বিশ্বজুড়ে প্রতি
বছর সাত
লাখের মতো
লোক আত্মহত্যা
করে। আর
১৫-২৯
বছর বয়সীদের
মৃত্যুর দ্বিতীয়
সর্বোচ্চ কারণ
আত্মহত্যা। মার্চ
২০২০ থেকে
ফেব্রুয়ারি ২০২১
পর্যন্ত বাংলাদেশে
১৪ হাজারের
বেশি লোক
আত্মহত্যা করে,
যা এই
সময় করোনাভাইরাসে
মৃত্যুর চেয়েও
বেশি। জাতীয়
মানসিক স্বাস্থ্য
ইনস্টিটিউটের (২০১৮)
জরিপ অনুযায়ী
১০-২৪
বছর বয়সী
মানুষের প্রায়
৫ শতাংশ
মানুষ একবার
হলেও আত্মহত্যার
চেষ্টা করেছে
এবং ১
দশমিক ৫
শতাংশ মানুষ
একবার হলেও
আত্মহত্যার পরিকল্পনা
করেছে। আর
নারীর মধ্যে
আত্মহত্যা প্রবণতা
পুরুষের তিন
গুণ। গত
নয় মাসে
৪০৪ শিক্ষার্থীর
আত্মহত্যা, অর্থাৎ
গড়ে প্রায়
মাসে ৪৫
শিক্ষার্থী আত্মহত্যা
করেছে। শহরাঞ্চলে
আত্মহত্যার চিন্তা
গ্রামাঞ্চলের তুলনায়
দ্বিগুণ। বেশির
ভাগ আত্মহত্যার
সঙ্গে বিষণ্নতা,
ব্যক্তিত্বের সমস্যা,
সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার
মুড ডিজঅর্ডার,
মাদকাসক্তের সম্পর্ক
রয়েছে।
সাধারণত আত্মহত্যা
দুই ধরনের
হয়। একটি
হলো হঠাৎ
করে আত্মহত্যা
করে ফেলে
যেটাকে ইমপালসিভ
সুইসাইড বলে।
যেমন মা
কোনো কারণে
তার সন্তানকে
বকাঝকা করলেন
আর সন্তান
ছাদ থেকে
লাফ দিয়ে
আত্মহত্যা করল।
আরেক ধরনের
আত্মহত্যাকে বলে
পরিকল্পনা করে
আত্মহত্যা। এক্ষেত্রে
ব্যক্তির মনে
অনেক দিন
থেকেই আত্মহত্যার
প্ল্যান আসতে
থাকে। এক
সময় ব্যক্তি
আত্মহত্যার চেষ্টা
করে ফেলে।
এ চেষ্টার
মাধ্যমে কেউ
একেবারেই আত্মহত্যা
করে ফেলে
আর যারা
একবার আত্মহত্যার
চেষ্টা করে
ব্যর্থ হয়
তাদের মধ্যে
পরবর্তী সময়ে
আত্মহত্যার প্রবণতা
বেড়ে যায়।
আত্মহত্যার সতর্ক
সংকেত: যারা আত্মহত্যা
করার কথা
চিন্তা করে
তারা তাদের
আচরণে কিছু
লক্ষণ প্রকাশ
করে। এ
লক্ষণগুলোকেই সতর্ক
সংকেত বলে।
এ সতর্ক
সংকেতগুলো জেনে
কার্যকর পদক্ষেপ
নিলে আত্মহত্যা
অনেকাংশে প্রতিরোধ
করা যায়।
আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন
ফর সুইসাইডোলজির
গবেষণায় আত্মহত্যার
জন্য যেসব
বিষয় সংকেত
হিসেবে কাজ
করে সেগুলো
হলো:
ক) মৃত্যুসংক্রান্ত
কাজ: যেকোনো
কাজে (অংকন,
লেখা, ফেসবুক
পোস্ট) মৃত্যুর
সংকেত থাকা।
নিজের প্রিয়
জিনিস অন্যের
মাঝে বিলিয়ে
দেয়া। সবার
কাছে ক্ষমা
চাওয়া। কারো
সঙ্গে কোনো
ঝামেলা থাকলে
মিটিয়ে ফেলার
চেষ্টা করা।
খ) কথাবার্তা:
যারা আত্মহত্যার
চিন্তা করে
তাদের কথায়
হতাশা এমনকি
সরাসরি মৃত্যুর
কথাও প্রকাশিত
হয়। যেমন:
আমি চলে
গেলে কেউ
আমাকে মিস
করবে না,
আমি যদি
মরে যেতে
পারতাম, আমি
চলে গেলে
সবাই ভালো
থাকবে ইত্যাদি।
গ) শারীরিক
পরিবর্তন: খুব
দ্রুত ওজন
বেড়ে যাওয়া
বা কমে
যাওয়া। শরীরের
বিভিন্ন জায়গায়
কাটা কিংবা
ইনজেকশনের সুচের
দাগ যেগুলো
জিজ্ঞাসা করলে
উত্তর দিতে
পারবে না।
ঘ) আচরণের
পরিবর্তন: সামাজিক
অনুষ্ঠানে যাওয়া
বন্ধ করে
দেয়। বন্ধু-বান্ধব,
আত্মীয়-স্বজন
সবার কাছ
থেকে নিজেকে
গুটিয়ে রাখে।
হঠাৎ করেই
নিজের যত্ন
নেয়া বন্ধ
করে দেয়া।
যে কাজগুলো
করতে একসময়
খুব আনন্দ
পেত সেগুলো
বন্ধ করে
দেয়া। হঠাৎ
করেই ঝুঁকিপূর্ণ
কাজ করা।
আচমকা অ্যালকোহল
বা নেশা
নেয়া শুরু
করা।
ঙ) চাপমূলক
ঘটনা: ভালোবাসায়
ব্যর্থতা, তালাক,
হতাশা, চাকরি
হারানো, অর্থনৈতিক
সমস্যা, জটিল
শারীরিক সমস্যা
এসব থাকলে
ব্যক্তির আত্মহত্যা
সতর্ক সংকেত
হিসেবে কাজ
করে।
চ) পূর্বের
আত্মহত্যার চেষ্টা:
যারা পূর্বে
আত্মহত্যার চেষ্টা
করে ব্যর্থ
হয়েছে তাদেরও
পরবর্তী সময়ে
আত্মহত্যার চেষ্টার
প্রবণতা থাকে।
আত্মহত্যার প্রতিরোধ:
শুধু মনোচিকিৎসক
কিংবা মনোবিজ্ঞানী
নয়, সবাই
মিলে দায়িত্ব
নিলে অনেকাংশে
আত্মহত্যা প্রতিরোধ
সম্ভব। এক্ষেত্রে
অনেকেরই দায়িত্ব
আছে, সংক্ষেপে
কিছু ব্যক্তির
করণীয় নিয়ে
আলোচনা করা
হলো:
(ক) আত্মহত্যাপ্রবণ
ব্যক্তির করণীয়:
নিজের মধ্যে
আত্মহত্যাপ্রবণতা আসতেই
পারে। তখন
কিছু কাজ
করলে অন্যের
সাহায্য ছাড়াও
আত্মহত্যা অনেকাংশে
প্রতিরোধ সম্ভব।
এক্ষেত্রে আপনাকে
আত্মহত্যার ওয়ার্নিং
সংকেতগুলো চিনতে
হবে। নিজের
ইতিবাচক চিন্তাভাবনাগুলো
খাতায় লিখে
তালিকা করে
বারবার দেখবেন।
সামাজিক সম্পর্ক
বাড়ানো প্রয়োজন,
যারা আপনাকে
বিপদের সময়
সহায়তা করতে
পারবেন তাদের
সঙ্গে যোগাযোগ
বাড়ানো। পরিবার
বা কাছের
মানুষের সঙ্গে
শেয়ার করা।
নিজের পরিবেশকে
আত্মহত্যার উপকরণমুক্ত
করা। নিয়মিত
মাইন্ডফুলনেন্স মেডিটেশন
প্র্যাকটিস করা।
আত্মহত্যা প্রতিরোধকারী
সংগঠন বা
কাউন্সিলরের সেলফোন
নম্বর হাতের
কাছে রাখা,
যাতে সংকটের
সময়ে তাদের
সঙ্গে কথা
বলা যায়।
দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে
মানসিক স্বাস্থ্য
প্রফেশনালদের সঙ্গে
যোগাযোগ করা।
(খ) প্রিয়জনের
করণীয়: একজন
ব্যক্তির মধ্যে
আত্মহত্যার সংকেত
দেখলে, প্রিয়জন
কিংবা পরিবারের
সদস্যরা আত্মহত্যা
