ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা সমাজবিজ্ঞানে। পরে জনবিজ্ঞানের ওপর চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণার জন্য ২০১০ সালে গ্লোবাল হেলথ কাউন্সিল (ইউএসএ) তাকে ‘নিক সাইমন্স স্কলার’ নির্বাচিত করে। তার একটি গ্রন্থসহ ৭০টির বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক প্রকাশনা আছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব সায়েন্টিফিক স্টাডিজ অব পপুলেশনসহ বিভিন্ন পেশাগত আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্যও তিনি। ১১ জুলাই ছিল বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। এ উপলক্ষে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন, জনবিজ্ঞানসহ নানা বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে তিনি কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা

কভিড মহামারী এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মধ্যে এবারের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উদযাপন হলো। এবারের প্রতিপাদ্য কী এবং এ সময়ে কেন এটি নির্ধারণ করা হলো?

গত দুই বছরের বেশি সময় আমরা করোনা মহামারীর মধ্যে ছিলাম। এখনো যে করোনা চলে গেছে তা বলা যাবে না, এখন নতুন আরেক ওয়েব চলছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধসহ পুরো বিশ্বই একটা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকটসহ রাজনৈতিক সংকট তো রয়েছেই।

জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলো প্রতি বছর ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উদযাপন করে। ১৯৯০ সাল থেকেই এটি পালন হয়ে আসছে। তবে এ বছরের উদযাপনটির মধ্যে একটু ভিন্নতা রয়েছে। যেমন গত দুই বছর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল কভিডকেন্দ্রিক। এবারের প্রতিপাদ্য ভিন্ন। আগামী ১৫ নভেম্বর জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিভাগের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী বিশ্বের জনসংখ্যা আট বিলিয়নে (৮০০ কোটি) পৌঁছে যাবে। একদিকে এটি একটি মাইলফলক। কারণ পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রথমবারের মতো ৮০০ কোটি হবে। বিষয় হচ্ছে—এ মানুষগুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এবারের  প্রতিপাদ্যে একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। প্রতিপাদ্যে বলা হয়েছে, ৮০০ কোটি  জনসংখ্যার এ বিশ্বে সবার জন্য সহনশীল ভবিষ্যৎ, সুযোগ  কাজে লাগানো এবং তাদের অধিকার ও পছন্দ নিশ্চিত করা।

একদিকে মাইলফলক বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যক্তির অধিকার ও পছন্দ নিশ্চিতে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে জনসংখ্যা বাড়ানো কিংবা কমানো মুখ্য বিষয় নয়, মূল বিষয়টা হলো সবার জন্য সমান সুযোগ যেন নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি যত ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো যেন দূর করা হয়। একই সঙ্গে পিছিয়ে পড়া যে জনগোষ্ঠী রয়েছে; যেমন  বিশেষ করে নারী, যুব, বয়স্ক, দরিদ্র, স্থানান্তরিত, বাস্তুচ্যুত—এমন মানুষের প্রতি দৃষ্টি রাখা।

একটা জনমিতিক সহনশীলতা, যেটাকে তারা ইংরেজিতে বলতে চাচ্ছে ‘ডেমোগ্রাফিক রেজিলেন্স’। জনমিতিক স্বাভাবিকতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে সবার মানবাধিকার এবং মানবাধিকারের মধ্যে ব্যক্তির প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার ও পছন্দকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, বিশ্ব আগের জনসংখ্যার পরিমাণগত ধারণা বা সংখ্যা থেকে গুণগত দিকে সরে এসেছে।

১৯৯৪ সালের ৫-১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৭৯টি দেশ মিসরের কায়রোয় জনসংখ্যা ও উন্নয়ন সম্পর্কিত একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন পপুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইসিপিডি) অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে একত্রিতভাবে যে প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন নেয়া হয়েছিল, তাকে বলা হয় আইসিপিডি প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন।

সেটি ছিল জনসংখ্যা উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘প্যারাডাইম শিফট’। ১৯৯৪ সালের আগে জনসংখ্যা নিয়ে সব ভাবনা-চিন্তা ছিল নম্বর বা সংখ্যাকেন্দ্রিক। কিন্তু ১৯৯৪ সালের পর থেকে আমরা চলে এসেছি জনসংখ্যার গুণগত দিকে। গুণগত দিকে এল ওই সম্মেলন থেকে, তখন আমরা এটাকে বলছি প্যারাডাইম শিফট। গুণগত দিকের মধ্যে আছে মানুষের অধিকার, পছন্দ, প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার, লিঙ্গসমতা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং পরিবার-পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো। এগুলো বৈশ্বিক নীতিমালায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

