২৩ আগস্ট ২০২২-এ গেজেট হয়ে গেল বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০২২-৩৫। এর আগে ২০২০ সাল থেকেই এ বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) নিয়ে বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলে আসছে। প্রথম থেকেই ড্যাপের দুর্বল পয়েন্টগুলো নিয়ে কথা বলে আসছিল বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। বিশেষ করে আমরা স্থপতিরাও সোচ্চার ছিলাম। সেই সূত্র ধরেই কিনা জানি না, ড্যাপসংশ্লিষ্ট পরিকল্পনাবিদগণের দোষারোপের আঙুল স্থপতি সমাজের দিকে। তাদের অভিযোগ, স্থপতিরা নিজ স্বার্থে ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা এফএআর নিয়ে বিতর্ক তুলেছে।

সর্বাগ্রে অভিযোগগুলো খণ্ডন করি। তারপর পরিকল্পনাটি সম্পর্কে দুটি কথা জিজ্ঞাসা করার আছে। কারণ পেশাজীবী পরিচয়ের বাইরে গিয়ে আমি সাধারণ মানুষ। সে জায়গাটা থেকেই প্রথম অভিযোগ, ‘স্থপতিরা এবং বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (বাস্থই) শুধু ইমারত নির্মাণ বিধিমালা তথা এফএআর ইস্যু নিয়ে কথা বলছে। এ পরিকল্পনা প্রতিবেদনে আরো অনেক পয়েন্ট আছে সেগুলো নিয়ে কথা বলছে না।’

সম্পূর্ণ ভুল একটি তথ্যের ভিত্তিতে এ অভিযোগ করা হচ্ছে, কিন্তু রাজউকের সঙ্গে বাস্থই এর যে সমঝোতা স্মারক যেখানে স্পষ্ট লেখা আছে, মুখ্য জলস্রোত, সাধারণ জলস্রোত ও প্লাবন ভূমিতে যে শর্তসাপেক্ষ স্থাপনার কথা উল্লেখ করা আছে, তা ড্যাপ কর্তৃপক্ষকে পুনর্বিবেচনার কথা অনুরোধ করা হয়েছে এবং এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধতা ও ভূগর্ভস্থ পানি হ্রাসের যে পরিস্থিতি তা আরো খারাপ দিকে মোড় নেবে, সে আশঙ্কাও ব্যক্ত করা হয়েছে। ড্যাপের সম্মানিত প্রকল্প পরিচালক সে স্মারকে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে সই করলেও তা তিনি আমলে নেননি। এ সমঝোতা স্মারকটির একটি অনুলিপি ড্যাপ গেজেট হওয়ার পর সব বাস্থই স্থপতিদের সম্মুখে উপস্থাপন করে, এবং পরবর্তী সময়ে অংশীজন সভায়ও তা উপস্থাপন করা হয়। সুতরাং এ ধারণা সম্পূর্ণই ভ্রান্ত, স্থপতিদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু শুধুই স্থাপনা। বরঞ্চ ঢাকা, এর আশপাশের এলাকা ও সমগ্র বাংলাদেশকে বিবেচনায় এনে ড্যাপের সংশোধন প্রস্তাবে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখিত পেশাজীবীরা।

দ্বিতীয় অভিযোগ: ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮-এ অভিন্ন এফএআরের বিধান আছে।

এটিও সম্পূর্ণ ভুল একটি অভিযোগ। কোনোভাবেই এখানে অভিন্ন এফএআরের বিধান নেই। প্রকল্পের ধরন, প্লট সাইজ, রাস্তার প্রস্থ এই মূল তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এফএআর নির্ধারণ হয়ে থাকে।  এটা মাথায় রাখতে হবে, এ বিধিমালাটি ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা’ নগর নির্মাণের কাজ নয়। এ কথা জেনে রাখা ভালো, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা  রাজউকেরই বিধিমালা, যা গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত, ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ (১৯৫৩ সাল থেকে কার্যকর বলে একে ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫৩-ও বলা হয়ে থাকে) এর অধীন বিধিমালা। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা যা বিএনবিসিকে (বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড) যথাযথ মেনে প্রণীত হয়েছে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা প্রণয়নের পর থেকে ধীরে ধীরে ঢাকায় স্থাপনাগুলোর গঠনে পরিবর্তন আসতে থাকে। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা যা প্রণয়নের পর থেকে অন্তত পাঁচ কাঠা প্লটের পুরোটাজুড়ে একটি বেঁটে ভবন নির্মাণ করে সেটব্যাক এরিয়াতেও বারান্দা বানানো বন্ধ হয়েছে। এলিভেশন ট্রিটমেন্টের নামে যে হাস্যকর আর্টিকুলেশন করা হতো তা বন্ধ, আমি তো বলব অভিন্ন এফএআর বরং ড্যাপ রিপোর্টে আছে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মোতাবেক আপনি এক ধানমন্ডিতেই সব জায়গায় সমান এফএআর পাচ্ছেন না। স্কুল করতে হলে ৫ কাঠার ওপর জমি থাকতে হবে, রাস্তা চওড়া না হলে বিল্ডিং হাইট পাবেন না। কিন্তু ড্যাপের প্রস্তাবে পুরো মিরপুর ১০ ও ১১তে ২ দশমিক ৩, বসুন্ধরায় ৪ দশমিক ১, ধানমন্ডিতে ৫ দশমিক ১, বাড্ডার ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে ২ দশমিক ৪, ৩৮ নম্বরে ১ দশমিক ৯ এবং কড়াইল এলাকায় ১ দশমিক ৩ কাঠার এফএআর দেয়া হয়েছে। তাহলে কোথায় অভিন্ন এফএআর?

তৃতীয় অভিযোগ: ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮-এর কারণেই ঢাকা শহর ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।

-ঢাকা শহর ধ্বংসের একমাত্র কারিগর যে রাজউক এ কথা খোদ রাজউক কর্তারাও অস্বীকার করতে পারবেন না। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা করার একটা মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সর্বোচ্চ আচ্ছাদিত স্থান বা এমজিসি কমানো, যা ৫ কাঠা বা ১০ কাঠার প্লটের পুরোটা জুড়ে করা স্থাপনাগুলোর কারণে বেড়ে যাচ্ছিল। বিধিমালায় স্পষ্টত উল্লেখ আছে আবশ্যিক উন্মুক্ত স্থানের পঞ্চাশ ভাগ মাটি রাখতে হবে, যার প্রধান কারণ হলো ভূগর্ভস্থ পানির প্রবেশ। ঢাকা ও এর আশপাশ ধ্বংস করে চলেছে রাজউক। রাজউক এ পৃথিবীতে একমাত্র সংস্থা, যা একই সঙ্গে দুটি ভূমিকা পালন করে। একটি হলো পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং ভূমি উন্নয়ন সংস্থা। রাজউক নিজেই নিজের প্ল্যানের ব্যত্যয় করে এসেছে বরাবর, ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮’ বাদ যাবে কেন? সে বিষয়ে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত লিখব। শুধু এটুকু জিজ্ঞাসা বসিলা এলাকা চোখের সামনে বস্তি হয়ে গেল, রাজউক কোথায় ছিল? পূর্বাচলের আশপাশে ১৯টি ডেভেলপার আবাদি জমি, খালবিল ভরাট করে জমি বিক্রির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, রাজউক কী পদক্ষেপ নিয়েছে? পুরান ঢাকায় একের পর এক ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে রাজউক কি করেছে? ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মেনে যে ভবন তৈরি হচ্ছে তার চেহারা আর অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ভবনের চেহারা মিলিয়ে দেখে নেবেন। বিধিমালা মেনে ধানমন্ডিতে যেসব বাসাবাড়ি হয়েছে সেখানে বাচ্চাদের খেলার জায়গা রাখা হয়েছে। তা যত ছোটই হোক। রাজউক একটা মাঠ দখলে নিতে পেরেছে শিশুদের জন্য? তাহলে ঢাকা নষ্টের কারিগর কে? ২০ বছর আগের সংরক্ষিত এলাকাগুলো কার গাফিলতি ও অদক্ষতায় প্রবর্ধন ব্যবস্থাপনা এলাকা বা গ্রোথ ম্যানেজমেন্ট এরিয়া হয়ে গেল? আরো প্রশ্ন জাগে মনে, কোন যুক্তিতে খালসংলগ্ন প্লটে ইমারত নির্মাণের অনুমতির প্রস্তাব দেয়া হলো? ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ৬ ফুট রাস্তার পাশে বাড়ি নির্মাণের অনুমতি দেয়া হয় না, ড্যাপে কেন হলো? তাহলে শহর ধ্বংসের কারিগর কারা?

