জাপানের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট-এফটিএ) স্বাক্ষরের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ। সব ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের আগেই দেশটির সঙ্গে এ চুক্তি করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে পণ্য রফতানিতে শুল্কমুক্ত এবং কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা থাকবে না। ফলে ওইসব দেশকে রফতানির ক্ষেত্রে উচ্চশুল্কের শিকার হতে হবে। এতে বিশ্বের রফতানি বাজার বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংকুচিত হবে। এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বাংলাদেশের রফতানি বাজার সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশ এবং অঞ্চলের সঙ্গে ইপিএ, পিটিএ ও আরটিএ চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। জাপানের সঙ্গে এফটিএ কিংবা ইপিএ স্বাক্ষরে সম্ভাব্য যাচাই শুরু করা তার ধারাবাহিকতারই অংশ। জাপানি কোম্পানি বলেছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর জাপানে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) উঠে গেলে তারা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক বাজার আসিয়ান, চীন ও ভারতের মতো দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার চিন্তা করতে পারে। অথবা উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যেই এফটিএ স্বাক্ষর জরুরি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যে উদ্যোগ নিয়েছে অর্থনীতির স্বার্থে সেটি দ্রুত এগিয়ে নেয়া প্রয়োজন। 

জাপান বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশ এবং বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্য এবং উন্নয়ন সহযোগী। বিগত ৫০ বছর জাপান বাংলাদেশকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। জাপান এখন বাংলাদেশের বড় রফতানি বাজারও। দুই দেশের বাণিজ্য দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগের পরিমাণও কম নয়। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় স্পেশাল ইকোনমিক জোনে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এমন অবস্থায় জাপানের সঙ্গে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) অথবা ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের (ইপিএ) মতো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাণিজ্য সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রাখবে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপানে ১ দশমিক ৩৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রফতানি করেছে, একই সময়ে ২ দশমিক ৪১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। জাপানের বাজারে এখন ১ বিলিয়নের বেশি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি হচ্ছে। আগামীতে মুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পাওয়া গেলে এ রফতানি আরো বাড়ানো কঠিন হবে না। যেকোনো দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে রাজস্ব লোকসান এবং স্থানীয় শিল্প সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশেষত যেসব দেশে বাংলাদেশের রফতানির চেয়ে আমদানি বেশি ওই সব দেশ, বিশেষত ভারত, চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে চুক্তি করা উচিত। আশার কথা, এরই মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভুটানের সঙ্গে এফটিএর বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। এর বাইরে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকার সঙ্গে এফটিএর বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। আরো আট থেকে ১০টি দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের (সিইপিএ) আওতায় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চলছে। অন্যদিকে কিছু আঞ্চলিক চুক্তির সঙ্গেও যুক্ত হতে চাইছে বাংলাদেশ, যাতে ওই সব অঞ্চলের দেশগুলোয় রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যায়। শুধু আলোচনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মধ্যে সবকিছু আটকে থাকলে চলবে না, দৃশ্যমান অগ্রগতি থাকতে হবে। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে আরো সক্রিয় হতে হবে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে তাল মিলিয়ে চলতে হলে বাংলাদেশকে এফটিএ, পিটিএর মতো চুক্তিতে যেতে হবে। রাজস্বের অংশ হিসেবে শুল্কের ওপর নির্ভরতা সরকারকে কমিয়ে আনতে হবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশও তাই করছে। তাদেরও একসময় অনেক প্রতিরক্ষণ (বেশি হারে শুল্ক) ছিল। কিন্তু এখন দুই-তিন শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ভিয়েতনামও তাই করেছে। ভিয়েতনাম এরই মধ্যে ১২টিরও বেশি দেশের সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষর করেছে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে পিছিয়েই রয়েছে।  