বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবেই ঘূর্ণিঝড়প্রবণ দেশ হওয়ায় প্রায় প্রতি বছরই আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এর ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও মানুষের মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশের জন্য একটি করুণতম অধ্যায়। তার পরও রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় যে অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখা যায়, তা সর্বজনীনভাবে অপ্রত্যাশিত।
সর্বশেষ সোমবার রাতে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং উপকূলে আঘাত হানার পর প্রাণহানিসহ জমির ফসল বিনষ্ট ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। জীবননাশের ক্ষেত্রে পানিতে ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি গাছচাপায় মৃত্যুর ঘটনাই বেশি। সময়মতো উপকূলবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে এবারো ব্যর্থতার চিত্র দেখা গিয়েছে। এমন দুর্যোগের জন্য যেখানে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ আগে প্রস্তুতি নিতে হয়, সেখানে মাত্র দুদিন আগে সবাইকে সতর্ক করে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো সম্ভব হয়নি। এমনকি আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আগে ভাত খাওয়ার সময় কিংবা ঘরে ফেরার সময় রাস্তায় গাছ পড়ে মৃত্যুর ঘটনাও দেখা গিয়েছে। স্বামী-স্ত্রী সন্তানসহ পুরো পরিবারই চোখের পলকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
রাজধানী ঢাকাতেও ঘূর্ণিঝড়ের ফলে সৃষ্ট বৃষ্টিপাতে তীব্র জলজট দেখা দেয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এভাবে দ্রুত এসে দ্রুতই চলে যায় ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং। এ ঘূর্ণিঝড়টির গতিপথ নির্ণয় করা কঠিন ছিল বলে আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন। ঘূর্ণিঝড়টি শুরু থেকেই এলোমেলো আচরণ শুরু করে বারবার গতিপথ পাল্টিয়েছে। সিত্রাং আসার পথে বৃষ্টি ঝরিয়ে নিজের শক্তি ক্ষয় করায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।
ঘূর্ণিঝড়টির অগ্রভাগ সোমবার সন্ধ্যায় এবং মূল কেন্দ্র রাতে উপকূলে আঘাত হানে। শক্তি হারিয়ে নিম্নচাপে পরিণত হয়ে সিত্রাং বাংলাদেশ ছেড়েছে। যাওয়ার আগে রেখে গিয়েছে আঘাতের ক্ষত।
সোমবার রাতে ভোলার কাছ দিয়ে বরিশাল চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম শুরু করে সিত্রাং। পরবর্তী ৩-৪ ঘণ্টা তাণ্ডব চালিয়ে এটি উপকূল অতিক্রম করে। তারপর এটি দুর্বল হয়ে বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল পেরিয়ে ভারতের দিকে চলে যায়।
ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রভাগের প্রভাবে রোববার থেকেই দেশের আবহাওয়া পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। উপকূলীয় এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি শুরু হয়ে সোমবার দিবাগত মধ্যরাত পর্যন্ত চলে। রংপুর বিভাগ ব্যতীত মোটামুটি সারা দেশেই ভারী বৃষ্টিপাত হয়, কোথাও কোথাও অতিভারী বৃষ্টি হয়। এর মধ্যে সূর্যের দেখা মেলেনি।
সিত্রাংয়ের তাণ্ডবের সময় উপকূলীয় জেলা নোয়াখালী, ভোলা, বরিশাল ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ৯ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসও দেখা দেয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে সারা দেশের ৪১৯টি ইউনিয়নে আনুমানিক ১০ হাজার বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছয় হাজার হেক্টর ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে। এক হাজার মত্স্যঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রথমে বরগুনার পাথরঘাটা, পটুয়াখালীর কলাপাড়া দিয়ে আঘাত হানার কথা থাকলেও দিক পরিবর্তন করে সেটি ভোলার ওপর দিয়ে যায়। এতে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিল তেমনটা ঘটেনি।
এক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার উপায় নেই। কারণ পূর্ণশক্তি দিয়ে আঘাত না হেনেও সিত্রাং যে ক্ষয়ক্ষতি করেছে, মাত্রা তীব্র হলে আমরা আরো তীব্র সংকটময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতাম।
নিয়মিত ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলেও জাতীয়ভাবে দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি যে যথেষ্ট নয়, সেটি বারবার ফুটে উঠছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণকাজে এখনো মন্থর গতি দেখা দেয়। ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি অর্থ বরাদ্দ হলেও মেরামতের কাজ শুরু করা হয়নি এমন বাঁধও রয়েছে। এর আগে ঘূর্ণিঝড় আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত খুলনা উপকূলের কয়রা উপজেলার হরিণখোলা ও গাতিরঘেরীর বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়ায় স্থানীয়দের নিয়ে মেরামতের কাজ চলছে। উপজেলার হোগলা, দোশহালিয়া, মদিনাবাদ লঞ্চঘাট, ঘাটাখালী, গাববুনিয়া, আংটিহারা, ৪নং কয়রা সুতির গেট ও মঠবাড়ির পবনা পর্যন্ত বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হলেও সেখানে বেড়িবাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দেয়ার এক যুগ অতিবাহিত হলেও আজ অবধি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরে প্রতি বছর সাত-আটবার নিম্নচাপ তৈরি হয়। এর মধ্যে কোনোটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। এ ঘূর্ণিঝড় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভারতের ওডিশা ও অন্ধ্র উপকূল এবং বাংলাদেশে আঘাত হানে। আবহাওয়ার চক্রে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির প্রবণতা কোনো কোনো দশকে বেড়ে যেতে পারে। ২০০৭ সালে ‘সিডর’ ও ২০০৯ সালে ‘আইলা’ বাংলাদেশে আঘাত হানার পর ১০ বছর ধরে প্রায় প্রতি বছর একটি করে ঘূর্ণিঝড় আঘাত করছে। অতীতেও দেখা গিয়েছে, ষাটের দশকজুড়ে প্রায় প্রতি বছর একাধিক ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশে আঘাত করেছে।
খুব স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে, আমাদের ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে ও বোধগম্য করে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে দেশের এ অঞ্চলকে আরো বেশি করে প্রস্তুত করতে হবে। বেড়িবাঁধগুলো সিডর ও আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তা এখনো পরিপূর্ণভাবে মেরামত করা হয়নি। অনেক এলাকা ও দ্বীপে বেড়িবাঁধও নেই। বরিশাল, নোয়াখালী ও সন্দ্বীপ উপকূল এবং মেঘনার মোহনায় সুন্দরবনের মতো বড় বনভূমি নেই। আবার সেখানকার নদীগুলোও অনেক বড়। ফলে জলোচ্ছ্বাস দ্রুত বসতি এলাকা প্লাবিত করে। যে কারণে এ এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে ক্ষতি বেশি হয়।
তাই চট্টগ্রাম ও বরিশাল অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় আঘাত করলে এমনিতেই ক্ষতি বেশি হবে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সব উপকূলীয় এলাকাকে এখন থেকেই প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলা করতে হতে পারে। এজন্য সরকারের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকতে হবে।
ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের আরো জোরালো তত্পরতা প্রয়োজন। দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে আমাদের দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই বাঁচতে হবে। এজন্য দুর্যোগ প্রতিরোধে যথাযথ প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। দুর্যোগ-পরবর্তী শুধু ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করে কোনো পরিবর্তন আসবে না। এ সময়ে দুর্যোগপীড়িত জনগণকে যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে দুর্যোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে অধিকতর কার্যকর করতে সরকারের আন্তরিক ভূমিকা প্রয়োজন। উপকূলে বাস করা মানুষগুলো এ দেশেরই নাগরিক, ঘূর্ণিঝড়ের আগে প্রচুর বৃষ্টি নামার সময় শহরের মানুষ যখন খিচুড়িবিলাস করে, তখন উপকূলের মানুষকে নিজের ঘর বাঁচানোর চিন্তায় থাকতে হয়। তাই শহরমুখী দৃশ্যমান উন্নয়নের পাশাপাশি উপকূলে বসবাসরত মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিত করতে সরকারকেই কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে।