চতুর্থ অভিযোগ: স্থপতিরা নিজ স্বার্থে ড্যাপ ২০২২-৩৫-এর ক্ষতি সাধন করতে চাইছে।

আবারো ভুল। ড্যাপে এফএআর বাড়লেও যেসব স্থপতি কাজ পাওয়ার তারা পাবেন, না বাড়লেও পাবেন। এফএআর কমিয়ে দেয়া মানে ভবনের সংখ্যা বেড়ে যাবে। সেগুলো ডিজাইন করবে কে? স্থপতি। সাপোর্ট টিম? প্রকৌশলীরা। কৃষি জমিতে শর্ত সাপেক্ষে স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেয়া হয়েছে। শর্ত মেনে সে স্থাপনার নকশাও স্থপতিই করবেন। জলকেন্দ্রিক ইকোপার্ক, ইকো রিসোর্ট এসবের নকশাও স্থপতি করবেন। কাজের সুযোগ তো সে অর্থে বেড়ে গেল। শহর ধ্বংস হয়ে গেলেওবা স্থপতিদের কি? তবে কি জানেন? নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না। কিছু প্রশ্ন এক্ষেত্রে না করলেই না। এই যে এফএআর কমিয়ে স্থাপনা বিস্তৃতি বাড়িয়ে দেয়া হবে, এ প্রস্তাবকে আধুনিক বলা কতটা যুক্তিগ্রাহ্য? প্লাবন ভূমিকে ভূমি ব্যবহার শ্রেণীবিন্যাসে অন্তর্ভুক্তি না দেয়া, কৃষিজমি ও জলাভূমিতে শর্তসাপেক্ষে উন্নয়নের অনুমোদন ইত্যাদি প্রস্তাব কি বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়? খালসংলগ্ন প্লটে বাড়ি আজ করলেন, কাল আপনার রাস্তার প্রয়োজন হবে, তখন খাল ভরাট করে রাস্তা বানাবেন—এমনটা যে ভবিষ্যতে হবে না ড্যাপ প্রণেতারা সে নিশ্চয়তা দিতে পারেন কি? উন্নয়নস্বত্ব বিনিময় ব্যবস্থাকে উন্নয়নস্বত্ব বিক্রয় ব্যবস্থা হিসেবে প্রস্তাব দেয়া এবং রাজউক নিজেই এক্ষেত্রে ব্যাংকের ভূমিকা পালন করবে এমন পরিকল্পনা প্রণয়ন কিসের ইঙ্গিত দেয়? যে প্রতিষ্ঠান আগাগোড়া দুর্নীতিপরায়ণ একটি প্রতিষ্ঠান, সে যখন এ ক্রয়-বিক্রয়ের দায়িত্ব হাতে নেবে, অবস্থা দাঁড়াবে কী? আরো প্রশ্ন জাগে মনে, রাজউক কোন স্বার্থে Dhaka Structure Plan ২০১৬-৩৫ গেজেট হওয়ার আগে বেআইনি ড্যাপ গেজেট করতে সরকারের কাছে অগ্রসর হলো? এতসব কিছু পর্যালোচনা করে যা দেখছি, তাতে এফএআর আসলে কোনো ইস্যুই না। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এ শহরের জীবন, যা আমরা তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতে দেখেছি অসহায়ের মতো।

এবার আসি ড্যাপ প্রতিবেদনের দুটি মূল বিষয়ে।

পরিকল্পনার শুরুতে এর মূল চারটি লক্ষ্যে চোখ রাখলে বোঝা যাবে এর গোড়াতেই গলদ। সেগুলো দেখা যাক;

ক. বিনিয়োগের সর্বজনীন স্বাধীনতা

খ. উন্নত জীবনমান

গ. সহনশীল শহর

ঘ. বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবন

দেখে প্রথম যে কথাটি মাথায় আসে তা হলো, আপসাইড ডাউন।  জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সমগ্র বিশ্ব যেখানে সোচ্চার সেখানে পুরো ক্রমটি নিচ থেকে শুরু হওয়া উচিত ছিল। পুরো রিপোর্টে এ গলদের প্রভাব খুব ভালোভাবেই পড়েছে। আদতে মনে হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বুঝতেই পারেননি ঢাকার, সর্বোপরি বাংলাদেশের মূল সমস্যাগুলো অথবা ইচ্ছা করেই পাশ কাটিয়ে গেছেন।

এবার এ পরিকল্পনার নির্ধারিত ভূমি ব্যবহার এলাকার দিকে নজর দিলে দেখা যায়, এখানে কোথাও প্লাবন ভূমির উল্লেখ নেই। কারণ প্লাবন ভূমির ব্যবহারকে হালের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় কৃষি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখানেই প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় কেন এ সিদ্ধান্ত? কেন এত মিশ্র ব্যবহার এলাকা? কোন কোন তথ্য-উপাত্ত ও স্থিতিমাপক বা প্যারামিটারের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে? এ উত্তরগুলো পুরো প্রতিবেদনের কোথাও খুঁজে পাইনি। কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে আমাদের আলোকিত করবেন আশা রাখি।

পরিশেষে এ বলব, আমরা চাই ড্যাপ বাস্তবায়ন হোক আর তা যথার্থ সংশোধন, পরিশীলন ও পরিমার্জনের মাধ্যমে। ঢাকাকে বাঁচাতে একটি যথোপযুক্ত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা প্রয়োজন, যা একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য ড্যাপের মাধ্যমে সম্ভব। ড্যাপ সংশোধন অত্যন্ত প্রয়োজন এই অর্থে যে এ বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাটি বস্তুত ডিটেইলের দিকে না গিয়ে পলিসি নিয়ে বেশি ভেবেছে ও লিখেছে। এটাকে অনায়াসে একটি পলিসি প্ল্যান বলাই ভালো। তেমন একটি পলিসি প্ল্যান যার বেশকিছু পলিসি আমাদের বিদ্যমান পলিসিগুলো যেমন—কৃষি, জলাভূমি, পরিবেশ ইত্যাদি সম্পর্কিত আইনগুলোর সঙ্গে অনেকাংশেই সাংঘর্ষিক। আশা করব ড্যাপের অসংগতিগুলো আমলে নেবে কর্তৃপক্ষ এবং তা শুধু ঢাকা না, সমগ্র দেশের স্বার্থে। কারণ আজ ঢাকা যা ভাবে, কাল পুরো বাংলাদেশ তাই ভাবব। ঢাকার পরিকল্পনার ত্রুটিগুলো পুরো দেশে পুনরাবৃত্তি হয়ে আসছে। এর থেকে আশু পরিত্রাণ না হলে সর্বনাশের আর বাকি থাকবে না কিছুই।

 

তাসলিহা মওলা: স্থপতি ও গবেষক