এখন থেকে চাল-গমসহ নয়টি নিত্যপণ্যের দাম বেঁধে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রীর মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বর্তমানে আর্থিক সংকটে মানুষ। মূল্যস্ফীতি চড়া। আয় বাড়েনি বড় একটা জনগোষ্ঠীর। ফলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছে। তার মধ্যে নানা অজুহাতে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে তত্পর। বেশকিছু পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে পড়তির দিকে, কিন্তু দেশের বাজারে বাড়ছে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে যতটুকু বাড়ছে, দেশের বাজারে বাড়ছে তার চেয়েও অনেক বেশি। এতে ভুগছেন ভোক্তা সাধারণ। এ অবস্থায় ভোক্তাকে সাময়িক স্বস্তি দিতে চায় সরকার। সরকারের ইচ্ছাটা সুবিবেচনাপ্রসূত; কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থায় উদ্যোগটি কতটুকু কাজ করবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। দেশের বাজারে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বরাবরই দুর্বল। এখানে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের অন্যায্য আঁতাতের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা ও প্রভাব অনেক বেশি। ফলে বাড়তি মুনাফা ধরেই ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধাজনক দামই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নির্ধারণ করা হয়। তদুপরি বাজার তদারকিতে সক্ষমতার অভাবে ওই নির্ধারিত দামও কার্যকর করা যায় না। না ব্যবসায়ী, না খুচরা বিক্রেতা— কেউই ওই দামে পণ্য বিক্রি করেন না। কাজেই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে যে দাম ঠিক করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, তাতে সুফল মিলবে কি?
অনেক দিন ধরে দেশে নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির। আন্তর্জাতিক বাজারে ঊর্ধ্বমুখিতার যুক্তি দেখিয়ে ক্রমেই দাম বাড়ানো হচ্ছে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এক বছরে গমের দাম বেড়েছে ৮ শতাংশ। অথচ দেশের বাজারে খোলা আটা ও ময়দা ৬৭ শতাংশ, প্যাকেট আটা ৬৪ ও প্যাকেট ময়দা ৫৯ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত চিনির দাম কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। কিন্তু দেশের বাজারে উল্টো চিনির দাম এক বছরে বেড়েছে ১৫ শতাংশ। একইভাবে এক বছরে বিশ্ববাজারে মসুর ডালের দাম কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। অথচ দেশের বাজারে তা বেড়েছে মানভেদে ২৯-৩৯ শতাংশ। এমএস রডেরও একই অবস্থা। এক বছরে স্টিল স্ক্র্যাপের দাম কমেছে ১৪ শতাংশ। দেশের বাজারে ৬০ গ্রেডের রড ১৫ শতাংশ এবং ৪০ গ্রেডের রড ১৬ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া সিমেন্টের দাম বেড়েছে এক বছরে ৩১ শতাংশ। স্পষ্টতই যে মাত্রায় দাম বাড়ানো হচ্ছে, তা অগ্রহণযোগ্য ও অযৌক্তিক। বিরাজমান পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অবশ্য দাম বেঁধে দেয়া বাস্তবসম্মত নয়। এখানে চাহিদা ও জোগানের স্বাভাবিক নিয়মেই পণ্যমূল্য নির্ধারণ হওয়াটাই দস্তুর। তবে অনেক দেশে পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, চাহিদা, জোগান ও দামের বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সরকারের হাতে থাকে। তথ্য-উপাত্তগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন পণ্যের সম্ভাব্য বা নির্দেশক দাম নিয়মিত প্রকাশ করা হয়। এতে করে ভোক্তারা অন্তত এটা ধারণা করতে পারেন, তারা কতটা বেশি দিয়ে কিনছেন। সমরূপভাবে বিক্রেতার ওপরও একটা পরোক্ষ নৈতিক চাপ তৈরি হয়। সবচেয়ে বড় কথা, কোথাও বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে কিনা, কৃত্রিম কারসাজি হচ্ছে কিনা তা কঠোরভাবে নজরদারি করা হয়। অসংগতি বা অনিয়ম পেলে সঙ্গে সঙ্গে শক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়। ফলে সেসব দেশে পণ্যের অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধির সুযোগ নেই বলা চলে।
সরকারি তরফে বলা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা ও অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলারের দর বাড়ার সুযোগ নিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের দাম অতিমাত্রায় বাড়ানো হয়েছে, যা হওয়া উচিত ছিল না। ধারাবাহিকভাবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তাতেও প্রকৃত দামে বিক্রি নিশ্চিত করা যায়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে ভোক্তার কাছে বাড়তি দাম আদায় করা হয়েছে। মূলত এটা প্রতিরোধ করতেই নয়টি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তবে এ পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সংশয় প্রকাশ করছেন। তারা বলছেন, যেসব পণ্যের সরবরাহকারী সীমিত, সেক্ষেত্রে মূল্য বেঁধে দেয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু যেখানে বহু ক্রেতা-বিক্রেতা এবং স্তর রয়েছে, সেক্ষেত্রে পণ্যমূল্য বেঁধে দেয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। তাছাড়া দেশের পণ্য কাঠামোয় কোনো গ্রেডিং করার ব্যবস্থা নেই। পণ্যের গুণগত মান নির্ণয়ে নেই কোনো পরিমাপক। আবার কোথায় কতটা মূল্যসংযোজন হচ্ছে, তার হিসাবও নেই। সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত উদ্যোগের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। এতদিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুধু চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করে দিয়ে আসছে। কিন্তু ওই নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন করা যায়নি। ডলারের বাজারেও একই কথা প্রযোজ্য। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের দর ৯৫ টাকা বেঁধে দিয়েছে। অথচ ব্যাংকে ও কার্ব মার্কেটে কোথাও সেই দামে ডলার বিক্রি হচ্ছে না। কম-বেশি ফারাক থাকছে অন্তত ১০ টাকা। কিংবা কিছু ক্ষেত্রে তারও বেশি। সুতরাং উল্লেখিত নয় পণ্যের ক্ষেত্রেও যে তেমনটা হবে না, তার নিশ্চয়তা নেই।
আমরা দেখছি, সরকারের পক্ষ থেকে ট্যারিফ কমিশন বিশ্ববাজার, স্থানীয় মজুদ ও চাহিদা পরিস্থিতি নিয়মিত বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন পণ্যের দাম কী হতে পারে, তার একটা প্রতিবেদন তৈরি করে আসছে কয়েক বছর ধরে। বাস্তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তার চেয়ে বেশি দামে ভোক্তাকে পণ্য কিনতে হয়েছে। এর বড় কারণ দেশে এখনো সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে না ওঠায় সিন্ডিকেট তৈরি হতে পারে সহজে। সিন্ডিকেট চাইলে ইচ্ছামতো দাম বাড়াতে পারে। অতীতে বহুবার এমনটা দেখা গিয়েছে। তাই শুধু দাম বেঁধে দেয়া সমাধান নয়, সেই অনুযায়ী বিক্রি হচ্ছে কিনা তা নিবিড়ভাবে নজরদারি করাও প্রয়োজন। তাছাড়া বাড়তি মুনাফা ধরে দাম নির্ধারণ করলে তাতে শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদেরই লাভ। বরাবরই এক ধরনের সমঝোতাভিত্তিক দাম নির্ধারণ হয়ে আসছে। এতে ভোক্তা স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে। তাই ভোক্তাদের স্বার্থ বিবেচনা করে বাজার নিয়ন্ত্রণে এখন সরকারের উচিত মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উপায় খুঁজে বের করা।
চলমান অস্থিতিশীল বাজার পরিস্থিতিতে নয়টি পণ্যের যে দাম বেঁধে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে সদিচ্ছাপ্রসূত। কিন্তু সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে নিকট-অতীতে এ ধরনের উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তাই দাম বেঁধে দেয়ার আগে বাজার তদারকি, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, পদ্ধতিগত উন্নয়ন এবং ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা উন্নয়নেই বেশি দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক।










