২০৩০
সালের মধ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট’ অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। এ দুটি লক্ষ্য অর্জনে সরকারের পাশাপাশি যেসব খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, এর মধ্যে টেলিযোগাযোগ খাত অন্যতম। এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ও সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমাদানের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে বিভিন্ন ঘটনা পরিক্রমায় দেখা গিয়েছে, টেলিযোগাযোগ খাতের প্রবৃদ্ধি নানা কারণে ব্যাহত হচ্ছে। টেলিযোগাযোগ খাতের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়, এমন কোনো নীতি বা সিদ্ধান্ত সরকারিভাবে গ্রহণ না করাই উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই এমন ধরনের সিদ্ধান্ত আসছে, যা এ খাতে প্রবৃদ্ধির চাকা গতিহীন করছে।
সম্প্রতি আমরা দেখেছি, টেলিযোগাযোগ সেবার মানোন্নয়নে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কমিশন (বিটিআরসি) নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। সেবার মানোন্নয়নের প্রশ্নে দল-মত নির্বিশেষে সবাই একমত এবং এক্ষেত্রে নেয়া কোনো উদ্যোগকে সর্বস্তরের মানুষ স্বাগত জানিয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে কলড্রপের জন্য গ্রাহককে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয় বিটিআরসি। ১ অক্টোবর থেকে এ নির্দেশ কার্যকর হয়েছে। এ উদ্যোগের জন্য অবশ্যই বিটিআরসিকে সাধুবাদ জানাতে হবে। তবে কেন সেবার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জিত হচ্ছে না সেজন্য অবশ্যই সমস্যার গভীরে গিয়ে বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে। টেলিযোগাযোগ খাতে মানসম্পন্ন সেবাদানে মূলত চারটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। এগুলো হচ্ছে প্রয়োজনীয় পরিমাণ বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ, উন্নত আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থা, টাওয়ার এবং অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক। এক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরদের দাবি, উল্লিখিত চারটি বিষয়ের সব ক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণের এখতিয়ার তাদের নেই। যেমন টাওয়ার স্থাপন ও অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি অপরিহার্য, কিন্তু মোবাইল অপারেটরদের দাবি, সেবার টাওয়ার বসানো কিংবা ফাইবার অপটিক্যাল নেটওয়ার্ক স্থাপন কোনো ক্ষেত্রেই মোবাইল অপারেটরদের আইনি এখতিয়ার নেই। এক্ষেত্রে তাদের টাওয়ার কোম্পানি এবং এনটিটিএন অপারেটরদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ নির্ভরতার কারণে মোবাইল অপারেটররা চাইলেই টাওয়ার কিংবা ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা নিজেদের মতো দ্রুত সমাধান করে সেবার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করতে পারে না। অন্যদিকে টাওয়ারে কোম্পানি এবং এনটিটিএন অপারেটরদের দাবি হচ্ছে তাদের পক্ষ থেকে অত্যাধুনিক নেটওয়ার্ক সেবার সব ব্যবস্থা থাকলেও মোবাইল অপারেটররা প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা নিচ্ছে না। দুই পক্ষের এ দাবির মধ্যে সমন্বয় সাধনের দায়িত্বও বিটিআরসির। এর আগে আমরা দেখেছি, মোবাইল অপারেটরদের জন্য প্রয়োজনীয় বেতার তরঙ্গ বরাদ্দে বিটিআরসি প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। সে উদ্যোগে সাড়া দিয়ে বিশ্ববাজারের তুলনায় মোবাইল অপারেটররা চড়া দামেই বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ নিয়েছে। গ্রামীণফোন সাংবাদিকদের জানিয়েছে, ২০২১ সালে নেয়া বেতার তরঙ্গের ৮৫ শতাংশের রোল আউট সম্পন্ন হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছর বেতার তরঙ্গ নিলামের ক্ষেত্রে বিটিআরসি আগের চেয়ে উদার নীতি গ্রহণের ফলে একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১৯০ মেগাহার্টজ পরিমাণ বেতার তরঙ্গ বরাদ্দের রেকর্ড স্থাপিত হয়। বর্তমান বিশ্ববাজারে বেতার তরঙ্গ রোল আউটের জন্য যেসব যন্ত্র আমদানি করা দরকার তা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে, তার পরও মোবাইল অপারেটররা উদ্যোগী হয়েছে। কারণ বিটিআরসি তাদের উদ্যোগী করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। অতএব টাওয়ার স্থাপন এবং ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রেও বিটিআরসি কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিলে অবশ্যই এক্ষেত্রে টেলিযোগাযোগ সেবাদানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের মধ্যে একটি সুসমন্বিত এবং দক্ষ সেবাদানের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তাহলে টেলিযোগাযোগ সেবায় গুণগত মান অর্জনও সহজ হবে।
টেলিকম খাতে সম্প্রতি একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, তা হচ্ছে গ্রামীণফোনের নতুন সিম বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা। প্রতিষ্ঠানটির ওপর সিম বিক্রির নিষেধাজ্ঞা আসে গত ২৯ জুন। গ্রামীণফোনকে দেয়া বিটিআরসির চিঠিতে বলা হয়েছে, বিটিআরসির পরীক্ষায় গ্রামীণফোনের সেবার মান সন্তোষজনক মনে হয়নি। প্রশ্ন উঠছে, সেবার মান সন্তোষজনক না হলে একেবারে সিমকার্ড বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? সেবার মান সন্তোষজনক না হলে একটি অপারেটরের সিমকার্ড বিক্রিতে যদি নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়, তাহলে অন্য তিনটি অপারেটরের সেবার মান কি বিটিআরসির মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়েছে? বিষয়টি আরো স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। গ্রাহকের সিমকার্ড কেনার ক্ষেত্রে একটা স্বাধীনতা অবশ্যই থাকা উচিত। একটা অপারেটরের সিমকার্ড বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দিলে গ্রাহকের সেই স্বাধীনতাও খর্ব করা হয়। আবার বর্তমানে দেশে এমএনপি সেবা চালু আছে। এতে গ্রাহকের যেকোনো সময় অপারেটর বদলের সুযোগ আছে। ফলে কোনো অপারেটরের সিমকার্ড বিক্রি বন্ধের মতো সিদ্ধান্ত এমএনপি অপারেটরের ব্যবসার ওপরও এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ব্যবসা সম্প্রসারণ যেকোনো লাইসেন্সধারী বৈধ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মৌলিক অধিকার। কাউকে এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কি লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের আছে? গ্রাহক সেবার মানোন্নয়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। সে ব্যবস্থা কঠোর শাস্তিমূলকও হতে পারে, কিন্তু তা অবশ্যই মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করে নয়। মোবাইল অপারেটররা কেন মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে পারছে না, সে বিষয়টির কারিগরিভাবে আরো গভীর অনুসন্ধান করা উচিত বিটিআরসির।
বর্তমানে চারটি অপারেটরই বড় সংখ্যায় গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। গ্রাহক সংখ্যার তারতম্য আছে। বাজারে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এ ধরনের তারতম্য হতে পারে। আবার একেক অপারেটর দেশের একেক অঞ্চলে নেটওয়ার্কের বিস্তৃতিতে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। বাংলাদেশে বিদ্যমান মোবাইল টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক বিস্তৃতির প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের এমন ১৩ শতাংশ ভৌগোলিক এলাকা রয়েছে যেখানে গ্রামীণফোন ছাড়া অন্য কোনো অপারেটরের নেটওয়ার্ক এখন পর্যন্ত নেই। এখন এসব এলাকার কোনো মানুষ এতদিন মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে ছিল, সেও যদি নেটওয়ার্কে আসতে চায়, এ মুহূর্তে কী করবে?
দেশের টেলিকম খাতের দুটি প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। যখন আমরা একটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করি, তখন একবারও ভেবেছি কিনা এদের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের কথা। এছাড়া সিম বন্ধ বা সীমিত পরিসরে চালুর নির্দেশনার ক্ষেত্রে গ্রাহকের পাশাপাশি খুচরা বিক্রেতাদের কথাও বিবেচনা করা উচিত। হাজার হাজার রিটেইলার আছেন সিম বিক্রি করে আয় করেন। রিসাইকেল সিম বিক্রিতে কিন্তু এসব রিটেলারের বিক্রির পরিমাণ বেশি হয় না। এ দুর্মূল্যের বাজারে খুচরা বিক্রেতাদের আয় কমে যাওয়া তাদের জীবনধারণকে আরো কঠিন করে তুলেছে। হয়তো সিম বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার আগে সেভাবে বিষয়টি ভেবে দেখা হয়নি।
সর্বোপরি, টেলিযোগাযোগ খাতে সেবার মান খারাপ, এটা হলো রোগ। আগে রোগের কারণ ভালোভাবে নির্ণয় করতে হবে, এরপর ওষুধ নির্ধারণ করতে হবে। সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করা না হলে রোগ সারানো কঠিন। সঠিক চিকিৎসার জন্য শুধু রোগ নির্ণয় নয়, রোগের ইতিহাস এবং রোগীর শরীরের অন্যান্য অংশের অবস্থা কেমন আছে, কোন ধরনের ওষুধে রোগীর কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়, সেসব সম্পর্কেও চিকিৎসককে জেনে নিতে হয়। একইভাবে মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতে সেবার গুণগত মান কেন যথাযথ নয়, তার কারণ সঠিকভাবে নির্ধারণ না করে কোনো চূড়ান্ত নীতি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ যুক্তিযুক্ত নয়। আমার বিবেচনায় একটি অপারেটরের সিমকার্ড বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্ত অনেকটা রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসার জন্য ব্যবস্থাপত্র দেয়ার মতো। গত দুই বছরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সত্যিই কিছু ভালো পদক্ষেপ দেখা গিয়েছে গ্রাহক সেবার মানোন্নয়নে। আশা করি, গ্রাহকসেবার নিম্নমানের বিষয়টিরও যথাযথ কারিগরি অনুসন্ধান করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সে অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হবে। এর আগে অ্যাডহক ভিত্তিতে নেয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবতার নিরিখে পুনর্বিবেচনা করবে বলেও আমরা প্রত্যাশা করতেই পারি।
রাশেদ মেহেদী: টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক










