ক্ষুধা বৃদ্ধি ও অধিক মাত্রায় খাদ্য সরবরাহের ঘাটতির সম্ভাবনার মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ব খাদ্য কাঠামোয় কালোমেঘের ছায়া বিরাজ করছে। ইউক্রেনে যুদ্ধের ফলে খাদ্য ও সারের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, এর সঙ্গে আবহাওয়ার চরম অবস্থা উৎপাদন ব্যাহত করা ও অর্থনৈতিক মন্দা মানুষের পর্যাপ্ত পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য কেনার সক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন খরার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলছে, তেমনি পানির সংকটকে বৃদ্ধি করছে। এর পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে ঝুঁকির বিষয়টিও যোগ হয়েছে।

ক্ষুধা ও অপুষ্টি মোকাবেলা করা কভিড-১৯-এর আগে থেকেই স্থবির হয়ে আছে। বর্তমানে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি অনুমান করছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে অথবা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন এবং কর্মঠ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য যাদের নিয়মিত পর্যাপ্ত নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই, এমন মানুষের সংখ্যা ২০১৯ সাল থেকে ২০০ কোটির ঘর অতিক্রম করেছে। এটি জাতিসংঘের দ্বিতীয় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মতো বৈশ্বিক মুখ্য বিষয়বস্তুর বিপরীত, কেননা সেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশগুলো থেকে ক্ষুধা নির্মূল, পুষ্টিমান উন্নয়ন এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থায় পৃষ্ঠপোষকতার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।

নিঃসন্দেহে ব্যবসা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গত জুন মাসে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কর্তৃক আয়োজিত আমাদের ১২তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে ১৬৪টি সদস্য রাষ্ট্র এ বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছে। এর বাইরে প্রচুর খাদ্য রয়েছে এমন স্থান থেকে যেখানে খাবার প্রয়োজন সেখানে খাদ্য সরবরাহ করা, ব্যবসার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা কর্মসংস্থান, জীবিকা এবং উপার্জনের ক্ষেত্রে সংস্থাটি মূল পরিবাহকের ভূমিকায় রয়েছে, যা বৈশ্বিক পুঁজিস্বল্পতার টেকসই ও কার্যকর ব্যবহারের ক্ষেত্রে মুখ্য বিষয়।

কিন্তু প্রায় সময় খাদ্য এবং কৃষির আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবসার ক্ষেত্রে অগোছালো ভর্তুকি এবং উঁচু মাত্রার সুরক্ষার ক্ষেত্রে দুর্বলভাবে সম্পন্ন হয়। অনেক অঞ্চলে গবেষণায় কম বিনিয়োগ, বিস্তৃত সেবা ও বাজার সংযুক্ত অবকাঠামো নিম্নগামী হচ্ছে এবং কৃষি উৎপাদনশীলতা স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে আফ্রিকার অনেক জায়গায় শস্য কম উত্পন্ন হয়। যা অন্যান্য উন্নয়নশীল অঞ্চলে উৎপাদিত শস্যের তুলনায় অপ্রতুল।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য রাষ্ট্রগুলো এসব সমস্যা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৫ সালে তারা স্থানীয় মূল্য ও আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের পার্থক্যের ক্ষেত্রে কৃষি রফতানির ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে রাজি হয়, যা উৎপাদনে ভারসাম্যহীনতা এবং অন্য দেশগুলোয় কৃষকের ক্ষতির ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এসব ভর্তুকি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে নাটকীয়ভাবে পতন ঘটে। ১৯৯৯ সালে প্রায় ৭০০ কোটি ডলার থেকে যা ২০২০ সালে ১২০ কোটি ডলারের নিচে নেমে আসে। কিন্তু ওইসিডি পরিসংখ্যান এটাই দেখাচ্ছে, ২০১৯-২১ সালে ৫৪টি উন্নত অর্থনীতির দেশ এবং ১১টি মুখ্য বিকাশমান বাজারে জনগণের মোট অংশগ্রহণ ৮ লাখ ১৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে এবং সাধারণ সেবার ক্ষেত্রে শুধু গবেষণা, প্রশিক্ষণ অথবা ভোক্তাদের পরিশোধের জন্য ২ লাখ ৭ কোটি ডলার বরাদ্দ ছিল।

অন্যান্য পৃষ্ঠপোষকতামূলক কার্যক্রম প্রায়ই অস্থিতিশীল উৎপাদন ও ব্যয় করাকে উৎসাহিত করে এবং বিশ্ববাজারে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতাকে অবমূল্যায়ন করে। যখন কৃষিপণ্যে গড় শুল্কহার ২০২০ সালে ৬ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, অনেক দেশ নির্দিষ্ট পণ্যে নিষেধাজ্ঞামূলকের মতো করে নির্দিষ্ট পণ্যে উঁচু শুল্ক ধার্য করে, যা সর্বোচ্চ ১০০০ শতাংশে পৌঁছায়।

এ বছরের শুরুতে সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় খাদ্যমূল্য এরই মধ্যে উঁচু পর্যায়ে চলে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ক্ষুধা বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করতে শুরু করেছে। তারপর ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অত্যধিক শোচনীয় পর্যায়ে নিয়ে যায়। মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি রেকর্ডসংখ্যক পর্যায়ে বৃদ্ধি পাওয়ার পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা পর্যবেক্ষণ করে পায় যে, অনেক দেশের সরকার খাদ্য রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এটা নিজেদের দেশের জন্য পরিস্থিতি সহজ করলেও বিশ্বের অন্যত্র খাদ্যাভাবকে বাড়িয়ে তুলেছে।

এ বাস্তবতার বিপরীতে জুন মাসে অনুষ্ঠিত ১২তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে আমরা যে বহুপক্ষীয় সহযোগিতার চিত্র দেখেছি, তাকে অবশ্যই স্বাগত জানাই। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যরা সম্মিলিতভাবে বিশ্ব খাদ্য ফোরামের মানবতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য কেনাকাটাকে রফতানি নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত রাখার ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফলে লাখো ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে সংস্থাটির সময় এবং অর্থের সাশ্রয় হয়েছে। তারা কৃষি খাদ্য বাণিজ্যকে উন্মুক্ত রাখার ক্ষেত্রেও অঙ্গীকারবদ্ধ এবং জরুরি ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক অবস্থান বদলানোর বিষয়টি কমিয়ে আনবেন বলেছেন। তারা ক্ষতিকর মত্স্য চাষে বার্ষিক ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভর্তুকির বিষয়টিও কমিয়ে আনার চুক্তিতে সম্মত হয়েছেন। এটি মানুষের সামুদ্রিক বাসস্থানের স্বাস্থ্যের উন্নতির মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে।

কিন্তু গত মাসে খাদ্য, খাদ্যবস্তু ও সার রফতানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আগের জায়গায় ফিরে যায়, যা নিম্নগামী প্রবণতার পুরোপুরি বিপরীত। এ পরিমাপের মোট সংখ্যা ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হয়ে বর্তমানে ৫২টি দেশে পৌঁছেছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা পর্যবেক্ষণ, স্বচ্ছতা এবং বুদ্ধিদীপ্ত কর্মপন্থার মধ্য দিয়ে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এ সংখ্যা কমিয়ে আনছে। কিন্তু এটি বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে।

এ ব্যবসা অধিক স্থিতিশীল এবং ন্যায়সংগত বৈশ্বিক খাদ্য কাঠামোর ক্ষেত্রে অবদান রাখছে, যা একই সারিতে ব্যবসা, পরিবেশগত এবং খাদ্য নীতিতে বৃহৎ প্রচেষ্টার প্রয়োজন প্রত্যাশা করে। এক্ষেত্রে একটি সামগ্রিক পন্থা কীভাবে খাদ্য উৎপাদন, বণ্টন ও আহার করা হয় সেটির ব্যবস্থাপনা পর্যাপ্ত সরবরাহ, জলবায়ু এবং অন্যান্য পরিবেশগত ঝুঁকিকে চিহ্নিত করা, টেকসই জমি ব্যবহার নিশ্চিত, দুষ্প্রাপ্য পানিসম্পদের ব্যবহার কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে জরুরি। কৃষি ব্যবসার ক্ষেত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কার্যক্রমের নিয়মাবলি দীর্ঘদিন অপরিবর্তনীয়। এটি হালনাগাদ করা বর্তমানে সব সময়ের প্রয়োজনের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ খাতে বিনিয়োগের জন্য আমাদের উত্তম প্রণোদনামূলক কাঠামো তৈরি করতে হবে।  

ক্রমবর্ধমান খাদ্য অনিরাপত্তায় সমাধান খোঁজার জন্য আমাদের সংলাপ বিস্তৃত এবং সমস্যার কাঠামোগত চালককে অনুসন্ধান করতে হবে। শক্তিশালী প্রামাণিক তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যদের ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হবে কীভাবে ব্যবসার পরিপূর্ণ সম্ভাব্য পরিসরকে কাজে লাগিয়ে সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াকে বৃদ্ধি করা যায়।

স্বত্ব:প্রজেক্টসিন্ডিকেট

 

নজি অকুঞ্জ আইয়ালা: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালক; নাইজেরিয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিশ্বব্যংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

ইংরেজি থেকে ভাষান্তরিত