প্রতিরোধে সহায়তা
করতে পারেন।
এ সময়
ব্যক্তিকে কোনো
পরামর্শ দেয়া
যাবে না।
কারণ এ
সময় তার
পরামর্শ শোনার
মতো মানসিক
অবস্থা থাকে
না। কোনো
রকম বিচার
করা ছাড়াই
তার কথা
সহমর্মিতা দিয়ে
শুনতে হবে,
যাতে করে
মানসিক চাপ
কমে যায়।
তার সঙ্গে
সবসময় থাকার
চেষ্টা, যাতে
সে কোনোভাবেই
এ সংকটময়
সময়ে একা
না থাকে।
আত্মহত্যার উপাদানগুলো
ব্যক্তির কাছ
থেকে সরিয়ে
রাখা। ব্যক্তিকে
মানসিক পেশাজীবীর
কাছে নিয়ে
যেতে মোটিভেট
করা। খুব
বেশি সমস্যা
হলে সাইকিয়াট্রিস্ট
ও ক্লিনিক্যাল
সাইকোলজিস্ট একত্রে
কাজ করেন—এমন
হাসপাতালে ভর্তি
করা। আত্মহত্যার
চিন্তা কমে
যাওয়ার পরও
ফলোআপ কাউন্সেলিং
করা, যাতে
ব্যক্তি পরবর্তী
জীবনে ভালো
থাকতে পারে
এবং এমন
পরিস্থিতি সহজে
মোকাবেলা করতে
পারে।
(গ) শিক্ষক
বা অভিভাবকের
করণীয়: শিক্ষক
বা অভিভাবকের
আত্মহত্যার ওয়ার্নিং
সংকেতগুলো সম্পর্কে
চিনতে শিখতে
হবে। যাদের
মধ্যে এসব
ওয়ার্নিং সংকেত
দেখা যাবে,
তাদের কোনোভাবে
দোষ দেয়া
যাবে না।
তাদের কোনোরকম
শারীরিক ও
মানসিক আঘাত
করা থেকে
বিরত থাকতে
হবে। তাদের
কথা সহমর্মিতা
দিয়ে শুনতে
হবে। তার
কাছে সমস্যা
শোনার পর,
সহমর্মিতা দিয়ে
আত্মহত্যা না
করার জন্য
লিখিত চুক্তি
করে কিছুদিন
সময় নিলে
এ সময়
সমস্যাটি সমাধান
হয়ে যাওয়ার
সম্ভাবনা থাকে।
নিজ প্রতিষ্ঠানে
মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ
দিয়ে এসব
ছাত্রছাত্রীকে নিয়মিত
কাউন্সেলিং করার
ব্যবস্থা রাখা
এবং নিয়মিত
শিক্ষার্থীদের সামাজিক
যোগাযোগের ওপর
বিভিন্ন ট্রেনিং
আয়োজন করা,
যাতে তারা
নিজেদের সিদ্ধান্ত
নিজেরাই নিতে
পারে। নিজ
প্রতিষ্ঠানে সাইকোলজিস্ট
না থাকলে
মানসিক স্বাস্থ্য
বিশেষজ্ঞদের কাছে
নিয়ে যাওয়ার
জন্য মোটিভেটেড
করতে হবে।
সমস্যা কমে
যাওয়ার পরও
যেন কাউন্সেলিং
সেশনে যান
সে সম্পর্কে
সচেতন করে
তুলতে হবে।
(ঘ) সামাজিক
মাধ্যমের যথাযথ
ব্যবহার: সামাজিক
মাধ্যমে আত্মহত্যার
ছবি, নিউজ,
ঘটনা প্রচার
করা থেকে
বিরত থাকতে
হবে। সামাজিক
মাধ্যমে আত্মহত্যা
সংবাদ পরিবেশনের
ধরন ঝুঁকিপূর্ণ
এতে বিষণ্ন
জনগোষ্ঠীতে আত্মহত্যার
হার বাড়তে
পারে। গবেষণায়
দেখা যায়,
কোনো তারকার
আত্মহত্যার পর
সেটা ব্যাপক
প্রচারের কারণে
সাধারণ জনগণের
মধ্যেও আত্মহত্যার
প্রবণতা বাড়ে।
আমেরিকান ফাউন্ডেশন
ফর সুইসাইড
প্রিভেনশনের ডিরেক্টর
অধ্যাপক হার্বার্ট
হেনডিন বলেন,
কল্পনার রঙ
মিশিয়ে আত্মহত্যার
ঘটনাকে প্রকাশ
করাটা পাঠকের
জন্য আকর্ষণীয়
হলেও তা
আত্মহত্যার প্রবণতা
বাড়িয়ে তোলে।
ঙ) মিডিয়ার
ভূমিকা: আত্মহত্যার
সংবাদ পরিবেশনের
ক্ষেত্রে মিডিয়াকর্মীদের
দায়িত্বশীল ভূমিকা
পালন করতে
হবে। এসব
ঘটনা বা
নিউজ প্রচারের
সময় বাংলাদেশ
সরকার ও
বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থার নির্দেশিকাটি
মেনে সংবাদ
পরিবেশন করতে
হবে। আত্মহত্যার
ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিরা
কোথায়, কীভাবে
সহায়তা পাবে
সে বিষয়ে
তথ্য প্রদান
করতে হবে।
আত্মহত্যা প্রতিরোধ
সম্পর্কে সঠিক
তথ্য দিয়ে
জনগণকে সচেতন
করে তুলতে
হবে। কীভাবে
মানসিক চাপ
ও আত্মঘাতী
প্রবণতা মোকাবেলা
করা যায়
সে সম্পর্কে
তথ্য দিতে
হবে। শোকগ্রস্ত
ব্যক্তি বা
পরিবারের সদস্য
বা বন্ধুবান্ধবের
সাক্ষাত্কার গ্রহণে
সাবধানতা অবলম্বন
করা, যাতে
কোনো প্রশ্ন
তাদের মনে
আঘাত না
দেয়। এ
সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ
স্থানে রঙিনভাবে
প্রকাশ করা
যাবে না।
এমনকি বিস্তারিতভাবে
আত্মহত্যার পদ্ধতির
বিবরণও থাকবে
না। ছবি,
ভিডিও বা
আত্মহত্যাকে প্ররোচিত
করে এমন
বিষয় পরিবেশন
করা থেকে
বিরত থাকতে
হবে। আত্মহত্যার
সংবাদ সংগ্রহ
করতে গিয়ে
সাংবাদিকরা নিজেরাও
আত্মহত্যার ঘটনা
দ্বারা প্রভাবিত
হতে পারেন,
সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে
তাদেরও বিশেষজ্ঞ
পরামর্শ গ্রহণ
করা দরকার।
একজন মানুষ
আত্মহত্যার মধ্য
দিয়ে শুধু
নিজের জীবনটাই
শেষ করে
দেন না,
এর ফলে
তার পরিবার,
সমাজ এমনকি
রাষ্ট্রও প্রভাবিত
হয়। কারণ
প্রতিটি মানুষের
জীবন অনেক
মূল্যবান। আত্মহত্যাকে
প্রতিরোধ করতে
পারলে ব্যক্তি,
পরিবার ও
রাষ্ট্রের অনেক
উন্নতি হবে।
আত্মহত্যা নিয়ে
অনেক ধরনের
কুসংস্কার আছে।
এ কুসংস্কার
ও সমাজ
থেকে বিচ্ছিন্নতার
ভয়ে মানুষ
এ বিষয়
নিয়ে কথা
বলতে চায়
না এমনকি
শুনতেও চায়
না। শুধু
এ কুসংস্কার
ও দৃষ্টিভঙ্গি
পরিবর্তন করতে
পারলে এবং
সবাই মিলে
একসঙ্গে কাজ
করলে আমরা
একটা বিশাল
জনগোষ্ঠীর আত্মহত্যা
প্রতিরোধ করতে
পারব। আসুন
সবাই মিলে
একসঙ্গে বৈজ্ঞানিকভাবে
কাজ করে
ব্যক্তির মধ্যে
আশা জাগিয়ে
তুলি এবং
আত্মহত্যা প্রতিরোধ
করি।
জিয়ানুর কবির: ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট










