীকৃত গুঁড়ো দুধের ক্ষেত্রে যে শুল্কহার বাড়ানোর দাবি করা হয়, সেক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক বাড়ালেও প্রকৃতপক্ষে সমাধান হবে না। কারণ এর ফলে গুঁড়ো দুধের ভোক্তাই কমে যাবে। তাই বিকল্প উপায়ে দুগ্ধশিল্পকে বাঁচানোর পরিকল্পনা করতে হবে। এক্ষেত্রে এটি পরিষ্কার যে দুগ্ধ খাতের উন্নয়নে শুধু আমদানি শুল্কের ওপর গুরুত্বারোপ না করে দুগ্ধ খাতের সব অংশীদার যেন তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করে, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক দুগ্ধ কোম্পানি বা আমদানিকারকদের একদিকে স্থানীয় দুগ্ধ উন্নয়নে মনোনিবেশ করতে হবে, অন্যদিকে সরকারকেও তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে ন্যায্য ভূমিকা রাখতে হবে। ঠিক একইভাবে স্থানীয় ডেইরি খামারের ব্যবসা সম্প্রসারণেও সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে। মোটকথা, দেশের দুগ্ধ খাতের উন্নয়নে সব অংশীদারের একত্র হয়ে কাজ করার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে যে অভিযোগগুলো রয়েছে তা নিরসনে খামারিদের দায়িত্ব নিজেদের দক্ষতা বাড়ানো, দুধের উৎপাদন খরচ কমানো এবং দুধের ভেজাল প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। দেশের কৃষি শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের সরকারের জন্য কৌশল বের করতে হবে, যেন সরকার দুগ্ধ খাতের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। এক্ষেত্রে সব ধরনের উন্নয়নকাজ যেন ঠিকভাবে হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য প্রধান কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে সরকারের মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।   

বাস্তবে দুগ্ধ খামারিদের আয় বৃদ্ধি নির্ভর করে দুধের উৎপাদন খরচ কমার ওপর। তাই উৎপাদন দক্ষতা বাড়িয়ে খরচ কমানোর বিষয়ে খামারিদের বেশি তত্পর হওয়া উচিত। বিশ্বব্যাপী দুধের গড় দামের চেয়ে বাংলাদেশের দুগ্ধ খামারিরা ৩৭ শতাংশ বেশি মূল্য পান। যদিও ছোট খামারিদের উৎপাদন খরচ বেশি হয় বলে তাদের লাভের পরিমাণ বেশি হয় না। ডেইরি উদ্যোক্তা খামার বন্ধ হলে ভোক্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং এতে দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করার সক্ষমতা কমে যাবে। তাই সরকারের উচিত মত্স্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে ডেইরি ফার্মগুলোকে টিকিয়ে রাখা। এর সঙ্গে বাজার ব্যবস্থা তদারকি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে পশুখাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে মনোযোগী হওয়া।