বাংলাদেশ কেন পারছে না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, বিনিয়োগ ওই সব অর্থনীতিতেই প্রবাহিত হয়, যেগুলো অন্য এক বা একাধিক বড় অর্থনীতির সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যের অংশীদার। কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিতে বিনিয়োগ প্রবাহিত হয় না। বাংলাদেশকেও এফটিএ, পিটিএতে যেতেই হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর বাণিজ্যিক জোট আসিয়ানের দেশগুলোর গড় ট্যারিফ (শুল্ককর) হার ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে তা ২৬ শতাংশের বেশি। এত বেশি শুল্কের দেশের সঙ্গে কেউ বাণিজ্য করতে আগ্রহী হবে না। জানা গিয়েছে, বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ২০২৪ সালে সম্ভাব্য ধাক্কা সামলাতে এ ধরনের চুক্তি করার বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল। যেকোনো দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু হলে সঙ্গে সঙ্গেই তা বাস্তবায়ন হয় না। এ আলোচনা আরো আগে থেকেই হওয়া দরকার ছিল। তাও মন্দের ভালো, এখন এ বিষয়ে অগ্রগতি হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন কয়েক দশক আগে বাংলাদেশকে যে জিএসপি সুবিধা দিয়েছে, তা তারা অন্য অনুন্নত দেশকেও দিয়েছে। একটা পর্যায় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রও তাদের বাজারে রফতানি করার জন্য জিএসপি সুবিধা দিয়েছিল; কিন্তু এখন আর নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ ওই সুবিধার কোনো সুযোগ নিতে পারেনি। কারণ হলো বাংলাদেশ একটিমাত্র পণ্য দিয়ে রফতানি বাস্কেটের বিরাট অংশ সাজিয়েছে, সে পণ্য জিএসপি সুবিধার আওতাভুক্ত ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোকে তাদের বাজারে কম শুল্কে বা বিনা শুল্কে পণ্য বেচার জন্য সুযোগ দিয়ে চুক্তি করেছে, অন্য কয়েকটি অর্থনীতির সঙ্গেও বিশেষ সুবিধা দিয়ে চুক্তি করেছে; কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে তেমন কিছু ঘটেনি। বাংলাদেশ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকেও বেশি ট্যাক্স বা রফতানি শুল্ক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য বিক্রয় করছে। তাতেও বাংলাদেশ ভালো করছে। ওই ভালো করার পেছনে রয়েছে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কস্ট কম্পিটিটিভনেস। বাংলাদেশ তাদের শুল্ক দিয়েও কম মূল্যে বিক্রয় করতে পারে বলে ওই বাজারে রফতানি বাড়ছে। তবে সেই প্রবৃদ্ধিও থেমে যেতে পারে, ভিয়েতনামসহ অন্য দেশগুলো যদি বিশেষ বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রীয় বাজারে তৈরি পোশাক নিয়ে প্রবেশ করতে পারে। মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের জন্য চাহিদা অসীম নয়। ওই চাহিদা একটি নির্দিষ্ট অংকের। সেই চাহিদা ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়াও পূরণ করতে পারে। অন্যরা পূরণ করলে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে, আর তারা না পারলে বাংলাদেশ সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে।

আজকের দিনে বাস্তবতা হলো কোনো বড় অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সংযুক্ত না হয়ে কোনো ছোট অর্থনীতিই উন্নতি করতে পারবে না। বাংলাদেশে বিদেশীরা, এমনকি দেশীয় ধনী লোকরা বিনিয়োগ করবে কেন? বিনিয়োগ করে তারা পণ্য ও সেবা কোন বাজারে বিক্রি করবে। আর সে জন্যই অঞ্চল ভিত্তিতে হোক বা দ্বিপক্ষীয়ভাবে হোক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির দিকে যেতে হবে। যারা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সুবিধা দিতে চায়, তাদের দিকেই হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। জাপানও এক্ষেত্রে সুবিধা দিতে পারে। তবে সুবিধা আদায় করতে হলে দক্ষতার সঙ্গে দরকষাকষিতে যেতে হবে। নিজের অবস্থানকে স্পষ্ট করে তুলে ধরতে না পারলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। বাংলাদেশকে অপেক্ষা না করে নিজ উদ্যোগে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। জাপানের সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষর হবে বড় একটি অর্জন। প্রত্যাশা থাকবে, দ্রুতই সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে উভয় দেশ একটি চুক্তি স্বাক্ষরে উপনীত হবে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আস্থা বাড়বে, যা বিনিয়োগ ও উৎপাদনে জরুরি।