উন্নয়ন মহাসড়কে চলমান আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও কৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। আদিকাল থেকেই এ দেশের মানুষ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল এবং কৃষি পেশাকে কেন্দ্র করেই আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। আজকের উন্নয়নশীল বাংলাদেশে কৃষি একটি সম্মান ও মর্যাদাশীল পেশা হিসেবে স্বীকৃত। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ১৯৭৩ সালে নোবেলজয়ী কৃষি বিজ্ঞানী নরম্যান আর্নেস্ট বোরলগ অনুসৃত সবুজ বিপ্লব বাস্তবায়নের নির্দেশনায় বর্তমান সরকারের কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও প্রণোদনায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতায় কৃষিবিদ পেশা প্রথম শ্রেণীর পদমর্যাদায় অভিষিক্ত অধিকতর মেধাবী শিক্ষার্থীরা কৃষিশিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণে ব্রত হয়ে দেশের কৃষকদের সঙ্গে ঐকতানে কৃষির উত্তরোত্তর উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
বিশ্বের ১৮২টি দেশের মধ্যে আয়তনে আমাদের জন্মভূমির অবস্থান ৯৪তম এবং এ দেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি ৫৩ লাখ ৪৮ হাজার। জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে অষ্টম এবং এ দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১ হাজার ২০০ লোকের বসতি। তদুপরি বাংলাদেশ আজ খাদ্যে উদ্বৃত্ত এবং নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিতের সংগ্রামে অগ্রসরমাণ। আশির দশকের শুরুতে এ দেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৯৬ লাখ ৪০ হাজার জন। তখন দেশে মোট জমির পরিমাণ ছিল ১৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন হেক্টর, যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন হেক্টর। বিভিন্ন প্রজাতির শস্য বহুমুখীকরণ ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মোট দানাদার শস্য উৎপাদন হয় ৪ কোটি ৯ লাখ ৭৮ হাজার টন। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। গত পাঁচ বছরে দেশে সবজি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৬ শতাংশ। এক সময়ের বন্যা, খরা ও দুর্ভিক্ষের বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করে বিদেশে খাদ্যশস্য রফতানি করছে। বর্তমানে বাংলাদেশে কৃষির চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা করে সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের নিরাপদ পুষ্টি নিশ্চিত করা।
এ দেশের নদী বিধৌত পলিযুক্ত উর্বর মাটি ও বিদ্যমান অবউষ্ণ জলবায়ু বহু কৃষি ফসল উৎপাদনের সহায়ক। কিন্তু অবউষ্ণ জলবায়ু নানা গোত্রের ও প্রজাতির পোকামাকড়ের উত্তরোত্তর বংশবৃদ্ধি, বিস্তার ও সংক্রমণে প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখে। ফসলের প্রকারভেদে পোকামাকড় সংক্রমণে ১০ থেকে ৬৫ শতাংশ শস্যহানি ঘটে। কোনো কোনো প্রজাতিতে শতভাগ শস্য পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। পোকামাকড় গুদামে সংরক্ষিত শস্যে শতকরা ১০ থেকে ৩০ ভাগ সংক্রমণ করে। ফসলে পোকামাকড়ের সংক্রমণ ও অন্যান্য আপদ রোধকল্পে প্রতি বছর দেশে প্রায় ৩৫ হাজার টন বালাইনাশক ব্যবহার হয়। আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বালাইনাশক ব্যবহূত হয়েছিল ২০১২ সালে এবং ওই বছর বালাইনাশক ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ৪৮ হাজার টন।
ব্যবহূত বালাইনাশকের কিঞ্চিৎ অংশ দেশে উৎপাদিত হয় বিধায় প্রতি বছর বিপুল অংকের মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। বালাইনাশকের বহুবিধ ও যথেচ্ছা ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন কৃষি ফসলের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। মাঠে প্রয়োগকৃত বালাইনাশকের মাত্র ১ শতাংশ অভীষ্ট আপদ দমনে কাযকরী ভূমিকা রাখে এবং অবশিষ্টাংশ উপকারী পোকামাকড়, মাটি, পানি ও কৃষি বাস্তুতন্ত্রের উপকরণে যুক্ত হয়ে সরাসরি অথবা অবশেষ হিসেবে পরিবেশে বিপর্যয় টেনে আনে।
বালাইনাশকের বিষাক্ততায় ফসলের পরাগী পোকা এবং উপকারী পরভোজী ও পরজীবী পোকা মারা যায়। ফসলের মাঠে পরভোজী ও পরজীবী পোকার প্রজাতি ও সংখ্যা হ্রাস পেলে আপদের পুনরায় অভ্যুদয় ঘটে এবং গৌণ আপদ মুখ্য আপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এছাড়া বালাইনাশকের নির্বিচার ব্যবহারের ফলে আপদগুলো প্রতিরোধী ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়। তখন সংশ্লিষ্ট মাত্রায় বালাইনাশকের কার্যক্ষমতা থাকে না। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলসহ আমাদের দেশেও এরই মধ্যে ধানের বাদামি ঘাস ফড়িং, হলুদ মাজরা পোকা ও কালো মাথা মাজরা পোকা বিদ্যমান কীটনাশকের প্রতিরোধী ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। বালাইনাশকের যথেচ্ছা ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসলের পরাগী পতঙ্গ। এরা ফুল থেকে সুধা (নেক্টার) পান করার নিমিত্তে দ্রুত এক ফুল থেকে অন্য ফুলে ভ্রমণ করে। এই সময় এরা গাছে সিঞ্চিত সংস্পর্শ কীটনাশক বা মাঠে প্রয়োগকৃত বালাইনাশকের প্রভাবে বিষাক্ত হওয়া গাছ থেকে সুধা পান করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
ফসলের পরাগায়ন হচ্ছে একই ফুলের পরাগধানী থেকে পরাগরেণু সেই ফুল বা একই গাছের অন্য ফুল বা একই প্রজাতির অন্য গাছের ফুলের গর্ভদণ্ডে স্থানান্তরিত হয়ে নিষিক্ত ডিম্বক তৈরির মাধ্যমে ফল ও বীজ উৎপাদনে সহায়তা প্রক্রিয়া। পরাগায়নের মাধ্যমে ফসল ও পতঙ্গ উভয়ই পারস্পরিক সহযোগিতায় আবদ্ধ হয় এবং প্রক্রিয়াটি জীবজগতের বিচিত্রতা ও বাস্তুতন্ত্রের প্রধান নিয়ামক বলে আখ্যায়িত।
উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের ৭০ শতাংশ প্রজাতির কৃষি ফসলের পরাগায়ন ঘটে পতঙ্গের মাধ্যমে। বিশ্বে প্রধানত ১০০ প্রজাতির আবাদি ফসল থেকে ৯০ শতাংশ খাদ্যের জোগান হয়। আর এই ১০০ প্রজাতির ফসলের মধ্যে ৭১ প্রজাতির ফসলের পরাগায়ন ঘটে মৌমাছি (এপিড়ি) পরিবারের পতঙ্গ দ্বারা। অন্যান্য প্রজাতির ফসলগুলোর পরাগায়ন ঘটে প্রজাপতি, মথ, থ্রিপস, বোলতা, মাছি ইত্যাদি পতঙ্গ দ্বারা। বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্যের ৩০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৌমাছি পরাগায়নের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
মৌমাছি (এপিড়ি) পরিবারে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ প্রজাতি রয়েছে এবং এই পরিবারের উল্লেখযোগ্য পরাগী পতঙ্গগুলো হলো মৌমাছি, ভীমরুল (বাম্বল বি), কাপেন্টার মাছি ও অসমিয়া মাছি। শীতপ্রধান দেশে গ্রিনহাউজ ও গ্লাসহাউজে চাষকৃত ফসলের পরাগায়নের জন্য গবেষণাগারে লালনকৃত মৌমাছি ও ভীমরুল ব্যবহার করা হয়। এজন্য বাণিজ্যিকভাবে মৌমাছি ও ভীমরুল পালনের কারখানা গড়ে উঠেছে। নেদারল্যান্ডসের ‘কোপাট’ একটি উল্লেখযোগ্য মৌমাছি ও ভীমরুল পালনের বাণিজ্যিক কারখানা। মৌমাছির ১০টি সচরাচর বিদ্যমান প্রজাতির মধ্যে এপিস ডরসাটা, এপিস ফ্লোরিয়া, এপিস সেরানা ও এপিস মেলিফেরা ফসলের পরাগায়নে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত। বাণিজ্যিক কারখানায় মৌমাছির এপিস সেরানা, এপিস মেলিফেরা ও ভীমরুলের বোম্বাস টেরেসটিস প্রজাতির প্রতিপালন করা হয়।
স্বপরাগী ও পরপরাগী উভয় প্রকার ফসলের ক্ষেত্রেই পতঙ্গ পরাগায়নে ভূমিকা রাখে। সবজি, ফল, ডাল, তেল ও মসলাজাতীয় ফসলের ক্ষেত্রে পতঙ্গ পরাগায়নের মাধ্যমে ফলন, শস্যের গুণগত ও পুষ্টিমান ও বীজের অংকুরোদগম হার বৃদ্ধি পায়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রতি একর জমিতে ৩ থেকে ৫টি এপিস সেরানা বা এপিস মেলিফেরা প্রজাতির মৌমাছির কলোনি সন্নিবেশের মাধ্যমে সূর্যমুখীর ৭৯ শতাংশ, সরিষার ৫৫ শতাংশ, কুসুম ফুলের ৬৪ শতাংশ, তুলার ১৮ শতাংশ, লিচুর ২০ শতাংশ এবং নারকেলের ৪০ শতাংশ ফলন বৃদ্ধি পায়। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮৯ সালে মৌমাছির কলোনি ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের যে পরিমাণ ফলন ও গুণগত মান বৃদ্ধি হয়েছিল, তার বাজারমূল্য ছিল ৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। ওই দেশে ২০০০ সালে মৌমাছির পরাগায়ন মূল্য উন্নীত হয় ১৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে।
সারা বিশ্বে ২০০৫ সালে ফসলের পতঙ্গ পরাগায়নের অর্থনৈতিক মূল্য নিরূপিত ছিল ২১০ বিলিয়ন ডলার, যা মোট উৎপাদিত মানুষের খাদ্যমূল্যের ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৃষি ফসলে মৌমাছির পরাগায়ন মূল্য ১ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে বিভিন্ন সবজি যেমন ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রোকলি, গাজর, মুলা, শসা, লাউ, কুমড়া, শিম প্রভৃতির ফলন, পুষ্টিমান বা বীজ উৎপাদনে বিভিন্ন প্রজাতির পতঙ্গ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকে। আম, লিচু, পেঁপে, স্ট্রবেরি, তরমুজ, বাঙ্গি ও লেবুজাতীয় ফলের পরাগায়নে পতঙ্গ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিভিন্ন ডাল, তেল ও মসলাজাতীয় শস্যের পরাগায়ণে বিভিন্ন প্রজাতির পতঙ্গের কার্যকরী উপস্থিতি লক্ষণীয়। এরই মধ্যে দেশে মধুর চাহিদা মেটাতে মৌমাছির খামার বৃদ্ধি এবং সেই সঙ্গে মৌ কলোনি আম, লিচু, কুল, সরিষা, কালোজিরা, পেঁয়াজ প্রভৃতি ফসলের মাঠে পরাগায়নে ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশে এক ফসলি ধান চাষের আধিক্য, কৃষিজমি নষ্ট করে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বনাঞ্চল সংকোচন, বালাইনাশকের স্বেচ্ছাচারী ব্যবহারের ফলে পরাগী পতঙ্গের প্রজাতি ও সংখ্যা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে এবং হ্রাস পাচ্ছে। আশার বাণী হলো, ২০১৩ সাল থেকে বালাইনাশকের ব্যবহার কমে আসছে। কিন্তু ভেজাল ও মারাত্মক বিষাক্ত বালাইনাশকের ব্যবহার এখনো দেদার চলছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে বিভিন্ন ফসলের মাঠে বিচরণকারী পরাগী পতঙ্গের প্রজাতিগুলো শনাক্তকরণ সম্ভব হয়নি।
বঙ্গবন্ধুকন্যা ও দেশরত্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও কৃষিবান্ধব নেতৃত্বে দেশ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও প্রতিটি নাগরিকের পুষ্টি নিশ্চিতকরণে দ্রুত এগিয়ে চলছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে পরাগী পতঙ্গ সংরক্ষণে মনোনিবেশ সমীচীন। এজন্য আপদ দমনে যুক্তিসংগত ও তুলনামূলক কম বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশবান্ধব সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ অতিজরুরি। আপদ দমনে অনুজীব ও ভেষজ কীটনাশক ব্যবহার এবং পরজীবী ও পরভোজী পোকার ব্যবহার উন্নয়নে গবেষণার মান বৃদ্ধি সময়ের চাহিদা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠকর্মীদের দ্বারা ও গণমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে কৃষকদের পরাগী পতঙ্গ পরিচিতি, খাদ্য উৎপাদনে এদের গুরুত্ব এবং সংরক্ষণে গণজাগরণ সৃষ্টি করা দরকার।
ড. মো. রুহুল আমীন: অধ্যাপক, কীটতত্ত্ব বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর










