আমি রওনক জাহানকে পাঁচ দশক ধরে চিনি। ১৯৭০ সালে আমাদের প্রথম পরিচয়, যখন রওনক হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে তার পিএইচডি থিসিস জমা দিয়ে সবেমাত্র ফিরেছেন। তখন স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দাবিতে ঢাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব উত্তাল ছিল। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্ররা রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন।

রওনক জাহান সম্প্রতি ‘পাকিস্তান: ফেইলর ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’ শিরোনামে প্রকাশিত থিসিসে যৌক্তিক ও গবেষণাপ্রসূত বর্ণনা দিয়ে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের অনিবার্য বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তিনি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এ পদে থেকে তিনি তার অর্জিত জ্ঞান ও ধারণা শিক্ষার্থী এবং সহকর্মীদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন। আমি মনে করি, তারা তাকে খুবই উদার মনের হিসেবে পেয়েছেন এবং ক্লাস লেকচার এবং ক্লাসরুমের বাইরের আলোচনায় তার মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে পুরোপুরি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। শহীদ মিনারের কাছে অধ্যাপক রাজ্জাকের বাসায় শিক্ষক ও পেশাজীবীদের ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়মিত আড্ডায় মিলিত হতেন। সেখানে শুধু অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও অধ্যাপক সালাহ উদ্দিনের মতো জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরাই যোগ দিতেন না, বরং তরুণ অর্থনীতিবিদরাও আগ্রহী হয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে অংশগহণ করতেন। রওনক এ গ্রুপটির মধ্যে সবসময় অকাট্য সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে যুক্তি উপস্থাপন করার মাধ্যমে একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠেছিলেন। তার সঙ্গে আমাদের সেখানে দেখা হতো এবং বিতর্কগুলোয় তার বাগ্মীতা এবং যৌক্তিক উপস্থাপন দেখে আমি মুগ্ধ হতাম।

এটা উল্লেখযোগ্য, জাতীয় আন্দোলনের পাশাপাশি নারীর অধিকারের দাবিও বাংলাদেশ হওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ১৯৭০ সালের শুরুর দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী নারীরা এ সংগঠনে যোগদান করেন। এছাড়া অন্যান্য ছোট ছোট গ্রুপগুলো নারীর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। রওনক জাহান এসব গ্রুপে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তার ধারণার বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হন। সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে তিনি এটি করেছিলেন, যেখানে অনেকের অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৭৩ সালে তিনি ওমেন ফর ওমেন নামে একটি নারী গবেষণামূলক সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। রওনক এ সংগঠনটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন এবং এটির গবেষণা কার্যক্রম নারীর অধিকার, লিঙ্গ সমতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পরিচালনা করেন। তার নেতৃত্বে ১৯৭৫ সালে এ সংগঠনের প্রথম প্রকাশনা আলোর মুখ দেখে।

এসব আয়োজনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন এবং আন্তর্জাতিক নারীবাদী অনুষ্ঠানগুলোয় আমন্ত্রিত হন। ১৯৭৫ সালে তিনি মেক্সিকোয় ইউএন ওমেনের সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে বাংলাদেশের নারী উন্নয়ন নীতি নিয়ে কথা বলেন। সেখানে তার অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক গুণী ব্যক্তিদের মধ্যে এ-সংক্রান্ত ধারণার আদান-প্রদানকে উৎসাহিত করে। তিনি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক আয়োজনগুলোয় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেন। ব্যাংককের এপিডিসি এবং পরবর্তী সময়ে জেনেভায় অবস্থিত আইএলওতে কর্মরত অবস্থায় নারীর অধিকার প্রসারে তিনি অবদান রাখেন।

দেশে-বিদেশে মানবাধিকার ও নারীর অধিকার নিয়ে অনেক বছর একসঙ্গে কাজ করার সুবাদে রওনকের সঙ্গে আমার দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি আমাকে মেক্সিকো সম্মেলনে যেতে উৎসাহিত করেছিলেন, যেখানে কারুশিল্প উৎপাদনে নারীর ভূমিকা নিয়ে আমাকে কথা বলার অনুরোধ করা হয়। এর ফলে এ অঞ্চলের অন্যান্য নারীবাদী যেমন ভারতের দেবাকি জায়েন ও বীণা মজুমদার এবং শ্রীলংকার কুমারি জয়াবর্ধনের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। নারীবাদীদের গ্রুপটি একসঙ্গে থাকায় আমরা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য নারীবাদীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ পাই। ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভস উইথ ওমেন ফর এ নিউ এরা (ডিএডব্লিউএন), এশিয়া প্যাসিফিক ফোরাম অন ওমেন, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এপিডব্লিউএলডি) অথবা অন্যান্য আঞ্চলিক নেটওয়ার্কগুলোর আয়োজনে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে অন্যদের অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগ পাই। রওনক জাহান তার অফিসের কাজ এবং লেখালেখি সত্ত্বেও এ দুটি ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিলেন।

রওনক জাহান পরিবর্তনের জন্য নারীর সংগ্রামকে দিক-নির্দেশনা দেয়ার ক্ষেত্রে তার একাডেমিক কাজ, রাজনৈতিক এবং নারীর অধিকার সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন।

 

ড. হামিদা হোসেন: মানবাধিকার কর্মী ও শিক্ষাবিদ