সে প্রেক্ষাপটে বলব, এ বছরই আট বিলিয়ন জনসংখ্যায় আমরা পৌঁছে যাচ্ছি। আমাদের দৃষ্টি হচ্ছে, এ জনসংখ্যাকে সুযোগ দিয়ে তাদের স্বাভাবিক বা প্রাণবন্ত ভবিষ্যৎ কীভাবে আমরা নিশ্চিত করতে পারি। সব নাগরিকের অধিকার ও পছন্দ বেছে নেয়া। যেমন  সন্তান কয়টি নেবে, বিরতিতে কয়টি হবে না হবে, এগুলো সম্পূর্ণ তার অধিকারের জায়গায় বা পছন্দের ভিত্তিতে স্বাধীনতার মধ্যে নিয়ে যাওয়ার জায়গাটা এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ মানবাধিকার ও পছন্দ হচ্ছে এখনকার সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ইউক্রেন প্রেক্ষাপটে যে মানুষগুলো বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তাদের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা। একইভাবে ইউক্রেন ইস্যু ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলেও যেমন রোহিঙ্গা; যারা বাস্তুচ্যুত হয়েছে তাদের দিকেও দেখার ব্যাপার রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দরিদ্র হওয়া জনগোষ্ঠী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সেদিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বকে আমরা সহনশীল স্বাভাবিক সমাজে রূপান্তর করতে চাই। সে প্রেক্ষাপটে আট বিলিয়নের জনসংখ্যা একটি বড় সংখ্যা, বড় সম্ভাবনা ও বড় চ্যালেঞ্জ—ফলে সবার অধিকার ও পছন্দের জায়গাটা আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করাই মুখ্য।

আগে একসময় জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা হতো, যে আমাদের শিল্পায়ন দরকার, শিল্পায়নের জন্য শ্রমিক দরকার, এখন তো এ রীতি পরিবর্তন হয়ে এসেছে। এখন শিল্পায়নের জন্য শ্রমিক দরকার নেই—প্রযুক্তি আছে, রোবট আছে, এখন কী জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা দরকার নাকি নতুন কোনো পরিবর্তন এসেছে এর মধ্যে?

জনমিতিক সংক্রমণ মডেলের ভিত্তিতে আমরা একটি দেশের জনসংখ্যার বৃদ্ধি লক্ষ করতে বা বুঝতে পারি। কোনো দেশের জনসংখ্যার নীতিতে জনসংখ্যার হার বাড়ানোর কথা চিন্তা করে, আবার কোনো কোনো দেশের জনসংখ্যার নীতিতে হার কমানোর কথা চিন্তা করে। এখন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও প্রভাবে মানুষের মধ্যে সন্তান নেয়া বা জনসংখ্যা বাড়ানোর চিন্তা-ভাবনায় বড় পরিবর্তন ঘটেছে। আগে কৃষিকাজের জন্য প্রচুর শ্রম লাগত। সেক্ষেত্রে দেখা যেত সন্তান বেশি হলে কাজকর্মের জন্য সুবিধা হয়। সে ধরনের একটা ভাবনা-চিন্তা ছিল। এখন প্রযুক্তি চলে এসেছে। প্রযুক্তি মানুষের স্থান দখল করে ফেলছে। আবার উন্নত বিশ্ব জনসংখ্যা বৃদ্ধির চিন্তা করছে। যেমন  সিঙ্গাপুর ও জাপান। কিন্তু আমাদের মতো দেশগুলোকে বিবেচনায় নিতে হবে—দেশগুলোর সামগ্রিক অবস্থাটা কী। তার এলাকা ও ভূখণ্ডের অবস্থাটা কী। আমাদের অবস্থাটা খেয়াল করতে হবে, আমরা ছোট একটা দেশ। আমাদের দেশের আয়তন অন্যান্য দেশের মতো বড় না। এ রকম একটা ছোট দেশে বিশ্বের ২ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ বাস করছে। সংখ্যার বিচারে এটি একটি বড় সংখ্যা। এখানে জাতিসংঘ জনসংখ্যা বিভাগের সদ্য প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২২ সালে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ৩১৫ জন মানুষ বাস করছে।  সংখ্যাটা ক্রমে  আরো বাড়বে, ঘনবসতি হবে। কিন্তু আমাদের ভূখণ্ড বাড়ছে না।

অনেক দেশ রয়েছে যাদের প্রচুর জায়গা বা  ভূমি রয়েছে। যেমন কানাডা, রাশিয়া। তারা জনসংখ্যা যদি বাড়ায় তাহলেও তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে না। কিন্তু আমাদের মতো দেশে শ্রমবাজারে যে পরিমাণ জনগোষ্ঠী প্রতি বছর প্রবেশ করছে, এ জনগোষ্ঠীর যদি চাকরিসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হয়, তাহলে কী হবে? আমাদের প্রতি বছর ২০ লক্ষাধিক মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। সে অনুযায়ী চাকরি ক্ষেত্র তৈরি করতে পারছি কি? আমাদের বেকারত্ব একটা বড় ইস্যু। আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। কিন্তু বেকারত্ব বা যুব বেকারত্বের হার ১৯৯৩-৯৪ সালের  সঙ্গে তুলনা করলে কিন্তু প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি চলে গিয়েছে। এসব বিষয় অবশ্যই ভাবনা-চিন্তার মধ্যে আনতে হবে। আমরা দেখেছি, প্রতি বছর বাংলাদেশে ৩২ লাখ ৪০ হাজারের মতো মানুষ জন্ম নেয়। মারা যায় ৮ লাখ ১৫ হাজারের মতো। তাহলে প্রতি বছর জনসংখ্যায় ২২ লক্ষাধিক মানুষ যুক্ত হচ্ছে। এ ধারাবাহিকতা কত দিন চলতে থাকবে?

শ্রমবাজারে যে মানুষ যুক্ত হচ্ছে, তাদের চাকরি কতটা নিশ্চিত করতে পারছি। স্থানীয় বাজার বা বৈশ্বিক শ্রমবাজারে তাদের সম্পৃক্ত না করা গেলে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। ভবিষ্যতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বাড়বে। আমাদের বিভিন্ন গবেষণা বলেছে, ২০২৯ সালে  বাংলাদেশ এইজিং সোসাইটিতে এবং ২০৪৭ সালে এইজেড  সোসাইটিতে পরিণত হবে। আমাদের আয়ুষ্কাল বাড়ছে। এখন টোটাল ফার্টিলিটি রেটকে (টিএফআর) যদি প্রতিস্থাপনযোগ্য মাত্রায় না পৌঁছানো যায়, তাহলে কী হবে? আশার কথা, আমরা প্রতিস্থাপনের কাছাকাছি পর্যায়ে চলে এসেছি। যত আধুনিকায়ন হবে প্রজনন হার তত কমতে থাকবে—তা-ই লক্ষ করা যাচ্ছে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরপর আমাদের একজন মা গড়ে সন্তান প্রসব করতেন ৬ দশমিক ৪-এর মতো। প্রায় সাতজন করে সন্তান একটা পরিবারে থাকত। এখন তা ২ দশমিক ৩-এ চলে এসেছে। এর পেছনে অনেক ফ্যাক্টর কাজ করেছে। যেমন  পরিবার পরিকল্পনা, শিক্ষা, মিডিয়া কমিউনিকেশন ইত্যাদি। এটা একটা ধারাবাহিক ব্যাপার।

চীনের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেক বেশি ছিল। তখন তাদের বেকারত্বের হার বেশি ছিল। তখন তারা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করল। তারা ‘ওয়ান চাইল্ড’ পলিসি গ্রহণ করে। ওই পলিসি দীর্ঘদিন স্থায়ী করে তারা জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমিয়েছে একদিকে, আবার কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। তবে এখন চীন নীতি পরিবর্তন করে ফেলেছে। সন্তান নেয়ার ক্ষেত্রে গিয়ে লিঙ্গ ভারসাম্যহীনতা তৈরি হলে নতুন সমস্যার আবির্ভাব ঘটে। চীনের ক্ষেত্রে সেটা ঘটেছে। প্রবীণ জনগোষ্ঠী বেড়ে যাচ্ছে। প্রজনন হার প্রতিস্থাপনের নিম্নে চলে গেছে। এখন চীন আবার প্রজনন হার বাড়াতে চাইছে ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করছে।

লক্ষ রাখতে হবে, এখন চীন যা করেছে, কানাডা যা করেছে বা যুক্তরাষ্ট্র যা করেছে আমাদের তা করা ঠিক হবে না। আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে নিজের দেশের কাঠামোর ওপর। আমার দেশের জনসংখ্যার পিরামিড কী? এখন কর্মক্ষেত্রের চেয়ে জনসংখ্যা বেশি। এটা ২০৩৬-৩৭ সাল পর্যন্ত এ জনগোষ্ঠী  বহন করবে। তারপর কী হবে?

বাংলাদেশের টিএফআরকে ২ দশমিক ১ বা রিপ্লেসমেন্ট লেভেল ধরে রাখতে হবে। এর মধ্যে  ভবিষ্যতের জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। যখন আমাদের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে যাবে তখন তাদের  আমরা কীভাবে কাজে লাগাব, তার ভাবনা এখন থেকেই শুরু করতে হবে। জনসংখ্যাকে সমস্যা হিসেবে নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে বলব। যদি সঠিক নীতি-কৌশল নিতে পারি, যদি তাদের  শ্রমবাজারে সংযুক্ত করতে পারি, তাহলে তারা সম্পদ হিসেবে কাজ করবে। বৈশ্বিক শ্রমবাজারে কোন ধরনের চাকরির চাহিদা রয়েছে, সে অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা প্রয়োজন। আমরা এখন ডিজিটাল সমাজ ব্যবস্থার কথা বলছি। আমরা এখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে গিয়েছি। এটা চলমান থাকবে। এ প্রযুক্তি কীভাবে আমার গুণগত জীবনকে প্রভাবিত করবে এবং যুব জনগোষ্ঠী সেই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে সামনে এগোবে সেটাই দেখার বিষয়।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জনসংখ্যা বেশি থাকলে লাভ, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কারণ তাকে যদি কাজে লাগানো না যায় বা মানসম্পন্ন জনশক্তি তৈরি করা না যায়, তাহলে কোনো লাভ নেই। দেশ জনমিতিক  লভ্যাংশ অর্জনের যে সময় ও সুযোগ পার করছে তার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে এটি ডেমোগ্রাফিক ডিজাস্টারে  পরিণত হতে পারে। জন অসন্তোষ তৈরি হবে, রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। মানুষের মাঝে হতাশা বাড়বে। মানুষের চাহিদা, প্রত্যাশার সঙ্গে যদি বাস্তবে মিল না থাকে, তখন নানা চ্যালেঞ্জ আসবে।

পৃথিবীর জন্য বা পরিবেশের জন্য টেকসই জনসংখ্যার কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ কী হতে পারে? এমন কোনো গবেষণা হয়েছে কি?

জনসংখ্যার আইডিয়াল কোনো সংখ্যা নেই। তবে আমরা এটা বুঝি, একটা দেশের জনঘনত্ব দিয়ে বিষয়টি পরিমাপ করা যায়। কোনো একটা জায়গায় যদি বেশি ঘনবসতি হয়ে যায়, তখন পরিবেশ দূষণের সম্ভাবনা বাড়ে, চাহিদা বাড়বে, ভোগও বাড়বে। এগুলোর ব্যবস্থাপনার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। আমরা যেটাকে বলি জনসংখ্যার ব্যবস্থাপনা। তবে খেয়াল রাখতে হবে, পৃথিবীর যে ধারণক্ষমতা আছে, জনসংখ্যা যেন তার অতিরিক্ত না হয়ে যায়। স্টিফেন হকিং যখন বেঁচে ছিলেন তখন তার ধারণা ছিল যে, জনসংখ্যার পরিমাণ বিশ্বের জন্য বেশি হয়ে গিয়েছে এবং তিনি আমাদের ভিন্ন বাসযোগ্য পৃথিবীর অনুসন্ধানের কথা বলেছিলেন।

আমাদের জনসংখ্যার ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবতে হবে, সাসটেইনেবিলিটির জায়গা থেকে জনসংখ্যা, পরিবেশ এবং উন্নয়ন এ তিনের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক বজায় রেখে এগোতে হবে।

কেউ কেউ মনে করে, যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি থাকে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য বেশি হবে, লাভ বেশি হবে। এটা এক ধরনের অর্থনীতিবিদের ধারণা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো যদি শক্তিশালী না হয় এবং কোয়ালিটি সার্ভিস যদি না দিতে পারে, তাহলে নানা সংকট তৈরি হতে পারে। জনসংখ্যা বাড়লে স্যানিটেশন, পানি, বাড়ি, স্বাস্থ্য, মৌলিক শিক্ষা ইত্যাদির মানসম্পন্ন সেবাও নিশ্চিত করতে হবে। যদি জনসংখ্যার পরিমাণ এত বেশি হয়ে যায় যে এসব সেবার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে সেটি অর্থনীতির জন্যই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে যে পরিমাণ জনসংখ্যা হলে মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করা যাবে আবার অর্থনৈতিক অগ্রগতিও হবে, সেটি নির্ধারণ করা জরুরি। 

ঢাকা শহরে এত মানুষের বসবাস, তার জন্য যদি মানসম্পন্ন ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা না থাকে বা ট্রাফিক জ্যামে যদি জীবন দুর্বিষহ হয়ে যায়, অনবরত দূষণ বাড়তে থাকে, তাহলে সেটি কাঙ্ক্ষিত জীবন হবে না। গুণগত জীবনমানের মানদণ্ডের প্রতিটিতে আমরা পিছিয়ে আছি বা প্রত্যাশিত মানের মধ্যে নেই। সেটা না থাকার একটা বড় কারণ হলো, আমাদের পরিকল্পনাগুলোয় জনসংখ্যা বণ্টন ও জনঘনত্ব নিয়ে করা হয় না। যেখানে কম জনবসতি রয়েছে, সেখানে জনগণকে স্থানান্তর করা—আমাদের এমন কোনো মাইগ্রেশন নীতিমালা নেই। কোথায় বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে হবে, কোথায় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে—এগুলো পরিকল্পনা করে এগোতে হবে।

উন্নয়ন ও পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে জনসংখ্যাকে রাখতে হবে। অল্প জায়গায় থেকেও মানুষ মানসম্পন্ন জীবন পেতে পারে; যেমন সিঙ্গাপুর, হংকং। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা সেই মানসম্পন্ন সেবা দিতে পারছি না। প্রতিনিয়তই মানুষ নগরমুখী হচ্ছে। জীবনযাত্রার মানের ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে। জনসংখ্যা যদি বেশি থাকে এবং তার যথাযথ ব্যবস্থাপনা না হয় তাহলে সেখানে দূষণ বা অন্যান্য চাহিদা বা ভোগ অতিরঞ্জিত হয়ে যাবে। ভোগ বেড়ে যাবে। এতে বাণিজ্য লাভবান হলেও জীবনযাত্রার মান ক্রমহ্রাসমান হবে।

জনসংখ্যার দক্ষ ব্যবস্থাপনা বলতে আসলে কী বোঝাতে চাইছেন?

বিকেন্দ্রীকরণেরও কিছু নীতি আছে। অনেক দেশ এর মাধ্যমে সফলতা পেয়েছে। আপনি হয়তো বলতে পারেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যা পারে বাংলাদেশ কী সেটা পারবে। সেটা ঠিক, সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। চীন যা করতে পারবে বাংলাদেশ তা করতে পারবে বা করতে হবে, বিষয়টি এমন নয়।

প্রতি বছর আমাদের চাষযোগ্য কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। এখন তাহলে আপনাকে সঠিক পরিকল্পনা করতে হবে। পরিকল্পনা করে আপনাকে ডিসেন্ট্রালাইজেশন করতে হবে। হাউজিং বা বসতবাড়ি করার সময়ে বহুতল ভবন প্ল্যান অনুযায়ী করা। কোথায় করবে, কীভাবে করবে। চাষযোগ্য জমি যাতে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত  না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ঢাকা শহর প্রতি বছর কত কিলোমিটার করে বাড়ছে, সেটা খেয়াল করেছেন। প্রতিনিয়ত ঢাকার সীমানা বাড়ছে।

ঢাকার সীমানা বাড়াতে গিয়ে কৃষিজমি হাউজিংয়ের আওতায় আনা হচ্ছে, যা যৌক্তিক নয়। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নতুন নতুন বীজ বা ফসল উদ্ভাবন করছেন। প্রযুক্তির একটা বড় ধরনের ভূমিকা বাংলাদেশে আছে। তা না হলে এ ছোট জায়গায় ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ ও বসবাস সম্ভব হতো না ।

আমি বলতে চাই, ঢাকা হলো প্রশাসনিক রাজধানী। অথচ এটি সবকিছুর রাজধানী হিসেবে বানিয়ে ফেলা হয়েছে। পড়াশোনা থেকে শুরু করে চিকিৎসা—সবকিছুর জন্য মানুষ ঢাকায় আসছে। সব সিটিকে কি একই উদ্দেশ্যে তৈরির দরকার ছিল? সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী বিকল্প রাজধানীর কথা আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। বিদ্যমান সিটিগুলোর জন্য আদর্শিক পরিকল্পনা দরকার। রাজধানীতে যেসব সেবা রয়েছে, সেগুলো রাজধানীর বাইরে বিস্তৃত করতে হবে। মানুষের জীবনমানের গুণগত উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।

 

শ্রুতলিখন: লাইছ ত্বোহা ও ফখরুল হাসান