ডেঙ্গু আবারো হানা দিয়েছে, এ রোগের বাহক এডিস মশার বিস্তার ঘটায় বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। সার্বিক পরিস্থিতি দেখে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন চলতি বছর আক্রান্ত ও মৃত্যু দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ হতে পারে। এরই মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে। গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নয়জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী মারা গেছেন, যা এ বছর সর্বোচ্চ। এর আগে গত ১৩ অক্টোবর একদিনে আটজনের মৃত্যু হয়েছিল। সব মিলিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু রোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬১।

অতীতের মতোই সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত সেবা মিলছে না। আক্রান্ত রোগীরা হাসপাতালের বারান্দা ও মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে সচেতনতার অভাবে অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাসায় চিকিৎসা গ্রহণ করায় মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, মোট আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা সরকারি হিসাবে সঠিকভাবে উঠে আসছে না। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ণয়ের ভিত্তিতে করণীয় নির্ধারণে ব্যর্থতা প্রকাশ পেতে পারে, সে সঙ্গে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মহামারীতে রূপান্তরিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। জাতীয়ভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গুবিষয়ক তথ্য প্রকাশ করে থাকে। এক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে হাসপাতালে ভর্তি ও দৈনিক মৃত্যুর তথ্য দেয়া হয়। কিন্তু কীটতত্ত্ব, রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সরকারের দেয়া তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন। তারা বলছেন, সরকারি হিসাব পূর্ণাঙ্গ নয়। আবার আংশিক তথ্যকে পূর্ণাঙ্গ ধরে প্রকাশ করাও অনৈতিক। কারণ ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্রমে অবনতি হচ্ছে। এখনই জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে।  

গত বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ নয়জন মৃত্যুর আগের দিন ডেঙ্গুতে চারজনের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া এ সময়ে মোট ৮৮২ জন রোগী ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ ডেঙ্গু পরিস্থিতির তথ্যানুযায়ী ঢাকার হাসপাতালগুলোয় নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ৪৯৮ জন, আর ঢাকার বাইরে ৩৮৪ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এতদিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ঢাকায় অনেক বেশি ছিল, কিছুদিন ধরে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়াল ৪০ হাজার ৯৮৩। এর মধ্যে ঢাকায় ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৭ হাজার ৬৪৬ এবং ঢাকার বাইরে হাসপাতালে মোট ভর্তি হয়েছে ১৩ হাজার ৩৩৭ জন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীতে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৯৮ এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় ৬৩ জন।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যের সঙ্গে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যের মিল নেই। বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী অন্তত পাঁচটি জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ ও একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে পাওয়া পরিসংখ্যানের সঙ্গে অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যের অসংগতি দেখা গিয়েছে। কক্সবাজারে চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৩৬ জনের মৃত্যু হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২৩ জনের কথা বলেছে। এ জেলাটিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে প্রায় ১৬ হাজার লোক চিকিৎসা নিলেও অধিদপ্তরের তথ্যে ১ হাজার ৬২৬ জন আক্রান্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম জেলায় ১৫ জনের মৃত্যু হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে সংখ্যাটি কম ছিল। এ জেলায় ২ হাজার ৪৪০ ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও অধিদপ্তরের তথ্যে অসামঞ্জস্যতা দেখা গিয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে সোমবার পর্যন্ত শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য আড়াই হাজারেরও বেশি রোগী ভর্তি হয়েছিল। আর মারা গিয়েছে অন্তত সাতজন। অথচ অধিদপ্তরের তথ্যে বলা হয়েছে, হাসপাতালটিতে এ বছর ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৬৫৪ জন এবং মারা গিয়েছে পাঁচজন।

এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয়ভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া তালিকায় সারা দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালের তথ্য থাকলেও বেশির ভাগ বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য নেই। একই সঙ্গে হাসপাতালের বাইরে থাকা রোগী ও মৃত্যুর হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। এমনটি নিকট অতীতেও দেখা গিয়েছে, ২০১৯ সালে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যুর হিসাবও সঠিক নয় বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সে সময় ১৭৫ মৃত্যুর কথা বলা হলেও প্রকৃত সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি। 

রোগতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালে যে পরিমাণ রোগী থাকে তার অন্তত পাঁচ গুণ বেশি পাওয়া যায় ওই এলাকায়। বৈজ্ঞানিক উপায়ে হাসপাতাল এলাকা অর্থাৎ ওই শহর বা গ্রামে জরিপ করলে দেখা যাবে, ১০ রোগী ভর্তি হলেও বাস্তবিক অর্থে চিকিৎসার বাইরে রয়েছে ৫০ জন। এ পদ্ধতিতে এনকেফালাইটিসের (জীবাণুঘটিত মস্তিষ্কের প্রদাহ) বেলায় জরিপ করা হয়েছিল।

এটা স্পষ্ট, কোনো রোগের ক্ষেত্রে আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র না উঠে এলে রোগ নিয়ন্ত্রণে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া যায় না। তাই সর্বাগ্রে রোগ বিস্তারের প্রকৃত অবস্থান নির্ণয় করতে হবে। এক্ষেত্রে জেলার একদিনের ডেঙ্গুর তথ্য জেলা সিভিল সার্জন অফিসের পরিসংখ্যানবিদ প্রস্তুত করে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ে পাঠিয়ে থাকেন। দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের বরাতে এমনটি বলা হলেও এটি আসলে প্রকৃত চিত্র উঠে আসার জন্য যথেষ্ট না। এজন্য বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসাও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। প্রকৃতপক্ষে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্যই ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা যাচাই করতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়লে মানুষ আতঙ্কিত হতে পারে সরকার যদি এটা ভাবে, তাহলে এটি একটি অমূলক ধারণা, বরং ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র জানলেই মানুষ বেশি সচেতন হবে। ডেঙ্গু হলে বাসায় চিকিৎসা না নিয়ে হাসপাতালে আসবে। 

দুই দশকের বেশি সময় ধরে ডেঙ্গু বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ২০০০ সালের পর থেকে প্রতি বছর বহু মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে এবং এতে মৃত্যুও হচ্ছে। চলতি বছরও যেহেতু ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্রমে অবনতি হচ্ছে, সেহেতু অতি দ্রুত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত ও মৃতের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করতে সরকারের প্রকৃত পদক্ষেপ জরুরি। সে সঙ্গে এডিস মশার বিস্তার রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।