দেশে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় দেশের শিল্প-কারখানাগুলো উৎপাদন সংকটে ভুগছে। এছাড়া বর্তমানে আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। এর বিপরীতে এলপিজি ও এলএনজির ব্যবহার বেড়ে গিয়েছে। অথচ আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণ নিজস্ব গ্যাস সম্পদ রয়েছে। কিন্তু কার্যকর পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতার কারণে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা গ্যাস অনুসন্ধানে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) আরো কার্যকর ভূমিকা পালনের ওপর জোর দিয়েছেন।
গ্যাস সংকটের প্রেক্ষাপটে ২০০৯ সালে নতুন করে আবাসিক গ্যাস সংযোগ দেয়া বন্ধ করে দেয় সরকার। ২০১৩ সালের শেষের দিকে আবাসিকের সংযোগ চালু করা হয়, কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর জ্বালানি বিভাগ থেকে অলিখিতভাবে বিতরণ কোম্পানিকে আবাসিকের নতুন আবেদন নিতে নিষেধ করে দেয়া হয়। পরে ২০১৯ সালে ফের আবাসিক সংযোগ স্থগিত রাখার আদেশ জারি করা হয়। তবে আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকলেও গ্যাস সংকট দূরীভূত হয়নি। এখনো বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কম থাকার অভিযোগ করা হয়। প্রায় সময় গ্যাস থাকে না এমন চিত্রও নগরীতে পুরনো। তার ওপর গ্যাস সঞ্চালন লাইন মেরামত করার সময় গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাতে উৎপাদন উদ্বেগজনকভাবে কমছে। পণ্যের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহে ঘাটতি হচ্ছে। ফলে পণ্যের দাম বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গ্যাসস্বল্পতার কারণে কারখানার উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশে নেমে গিয়েছে। এক্ষেত্রে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে কর্মীদের ওভারটাইম করিয়ে সচল রাখতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছে। সম্প্রতি গ্যাস সংকটের কথা জানিয়ে দেশের শিল্পমালিকরা সরকারের কাছে গ্যাস আমদানির কথা বলেন। এ সময় তারা গ্যাসের বাড়তি মূল্য পরিশোধেরও প্রস্তাব দেন।
বিদ্যমান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের স্থল ও জলভাগে অনেক গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে, কিন্তু নিজ দেশের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন অকার্যকর রেখে সহজ পথে এলএনজি আমদানিতে মনোযোগ দেয়া হয়েছে বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, বাংলাদেশে গ্যাস নেই, এ কথার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং বাংলাদেশে প্রচুর গ্যাস আছে, ঠিকমতো অনুসন্ধান করলে এ গ্যাস উত্তোলন সম্ভব। এজন্য ব্যাপক হারে গ্যাস অনুসন্ধানে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য বাপেক্সকে আরো জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে বলে তারা মত দিয়েছেন। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে এক্ষেত্রে আর দেরি করা ঠিক হবে না বলেও তাদের পরামর্শ রয়েছে।
বাস্তবতা হচ্ছে, গ্যাস উত্তোলনে জাতীয় সক্ষমতাকে না বাড়িয়ে চলমান সংকট থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে এলএনজি আমদানি করে সাময়িক জোগান দেয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর মাধ্যমে গ্যাস সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়। তাছাড়া এলএনজি ও এলপিজি বেশ ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ বটে। পরিসংখ্যান বলছে, আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণে গ্যাস সম্পদ রয়েছে, কিন্তু মাস্টারপ্ল্যানে নিজস্ব গ্যাসের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব না দিয়ে এলএনজিনির্ভরতার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া গ্যাস সম্পদ একটি দেশের জাতীয় সম্পদ হওয়ায় এর উত্তোলন প্রক্রিয়া দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই হওয়া উচিত, কিন্তু দেশের প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা থাকার পরও বারবার বিদেশী কোম্পানিকে গ্যাস উত্তোলনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, এমন অভিযোগও পাওয়া যায়। কয়েক বছর আগে দেখা গিয়েছিল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স ১০৮টি গ্যাসফিল্ড খননের পরিকল্পনা করার পরও জ্বালানি মন্ত্রণালয় বাপেক্সকে বাদ দিয়ে গ্যাসফিল্ডগুলো রাশিয়ার কোম্পানি গ্যাজপ্রমের কাছে দেয়া হয়। এভাবে রাষ্ট্র মালিকানাধীন কোম্পানিকে গ্যাস উত্তোলনের দায়িত্ব না দেয়াটা দুঃখজনক। কেননা এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হওয়ার সম্ভাবনার পাশাপাশি চুক্তি অনুযায়ী সরকার ছাড়াও তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির সুযোগ থাকায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের গোপন তথ্য বিদেশীদের কাছে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, এটি আমাদের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। তাছাড়া বিদেশী কোম্পানি হলেই যে তারা খুব দক্ষ হবে, সেটিরও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের যেহেতু সক্ষমতা রয়েছে, তাই সেটি অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে। তাছাড়া বিদেশী কোম্পানিকে কাজ দিলে দেশী প্রতিষ্ঠানের গ্যাস উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রও অব্যবহূত থেকে যায়, যা পরবর্তী সময়ে অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাকে অবহেলা করা যাবে না।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যাপকভাবে কাজে লাগালেও ২০১০-এর দশকে এলএনজি ও এলপিজির নির্ভরতা বেড়ে যায়। এতে যে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে, তেমনটি নয় বরং গ্যাস সংকট আরো তীব্র হয়েছে। ফলে এখন গ্যাস অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তাই ফুটে উঠছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সই রাষ্ট্রীয় মালিকানা অক্ষুণ্ন রেখে স্থল ও জলভাগে গ্যাস উত্তোলন করতে সক্ষম। কিন্তু বাপেক্সকে সরকার বাজেট না দিয়ে বিদেশী কোম্পানিতে আগ্রহ দেখায় এমন অভিযোগও দীর্ঘদিনের। বাপেক্স বাংলাদেশের সিলেটের জকিগঞ্জে দেশের ২৮তম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এ কূপ থেকে ৪৮ বিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা যাবে। বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বাপেক্স দেশের সর্বত্রই অনুসন্ধান চালানোর কথা বলেছে এবং জরিপে পাওয়া গেলে বাংলাদেশের যেকোনো জায়গা থেকেই গ্যাস উত্তোলনের ক্ষমতা রয়েছে বলে বাপেক্স জানিয়েছে। বাপেক্সের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্যানুযায়ী, এ মুহূর্তে ১২টি অনুসন্ধান কূপ, ১৭টি উন্নয়ন কূপ, নয়টি আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র এবং সাতটি উৎপাদনক্ষম গ্যাসক্ষেত্র এ কোম্পানির আছে। তবে বাপেক্সকে কতটা কাজ করতে দেয়া হয় তা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে সরকারের বাইরে থেকে। বিশেষজ্ঞরাও অনেকে বলেন, বাপেক্সকে দিয়ে আরো কাজ করানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নানা স্বার্থে বিদেশী কোম্পানিকে কাজ দেয়া হয়।
কিন্তু সরকার চাইলে বাপেক্সের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার আরো উন্নয়ন ঘটিয়ে দেশের গ্যাস কূপ খননের সব কাজ এ সংস্থাকে দিতে পারে কারণ তাদের দক্ষতা এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। আমরাও চাই, গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক। এক্ষেত্রে বিদেশী কোম্পানিকে কাজ না দিয়ে বাপেক্সকে আরো কার্যকর করা প্রয়োজন। যদিও সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক কারণে গ্যাসের হাই প্রেশার জোনে অনুসন্ধানের কাজ বিদেশী অভিজ্ঞ কোম্পানিকে দিয়েই করাতে হবে কারণ বাপেক্সের এ ধরনের জোনে কাজ করার যথেষ্ট সক্ষমতা এখনো হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাপেক্সকে যথাযথ গুরুত্ব দিলে যেকোনো জায়গায় কাজ করার জন্য স্বল্পসময়েই যোগ্য করে গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা আশা করব, গ্যাস সংকট নিরসনে বাপেক্সের দক্ষতাকে সরকার মূল্যায়ন করবে এবং বাপেক্স গ্যাস অনুসন্ধানে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।










